Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসু বিষয়ক সতেরো

‘ব্রাত্য রাইসু’ নামের সঙ্গে পরিচয় স্কুলে পড়ার সময়। পত্রিকায় উনার বইয়ের নাম দেখছিলাম—আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি। নামটা তার অভিনবত্বের কারণেই মাথায় থেকে গেছিল। আর সাহিত্য পাতায় পরে তার ‘নদীমধ্যে গুরুসঙ্গ’ পইড়া মজা পাইছিলাম। যোগাযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর।

যোগাযোগ বলতে উনার ইয়াহু গ্রুপ কবিসভায় কী উপলক্ষ্যে জানি কবিতা চাইছিল, আমি মেইল করে কবিতা পাঠাইছিলাম। রাইসু ভাই সেগুলি গোনায় ধরেন নাই। কী হইল জানতে চেয়ে আমি মনে হয় আবার মেইল দিছিলাম। উনি অইটার আর রিপ্লাই করেন নাই বোধ হয়। মনে নাই ঠিক।

রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ২০১৪ তে। মূলতঃ অর্থসংক্রান্ত কারণে। তখন আমার পেপাল অ্যাকাউন্টে ডলার থাকত, উনি আমার থেকে সেই ডলার কিনে নিয়ে সাম্প্রতিক ডটকম সহ তার আর আরো কী কী ওয়েব সাইটের ডোমেইন, হোস্টিং এইগুলার পেমেন্ট করতেন। উনারে আমার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটায় দিছিলেন রক মনু ভাই। তারপর কেমনে কেমনে জানি রাইসু ভাই বন্ধু মানুষ হয়ে গেলেন। উনারে নিয়া ৫০ খানা কথা লিখব ভাবছি—বিগত ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে।

ইফতেখার ইনান

১. রাইসু ভাইয়ের বয়স ৫০ বছর হইছে এইটা আমার জন্য একটা স্বস্তির ঘটনা। উনার বয়স ৫০—এতে আমার কাছে ৫০ বছর বয়সের কোয়ান্টিটেটিভ ভ্যালু কমে গেছে এবং কোয়ালিটেটিভ ভ্যালু বেড়ে গেছে। ৫০-এর যেই বুড়া টাইপ ইম্প্রেশন মাথায় ছিল সেইটা উনি বদলায় দিছেন।

২. রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক দিন পর পর ফোনে কথা হয়—আমি না হয় উনি কল করেন। উভয় ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো প্রয়োজনে কল করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সেই প্রয়োজন পূরণ করতে পারি না। তাতে কিছু অবশ্য যায় আসে না। আবারো বেশ কিছুদিন পর হয় আমি না হয় উনি আমারে কল দেন। এইটা মজার ব্যাপার—পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিমবায়োটিক যে অংশটি থাকে, রাইসু ভাই এবং আমার মধ্যে সেখানে সিমবায়োসিস-এর শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও তা চলমান আছে।

৩. ফোনে কথা হওয়ার চাইতে আরো অনেক অনিয়মিত ঘটনা উনার সঙ্গে দেখা হওয়া। তবে দেখা হইলে উনার সঙ্গে লম্বা সময় কাটানো হয়। নানা বিষয় নিয়া কথা হয়—খালি শিল্প-সাহিত্য নিয়া কোনোদিন কথা হইছে বলে মনে পড়ে না। একবার অবশ্য উনি আমারে জিগাইছিলেন আমি কী ধরনের বই কিনে পড়ি। সেইটা মনে হয় সার্ভে ছিল একরকম। আমি উনার বই ও লেখাও কম পড়ছি। তাই উনি লেখক, কবি, চিন্তক, বুদ্ধিজীবীসহ আরো যে যে সত্তা ধারণ করে থাকেন সেসব থেকে উনার ব্যক্তিসত্তাই আমি বেশি পর্যবেক্ষণ করতে পারছি। ব্যক্তি হিসেবে রাইসু ভাই অসাধারণ ও বিরল মানুষ—উনি অন্য মানুষের প্রতি প্রচুর পরিমাণ এমপ্যাথি ধারণ করেন এবং যে কোনো মানুষের সঙ্গে ইন্টারেক্ট করার সময় অই মানুষের প্রতি আন্তরিক সম্মানসহ ইন্টারেক্ট করেন। রাইসু ভাই নানা পরস্পরবিরোধিতা নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন, কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমি কোনো পরস্পরবিরোধিতা বা ইনকনসিসটেনসি দেখি নাই—সকল শ্রেণীর ও বয়সের মানুষের সাথে একই রকম ব্যবহার করেন উনি, একই রকম সহানুভূতি ও সম্মানবোধ সহকারে।

৪. রাইসু ভাইয়ের যা যা কবিতা, গল্প পড়ছি তার কিছু আমার ভালো লাগছে, বেশির ভাগ ভালো/খারাপ কোনোটাই লাগে নাই—তবে উনার বেশির ভাগ লেখাই, সেটা কবিতা হোক আর ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাস, চিন্তা উস্কাইতে সক্ষম। এইটা উনারে অন্যদের থেকে আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ কইরা তুলছে বলে মনে করি। অন্যদের বলতে এইখানে আমি বাংলাদেশের যে সকল ব্যক্তি ফেসবুক ও অন্যান্য মিডিয়াতে বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করে থাকেন তাদের বোঝাতে চাচ্ছি। রাইসু ভাই ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে আমার পর্যবেক্ষণ হল তারা মূলত বিভিন্ন সোর্স থেকে নানা জিনিস সংগ্রহ কইরা রিসাইকেল করে সেটা পোস্ট বা পাবলিশ করে থাকেন। এই কারণে তাদের আলাদা বা গুরুত্বপূর্ণ বইলা বিবেচনা করতে পারি না।

৫. রাইসু ভাই অনেক কিছু করেন—তিনি লেখেন, আঁকেন, কথা বলেন, চিন্তা করেন, গান করেন, এমনকি অভিনয়ও করছেন। এই অনেক কিছুর মধ্যে উনার যেই প্রতিভায় আমি বিমুগ্ধ সেইটা হলো উনার নামকরণের প্রতিভা। তিনি তার উদ্যোগ ও কার্যক্রমের অসাধারণ সব নাম দিতে পারেন। যেমন ধরেন, পুস্তক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বহিঃপ্রকাশ’—কী দারুণ!

৬. অনলাইন মার্কেটিং, ওয়েবসাইট ম্যানেজমেন্ট, কই থেকে কী টুল পাওয়া যায়, সেইগুলা দিয়া উনি কী কী করতে পারেন, উনার যে সব ওয়েবভিত্তিক উদ্যোগ আছে সেইগুলারে কেমনে আরো বড় করা যায়—এই সব নিয়া রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে সবচাইতে বেশি কথা বলছি। উনি গভীর মনোযোগ নিয়া সে সব শুনছেন, নোট রাখছেন, এবং কার্যত যা কিছু করার প্ল্যান হইছে তার মধ্যে বেশি হইলে ১০% করছেন।

৭. উনি আমাকে নানা সময়ে নানা বিষয়ে লিখতে বলছেন, বিষয় ছাড়া যা খুশি লিখতেও বলছেন। আমিও প্রতিবার গভীর আগ্রহে কী নিয়ে লেখা যায়, কেমন হইতে পারে, কত দিনের মধ্যে লেখাটা দেয়া দরকার এইসব জিজ্ঞাসা করছি, নোট রাখছি এবং এখন পর্যন্ত কোনো একটা লেখাও লিখি নাই। দেখা যাইতেছে রাইসু ভাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার থেকে বেশ এগিয়ে আছেন, অন্ততঃ ১০ ভাগ।

৮. ২৫ থেকে ৩৫ বছরের বিরহকাতর, প্রেমে হতাশ, কর্মজীবনে অসফল জনতা মনোরোগ চিকিৎসক বা কোয়ান্টাম মেথড বা ইউনানী পদ্ধতির বদলে রাইসু ভাইকে প্রেরণা হিসেবে নিতে পারেন। উনি ৫০ বছরে এসেও দারুণ উদ্যমী, জীবন ও জগতের আগ্রহী পর্যবেক্ষক এবং তার জীবনে প্রেমের ব্যাপক প্রাচুর্য। রাইসু ভাই একবার বললেন, “বস আমার যে কত প্রেমিকা, এরা যে কী মজার মজার কাহিনী করে!” এবং ঘটনা সত্য।

৯. একবার প্রায় মধ্যরাতে রাইসু ভাইকে তার বাসা থেকে নিয়া গেলাম ধানমণ্ডির স্টার-এ, সঙ্গে আমার বন্ধু জাহিদ। বন্ধু জাহিদের তখন একটা সিনেমাসুলভ রোমান্টিক কাহিনী চলতেছে, যার নায়িকা তখনো সাড়া দেয় নাই—একরকম তাড়ায়ে দিছে আসলে, কিন্তু আমরা চেষ্টা চালায় যাইতেছিলাম। জাহিদের প্রেমকাহিনী শুনতে শুনতে রাইসু ভাই বলল, এই রকম যতদিন প্রেমটা হবে না ততদিনই প্রেম থাকবে। প্রেম হইয়া গেলেই প্রেম শেষ।

১০. উপরের পয়েন্টে উনার প্রেম বিষয়ক কথাখানি একটা চমৎকার প্যারাডক্স। কিন্তু বক্তব্য বুঝতে এবং সেইটারে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করতে আমার বা আমার বন্ধুর সমস্যা হয় নাই। উপরের পরস্পরবিরোধী কথাটা আলাপের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা একেবারেই বাদ দিয়া কমুনিকেট করতেছে—এই পর্যবেক্ষণ ফেসবুকে রাইসু ভাইয়ের নানা রকম আপাত প্যারাডক্সধর্মী বক্তব্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে। অন্ততঃ আমারে কিছু ক্ষেত্রে করছে বলে মনে হয়।

১১. উনার সম্পর্কে অন্যদের লেখাগুলি পড়লাম। বেশ কয়েকজন তারে একজন বিরল ধরনের মানুষ হিসেবে গণ্য করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন যে উনি ভণ্ড না। এবং এইটা আমারও পর্যবেক্ষণ—রাইসু ভাই খুবই অথেনটিক একজন পারসন, সন্দেহ নাই। উনার অথেন্টিসিটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হইয়া উঠছে—এইটা দুঃখজনক। এইটা দিয়া আমাদের দেশের মর্মান্তিক অবস্থাটা বোঝা যায়। যেই দেশে একজন ব্যক্তির অথেন্টিসিটি তারে বিরল বা বিশেষ কইরা তোলে সেই দেশের সার্বিক অবস্থা খুব একটা সুবিধার না।

১২. রাইসু ভাইয়ের কোনো প্রেমিকার সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ হয় নাই। হয় নাই বলে আফসোস করছি, এমন না। ইন ফ্যাক্ট, তার পরিমণ্ডলের তেমন কাউরেই আমি চিনি না। এইটা বেশ অস্বাভাবিক—উনার একাধিক বাসায় আমি দীর্ঘ সময় পার করছি, সুতরাং। স্কয়ার হসপিটালের উল্টা দিকের বাসায় মনে হয় এক বা একাধিক রাতেও থাকছি—থাকছি বলতে ঘুমাইছি আর কি, যতদূর মনে পড়ে। তবে এইটা আমি বুঝতে পারি যে উনার পরিচিত মানুষের পরিমণ্ডল অনেক বিশাল—কিন্তু উনি সম্ভবত উনার অথেন্টিসিটির কারণেই বেশির ভাগ মানুষের সাহচর্যে স্বস্তিবোধ করেন না বা অনেক মানুষ তার সাহচর্যে অস্বস্তি বোধ করে অথবা দুইটাই। আমার মনে হইছে উনি অপেক্ষাকৃত কম বয়সের মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করেন—তারা জীবনের যাবতীয় ভাণ তখনও রপ্ত কইরা ওঠে নাই বইলাই বোধহয়।

১৩. রাইসু ভাইয়ের পরিমণ্ডলের কিছু মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হইছিল উনার সঙ্গে শাহবাগের এক বার-এ গিয়া। পিকক ছিল বোধহয়। অইখানের ওয়েটার থেকে অতিথি—সবাই তারে চিনে। নিজের নাম মনে করতে পারতেছে না এই লেভেলের টাল, কিন্তু রাইসু ভাইরে দেইখা ঠিকই ডাক দিতেছে—অবস্থা অনেকটা এইরকম ছিল। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, রাইসু ভাইকে যারা অফলাইনে চিনেন তারা উনারে বেশ পছন্দ করেন। রাইসু ভাই সহজ মানুষ, তারে পছন্দ করাও সহজ।

১৪. রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার আগে একটা বিষয় নিয়া আশঙ্কিত ছিলাম—কোথাও পড়ছি বা কারো থেকে জানছিলাম যে ব্রাত্য রাইসু নাকি হুমায়ুন আহমেদের হিমু নামক ভাদাইম্যা চরিত্রের বাস্তব রূপ। পরে হিমু বিষয়ক কোনো একটা বইয়ের উৎসর্গ রাইসু ভাইকে করা হইছে—এটা আবিষ্কার করে আশঙ্কা আরো প্রবল হইছিল। হিমু আমার খুবই অপছন্দের একটা চরিত্র। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সত্তর ও আশির দশকে জন্ম নেয়া প্রজন্মের মেয়ে অংশের বিরাট ক্ষতিসাধন করছেন শাহরুখ খান আর ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটা করছেন হিমু নামক এই চরিত্র। পরবর্তীতে স্বস্তির সঙ্গে দেখলাম যে রাইসু ভাই মানুষটারে কোনো দিক দিয়াই হিমুর সঙ্গে মিলানো যায় না। উনি র‍্যান্ডম কাজ করেন না, মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন না, অদৃষ্টের হাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি ছেড়ে দিয়ে মহানন্দে ঘুরে বেড়ান না, খালি হিমুর মতো অ্যাটেনশন পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন, তাও সেইটা ফেসবুকে।

১৫. ব্যক্তি রাইসু সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণা পাইছিলাম আনিকা শাহ-এর থেকে—যখন তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। আনিকা রাইসু ভাইকে ভীষণ পছন্দ করতেন, এখনো বোধ করি করেন। আমরা রাইসু ভাইরে নিয়া অনেকবার কথাও বলছি মনে পড়ে। আনিকার থেকে রাইসু বিষয়ক কিছু গল্প শুনছি—শুনতে শুনতে রাইসু ভাইয়ের প্রতি তার মুগ্ধতা টের পাইছি। যেহেতু আনিকার প্রতি আমার অপার মুগ্ধতা ছিল (এবং আছে) সেহেতু তিনি যখন অন্য কারো প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করছেন তখন আমি ঈর্ষাকাতর হইতে পারতাম। সেটা একেবারেই হয় নাই—বরং আমিও রাইসু ভাইয়ের প্রতি মুগ্ধতা বোধ করছি। রাইসু ভাইয়ের ক্ষেত্রেই এইটা সম্ভব।

১৬. ছোট বড় নানা বিষয়ে আমার নিজের যেসব ধ্যান-ধারণা আছে সেগুলা খুবই শক্ত—নিজের বুঝের বিপরীত কোনো ধারণা আমি সহজে গ্রহণ করি না। অপরের কনভিন্সিং আরগুমেন্ট শুনে হয়তো আমি চুপ করে যাব, কিন্তু আদতে মোটেই কনভিন্সড হব না। তো আমার এইরকম একটা ধারণা হইল—কথা বলার সময় আমরা উচ্চারণ করি ‘করতেসি/ যাইতেসি’ এইরকম, সুতরাং লেখার সময় নাগরিক চলতি ভাষাতেই যদি লেখি তাহলে এইগুলা ক্ষেত্রে ‘ছ’ এর বদলে ‘স’ লেখা উচিত। রাইসু ভাইয়ের লেখায় দেখতাম উনি নাগরিক চলতি ভাষাতে লিখতেছেন—‘করতেছি/যাইতেছি’ ছ দিয়াই লেখেন। এইটা আমার মৃদু বিরক্তি উদ্রেক করতো। একদিন উনারে জিগাইলাম। রাইসু ভাই সেদিন যা বলছিলেন তার সারমর্ম হইল, ইংলিশ বর্ণমালায় এমন অনেক লেটার আছে যেগুলার এক এক শব্দের ক্ষেত্রে এক এক উচ্চারণ। সহজ উদাহারন, C অক্ষরটি। ক, চ, ছ—অনেক রকম উচ্চারণ এইটার, সেইটা নিয়া আমাদের মাথাব্যথা নাই। একটা অক্ষরের একাধিক উচ্চারণ হইতে পারে সেটা আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি, কিন্তু বাংলাতে এইটা মানতে নারাজ। ‘স’ উচ্চারণ ‘ছ’ অক্ষর দিয়া লিখা যাইতেই পারে আসলে। আমি রাইসু ভাইয়ের কথায় কনভিন্সড হইলাম এবং ছ/স বিষয়ে আমার চিন্তা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা থেকে ফেলে দিয়ে তারপর থেকে ‘করতেছি/যাইতেছি’ ধরনের বানান লিখছি, প্রমাণ এই লেখা। রাইসু ভাই এইটাও বলছিলেন যে ‘ছ’ অক্ষরটাকে অনেকেই গ্রাম্য/ আনস্মার্ট গণ্য করেন। আমি এইটাতেও একমত।

১৭. রাইসু ভাইয়ের একটা প্রতিষ্ঠান তথা মিডিয়া-বিরোধী ইমেজ প্রচলিত আছে। তিনি সেটা হইতেও পারেন। তবে রাইসু ভাই ইন্টারনেট নামক মিডিয়া যে শুধু আগ্রহের সঙ্গে ব্যবহার করেন তাই না, উনি ইন্টারনেটে যে সকল হাবিজাবি আর্টিকেল পাওয়া যায় সেগুলি পড়েন এবং দারুণভাবে প্রভাবিতও হন। প্রভাবিত হয়ে তিনি প্রায়ই শিশুসুলভ (এবং হাসাহাসি করার মতো) কাজ কারবার করে থাকেন। একবার বললেন যে উনার আর চশমা পরার দরকার নাই—কোনো এক ওয়েব সাইটে তিনি এক লেখা পড়ছেন যেখানে কিছু কায়দা দেয়া আছে যা প্র্যাক্টিস করলে নাকি চোখের সমস্যা এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। তো সেই সব কায়দা তিনি প্র্যাকটিস করে যাচ্ছেন আর কি। এইরকম তিনি মাঝে মাঝে নতুন ও বৈপ্লবিক ডায়েট ট্রাই করেন, ইয়োগা করার পরিকল্পনা করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

রাইসু ভাই সম্পর্কে ৫০টা পয়েন্ট বা টীকা লেখার ইচ্ছা নিয়া এইটা লেখা শুরু করছিলাম। প্রায় ২ বছর হয়ে গেছে, লেখাটা শেষ করতে পারছি না। রাইসু ভাই বহুমাত্রিক ও বর্ণময় চরিত্র, তার সম্পর্কে ৫০টা পয়েন্টের বেশিই লেখা সম্ভব। লেখা শেষ করতে না পারার পিছনে মূল সমস্যা আমার আলস্য। এই জন্য সিদ্ধান্ত নিলাম যে তিন ভাগে লিখবো, প্রথম দুই ভাগে ১৭টা করে পয়েন্ট, শেষ কিস্তিতে ১৬টা। তাহলে সম্ভবত শেষ করা যাবে।

একদিন যেন আপনার সম্পর্কে ১০০টা পয়েন্ট লেখার উপলক্ষ্য আসে। আপাতত রাইসু ভাই, আপনাকে শুভ জন্মদিন—২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ এই তিন বছরের।

নভেম্বর, ২০১৯

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুকে যেভাবে দেখছেন

রাইসুর ৫০তম জন্মদিনে ওনাকে নিয়া কিছু লেখা পড়ছিলাম। জাস্ট চোখ বুলানোর মত কইরা। ওনাকে নিয়া লিখতে চাইলেও হইয়া ওঠে না। লিখছি কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়, একই একঘেয়ে জিনিস দাঁড়াইতেছে।

লেখাগুলি অনেক বেশি ‘ভালো মানুষ’ রাইসুকে নিয়া আর কম ‘প্রভাবশালী’ রাইসুকে নিয়া। প্রত্যেকেই যারা লিখতেছেন, রাইসু যা তাকে অনেক ছোট কইরা তারা দেখতেছেন এবং পোর্ট্রেও করতেছেন সেই ভাবেই। রাইসু কেমন, কী আচরণ তার, কী কী ভালো দিক তার, মানুষ হিসেবে সে কেমন—এইসব খুবই হালকা বস্তু।

কেউ রাইসুকে বলতেছেন সাহসী, কেউ উইয়ার্ড, কেউ সৎ, কেউ অসম্ভব ভালো মানুষ, বুদ্ধিজীবি, দার্শনিক—কিন্তু এত এত কথার মধ্যে কোথাও রাইসু’র পাওয়ারটা নাই। সে যে চাইলেই যেকোনো কিছু থ্রি সিক্সটি উল্টায়া দিতে পারে যাতে মনে হবে বিষয়টা আগের জায়গাতেই আছে, কিন্তু ততক্ষণে ভিতর থেকে চেঞ্জ হয়ে গেছে—এইটা কেউ বলতেছেন না। বা বুদ্ধিজীবী হিসেবে রাইসু কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার সামাজিক প্রভাবগুলি কী কী, রাইসুর টাইমটা কেন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই বলেন না।

রাইসুকে জাস্ট বেটার বলা, গ্রেট বলা হেন-তেন তার সবচেয়ে বড় হওয়াকে সবচেয়ে প্রভাবশালী হওয়াকে এড়ায়া যাওয়া।

আপনি তাকে ভালো বলতেছেন, জোর দিয়া তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা দাবি করতে পারতেছেন না।

এর দুইটা দিক আছে। প্রথমটা আমি বলব না। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, একটা চরিত্র বা ঘটনা গইড়া ওঠে ঠিক সেইভাবে যেইভাবে তার কমিউনিটি তাকে নেয়। ‌এমনকি তা প্রচারও করবে কিন্তু তারা তেমন ভাবেই। অসংখ্য কম গুরুত্বপূর্ণ আচরণ ও কথা, নিছক তার বেসিক মানবিক বৈশিষ্ট্য, বা সারল্য বা হাসি বা উইট’ই ‘তিনি’ হইয়া উঠতেছেন। এইটা দুঃখজনক।

অর্জয়িতা রিয়া

আমার দেখা মানুষদের মধ্যে রাইসু সবচেয়ে সাধারণ। তার পাটিতে বইসা খাওয়া, গরম ভাত খাওয়া, কাজের লোকেদের জন্যে ডিম বরাদ্দ করাকে মহা মানবিক ব্যাপার হিসেবে চালানোর একটা বিষয় আছে। কেন জানি না। পাটিতে বইসা খাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। রাইসু মহামানব হয় না পাটিতে বইসা। এইটা উনার লাইফস্টাইল মাত্র।

আর যে কাজের লোকেদের খাওয়ান উনি, তা তো স্বাভাবিকই। এই জিনিস নিয়া মানুষের ওয়াওগিরি থাকার মানে তারা বা অন্যেরা কাজের লোকেদের খাইতে দেয় না।

রাইসু কী প্রকারে পলিটিক্স করেন তা লোকে বোঝে কিনা জানি না। উনি নিজেই যদিও তা ক্লিয়ার করেন, তারপরও অন্যেরা ঘুলায় গিয়া কখন পলিটিক্স করতেছেন আর কখন না সেইটা বুঝতে পারে না। এমনকি এও বলতে দেখছি, রাইসু যা, তা হওয়ার চেষ্টা কইরা হইয়া আছে।

তারা রাইসুর চিন্তা, সাহিত্য, ছোট ছোট ঘটনাকে আলাদা আলাদা ভাবে ঘটনা আকারে দেখতে পাওয়া, ঘটনা দেখতে চাওয়ার জন্যেই যে তার সাবজেক্টের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বিশেষত সবকিছু চাইলেই যে তার শেষ কইরা দিতে পারার, বদলায়া দিতে পারার ক্ষমতা সেইটা’র আনন্দ তারা কখনোই পাইল না, হায়!

তা ওনাকে নিয়া লেখাগুলি পড়লেই বোঝা যায়। কত তুচ্ছ জিনিস দিয়া তারা ওনার সঙ্গে মেশার সময়গুলি পার করছে বা করে।

ওনার সাহস, স্পষ্টবাদিতা, খোঁচাকে ওনার বিশেষত্ব ধরার প্রবণতা দেখা যায়। ওনার যেকোনো সরল এবং স্বতস্ফূর্ত প্রকাশগুলিও তারা ওনার চেষ্টা হিসেবে দেখেন। বিষয়টা হতাশাজনক।

আরেকটা সমস্যা হইল রাইসুর উইট বুঝতে পারে না তারা। উইটটাকে জাস্ট হাস্যরসের মধ্যে নিয়া আসে। ওনার বুদ্ধিমত্তা এবং আবারো সেই স্বতস্ফূর্ত রেসপন্সকে মাইনাস কইরা একটা ঠাট্টামূলক হালকা চরিত্র আকারে পোর্ট্রে করে। যেইটা সে না।

যারা আপনাকে আপনার বিউটি দিয়া ভালোবাসে, রাইসু, তাদের নিয়া অত সমস্যা নাই, তারা আপনার ইন্টেলেকচুয়ালিটির দিকে নাই আর যাবেও না। কিন্তু যারা আপনার বুদ্ধিমত্তার জন্যেই আপনাকে ভালোবাসে বলে এই বিষয়গুলি ওনাদের ভাইবা দেখা উচিত আমি মনে করি।

কারণ তারা যে শুধু মনে করতেছে আপনাকে এমন তা তো না, আপনার খণ্ডিত অংশকে পূর্ণাঙ্গ ভাবতেছে এবং তা প্রচারও করতেছে। তা আপনার ক্ষতিই করতেছে আল্টিমেটলি। আপনি কী কী কখনোই আসতেছে না। জিনিসটা অসম্মানেরও, আপনার মত চরিত্রগুলির জন্য।

তাদের দেখা দেখা না—এরকম বলতেছি না। কিন্তু স্ট্রাকচার যদি এইটা হয়, আরো অন্য অনেকের সঙ্গেই আপনাকে ঘুলানো যাবে তাইলে।

সেইক্ষেত্রে দেখা সমস্যাজনক। আপনি কী এবং আপনার যে কোর বৈশিষ্ট্যগুলি, অন্যদের লেখায় পাওয়া যায় কম।

আর এর বাইরে যেহেতু আপনার ছোটকালের কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা লোকেরা বিশেষ বলতে চায় না আপনাকে নিয়া, বোঝা যায় না ইন্টেলেকচুয়ালিটির বাইরে আপনার ক্যারেক্টারকে নিতে হইলে এর কোন কোন জিনিসগুলি নিতে হবে।

আপনার সঙ্গে মিশার আনন্দেই জাস্ট থাকেন, যাদেরকে আপনার সঙ্গে মিশতে দেখছি। আপনাকে কাছ থেইকা দেখতে পাওয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা আছেন, এইটা এখনো উপলব্ধি কইরা উঠতে পারেন নাই। এমন কিছু অলৌকিক পরিবর্তন লাগবে তাদের যে তারা হঠাৎ একদিন ঘুম থেইকা জাইগা বুঝতে পারবে আপনি সোসাইটিতে কী কী চেইঞ্জ আনছেন, এবং কীপ্রকারে আনছেন।

ঢাকা, নভেম্বর ২০১৯

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু কী জিনিস?

কোনো ছাপাখানায় ছাপা হইতেছে না, কলম দিয়া লেখা হইতেছে না, কিন্তু দমে দমে প্রকৃতিতে লেখা হইতে থাকতেছে একটা বই, এমন এক বই, পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্টাইতে থাকলে কেবল আসতেই থাকে, শেষ হয় না, নানা রঙের পৃষ্ঠা, রাত্রির মতো, দিনের মতো, পাহাড় ও নদীর মতো পৃষ্ঠা, অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের মতো, নারী পুরুষের আন্তরিক ঝগড়ার মতো পৃষ্ঠার বইটার নাম ব্রাত্য রাইসু; একটি জিন্দামানুষবই। কাগজের পাতার বই না, ইলেক্ট্রনিক বই না, ন্যাচারাল বায়োবুক বলা যায় হয়ত, যে-বইয়ের দেহ আছে, মন আছে, মাথা আছে, চোখ মুখ হাত পা পেট পিঠ ত আছেই। সব মানুষই জিন্দাবই।

আর এই রাইসুবই, অন্য সব মানুষবই পড়াপড়ির মতন, মানুষ পশু পাখি কীট পতঙ্গ, জল ধূলা মেঘ, অরণ্য শহর বন্দর, বিদ্যুৎবাতি দালান চেয়ার টেবিল, জানালা দরজা বিছানা বালিশ, আসমান জমিন, ছয় ঋতু বার মাস সবাই পড়তেছে, পড়তেছে প্রতি ইউক্টো সেকেন্ড, পড়তেছে ননস্টপ ব্রাত্য রাইসু-কিতাব। তাকে সত্যবাদী মিথ্যাবাদী পড়ে, সব রাজনৈতিক দলের লোক পড়ে, যে পড়তে চায় না সেও পড়ে ফেলতেছে—ডাইরেক্টলি, ইনডাইরেক্টলি।

সারওয়ার চৌধুরী

এই বই, এমন এক বিস্ময়কর বায়োবই, যে-বই নিজেও পড়তেছে।

কী পড়তেছে?

নেচার পড়তেছে। যেমন আমরা বাঁশঝাড় পাখি পড়ি, তারাও আমাদেরকে পড়ে। রাইসু কখনও না-পড়েও পড়ে ফেলতেছে দিবানিশি শত্রুমিত্র উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম উপর নিচ সমান তালে। তার পড়ার একটা মজাদার টেকনিক হইল, ধাম কইরা একটা স্ট্যাটাস—আপসাইড ডাউন টাইপের, কিংবা ননসেন্সিক্যাল হিউমার, ব্যস, এবার ধুমছে আসতে থাকছে প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক নেতিবাচক। এইসব প্রতিক্রিয়া পাঠ করতেছেন ব্রাত্য রাইসু। ভাষার ভিতরে, ভাবের ভিতরে, চিন্তার ভিতরে, মানুষ কেমনে-কেমনে ভাসে আর ডুবে, সেইটা দেখে ফেলতেছে। দেখতেছে ভাঁড়ের চোখে, কবির চোখে, কথাশিল্পী ও চিত্রশিল্পীর চোখে, দার্শনিকের চোখে (প্রত্যেক মানুষের মাঝে নানা লেবেলের দার্শনিক চোখ থাকে)।

মানুষের সমাজে, দেশে ও বিদেশে বহু জাতের মানুষের সাথে উঠাবসা লেনদেন কইরা দেইখা আসতেছি, বেশিরভাগ মানুষের বিবেচনা এইরকম যে—”আমার স্বার্থে আমার পক্ষে না থাকলে দূরে গিয়া মরো।” এই রকম বিবেচনার মানুষেরা কোনো ঘটনাকেও ভাল কইরা বুঝতে পারে না। মানে, বেশিরভাগ মানুষ পক্ষপাতদুষ্ট থাইকা, নিজের মতলবে নাচানাচি কইরা, নিজেরে সঠিক পথে রাখতে পারছে বইলা মনে করতেছে। এই রকম বিবেচনার সমাজের মানুষ ব্রাত্য রাইসুকে বুঝতে পারার কথা না।

রাইসু ত তার বুদ্ধিজীবিতা নিয়া সবার পক্ষে আছেন আবার কারো পক্ষে নাই থাকার মইধ্যে থাকতেছেন। ওরা ভাবে এইটা সুবিধাবাদী পজিশন। আসলে মনে হয়, এই রকম থাকা এক হিসাবে ‘ন্যাচারাল স্টেইট’-এ থাকা। একজন বুদ্ধিজীবী এই রকম অবস্থানে থাইকাই তার দেশ-সমাজ-সংস্কৃতি বোঝেন এবং তার মইধ্যে তৈরি হওয়া ধারণাসমূহের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারেন। ধারণাসমূহ খুঁতশূন্য কী না সেইটা নিয়া যে তর্ক চলতে পারে, বা এক পরিপ্রেক্ষিতে যা ঠিক, অন্য পরিপ্রেক্ষিতে তা বেঠিক যে হইতে পারে, সেইটা বুদ্ধিজীবীর মাথায় থাকে, রাইসুর মাথায়ও আছে বইলা মনে হয়। তার প্রধান ফাইট একদিন বলছিলেন ফেইসবুকে—কেউ নিজের নৈতিক বিবেচনা অন্যের উপর চাপাইয়া দেয়ার বিরুদ্ধে থাকেন উনি।

আমরা দেখি, জগতে প্রত্যেকটা মানুষের আলাদা কনশাস লেবেল থাকে। ফলে উপলব্ধির ভিন্নতা থাকবেই, কাজের ভিন্নতা থাকবেই। প্রাণিজগতে প্রত্যেকের ইননেইট নেচার আছে। শাসন কইরা, হত্যা কইরা হাজার হাজার বছর ধইরা কচ্ছপ ও বৃশ্চিক নেচারের জনম লওয়া আটকানো যায় নাই।

হেরাক্লিটাসের যুগেও দূর্বাঘাস ছিল, এখনও আছে। রূপ বদল হইলেও স্বভাববৈচিত্র, রঙবৈচিত্র থাকাটাই প্রাকৃতিক। এই প্রকৃতিতে লড়াইয়ের মইধ্যে বিস্ময়কর স্ববিরোধ থাকতেছে। ব্রাত্য রাইসুর মাঝেও স্ববিরোধ থাকতেছে। ওয়াল্ট হুইটম্যান তার ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এ বলছিলেন—”ডু আই কন্ট্রাডিক্ট মাইসেলফ? ইয়েস আই ডু।”

মানুষের জীবদেহটিও ত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্ববিরোধ চর্চা করতে করতে পরে দপ কইরা ইতি হয়। সেইটা কী রকম? খুব সচেতনভাবেও মানুষ প্রতিদিন যা খায়, যে পরিবেশে থাকে, তাতে তার শরীরের জন্যে উপকারি অপকারি দুইই পাইতেছে, গ্রহণ করতেছে বৈপরীত্য, সে নিতে বাধ্য হইতেছে বলা যায়। চিনি শক্তি দেয়, চিনি ওজন বাড়ায়, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ায়। একটা কাটাকুটি হিসাব জারি থাকতেছে—একটা প্লাস মায়নাস হইতে থাকছেই বলা যায় আমাদের স্বাভাবিক খাবারে। বেশি লাভ বেশি ক্ষতির মইধ্যে পড়লে বায়োমেকানিজম সংকটে পড়তেছে।

আর যে কোনো আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই কি একজন মানুষ নীতিহীন হয়? হয় না। কারণ, নিজের নীতি অন্যের অন্য লেবেলের সচেতনতার উপর চাপাইয়া দেয়ার জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া হইতেছে আরেকটা নৈতিক অবস্থান। এই অবস্থান রাইসু নেন, নেন বইলাই উনি নীতিবানও। তার বান্ধবী নাদিয়া ইসলাম লেখেন, “উনি আদর্শবাদ সহ সকল বাদের সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াও একজন আদর্শবাদী নীতিবান মানুষ।” আবার ক্রমাগত পরিবর্তনশীল জগতে কোথাও অনড় থাকতেছেন না যে সেইটাও দেখা যায়।

ব্রাত্য রাইসুর সাথে আমার এখনও সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ হয় নাই। বয়সের হিসাবে দেখলাম, আমার দুই বছরের ছোট উনি। নব্বইয়ের গোড়ার দিকে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আর ব্রাত্য রাইসু বিরচিত ‘যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক’ শীর্ষক উপন্যাস ধারাবাহিক আসতেছিল। তখন থাইকা না, আরো দুই বছর আগে থাইকা হয়ত তার লেখালেখি দেইখা, জানছিলাম ব্রাত্য রাইসু নামে একজন লেখক আছেন ঢাকায়।

পরে ব্লগে ও অনলাইন মিডিয়ায় তার নানা রচনা পড়ি। তার আলাদা ভাষা আছে দেখলাম। এবং এইটাও দেখলাম, বাংলাদেশভিত্তিক একটা বাংলা ভাষা, যে-ভাষা কথায় ও লেখায় সরস হইয়া আসতে পারে সেই প্রয়াস তিনি চালাইয়া আসতেছেন। এইটা এমন এক সময়খণ্ডে তিনি করতেছেন, যে-সময়খণ্ডে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়ায় জনম নেয়া সুতানটিভিত্তিক বাংলা চলিত ভাষা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দির প্রভাবে অন্যরকম রসকষহীন রূপ নিতে লাগছে। আর এইটা একই সাথে প্রমিত ভাষার এলিটিজমের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া যাওয়া। এই কাজের দ্বারা ব্রাত্য রাইসু তার সমসাময়িক লেখকগোষ্ঠীর একাংশকে প্রভাবিত করতে পারছেন। এই ব্যাপারে তার চিন্তাটা হইল, “আমি এক্সপ্রেশনের অধিকারের মধ্য দিয়া আগাইছি, যেন সব ধরনের ভাষাই চলতে পারে। প্রমিত রীতিও চলতে পারে এর শাসনের উচ্চম্মন্যতা বাদ দিয়া।”

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিতে একবার ‘প্রমিতের পরিমিতি’ শীর্ষক টক শো-তে রাইসু সাফ বলেছেন, “প্রমিত হইল বিকৃতি। স্বাভাবিক না” কারণ ব্যাখ্যা কইরা বলছেন, এইটা ত স্বাভাবিক এক্সপ্রেশন থাইকা আসে না, এইটা বানানো হইছে।

ভাষার ভিতরে রদবদল হয়ই। আঠারো শতকের বাংলা ভাষার মাস্টারি এখন চলবে না। সামনের দিকে—দুই শ বছর বাদে, বর্তমান বাংলা প্রমিত রূপটি থাকবে না শিউর অ্যান্ড সারটেইন বলা যায়।

এই যুগের কোনো প্রতিষ্ঠিত ভাষা দুই চার হাজার বছর পরে পাওয়া যাইবার গ্যারান্টি নাই। বর্তমানে বাইশটা দেশে আরবি ভাষা প্রতিষ্ঠিত। অথচ ইয়েমেন থাইকা ধইরা ইরাক সিরিয়াসহ মিশর পর্যন্ত বিশাল এই অঞ্চলে অনেক আগে আরামায়িক ভাষা ছিল প্রতিষ্ঠিত লিংগুয়া ফ্রাংকা। তখন হয়ত জাজিরাতুল আরবের কোনো ট্রাইব প্রাচীন টাইপের আরবিতে কথা বলতো। এখন সিরিয়ায় একটা ট্রাইবের কাছে সীমিত হইয়া আছে আরামায়িক ভাষা। ভাষা-সংস্কৃতির দৌড়াদৌড়ি এই রকমই।

ব্রাত্য রাইসু অনেক বিষয়ই খোলামেলা বইলা দেন। সোশাল মিডিয়া ফেইসবুকে তার বান্ধবীরা তাকে অপেন ফোরামে ধুম কইরা বইলা ফালায় “আই লাভ ইউ রাইসু।” ঘটনা কী? রাইসু যৌনসংসর্গের লিপ্সায় টিনএইজ মেয়ে পটান? নাহ্ সেইরকম কিছু না। ইনবক্সে জিগাইছিলাম। জানাইলেন, “মেয়েদেরকে আমি ওইভাবে পটাই না, ওনারাই আমারে পটান, তাদের সবার সঙ্গে আমি যাই না।” দেখলাম, জবাবটা ইন্সট্যান্টলি দিছেন রসালো কইরা।

মানে, ব্রাট্রান্ড রাসেলের মতো যৌনসংসর্গের লিপ্সায় নারী পটানোর ধান্দাতে নাই রাইসু। রাসেল ত পরের বউ পটাইত। কবি টি এস এলিয়টের বউ মানসিক রোগাক্রান্ত ভিভিয়েনের সাথেও শুইছে রাসেল।

দেখা যায়, অনেক কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী দার্শনিকদের জীবনের একটা অধ্যায়ে নারীর সাথে বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারটা থাকছে। এই থাকার মইধ্যে শাদা কালোর মিশ্রণ আছে। সেইটা বাঁশি বাজবার একটা উপলক্ষও হইতে পারে। নজরুল রবীন্দ্রনাথের জীবনে কেবল না, ধার্মিক দার্শনিক কবি ইকবালও তার জার্মান প্রেমিকার উদ্দেশ্যে সাগরপারে বসে লেখছিলেন, “ইস তনহাই মে মুঝে রাহাত দেতি হ্যায় হাওয়া জিস্ নে তোমহারি জিছিম চুম কার আয়ি হ্যায়।”

সহস্র সংকটে ভরা এই জগতে দরদ চর্চার জন্যে যেই প্রেমের অনুভূতি, সেই অনুভূতির কার্যকারণ পরিপ্রেক্ষণ যা-ই থাক, এইটা যেই সৃজনের ইন্সপায়ার করে, সেই সৃজন বিস্ময়কর হইয়া আসতেছে না? মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ কেউ পছন্দ না করলেও, ভালবাসাবোধ এইভাবেও যে ফুটতেছে, এইটা, মানে এইটা নানা রূপে ত ফুটতে থাকছেই।

সুতরাং যে কোনো আদর্শের বাক্সে ভইরা ফেনোমেননগুলারে বাতিল করলেই প্রকৃতি থাইকা বাতিল হইতেছে না। কেউ চোখ বন্ধ করলেই বাতিগুলো অফ হয় না, সূর্যালোক বা জোছনা নিভা যায় না। হিসাব অত সোজা না। লবণাক্ত পানি থাইকা মাছ তুইলা লবণ দিয়া রান্না কইরা খাইতে হয়। কারণ লবণাক্ত পানির মাছ লবণাক্ত না।

আগে সামহোয়ারইনব্লগে দেখছি, ফেইসবুকে দেখতেছি, রাইসুর পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষে তার পক্ষে-বিপক্ষে লেখা দেখছি; যারা রাইসুর নিন্দা করেন তারা খুব সমৃদ্ধ চিন্তাসহ কথা বলতে পারেন নাই। যারা তাকে ভালবাসেন তারা বেশ শক্তপোক্ত বিশ্লেষণসহ কথা বলেন। রাইসু দেশের ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করেন না। দল করলেই যে রাজনীতি করা হইয়া যায় না সেইটা সাফ বইলা দেন ব্রাত্য রাইসু।

“দল করা মানে রাজনীতি করা নয়। সে আপনি বামই করেন আর হেফাজত। দল কিংবা সিংহাসনের বাইরে সাংস্কৃতিক বদল ঘটানোই হচ্ছে আসল রাজনীতি। সে বদল দল-রাজনীতি কিংবা সরকার বিরোধিতার মাধ্যমে আসবে না।”

ব্রাত্য রাইসু, এই জিন্দাবইয়ের উপর কথা বলা শেষ করা যাবে না, কারণ পৃষ্ঠা সংখ্যা বেশুমার। উনি ডেসপারেইটলি জানিয়ে দেন উনি ‘পশুর মতো স্বাভাবিক’। তাৎপর্যপূর্ণ কথা। গাধাকে যারা মিসকনসেপশন খাইয়া বেআক্কেল ভাবেন, তারা রাইসুর এই কথা বুঝবেন না। গাধা ত আসলে খুব স্টাববর্ন এবং হাইলি ইন্টেলিজেন্ট প্রাণী। আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক গাধা তারা বুইঝাসুইঝাই বানাইছে। তবে রাইসু এর ঠিক উল্টা কথাও অন্য কোথাও বলে থাকতে পারেন।  দুই ধরনের ঠিক হওয়া যে সঠিক হইতে পারে, এইটা দেখবার বিশেষ জায়গা আছে, ঐ জায়গায় যাইতে অন্তর্দৃষ্টি থাকা লাগে। তাইলেই দেখা যায় চমৎকার কিছু। নইলে গাধাকে ‘গাধা’ বুঝবার মিসকনসেপশনের ভিতরে থাকা লাগবে।

রাইসু ভাঁড়ামি করেন, এর মানে কী?

তারই জবাব—“ভাঁড় হাস্যরস নিয়া কাজ করে না, সে করুণ রসরে হাস্যরস হিসাবে খাওয়ায়, আপনাদের।”

করুণ রসরে হাস্যরসে তবদিল করতে পারে কয় জনে? রাইসু পারেন। তাই ব্রাত্য রাইসু ইজ ব্রাত্য রাইসু। তাই হয়ত ঢাকা শহরে অভাব-অনটনে থাকা সত্ত্বেও অতুলনীয় অনমনীয় অনির্ণেয় কিন্তু স্বাভাবিক রাইসুর কবিতা ও চিত্রকলা নতুন ধরনের ইনফেকশাস শিল্প হয়, রঙেরসে কমিউনিকেইট করে, জ্বালায় উস্কায়, সৃজনশীল বানায়।

পঞ্চাশতম জন্মদিনে বিচিত্র কর্মবীর ব্রাত্য রাইসুর জন্যে অনেক অনেক আন্তরিক শুভ কামনা।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

সেইসব রাইসু

রাইসুর সাথে আমার পরিচয় হয় ৯০ সালে, আমার ঢাকায় আসার পর। মনে হয় শাহবাগের সিলভানা রেস্তরাঁতেই দেখা হইছিল। কিংবা পিজির সামনে।

রাইসু ৫০ বছরে পড়ছে এই জন্য অল্প কিছু কথা এইখানে স্মরণ করব। রাইসু জন্মদিন ১৯ তারিখ আমার জন্মদিন ২১ তারিখ, প্রায় কাছাকাছি। এইসব জন্ম তারিখের বিজোড় সংখ্যা ভালো লাগে আমার। আমরা বৃশ্চিক রাশির লোক। ফলে কমন গ্রহ-তারার কমন কিছু অনুগ্রহ পাইতে থাকি যেন আমরা পৃথিবীতে!

স্মরণ করতে গেলে লিখায় অতীতের কথা আসে। আর তাতে প্রয়াণময়তার ঘ্রাণ আসি হাজির হয়। অতীত আসক্তি, অতীতের মধ্যে ভ্রমণ যা মূলত নাই, শুধু নিজের কিংবা যৌথ স্মৃতির ভিতর নির্বাসন মনোভাবে ঘোরা। স্থান ও কালে ভ্রমণের দায়বদ্ধতা বোধ হয়।

তখন আশি আর নব্বইয়ের কয়েকজনের আড্ডা হইত নিয়মিত। গাণ্ডীবের লেখকদের কারো কারো সাথে বসতাম। সিলভানাতে কবি ফরিদ কবির আসতেন। ওনার সাথেই বেশি বসতাম আমি। উনি সদালাপী ও অন্যের চিন্তার প্রতি সহনশীলতা ছিলেন। সিনিয়রদের মধ্যে উনার সাথে চলাফেরায় শান্তি পাইতাম। আস্তে আস্তে ৯০ এর দশকের অনেক কবিদের সাথে দেখা হইতে থাকে নতুন আজিজ মার্কেটে।

জহির হাসান

অন্য কবি বন্ধুদের চাইতে আমার রাইসুকে অন্যরকম লাগত। রাইসুর সাথে সিনিয়র কবিদের আর্টিস্টদের বেশি যোগাযোগ ছিল। আড্ডা হইত আজিজে পিজির পিছনে। রাইসু তখন সাজ্জাদ ভাইয়ের (সাজ্জাদ শরিফ) সাথেই বেশি ঘুরত। অল্পবয়েসী সুন্দর বুদ্ধিমতী মেয়ে বন্ধুদের সাথে রাইসু নিঃশব্দে ঋতু বদলের মতো প্রেমে পড়ত, প্রেম চালাইত! ওর মেয়েবন্ধুদের সাথে যন ঘুরত আমাদের সাথে সেইসব মেয়েদের পরিচয় করাইয়া দিত! আবার কখনো কখনো আমাদের পাত্তাই দিত না! ওর কাছে সরলরেখার মতো একটানা কোনো আচরণ পাওয়া কঠিন ছিল।

নানা সার্কেলের সাথে ওর একটা যোগাযোগ ছিল। ওর বেশভুষা কথাবার্তা সব সময়ই আলাদা। ও তাই সবার নজর কাড়ত। ট্র্যাডিশনাল চিন্তারে আগাগোড়ায় ও গলা কাটত। সবকিছুরেই ক্রিটিক্যালি দেখত। সাদা-কালো অবস্থানের বাইরে গিয়া একটা ৩য় বা ৪র্থ অবস্থান নেওয়া সম্ভব ছিল ওর পক্ষে, যা রাইসু এখনো নেয়।

একবার মনে পড়ে পাঠক সমাবেশের (এখন জুসবারের দোকানটা যেইখানে) সামনে বসি আলাপ পাড়তেছি আমরা কারা কারা যেন। রাইসু আসল। দেখি ওর পায়ে একটা স্যান্ডেল, স্যান্ডেলের তলারতে কালার কী যেন উঁকি মারতেছে অসহায়!

আমি আবার খেয়াল করলাম। বইলাম, পা খোলেন, স্যান্ডেলটা দেখি। দেখি স্যান্ডেলে বিপ্লবী চে গুয়েভারার ছবি আঁকা। আমি কইলাম, চে-রে এইভাবে মাড়াইতেছেন পায়ে?

ও হাসল।

বুঝলাম, চে ফ্যাক্টর না। যে কোনো বিগ বিশ্বাসের খুঁটি ধরি নাড়ন-চাড়ন, ধমের্র মতো কাজ করে যেইসব অনড় চিন্তা সেইগুলারে নাড়াই দেওয়া ওর একখান মূল কাম!

কইলাম, কই পাইলেন?

থাইল্যান্ডের।

আমি কইলাম মনে মনে, থাইলান্ডঅলারা তো এই কাম করবেই!

রাইসু মাঝে মাঝে ফিতাঅলা কেডস পরত। কিন্তু ফিতা লাগাইত না! একদিন জাদুঘরে কি একটা অনুষ্ঠানে আমরা গেছিলাম। আামি জিগাস করলাম। এই কাম ক্যান করেন। ও যা কইল, তার মানে করা যায় এরকম—লোকজনরে অপ্রস্তুত রাখতে ব্যস্ত রাখতে চাই আমার ব্যাপারে!

ওর এইসব শোভিনিস্টিক বিষয়গুলি স্ট্রং চিন্তা বা কখনো খামখেয়ালির বশেও করত। ওর সাথে বন্ধুত্বের একটানা বসন্ত কারও যায় নাই। আড্ডায় তর্ক চলত সাহিত্য ধর্ম রাজনীতি নানা বিষয়ে। কবিতারও পাঠ হইত। একবার এডওয়ার্ড সাঈদের ‘রিপ্রেজেন্টশন অব ইন্টেলেকচুয়াল’ বইয়ের অংশবিশেষ পাঠ চলল। এ তো পাঠ না, সাঈদরে কোথাও প্রশংসা কোথাও ভুল ধরায়ে দেওয়ার সামিল। বড় বড় চিন্তাবিদের, বুদ্ধিজীবীদের লিখা পাঠান্তে ভাল-মন্দ দিক খুটায়ে বার করা। প্রশ্ন তুলতে পারার মধ্যেই চিন্তার আগানো পিছানোর ইতিহাস জড়িত ছিল। রাইসু প্রশ্ন তুলতে পারত। এডওয়ার্ড সাঈদের প্যালেস্টাইন ইস্যু ছাড়াও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সব কাজকে আমরা তখন অনেক মহব্বতের সাথে দেখতাম। ফুকো গ্রামসির চিন্তা উনার পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্যচিন্তার ও আলোচনার পদ্ধতিগত দিকটা উনার কাজেরে ইন্ধন যোগাইছে।

ঢাকা শহরের নানা জায়গায় নানা বন্ধুর বাসায় আড্ডায় গেছি রাইসুর ডাকে। অনেক সময় তরিকার বাইরের লোকদের বাদ দেওয়া হইত। অনেক আড্ডায় মদ পান চলত। রাইসু মদ খাইত শুধু। গাজা সিগারেট প্যাথেডিন না মারত! তার এই স্বাস্থ্য ও দেহ সচেতনমূলক অগ্রহণ আমার সাথে যাইত। আমি মদ পান করতাম না তবে হোমিওপ্যাথি ঔষধের মতো এক গ্লাস পানিতে কয়েক ফোটা মদ নিয়া না-মদ না-পানি খাইতাম। তাতেই আমার ভাল নেশা হইত! কারো কারো কাছে আমারে চরিত্রশূন্য পানপাত্রই লাগত। কিংবা নেহাতই বেরসিক!

মদপান ছাড়াও অনেক আড্ডা হইছে। আমাদের এইসব সামাজিকতা চলত অনেক রাত অবধি! শুধু একদিনের কথা বলি, (বলা ঠিক হইতেছে কিনা?) রাইসু একটা নতুন বারে অনেক মদ খাইল। ময়ুরী না, সাকুরা না। বোধহয় ইস্টার্ন প্লাজার আশেপাশে কোথাও। বোধ হয় আমরা ৩জনই ছিলাম। এক উঠতি অভিনেতা (বড়ভাই সুলভ আচরণের কারণে তারে আমার অপছন্দ), রাইসু আর আমি। রাইসুও ইতোমধ্যে একটা নাটকে নাকি অভিনয় করছে কিংবা করতেছিল। রাইসু অভিনীত নাটকটা আমার দেখা হয় নাই।

ঐদিন রাইসু মাত্রাতিরিক্ত মদ খায়। ও তখন বোধহয় অস্ট্রেলিয়া ফেরত, ভুলি গেছি! ও থাকত ওর ওয়াইফের সাথে ডলফিন গলির ভিতরে উঁচা একটা বাসায়। বারেরতে নামার পর ঐ অবস্থায় ও বাসায় যাইতে চায় নাই। একটা রিকশা নেওয়া হইল। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর আসলাম। নামলাম। লেকের পাড়ে নিচের দিকে যাই আমরা বসি। ভেজাল হইল, রিম ঝিম বৃষ্টি শুরু হইল। রাইসু কইল, জহির আমি একটু আপনার কোলে হাঁটুর পর মাথা রাখি শুই? অতিরিক্ত মদ খাওয়ায় ফলে শরীর টলকাই গেছিল ওর। আমি কইলাম শোন। অনেকক্ষণ চোখ বুজি থাকল ও। রিম ঝিম বৃষ্টির ক্ষেমতি নাই। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি কইল, জহির, জীবনে টাকা-পয়সা কিছু না! রাইসুরে হতাশ চেহরায় এইভাবে কথা বলতে কোনোদিন দেখি নাই। সেই প্রথম দেখলাম। বৃষ্টির তাড়া বাড়তেছিল। দেখলাম যে বেশি ভিজা ঠিক না! আমরা আরেকটা রিকশা নিই। যাই ওর বাসার সামনে। রাইসুরে বিদায় দিয়া আমাার কাঁঠাল বাগানের বাসায় আসব। ওর বাসার সামনে একটা সাদা গাড়ি দৌড়াই আসি রাস্তায় জমি থাকা পচা পানি আমার সাদা শার্টে ছিককায় পড়ল। প্রথমত খারাপ লাগলেও পরে দেখি যে আমি শরীর যেন একটা ক্যানভাস তাতে কাদাজলের অ্যাবসট্র্যাক্ট আর্ট আঁকা হইছে। কী করা!

মনে পড়ে আর্টিস্ট রনি আহম্মেদের বাসায় উত্তরাতে আমরা আড্ডা দিতাম। মঈন ভাইয়ের বাসায়, লিপুর বাসায়, আলী সাহেবের বাসায় ইস্কাটন গার্ডেনে, কাজী জহিরুলের বাসায়, ফরহাদ ভাই, সলিমুল্লাহ ভাইদের টোলে, আলিয়াঁসে, টিএসসিতে, জার্মান কালচারে, ছবির প্রদর্শনীতে, সিনেমার প্রদর্শনীতে, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে, মধুর ক্যান্টিনে, বাংলা একাডেমির বইমেলায়। আরো অনেক জায়গায়। শেষমেশ শেষের দিকে রাইসুর পান্থপথের ১৬ তলার বাসাতে।

এর মাঝে প্রায় ৭ বছর কোনো কবিতাই লিখি নাই। রাইসুর সাথেও ৬/৭ বছর দেখা হয় নাই। একটানা এখন কবিতায় আমরা যেমন সিরিয়াস তখন আড্ডাও হইত সিরিয়াসলি। আজ আর সেইসব পুরানা বাসাগুলির কতেক আর নাই। মনে হয় সেইসব রাইসুমিশ্রিত আড্ডাগুলি পুরাই আলাদা!

রাইসুর আরেকটা সার্কেল ছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত কেন্দ্রিক। সেইগুলায় আমি যাই নাই তেমন। তো আমার এক বন্ধু ছিল তীব্র আলী।ও ফিজিক্সে পড়ত, আমি কেমিস্ট্রিতে, পাশাপাশি ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওদের বাসাতেও আমরা আড্ডা দিতাম শাহাজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনিতে। মিলান কুন্ডেরা, কাফকার উপন্যাস ও গেয়র্ক ট্রাকলের কবিতা তীব্র খুব লাইক করত! আমারও কাফকার লিখা খুব পছন্দ ছিল! কাফকার পিতার একটা কনসেপ্ট আছে। কর্তৃত্বময় এক পিতা ঈশ্বরের মতো। কিংবা পিতাই ঈশ্বর। চাপি বসা অর্থ (মিনিং) মানুষের জীবনে নিজের তৈয়ার করা অর্থের কোনো মূল্য নাই। ব্যাক্তির উপর রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিস্তার চির জারি থাকার আ্যালিগরি। থাকার। মুক্তি স্বাধীনতার নাম সেইখানে মৃত্যু! বাট কাফকার এইসব হতাশাময় অ্যালিগরিক্যাল লিখা রাইসুর ভালো লাগত না যতদূর মনে পড়ে! এইসব নিয়া আমাদের নানা মত চলত!

নব্বইয়ের প্রথম দিকে মঈন ভাইয়ের ‘প্রান্ত’ পত্রিকার একটা ইস্যুর দায়িত্ব নিছিল রাইসু। ওর আঁকা প্রচ্ছদে ঐ সংখ্যা ছাপা হইছিল। তখন আমরা যারা নব্বইয়ের কবি তাদের একটা বিপুল অংশগ্রহণমূলক সংখ্যা হইছিল। স্যানে আমার প্রথম অণুগল্প ছাপা হইছিল। মনে পড়ে আমাদের বন্ধু মাসরুর আরেফিন আসলো আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স শেষ করি। ওর বিশ্বসাহিত্যের অনেক পড়াশুনা ছিল। মাসরুর-রাইসু অনেক অনেক খাতির হয় পরে। পরে দ প্রকাশন (রাইসুর নিজস্ব পত্রিকা ও প্রকাশনা) থেকে মাসরুরের একমাত্র কবিতার বই বার হয়।

রাইসু আগাগোড়া ছবি আঁকত। কবিতার পাশাপাশি। আমরা জানি যে রাইসুর ছবি আঁকার একটা নিজস্ব ধরন আছে। একবার আহমাদ মাযহার ছবি আঁকার এক আড্ডায় কইছিলেন আমারে, রাইসু মূলত আর্টিস্ট, কবিতা লিখার চেষ্ট করে। আমি মাযহারের সাথে একমত না! শাহবাগে মাঝে মাঝে দেখতাম ছবি আঁকার বাঁধাই করা খাতা-পেন্সিল হাতে রাইসু। আমিও আঁকতাম আমার বিশ্ববিদ্যালয় হলে সবাই ঘুমাইলে। সেইসব ছবি কাউরে দেখাইতাম না! সেইসব খাতার কিছু কিছু আজও আছে। আমাদের সময়টায় তখনও বোধ হয় স্পেশাল কিছু হওয়া নিয়া ব্যস্ত হই নাই আমরা।

ছবি, গান, কবিতা, ফিল্ম দেখা এক সাথে সবই চলত। একটা হলিস্টিক জগৎ আমরা নষ্ট হইতে তখনও দিই নাই । সব কিছুতে রাইসু এক বিশেষ বোদ্ধা এই বিষয়টা ছিল। কারণ ও দেখতাম সব কিছুই নিত না। অনেকের অনেক দেখাশোনারে বুজরে বেদম খারিজ করত! একবার রিয়াজুর রশীদ গল্পকার, রিয়াজ ভাইয়ের বাসায় ছবি আঁকার ডাক দিল রাইসু। সবাই চেষ্টা করলেই কিছু না কিছু আঁকতে পারেই এই একটা বিশ্বাস ছিল আমাদের। ফোঁড়ার মুখ কাটলে নিচেরতে রস বার হইতে থাকে। সো আকার প্রাথমিক চেষ্টা করলে কারো ভিতর ছবি থাকলে বার হইবেই। সেই সময় রিয়াজ ভাইয়ের বাসায় ছবি আঁকতে আসত রাইসু, আমি, নাদিয়া ইসলাম, গল্পকার রাশিদা সুলতানা, ফরিদা ভাবী ও আরো অনেকে। সেইসব আঁকা ছবি সামহোয়ার ব্লগে আপলোড হইত নিয়মিত। নাদিয়ার ছবি আঁকায় ছোট বয়সেই মুন্সিয়ানার ছাপ ছিল।

এরও আগে মনে পড়ে রাইসু অস্ট্রেলিয়া থাকতে (২০০৩-৪) অনলাইন ইয়াহু গ্রুপের মাধ্যমে ‘কবিসভা’র প্রবর্তন করে। পরে বাংলাদেশে ফিরার পরেও তাহা চলিতে থাকে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কবিতা ছাপা হইতে থাকে স্যানে। লিখার পাশাপাশি কবিতার আলোচনার পাশাপাশি দলাদলিও প্রচুর হয়। শুনছি উৎপলকুমার বসুও যোগ দিছিলেন ‘কবিসভা’তে। পরে তিনি কী কারণে ঐ গ্রুপ ত্যাগ করছিলেন জানি না।

সেইখানে আমার কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিনের মন্তব্যে আমি বিব্রত হই। সবচাইয়ে আরেকটা ক্ষতিকর আলোচনায় জড়ায়ে পড়ি আমি। তখন ২০০৬ সাল উৎপলকুমার বসু ঢাকায় আসেন জাতীয় কবিতা পরিষদের আমন্ত্রণে। উনার একটা সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি আমি। উৎপল বসুরে আমি আর আমার এক আত্মীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (উৎপলের পরিচিত) উনারে উনার বাপ-দাদার ভিটা মাটি দেখানোর লাগি বিক্রমপুরের মালখা নগর গ্রামেও নিয়া যাই পরে।

যা হোক, উৎপলের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রাইসুর অনুরোধে ওর ‘কবিসভা’তে ছাপা হয়। পরে অনেকে ঐ সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য আমারে ভূয়সী প্রশংসা করে। সলিমুল্লাহ ভাই মেসেজ করি নিন্দা জানাইছিলেন! কলকাতার কবি হিসেবে উৎপলের তেমন কবিতা হয় না! ইত্যাদি।

সলিম ভাইয়ের উৎপলের কবিতা বিষয়ে এইরূপ নিজস্ব চিন্তা থাকতেই পারে। ঐ সাক্ষাৎকার নিয়া বিশাল আপত্তিকর মন্তব্য করেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। তিনি কইছিলেন, আমি কোন অথরিটি বলে উৎপলকুমার বসুর সাক্ষাৎকার নিছি? উৎপলই বা কেন আমার কাছে ইন্টারভিউ দিলেন।

সুব্রতদার এই বড়ভাই তথা দাদাগিরি মার্কা বাংলা সাহিত্যের লিজ গ্রহীতাসুলভ মন্তব্যে আমাদের কবিবন্ধু সুমন রহমানও আমার মতো ক্ষুব্ধ হইছিল। শাহবাগে সুমনের সাথে দেখা হইলে সে আমারে তা জানায়।

আমি পরে সুব্রতদারে কড়া উত্তর দিছিলাম। সাজ্জাদ শরিফ কইছিলেন, আমার নাকি প্রশ্নই হয় নাই। এছাড়া নানা রকম তাচ্ছিল্য করি মন্তব্য করছিলেন সাজ্জাদ ভাই।

মনে পড়ে ঐ সাক্ষাৎকারে আমার প্রশ্ন বিষয়ে সাজ্জাদ ভাইয়ের অন্যায্য আপত্তিগুলার উত্তর দিতে দেরি হয় আমার। কারণ তখন আমি পারিবারিক কিছু ঝামেলার মধ্যে ছিলাম। পরে রাইসুর সাথে দেখা হইলে রাইসুও সাজ্জাদ ভাইয়ের অন্যায্য আপত্তিগুলা পছন্দ করে নাই বলে আমারে জানায়। সমস্যা হইছিল সাজ্জাদ ভাইয়ের আপত্তিগুলার পাশাপাশি আমার কড়া উত্তরগুলা যোগ করি উৎপলের সাক্ষাৎকারখানা সবার নিকটে পাঠানো হয়, তা লিংকে দিছিল রাইসু। লিংক ওপেন না হওয়ায় আমার উত্তরগুলা আগ্রহীরা আর পড়তে পারে নাই।

যাহোক, সেই সময়ে রাইসুই এই দেশে প্রথম ইয়াহু গ্রুপের মাধ্যমে কাব্য-সাহিত্য চর্চার প্রচলন করে, ফলে ট্র্যাডিশনাল ছাপানো কাগুজে সাহিত্যপাতার বাইরেও তার প্রচার-প্রসার হইছিল।

তো, সাজ্জাদ ভাই আর সুব্রতদার ঐ দাদাগিরি আচরণের পর তাদের সাথে সম্পর্কও তিক্ত হয়। ক্ষুদ্র আমারে ছাড়াও যেহেতু সমাজ চলে অতএব, আমি চুপ যাই তখন।

রাইসু ভালো কবিতারে প্রমোট করত। বাজে লিখা খুব কম ছাপত। ওর সম্পাদনার একট মান থাকত। রাইসু ‘প্রথম আলো’ ছাড়ার পর ‘প্রথম অলো’র সাহিত্য পাতার দশা করুণ হইতে থাকে। রাইসু ‘প্রথম আলো’ ছাড়ার পর আমি আর কোনোদিন ঐ অফিসে গেছি কিনা মনে নাই। যেইটা ‘বিডি আর্টসে’ও দেখছি। রাইসুর ‘বিডিনিউজ’ ছাড়ার পর ‘বিডি আর্টসে’র পাতা বাজে হইতে শুরু করে। এইখানে বলা ভাল আমার ২য় কবিতার বই ‘গোস্তের দোকানে’র বইয়ের আলোচনা ছাপা হয় ‘বিডি আর্টসে’। সেইটাই ছিল ‘বিডি আর্টসে’র প্রথম বইয়ের আলোচনা। আলোচনা করছিলেন আলম খোরশেদ।

রাইসু তখন ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য পাতা দেখত। আমি ‘প্রথম আলো’ অফিসে মূলত রাইসুর সাথে আড্ডা সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাইতাম। অনেক সময় এক সাথে ৬/৭ টা করি কবিতা দিই রাখতাম। সময় সুযোগ মতো ওর ভাল লাগলে ঐসব কবিতারতে বাছাইকৃত কবিতা ও ছাপত।

‘প্রথম আলো’তে আমার যে ৮/১০টি কবিতা ছাপা হইছিল তা মনে হয় রাইসুর কারণেই। রাইসু আমার লিখারে তখন গুরুত্ব দিত তাই হয়ত আমার প্রথম বই ‘প্রথম আলো’র টপ টেনে স্থান পাইছিল।

রাইসু অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে নাকি ‘প্রথম আলো’ সাহিত্য পাতার দায়িত্বে যে পরে আসে তারে বলে গেছিল জহিরের বইটা যেন বাদ না পড়ে। পরে রনি আহম্মেদ একটা আলোচনা লিখে আমার প্রথম বই ‘পাখিগুলো মারো হৃদয়ের টানে’ নিয়া।

রাইসুর এই রকম বন্ধুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার কথাই মনে আছে। সলিমুল্লাহ খান সাহেব একবার আমার কানের কাছে মুখ আনি ‘প্রথম আলো’ অফিসে বলছিলেন, আমি আপনার কবিতার ভক্ত! তখনও ফিজিক্যালি সলিম ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ঘটে নাই। আমি অবাক হইলাম আমার মতো মুখচোরা লোকের কবিতা উনি কোথা হইতে পড়লেন। পরে জানছি রাইসুই নাকি উনারে সেই যুগের আবির্ভূত ভালো কবিতার স্যাম্পল হিসাবে আমার বইটা পড়ার তাগিদ দিছিল। যা হোক এত বিস্তারিত সেইসব বলার স্পেস কম। মোট কথা রাইসু ভাল লিখারে সবসময় আগায়ে রাখতে পছন্দ করত।

আবুল হাসান মার্কা শোকগ্রস্ত কবিতারে রাইসু সরাসরি খারিজ করত! অস্তিত্ববাদী ঘরানার শোক, আলগা ভুয়া বানানো দুঃখী, গ্লুমি, ক্লিশে উন্নয়নমূলক সাহিত্য-কবিতা রাইসুর ধারে কাছে ভিড়তে পারত না!

ফর্মের প্রতি রাইসুর অগাধ লৌকিক টান। রাইসুর কবিতায় ভাবরসের দিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে উইট আসে তার সাথে একটা হেয়ালির যোগ থাকে, ফলে প্রচলিত হাস্যরসের চেহারার মাত্রা পাল্টায় যায়। নতুন একটা রস তৈয়ার হয়। এই রসের নতুন নামও দেওয়া যাইতে পারে। এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিগনেচার ওর কবিতায়। ভবিষ্যতে হয়ত সিরিয়াস কেউ এই রস-ভাষা নিয়া কথা তুলবে আমি নিশ্চিত।

রাইসুর লিখার ফর্মের দিকটায় আমার মনে হয় পুরানা কবিতার ঐতিহ্যিক জিনিসপত্র থাকে। কিন্তু তা রূপ পাল্টাতে ব্যস্ত রহে, নতুন একটা বাস্তবতায় হাজির হয়। সূক্ষ্ম জিনিসপত্র ধরার প্রতি যত্ন লক্ষ্য করা যায়।

কবিতায় বিনির্মাণ ও অ্যান্টিলোগোসেন্ট্রিক অবস্থান নেয় রাইসু। ফলে প্রতিষ্ঠিত চিন্তা-ভাবনার সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদ অস্বীকার ও বাতিলের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সচেতন একটা ডায়নামিক্স পাওয়া যায় ওর সব কবিতাতেই। এই অবস্থায় কবিতা কার্যত হইতে হয় আক্রমাত্মক উইট, লাইটনেস আনার জন্য সিরিয়াস চিন্তারে টলায়ে দেওয়ার কার্যক্রম। ওর কবিতায় ভাড়ামির পয়দা তাই দৈব কিছু না, আবশ্যক। সেই অর্থে রাইসু কবিতায় লাইটনেসের বড় দোকানদার। সিরিয়াস চিন্তারা লাইটনেসের বাড়িতে য্যাবত খাইতে আসে।

ঘুরি ফিরি মধ্যবিত্ত প্রায় সকল লেখার যেন কেন্দ্রে আসি পড়ে। উল্লেখ করতে দোষ নাই এইসব জিনিসের কিছু আমরা উৎপলের কবিতায়ও দেখি। রাইসু এইসব অভিজ্ঞতা উৎপলেরতে নিতে পারছে কিছু মাত্রায় হয়ত। উৎপলের ভিতর ইন্টারটেক্সুয়াল ও বিনির্মাণের প্রচুর ব্যবহার আমরা লক্ষ্য করি। পিছনে গেলে ভাষার ভিতর ব্যাপক মোচড় ইনক্লুশন ভারতচন্দ্রের ভিতর এইসব বেশি পাওয়া যায়। আরবান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও লাইফ স্টাইল এমনকি প্রেম সব রাইসুর কবিতায় সমালোচিত হইতে আসে। মোট কথা অবিকশিত আরবান মধ্যবিত্ত একটা ঝোপ, তারে রাইসু নানা পদে যথেষ্ট কোপাইছে। ওর গল্পগুলাতেও এইসব আসে। মোট কথা ওর নিজের চিন্তাটাই ওর লেখায় আসে।

নিজের লিখা যেন নিজের চেহারার মতো দেখতে লাগে। এই প্রচেষ্টা ওর লিখায় আমি পাই। দেহকেন্দ্রিক সাহিত্য প্রচেষ্টা বলি আমি এইটারে। তার মানে এই নয় যে কল্পনা ফ্যান্টাসি বাদ বরং তা রাইসুর লিখাতে আমি বেশি পাই। কল্পনা দেহেরই অংশ।

সংক্ষেপে রাইসুর কবিতা আমার ভাল লাগে আগাগোড়াই। প্রকাশিত ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ ও ‘হালিকের দিন’ এই দুইটা বইয়ের সকল কবিতাই আমার পড়া। রাইসুর কবিতা পড়লে বোঝা যায় এইটা রাইসুরই। এই স্বকীয়তার প্রাপ্তিযোগ ঘটে কয়জন কবির জীবনে!

ফেইসবুকে, ছাপানো পত্রিকাসূত্রে অনেক কবিতা পড়িছি ওর। ইহকালে সময় করি একটা আলোচনা লিখব ওর কবিতা নিয়া ভাবতেছি। ওর কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ৫০ পৃষ্ঠাধিক আলোচনা আমার তত ভালো লাগে নাই। সেইখানে সুব্রত দেখাইছেন রাইসু ছন্দ অলংকারে বিশাল উস্তাদ! কবিতায় তাহার ব্যাপক প্রয়োগ ঘটিয়াছে! বরং আমি মনে করি স্পিরিটের জায়গায় রাইসু সীমা লংঘনই পছন্দ করে। বলতে গেলে সীমা লংঘনই রাইসুর কবিতা।

বর্তমানে রাইসু বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেছে। ওর যুক্তি-তর্ক, সেকুলার বিরোধিতা, নানা জাতীয় ব্যক্তিগত বিষয়ে মত রাখতেছে। এইগুলা স্ট্রাকচারড না। গোছাই এক জায়গায় করলে হয়ত একটা অর্থ কার্যকর মিনিং তৈয়ার করি চিন্তা হিসাবে দাঁড়াইতেও পারে।

এ জীবনে অনেক বন্ধু পাইছি। সবাই ক্ষণকালের। এইটাই বন্ধুত্বের বিউটি। রাইসুর সচেতন সতর্কমূলক (রাজনৈতিক) মেলামেশা চলাফেরা অনেক দেখছি। সব আড্ডায় আলোচনায় সবাইরে সে রাখতে পছন্দ করে না। অনেক সময় এইসব নিয়া সম্পর্কের তিক্ততা তৈয়ার হয় নাই এমন না! সেইসব আমি তেমন মনে রাখতে চাই না! আমার স্পিরিচুয়ালিটি আমার ধর্ম আজ আর আমার মনের আয়েশের এই সম্পর্কের এইদিকটার হেরফেরের মধ্যে আটকাই নাই!

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

মেল চক্করে রাইসু

কবি, বুুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, আর্টিস্ট ব্রাত্য রাইসু আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড, ফেসবুকে আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ৪ কি ৫ বছর।

এই নভেম্বরের শুরুতে রাইসু এক স্ট্যাটাসে জানাইল যে নভেম্বরের ১৯ তারিখ তার বয়স ৫০ বছর পার হবে; মনে পড়ল, নভেম্বরের ১৬ তারিখ আমার বয়স ৫২ পার হবে। রাইসু তার স্ট্যাটাসে জানায় যে সে তার পঞ্চাশ পূর্তিতে ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খুলতে চায় যাতে তার বন্ধু ও পরিচিত জনেরা তাকে নিয়া কিছু লেখা-জোখা করতে পারে।

স্ট্যাটাসটা দেইখা ঠোঁটের দুই কোনায় একটা বাঁকা হাসি খেইলা গেল, মনে হইল, হ, রাইসুর ৫০ পূর্তির এই ইভেন্টে লেখি। কিন্তু রুটি-রুজির কসরৎ আর পারিবারিক দৌড়ে লেখার ভাবনাটা আর দানা বাঁধতে পারতেছিল না, ক্রমে চিন্তাটা মাথা থিকা আউট হইয়া যাইতেছিল। অতঃপর ৯ নভেম্বর জনপ্রিয় লেখিকা ও রাইসুর ঘনিষ্ঠা নাদিয়া ইসলামের কাছ থিকা মেসেনজারে এরূপ বার্তা পাইলাম:

“হাই ফরিদ, ব্রাত্য রাইসুর ৫০ তম জন্মদিন আসছে নভেম্বরের ১৯ তারিখ। আপনি রাইসুকে নিয়ে একটা লেখা দিতে পারবেন কি? মানে রাইসুর সাথে আপনার কীভাবে পরিচয়, কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে আছে কি না বা রাইসুকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন এইসব। লেখার শব্দসংখ্যা আনলিমিটেড। লেখা দিতে হবে ১৭ তারিখের ভিতর। লেখা দিলে তার নিচে/ উপরে আপনার নাম, পরিচয়, জন্মতারিখ উল্লেখ করবেন প্লিজ। দিলে আমাকে লেখা ইনবক্স করবেন, না দিলে এই ইনবক্সের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নাই। আমার নাম নাদিয়া ইসলাম বাই দ্যা ওয়ে, আমি রাইসুর বন্ধু। আমি রাইসুর পরিচিত/ বন্ধুদের সবার লেখা পাইল-আপ করছি, যেটা ওর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে যাবে। থ্যান্কস।”

ফরিদ আহম্মেদ

এই বার্তা পইড়া আমার ঠোঁটের কোনায় আবার এক পশলা হাসি খেইলা গেল, নাদিয়াকে আমি এই উত্তর দিলাম:
“হাই নাদিয়া, থ্যাংক ইউ ফর সেন্ডিং মি দিস মেসেজ। রাইসুর ৫০ উপলক্ষে রাইসুর বিজ্ঞাপনটা পড়ার সাথে সাথেই আমার কিছু একটা লেখার জন্য মনটা আঁকাবাকা হচ্ছিল, রুটি-রুজি আর পারিবারিক ব্যাস্ততায় বিষয়টা আবার দূরেও সরে যাচ্ছিল। আপনার এই বার্তায় বিষয়টায় আরও ইনসপায়ার্ড বোধ করতেছি। আপনার দেয়া দিন সীমানার মধ্যে কিছু একটা লেখার ব্রত নিলাম, বাকিটা এলাহি ভরসা।”

জবাবে নাদিয়া একটা “Thank YOU”-র GIF পাঠাইলে আমি তাতে লাইক দিলাম।

২. পরদিন রাইসুর কাছ থিকাও এ সংক্রান্ত একটা লেখার অনুরোধ ইনবক্সে পাইলাম। যেহেতু নাদিয়ার কাছে আমি এ সংক্রান্ত করার জানায়া দিছি তাই রাইসুর মেসেজের কোনো জবাব না দিয়া এই লেখাটা কেমনে পাকানো যায় সেই বিষয়ে মনোনিবেশ করলাম।

৩. রাইসুর প্রথম স্ট্যাটাসটা পইড়া যখন লেখার ব্যাপারে মনমনাইতে ছিলাম তখনও নিশ্চিত ছিলাম না ঠিক কী আমি লেখতে পারি। নাদিয়ার মেসেজটা দ্বিতীয় বার পাঠের সময় দেখলাম ওখানে ‘কী লেখা যায়’-এর একটা গাইডলাইন আছে। ভাবলাম, এই গাইডলাইন অনুসরণে যা পারি তাই লেখি, আর এই লিখতে বসলাম।

৪. রাইসুর সাথে আমার কীভাবে পরিচয়?

যদিও ব্রাত্য রাইসুর সাথে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপ ৪/৫ বছরের কিন্তু আমরা পরস্পরকে মুখ দেখাদেখি চিনি ৮০-র দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময় থিকা। ঢাকার দূতাবাসগুলার কালচারাল সেন্টার (যেমন, ইউসিস, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, আঁলিয়াস ফ্রসেজ, গ্যাটে ইনস্টিটিউট, ইত্যাদি) ভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীগুলাতেই সম্ভবত প্রথম দেখাদেখি শুরু। যদিও দেখাদেখি হইত হরহামেশাই কিন্তু আলাপ হয় নাই তত। তারপর কবে থিকা আমরা পরস্পরকে তুমি সম্বোধন করি তাও মনে করার মত কোনো বিশেষ উপলক্ষ নাই তাই তা মনেও নাই।

উননব্বই সালে আমার এমএসসি পরীক্ষা হইয়া গেলে আমি জাহাঙ্গীরনগরের হল নিবাস সাঙ্গ করিয়া ঢাকায় স্থায়ী অস্থায়ী নিবাস নিলে পর আমার প্রায় প্রতিদিনের চক্কর ছিল পাবলিক লাইব্রেরি, চারুকলা, টি এস সি, হাকিম চত্বর , শাহবাগ, পি জি, পরে আজিজ মার্কেট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আর্ট এক্সিবিশন, ইত্যাদি। রাইসুকেও ঐ কালে দেখছি ঐসব মেল চক্করে। ইতমধ্যে রাইসু প্রকাশিত কবি, ‘গাণ্ডিব’ কবিদলে সে ঘুইরা বেড়ায়, কাছাকাছি কিন্তু প্রায় দূরে, অন্য কোন ম্যালে, অন্য কোনো ভাবধারায়।

৫. আমার নিজ বিষয়ে কতক টিকা টিক

এই কালে আমার প্রায় এরূপ ভাবধারা ছিল যে, আমার আশপাশের সব কিছু খুুব শ্যালো, কারো ভিতর কোন ডেপ্থ খুঁইজা পাইতাম না, সবাইরে মনে হইত ফাতরা, সবকিছুরে মনে হইত ফাতরামি-ইতরামি, এমনকি নিজেকেও তাই, ফলত আমি যদিওবা আশেপাশে তাকাইতাম কিন্তু কিছুই প্রায় দেখতাম না, মানে আমি আমার পরিপার্শ্ব বিষয়ে ছিলাম একান্তই অনওয়াকিবহাল, ভদ্রলোকেরা যাকে বলে ইগনোরেন্ট ঠিক তাই! যদিও আমি এসব চক্করের অনেকেরেই নামে-ধামে চিনতাম কিন্তু কারও সাথেই চিন-পরিচয় হয় নাই আরও দূর অগ্রগামী।

৬. রাইসুর সাথে আমার উল্লেখযোগ্য ঘটনা?

৬.১. রাইসুকে তখন সবচেয়ে বেশি দেখতাম সাজ্জাদ শরিফের সাথে। রাইসু সম্বন্ধে যে আমি বিশেষভাবে কিছু ভাবতাম এমন না, কিন্তু সাজ্জাদের অ্যাট্যুটুডের কোনো একটা দিক আমার বিশেষভাবে বিরক্তিকর লাগত, সেটা হৈল তার বেহুদা ঔদ্ধত্ব, এমন না যে সাজ্জাদের সাথে আমার এ সংক্রান্ত কোনো বিশেষ ঘটনা আছে, সাজ্জাদ আর আমার পারস্পরিক সম্বোধন ছিল আপনি, তো, সাজ্জাদের বিষয়ে আমার মনোভাবকে বলা যায়—এ ভেরি সাবজেকটিভ চয়েজ। এনিওয়ে, রাইসু-সাজ্জাদ যেহেতু একসাথে চলে তাই তাদের উভয়কে দেখলেই আমার কপাল কুুচকানি আসত। এমনও হইয়া থাকতে পারে যে, আমরা মনে মনে পরস্পরকে ভেঙচাইছি অনেকবার, তবে এখন এ বিষয়ে নিশ্চিত কইরা কিছুই মনে পড়তাছে না।

৬.২. পিজির নিচে বা পাবলিক লাইব্রেরিতে বা আজিজ মার্কেটে এ রকম অনেকবারই হইছে, দেখা গেল তিন-চাইরজন বা পাঁচ-ছয়জন বা সাত-আটজন বা আরও বহুজনের দাঁড়ানো আড্ডায় আমিও আছি আর রাইসুও আছে কিন্তু আজকে এইসব আড্ডার কিছু স্মৃতি শ্রুতি করতে গিয়া দেখি থিংকস আর অবলিভিয়াস।

এই সময় রাইসু কখনও কখনও বেগম আখতারের ঠুমরির কলি গাইত খেয়ালে-বেখেয়ালে, পাবলিকলি, আর বন্ধুদের, বিশেষত কিশোরীদের সাথে সাক্ষাৎ অভিভাষণ হিসাবে বলত—হোলা!

৬.৩. তারপর অনেক অনেক কাল আমাদের দেখা নাই, ২০০৫ থিকা আমি দেশছাড়া, তারপর ২০১১ কি ২০১২ তে আমি দেশে গেছি, তখন ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে বইমেলা চলতাছে আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলতাছে গণজাগরণ মঞ্চ, সেই সময়কার কোনো এক বিকাল বেলায় আমি ছবির হাটের কাছে উদ্যানে খাড়ায়া আছি, দেখি কাজল শাহনেওয়াজ, সুমন রহমান আর ব্রাত্য রাইসু এক সাথে বইমেলা থিকা ফিরতাছে, আমারে দূর থিকা দেইখা তিন জনই সখা ভাবে আগায় আসে উষ্ণ অভিবাদনে আর আমিও পুলকিত হয়ে হই বিগলিত চিত্ত। সেটাই রাইসুর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।

৭. রাইসুকে আমি কীভাবে মূল্যায়ন করি?
রাইসুর সাথে ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপের আগে রাইসুর লেখালেখি নিয়া আমার কোনো ধারণা ছিল না, তার সাথে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপের পর দেখলাম রাইসু কুতর্কের দোকান চালায়, তার কবিতার পোস্টের অধিকাংশতে আমি লাইক দেই, তার অ্যাক্টিভ বুদ্ধিজীবিতায় অ্যাকশন আছে, বুদ্ধিজীবী হিসাবে সে মাঠ গরম কইরা তোলার বুদ্ধিবৃত্তি প্রদর্শন সক্ষম।

ব্রাত্য রাইসুর বুদ্ধিবৃত্তির উদাহরণ স্বরূপ তার ঢাকা ক্লাব কাণ্ডের উল্লেখ করা যায়, যে বুদ্ধিবৃত্তিক নৈপুণ্যে সে ঢাকা ক্লাব কাণ্ডের উপস্থাপন ঘটাইছে, যে টান টান সার্কাস্টিক আমেজ শুরু থিকা সমাপ্তি অবধি তাল লয় সহকারে খেলা করাইছে তাতে আমি বিগ অপেরা দেখার আনন্দ উপভোগ করছি, অবশ্য এ রকমও কয়েকবার মনে হইছে যে মাজুল প্রতিপক্ষের নিষ্ক্রিয় অন্তর্ধানে অপেরাটা বিগ শো-য়ের কতক স্ট্রিং মিস করছে।

৮. ব্রাত্য রাইসুর ৫০ উত্তর আভিযাত্রায় শুভকামনা।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুকে নিয়ে যৎসামান্য

২০০৩ বা ০৪ বা ০৫ বা ০৬—তখন আমরা বাংলা কবিতার মাস্তানি রপ্ত করছি। উন্নাসিকতার চির সজারু কাঁটা সারা দেহের লোম-চুল-বাল। কলমকে কলম মনে হয় না, ঘরে বানানো হাতবোম মনে হয়, যেখানে-সেখানে ফুটে যে কোনো মুহূর্তে আতঙ্ক ছড়াতে পারে চারপাশে। আমাদের সময়ের আগে জন্মানো সব চিন্তা, শিল্প, কবিতা থেকে ব্যায়ামবিদের গাঁ গুলানো ঘামের গন্ধ পাওয়ার মত নাক নিয়ে আমরা শাহবাগের দারোয়ান। রশীদ খান আর ভীমসেন যোশি আমাদের নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত গায়। সূর্যাস্তের আগে যখন রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের জাতীয় পতাকা ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তখন ভাবি সকল পতাকাদণ্ড আমরা গায়েব করে দিব।

আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কনফিডেন্স ব্যাপক, প্রবল। সাহিত্যের রথীরা আমাদের এড়িয়ে চলে। কিছুতেই তাদের আমাদের ভালো লাগে না। তাদের দুচারটা পোষমানারাও আমাদের এড়িয়ে চলে, যেহেতু প্রভুভক্ত ঘেউ পাচাটা মারার অধিকার আমাদের ছিল।

আমাদের আড্ডা আজিজের নিচতলার হোটেলে। সেখানে যে চা দিয়ে যায় তার নাম আমরা রেখেছিলাম বিখ্যাত এক কবির নামে।

মৃদুল মাহবুব

সেই সমস্ত উত্তাল লাল বারুদ মাখা দিনগুলোতে লাজুক সেনাপতি বেশে মাসুদ খান আসতেন বিরাট সরকারি গাড়ি চেপে, ইন-করা ফিটফাট কবি। আশির দশকের সবচেয়ে পাত্তা পাওয়া মিষ্টভাষী কবি আমাদের আড্ডায়। নিজের কবিতা বাদে বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো হিন্দু-মুসলিম কবি নাই যার কবিতা চা খেতে খেতে তিনি পড়েন নাই। বৌদ্ধ কোনো কবির কবিতা তিনি পড়েন নাই আজ মনে পড়ছে। সেই সমস্ত আড্ডায় মাসুদ ভাই আমাদের একটু একটু ব্রাত্য রাইসু খাওয়াতে চাইতেন চায়ের সাথে সাথে, চা দিয়ে পুড়ি যেভাবে খায়।

যেহেতু প্রতিরোধ গড়ার মত কম বয়স ও চক্ষুলজ্জাহীনতা আমাদের প্রবল মাত্রায় ছিল সেজন্য রাইসুর কবিতা তেমন একটা বেল পায় নি আমাদের হৈচৈময় দিনগুলোতে।

কেন পায় নি?

‘খাইছি’, ‘করছি’ এই সব ক্রিয়ার কাণ্ডজ্ঞানহীন কাণ্ড কবিতা তৈরি করার প্রজেক্ট ছাড়া তেমন কিছু বলে মনে হতো না। ‘পূর্ববাংলার ভাষা’ নামক যে তকমা বাজারে চালু ছিল তার সবচেয়ে বড়  অ্যাপ্লাইড প্রজেক্ট হলো ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি‘। তাই পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলনকারীদের কাছে রাইসু একটা নামই সে সময়। সব থেকে সফল প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি)। জোর করে নতুন কবিতা হিসাবে চালানোর এই সমস্ত রাইসুর চালাকি, হারামিপনা।

আমরা বলতাম ডিপজলের পূর্ববাংলার ভাষায় লিখিত তার এইসব কবিতার মধ্যে এক রকম গায়ের জোর মার্কা ভিলেনি আছে; ইঞ্জিন গরম, সান ডে মানডে ক্লোজিংয়ের হাস্যরস আছে। কবিতাকে এত শস্তা আমরা হতে দিতে পারি না আমাদের চোখ লাল সিজনে। আমরা কয়জন আজিজের একই ইউনিফর্ম পরিহিত দারোয়ান; এভাবে শিল্প চুরি হতে দিতে আমরা পারি না।

স্যাটায়ার বাংলা কবিতায় নতুন এমন কিছু না। রাইসুর কবিতা বড়জোর ট্রাডিশনাল স্যাটায়ার কবিতা, যা বহুকাল আগেই লিখিত বাংলায়। পাঠ্যপুস্তকের সফদার ডাক্তার টাইপের শিশুতোষ স্যাটায়ারের ষোড়শ ভার্সন রাইসুর কবিতা; ঊণউন্নত, ক্ষেত্র বিশেষে বহুমুখীর ভান ধরা, ধামাটে। রাইসু সেই আবহমান বাংলা কবিতার স্যাটায়ারের একটা অপভ্রংশ মাত্র। সেই ২০০৩ কিংবা ০৪ বা ০৫/ ০৬ সালে রাইসুর কবিতা মাপার জন্য আমার গজফিতায় বড়জোর এক ইঞ্চি ছিল কিনা সন্দেহ আছে। সো, রাইসু, নো বেল , নো পাত্তা। ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ হলো মরা বাড়িতে শোক না করে হাস্যরস করার মত জাত ফালতুমি, অতি ভিন্নতার মাইকিং।

এই সমস্ত নিয়ে তর্কাতর্কির পর মাসুদ ভায়ের বিনীত গুরুগম্ভীর অনুরোধ—তারপরও আমরা যেন রাইসুকে আবার পড়ে দেখি সময় সুযোগে। কবিতার উপর আস্থা তখন ধর্মবিশ্বাস পর্যায়ে। সেই সময় রাইসুর ‘আকাশে কালিদাসের সাথে মেগ দেখতেছি’ বাজারে বিরল। মাসুদ ভাই সেই বইয়ের একটা কপি মগবাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দিয়েছিলেন। তা আর ফেরত দেওয়া হয় নাই। আমার ফেরত দেবার ইচ্ছা জাগার আগেই তিনি দেশ ছেড়েছেন। এই কপি আমি একদিন নিলামে তুলবো এবং সেই টাকা দিয়ে ‘রাইসু কালিদাস’ পদক প্রদান করবো আমাদের মত আগুন লাগা বয়সী তরুণ দুস্থ কবিদের কোনো দলকে যারা সেই টাকায় অন্য কোনো বড় কবির তত্ত্বাবধানে চা খাবে আর ওয়াক থু থু করবে আমাদের সময়ের কবিদের কবিতা পড়ে। তাদের রক্তের রঙ হবে আমাদের মতই গাঢ় নীল।

তবে সেই সময় জনাব রাইসু সম্পর্কে আমার যে বিরাট জ্ঞানগর্ভ ক্রিটিকাল মনোভাব ছিল তা এখনকার যৎসামান্য উপলব্ধির হিসাবে নিতান্ত ফালতু ও বাজে মনে হয়। কবিতা নামক ধর্মচর্চার নানা রকম সীমাবদ্ধতা ছিলো বৈ কি! সময়ের সাথে সাথে সময়ই পাল্টায়, নতুন চিন্তা জন্ম হয়। কবি হিসাবে ব্রাত্য রাইসু মূল্যবান আমার কাছে এখন। কেননা বড় কবি হবার নানা উপসর্গ এবং সেই রোগটা তার ছিল এবং এখনও যেহেতু তার বয়স মাত্র ৫০, সেজন্য ধরে নিচ্ছি বড় কবি হয়ে ওঠার জন্য তিনি আরো ৩০-৩৫ বছর পাবেন।

কেন তিনি বড় কবি হয়ে উঠবেন বা গুরুত্বপূর্ণ এখনই তার কারণ পরে বলি।

একটা বয়সে মানুষ দল বেঁধে ভাবে, দল বেঁধে খায়, দল বেঁধে প্রেম করে, ঘৃণা করে, দল বেঁধে স্বপ্নে বিছানা ভেজায় ও দল বেঁধে বানরের মত কিচির মিচির করে গাছের ডালে ঝোলে। সো সেই সমস্ত চিন্তা যত না ব্যক্তিগত তার থেকে বেশি দলগত। একটা বয়সের পর একটা বিচ্ছেদ, ছেদ, নির্জনতা, ব্যক্তিকেন্দ্রর ঘোর লাগে। এই নির্জনতার সাংগ্রি-লায় বসে বাংলাভাষী নানা কবির কবিতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে রাইসুর কবিতা নিয়েও ভেবেছি।

দেখলাম, রাইসু নামক একক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সমবায় সমাজ ও টিনের চশমা লাগানো তার অনুগামীরা তাকে কবি না ভেবে চিন্তক ভেবে বসে আছে।

এটা নিতান্ত রাইসুর অবমূল্যায়ন, তার বিরোধী বা অনুগামী দুই তরফ থেকেই। সে যতটা কবি ততটা চিন্তক নন। রাইসুর চিন্তা খাপছাড়া। চিন্তা বিষয়টা একে অপরের উপর নির্ভর করে যৌথভাবে আগায়। রাইসুর চিন্তাপদ্ধতি অনেক বেশি ব্যক্তিগত রাজনীতি নির্ভর; অনেক সময়ই সমর্থন বা বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সমর্থন বা বিরোধ চূড়ান্ত নতুন কোনো চিন্তার জন্ম দেয় না। এটাই হয়তো এই সমাজের একটা ট্র্যাজেডি, না হয় বড় কমেডি যে রাইসুর মত বড় কবিকে চিন্তক হিসাবে ধরে নিচ্ছি।

তার কুতর্কের দোকানের অন্ধকারের উপর যে কবিত্বের আলো সে, এই নাগরিক ঢাকা শহর তা ধরতে পারে নাই। ভাষা বিষয়ক তার জ্ঞান ভাসা ভাসা, উপরি উপরি। যত না কুতর্ক পাঠ সমাজের, ততটাই কম রাইসুর কবিতা পাঠক। বা ততটা কবিতাও সে লেখে নাই হয়তো। রাইসু যতটা স্মার্ট তার ফলোয়াররা ততটাই ক্ষ্যাত, গ্রাম্য, স্বল্পস্বশিক্ষিত। লেখকের ৪০-এর পর একটা সময় আসে যখন সে তার ফলোয়ারকে সার্ভ করতে চায়। আমার মনে হয় রাইসু ভায়ের ক্ষেত্রে তেমনই হয়েছে। তিনি তার অকালচার্ড ফলোয়ারদের না পারার অবচেতনকে নারিশ করতে করতে, তাদের ভ্যালুটাকে মুভ ফরোয়ার্ড করতে করতে অনেক বেশি সরে গেছেন কবিতা থেকে কুতর্কের দিকে।

এটা হয়তো তার সিক্রেট প্লেজার। সাধুর যেমন প্রাপ্ত বয়সে চুরি করতে গেলে লিঙ্গোত্থান হয়! একজন লেখককে তার নিজের ভ্যালুটাকেই ইলংগেট করতে হয়। পাঠকের দায়িত্ব নিতে গিয়ে তাকে শেষ হয়ে যেতে হয় কখনও কখনও। সব কিছুই ব্যক্তির চয়েস। হয়তো এইটাই রাইসু চায়। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তার মধ্যে সন্মোহন করার ক্ষমতা আছে, হেড টু হেড টেল টু টেল এর প্রতিলিপি তিনি তার ফলোয়ারদের দিয়ে লেখাতে পারেন।

নকলের একটা সীমা থাকে! কিন্তু তার চিন্তা বা কবিতার ভঙ্গি বা তার ভাব বহু নবীন নবিশদের নকল করতে দেখেছি। তারা চৈনিক জাতির মত কপি করতে পারে হুবহু রাইসুকে। ফলে রাইসুর অনেক কবিতা ও চিন্তা তার ফলোয়াররা লিখে দিচ্ছে নিজেদের নামে। সেই অর্থে রাইসুর নিজের কবিতা তিনি শুধু নন, তার ফলোয়াররা লিখছেন। এইটা যে কোনো কবি জীবনের বড় পাওয়াই তো বটে। এবং বড় কবির সময়কে প্রভাবিত করার যে ক্ষমতা থাকে তা তো এটাই।

বাংলাদেশের সাহিত্যের কয়জন কবি দিয়ে সমকালের ছোট ছোট পোলা-মেয়ে কবিতা যশঃপ্রার্থীরা প্রভাবিত? তেমন নাই। কিন্তু রাইসুর কবিতা ও চিন্তা অনুকরণকারীদের বয়স ১৭ থেকে ৫৫। আপনি তার যাই বিরোধিতা করেন না কেন, এটা ভেবে দেখা দরকার।

কথা হলো, কী এমন আছে তার কবিতায় ও ভাসা ভাসা খণ্ডিত চিন্তায়?

রাইসু যে ভাষায়, যে বিষয়ে, যে অনুসঙ্গে, যে উপমায় কবিতা লিখেছেন, আরো সোজা ভাবে বললে তার কবিতা করার যে সিলেকশন ও চয়েজ, ফ্রি উইল তা কয়জন বাংলাভাষী কবির আছে এই বঙ্গ ভাষায়?

এ লেখার জন্য সাহস ও ঝুঁকি দুটোই লাগে। বাংলা কবিতায় এই রকম ঝুঁকি খুব কম কবিই নিয়েছেন।

তার আগে-পরের অধিকাংশ কবি গড়পড়তা সচল ট্রেন্ডি কবিতার রিমিক্সে সমকালে হাততালি দেওয়া কবিতা বা অধিক অর্থপূর্ণ নিরীক্ষা লিখে লিখে নিজেকে মাঝারি মাপের কবি হিসাবে সাহিত্যের সমবায় সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

রাইসুর সময়ের কবিতার ঘ্রাণময়, প্রাণময়, শিল্পময় বাগানে সে একটা কালো কাউয়া; প্রবল ও প্রখর তার কণ্ঠস্বর। দূর থেকে শোনা যায়। বড় কবিরা সচলতার বিপরীতে কবিতার ভাষা ও চিন্তা নিয়ে বড় ধরনের সাহস ও রিস্ক নেয়।

উৎপলের ‘চৈত্রে রচিত কবিতা’ স্বাভাবিক বাংলা কবিতা ভাষার বিপরীতে লেখা। জীবনানন্দ শাসিত যে বাংলা কবিতার শিল্পসম্মত হেজিমনি তার মধ্যে একটা ঝাঁকুনি উৎপলের কবিতা। বাংলা কবিতার ভাষা রিঅর্ডার হলো উৎপলের কাজের মাধ্যমে। বা জহর সেন মজুমদারের প্রবল একটা কবিতাগ্রন্থ ‘বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম’। প্রজন্মকে ভিন্ন কবিতা লেখার সাহস দেয়। চলিত কবিতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের মত,  স্রেফ নিজের মত লিখে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেবার মত কতজন কবি এ সময়ে আছে!

রাইসু বাংলা কবিতার সহজ জাগানিয়া ওয়ান আয়রন ম্যান আর্মি। তার সবচেয়ে বড় শক্তি তিনি আবহমান শিল্পিত কবিতা লিখতে চান নাই, লিখেন নাই।

বড় শিল্প ইনডিফারেন্ট। রাইসুর হাতে বাংলা কবিতার রিনিউয়্যাল হয়েছে। এর বড় কবিরা তার লেখা দ্বারা শিল্পকে অনুপ্রেরণা দেয়, নিজের মত লিখতে থাকার শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে ঘাড়ের উপর হাত রাখে তারা। এটাই বড় কবির কাজ। কতটা ভালো কবিতা, শিল্পসম্মত কবিতা লেখা হলো সে বিচার কোনো বিচার না। কেননা কবিতার মত শুনতে ভালো-ভালো কবিতা বহু লেখা হয়েছে। এই সমস্ত অবাল কবিতার দরকারই বা কী আর। যে পরিমাণ ভালো শিল্পিত, নন্দিত, ছন্দিত কবিতার জন্ম হয়েছে তারপর এই রকম ভালো কবিতা আরও দুইশ বছর না লিখলেও চলে।

“বাংলা কবিতায় ‘আকাশে কালিদাসের সাথে মেগ দেখতেছি’ একটা বিরল ঘটনা। চিন্তায় ও ভাষায় এটা নতুন।”

কবিতা মানে ভাষা ও চিন্তা। সেই ভাষা চিন্তা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয়। সবাই এই পরিবর্তনে শরিক হতে পারে না। বাংলা কবিতায় ‘আকাশে কালিদাসের সাথে মেগ দেখতেছি’ একটা বিরল ঘটনা। চিন্তায় ও ভাষায় এটা নতুন। এইরূপ যা লেখা হয়েছে তা বড় প্রাণহীন, শব্দ-কসরৎ। এই রকম ভাষায়, বিশেষত মৌখিক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে আরও দু’একটি কবিতার বই আছে। সেগুলো সেই অর্থে কবিতার বই হয়ে ওঠে নাই। সেই তুলনায় রাইসুর কবিতা সজীব, জীবন্ত, কচি কচি।

পাঠকের কবিতা সম্পর্কিত যে ভ্যালু তাকে একটা ধাক্কা দেয় রাইসুর কবিতা। একটা নতুর চিন্তার জন্ম দেখা যায়। এক নতুন দার্শনিক জীবনের দিকে যাত্রার ইন্সেপাইরেশন তার কবিতাগুলি। যা তার কুতর্ক থেকে বহু গুণ শার্প, স্মার্ট। আর এইসব নতুন কবিতা ভালো লাগা, না-লাগা রুচি নির্ভর একটা ব্যাপার। এই সমাজে অধিকাংশ কবিতায় কোনো দার্শনিক উপলব্ধি নাই, দৃষ্টিভঙ্গির কোনো নতুনত্ব নাই। খালি কথা আর কথা, আপ্তবাক্য, শক্ত শক্ত শব্দ, অতিপ্রতিজ্ঞা, ছন্দ আর ইমেজি ঝনঝনানি। এই সমস্ত বর্ণনাক্রান্ত দেওয়ালে টানানো ছবির মত কবিতার বিরুদ্ধে রাইসুর কবিতার দার্শনিকতা, তার ভাষা ও প্রকাশনামা অতিনতুন লাগে আমার কাছে। এতগুলো বিষয় একসাথে বাংলা কবিতায় কম।

কাদের কবিতায় আছে বলুন? সেই হিসাবে সে বড় কবির লক্ষণ নিয়ে হাজির আছে সুসাহিত্যিক সমাজে। এমন সুশীলতাহীন ভাষায় কবিতা লেখার সাহস এবং তার সফলতা বড় বিষয় হিসাবেই আমি দেখি, অন্তত টিল নাউ।

এটাই তার কবিতা নিয়ে আমার যৎসামান্য ধারণা।

বুুড়া কবিরা কম বয়সী কবিদের নানা কুপরামর্শ দেয়। কিন্তু এই থাম্বসরুলের বাইরে আমি রাইসুকে দুই তিনটা পরামর্শ দিতে চাই।

নিজের কবিতাকে নিজের ছাড়িয়ে যাবার কিছু বিষয় থাকে বড় কবিদের মধ্যে। নিজেকে রিনিউয়্যাল করা লাগে।

রাইসুর প্রথম ও শেষ কবিতার বইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কম। কবিতায় নতুন রাইসুর দেখা যেন পাওয়া যায়। ব্রাত্য রাইসুকে তার ক্ষ্যাত, চূড়ান্ত আনস্মার্ট ফলোয়ার দলকে এখনই এড়িয়ে যাওয়া দরকার তার নিজের প্রয়োজনে। কেন তা আগেই বলেছি যদি তিনি বুঝে থাকেন।

তার উচিত জীবদ্দশায় কম দামে নিজের বইপত্র ছাপানো। কথা কম বলে আরও কিছু লেখা লিখে ফেলা দরকার তার বয়স ষাট হবার আগেই। ষাটের পর লেখকরা নিজেই নিজের রিপিটেশন করে। নতুন কিছু হয় না তেমন একটা। হলে তার উদাহরণ কই? তিনি তার সচল বয়সে অনেক চিন্তা-ভাবনা করছেন। সেগুলোর বই আকারে প্রকাশিত রূপে থাকলে তাকে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হয়।

তার চিন্তার বিপরীতে সমাজকে চিন্তার সুযোগ দিতে হবে। এত বছর লেখালেখির পর নিজের লেখাপত্রকে সুলভ করে রাখা ভালো। ৫০ বছরে তার লেখালেখি অতি সামান্য, তিনি যেন ভুলে না যান যে তিনি রিল্কে নন।

এইগুলো তার মত ৫০ বছর বয়স্ক কবির প্রতি আমার যৎসামান্য পরামর্শ।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

চেনা, আধ-চেনা অথবা না-চেনা ব্রাত্য রাইসু

আমি সাধারণত সেলিব্রেটিদের নিয়ে ঘাটাঘাটি করি না। কম ঘাটাঘাটি করে আমি তাদেরকে শান্তিতে রাখতে চাই আর নিজেও শান্তিতে থাকতে চাই। যাই হোক, ব্রাত্য রাইসু কি সেলিব্রেটি?

আমার মনে হইছে ‘হ্যাঁ’। তাই আমি কখনোই তাকে ঘাটাঘাটি করি নাই।

তাইলে পরিচয় হইল কেমনে?

আমার ইউনিভার্সিটির এক বড় ভাইয়ের ফেসবুকের স্ট্যাটাসের  কারণে। সেই ভাইয়ের বেশি ভাগ স্ট্যাটাস দেখলেই কেন জানি গা গিরগিরানি রাগ ওঠে। দুনিয়ার সকল লোকের উপরেই সে মহা বিরক্ত আর সেইসব তার স্ট্যাটাসের মূল বিষয়। ঐ ভাইয়ের এ রকম কোনো এক স্ট্যাটাস আমি একদিন নাকমুখ কুঁচকায়ে দেখতেছিলাম। আমার কাছে কোনো শক্ত জবাব ছিল না। কিন্তু ব্রাত্য রাইসু তাকে একটা কঠিন কিছু বললেন; খুশীতে আমি তাতে লাইক দিলাম। তার পর পরেই তিনি আমাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠালেন।

আমি সেলিব্রেটিদের ত্যক্ত করি না এইটা ঠিক, কিন্তু তারা আমাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ করবে আর আমি গ্রহণ করব না এত বড় বুকের পাটা আমার নাই। আমি লাফাইতে লাফাইতে অ্যাকসেপ্ট করলাম।

ফারজিনা মালেক স্নিগ্ধা

এমনে করেই কিছুদিন গেল। সেলিব্রেটি লোকদের বন্ধু আমি—এই সুখেই আমি সুখী। কখনোই ত্যক্ত করি না তারে। শুধু তার স্ট্যাটাস পড়ি। কোনো কোনো দিন বানের জলের মত স্ট্যাটাস আসে নিউজ ফিডে। মধ্যে মধ্যে ভাবি এই লোকটার সিনামা বানানো আর সিনামা দেখানোর মধ্যে কোনো সেন্সর বোর্ড নাই। যাই মনে আসে তাই লেখে। নাইলে এ রকম এক ঘণ্টায় পাঁচটা ছয়টা স্ট্যাটাস আসে কেমনে?

আবার একটু পরে মনে হইছে, ভাগ্যিস সেন্সর বোর্ড নাই। যা ভাবে তাই লিখতে পারে। আমি তো কাটাকাটি করতে করতে এমন একটা লেখা লিখি যে পরে মনে হয়, এই রকম কিছু তো আসলে আমি ভাবি নাই। যা ভাবলাম তা তো নাই হয়ে গেল! যাই হোক ব্রাত্য রাইসুর স্ট্যাটাসে আসি আবার।

অনেকগুলো স্ট্যাটাসই খুব বিরক্ত লাগে। যেমন ধরেন একদিন দেখা গেল লেখছে “আমার থেকে বড় বুদ্ধিজীবী আর কে আছে এই দেশে?” পড়লেই মেজাজ খারাপ হয়; কী উদ্ধত! মন চায় দেই একটা গালি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গালি তো দূরের কথা একটা অ্যাংরি ফেইজও দেই না।

দুইটা কারণে নির্লিপ্ত থাকি আমি। প্রথম কারণ, ঐ যে আমার ‘ভদ্র’ ‘সভ্য’ ‘সেন্সর বোর্ড’! কাটাকাটি করা যার কাজ। পেটের ভিতর থেকে সব কিছু বাইর হইতে দেয় না। দ্বিতীয় কারণটা আমার জন্য একটু লজ্জার। কেননা, আমি সত্যিই জানি না ব্রাত্য রাইসুর থেকে আরও ভাল বুদ্ধিজীবী আছে কিনা এই দেশে। যদি মতামতে বলি যে আপনি একটা ছোট বুদ্ধিজীবী, তাইলে তো আমাকে বড় বুদ্ধিজীবী কারা এবং কেন তা দেখাইতে হবে।

ঠিক এই পয়েন্টে এসেই ব্রাত্য রাইসুর উপরে আমার রাগ খানিকটা কমে। আমার মনে হইতে থাকে সে ইচ্ছা কইরাই উস্কায়া দেয় লোকজনরে। “আয় আমার সঙ্গে তর্ক করতে আয়” এইরকম একটা ভঙ্গী থাকে কথায়। আর কারও সঙ্গে তর্ক করতে গেলেই তো আপনাকে সেই বিষয়ে জানতে হবে—ওইটাই মনে হয় তার খেলা। যাই হোক, এই সবই তো আমার মনে হওয়া। খুব দূর থেকে মনে হওয়া।

পরে অবশ্য আর একটু কাছ থেকে যোগাযোগ হল তার সাথে। সেটাও একটা স্ট্যাটাস এর জের ধরেই। “বান্দরের মানুষ হওয়া, সেই মানুষের সভ্য হওয়া, আর সভ্যতারে বুইড়া আঙুল দেখানো”—এইরকম কিছু একটা বিষয় নিয়া স্ট্যাটাস দিছিলাম কোন এক কালে। সেইখানে ব্রাত্য রাইসু একখানা হাসিমুখ দিছিল। আমার দেখা ওইটাই উনার সবচাইতে ভাল কমেন্ট।

আমি তো পুরাই খুশী। কারণ আমার কোনো লেখক বা বুদ্ধিজীবী বন্ধুবান্ধব আমার লেখায় লাইক-কমেন্ট দেয় না। আমি ধইরাই নিছি, ওরা উঁচা জাতের আর আমি ওঁচা জাতের। যাই হোক আমার খুশী ভাব আরও একশ গুণ বেড়ে গেল যখন তিনি আমাকে টেক্সট করলেন আর আমার কাছে লেখা চাইলেন shamprotik.com এর জন্য।

দিলাম লেখা। তারপরের ঘটনা আরও অদ্ভুত! উনি বললেন “লেখা ভাল হইছে।”

আমি তখনও বুঝতে পারি নাই যে উনি এত ভাল করে (আমার ভালর মাপকাঠিতে আর কি!) কথা বলতে পারেন। তারপরে মাঝে মধ্যেই ইনবক্সে কথা হইত। হিজিবিজি সব বিষয়ে। লেখা পাঠান, লেখা দিচ্ছি, ঢাকায় আসলে বইলেন আড্ডা দিব নি—এই ধরনের কথাবার্তা।

এর মধ্যেই এক স্ট্যাটাসে লিখলেন, তারে যেন ইনবক্সে বেশি বিরক্ত না করা হয়। সে ইনবক্সে জবাব দেয় না—এইসব কী সব জানি।

আমি চুপ কইরা যাই। আবার কিছুদিন পরে হয়ত উনিই নক করে, লেখা চায় বা আমি নিজেও কিছু লিখলে তাকে জানাই। কিন্তু তার চাঁছাছোলা ব্যক্তিত্বের কারণে একটা দূরত্ব বজায় রাখি। কী না কী বইলা ফেলে আবার! ভয়টা কেমন বেশি ছিল তার একটা কাহিনি বলি?

একদিন উনি আমাকে ফোন দিছে কোনো একটা লেখার বিষয়ে। কথা হইল অনেকক্ষণ। শেষে যখন ফোন রাখলো, তখন আমারে বলল, “আপনার সাথে কথা বলে অনেক ভাল লাগল।” বিশ্বাস করেন… আমার পুরা কয়েক সেকেন্ড লাগছিল বুঝতে যে ব্রাত্য রাইসু এই ভাবে কথা বলছে। উনার সম্পর্কে আমার ধারণা এতটাই অন্যরকম ছিল! (“অন্যরকম” কথাটা লিখেই মনে হল এটা নিশ্চই আমার সেন্সর বোর্ডের কাজ!)

যাই হোক, উনাকে আমি চিনি/জানি বলতে এগুলাই। দেড়/দুই বছর ধরে স্ট্যাটাস দেখা আর ইনবক্সে কথা বলা। এর মধ্যে যে কতবার কত স্ট্যাটাস দেখে মেজাজ খিচড়ায়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নাই। তবে আমার তার মধ্যেও একটা জিনিস খুব মজা লাগছে। উনি প্রথমে কিছু একটা বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়; ধরেন—ঢাকা ক্লাব থিকা আমাকে বাইর কইরা দিছে অথবা ১৮ থেকে ২১ বছরের মেয়েদের প্রতি আমার আগ্রহ অথবা আমার জন্মদিন নিয়া আমি হ্যান করব আমি ত্যান করব—এই ধরনের কিছু একটা।

প্রথমে স্ট্যাটাসটা পড়েই আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল। তারপর উনি যখন লাগাতার এই বিষয় নিয়াই লেখতে থাকে তখন এক ধরনের অভ্যস্ততা কাজ করে। আস্তে আস্তে বার্তার মধ্যে ঢুকতে থাকি। একটা সময় পরে আর খারাপ লাগে না। বরং নিজেকে ইনক্লুডেড ফিল করি। ঘটনার পরের ধাপ জানতে ইচ্ছা করে। এইটা মনে হয় উনার একটা ক্ষমতা।

আর কী? উনারে নিয়া দুই একটা ভাল কথা লিখতে ইচ্ছা করতেছে। কিন্তু আমি আসলেই ব্রাত্য রাইসুরে জানি না খুব বেশি। উনার একটা বইও পড়ি নাই এখন পর্যন্ত। এই মাত্র যে লাইনটা লিখলাম তারপরেও যে উনি আমার এই লেখাটা ছাপাইতে দিতাছে শুধুমাত্র এই কারণেই ব্রাত্য রাইসুরে ভাল লাগতেই পারে!

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুর আবির্ভাব

ব্রাত্য রাইসু আকারে পৃথিবীতে আগমনের ৫০ বছর উদযাপনরে অভিনন্দন জানাই। যদিও ব্রাত্য রাইসু গঠিত হওয়ার উপাদান সমূহের বয়স জগতের সমান সমান। তাঁর ১৩০ বছর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা সে তুলনায় সামান্যই।

সাহিত্যে বংশানুগত পীরপ্রথা ভাঙিয়া রাইসুর ছক্কার বল জনতার গ্যালারিতে পড়িতেছে, সবাই ওই বল টোকাইতেছে। বাকি জিন্দেগি যাতে জনতা রাইসুকে পীরে পরিণত করিয়া ফেরকাবন্দি না করে, সেই লক্ষ্যে রাইসু বলগুলো গ্যালারির বিভিন্ন দিকে ছুঁড়িয়া দিতে পারেন। অবশ্যই এই ক্ষেত্রে ব্রাত্য রাইসুর দক্ষতা অনন্য।

মুহম্মদ আবদুল বাতেন

যাহারা মনে মনে রাইসুর প্রতি ঈর্ষা করেন, তারাও অনেকে অবশ্যই প্রকাশ্যে প্রশংসা না করে পারেন না। এতে বোঝা যায়, রাইসু নিজস্ব এবং ভিন্ন একটি মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। মতের মাত্রাগত ভিন্নতা ব্যক্তিভেদে আলাদা হইতে পারে, কিন্তু রাইসুর চিন্তা ও উদ্ভাবনা সজীব ও আনন্দময়।

রাইসুর ভাষা ও শিল্পবোধ এই সময়ের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। রাইসু নিজের নিন্দা নিজেই করতে পারেন, নিজের অধিকার এবং নিজের মহত্ত্ব নিজেই ঘোষণা দিতে পারেন, নিজেকে উন্মুক্ত করে প্রকাশে তার কোনো দ্বিধা নেই। তাঁর প্রশংসা কিংবা নিন্দা করিয়া কোনো লেখা বেহুদা মনে হয়। রাইসু উন্মুক্ত।

নব্বই দশকের শুরু থেকে রাইসুর লেখা ও চিন্তার সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে। আমার অন্তর্মুখী এবং নিজেকে নির্বাসিত রাখার স্বভাবের কারণে রাইসুর সঙ্গে প্রথম দিকের সেই দিনগুলোতে আমার আলাপ ও সাক্ষাৎ ঘটে নাই। ট্রেন স্টেশনের মতো পাশাপাশি দুটি ট্রেন মুভ করলেও তাদের মুখোমুখি হতে হয় না। রাইসুর সঙ্গে আমার চলা ওই সমান্তরাল যাত্রার মতোই, দেখা হলেও কথা হয় নাই। এই চলনটা আমার ভালোই লাগে, রাইসুকে বুঝতে এবং তার চিন্তা ও লেখার আস্বাদনের পরিসর পাই।

রাইসুকে বুঝতে পারাটা একটু জটিল। কারণ আমাদের প্রচলিত সাহিত্য সমাজ খুঁটি ধরে ঘোরে, সবাই একটা লাটিমের নির্দিষ্ট সীমায় সুতা ধরে ট্যাগ লাগাইয়া চলে। ডান, বাম, গোঁড়া নানা গুরুপন্থী, নানা চেতনাপন্থী—রাইসু এর মধ্যে পড়েন না। তার কর্ম, জীবন প্রণালী, লেখার ভাষা, চিন্তা পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। পরিচিতদের কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করেছে, রাইসুকে কেন পছন্দ করি, আমি বলি—রাইসু সৎ এবং মৌলিক।

রাইসুকে নিয়া অনেক গল্প, ঠিক গল্প নয়, রাইসু কেমন সেই আলোচনা আমি বহুবার শুনেছি রাইসুর স্কুল জীবনের সহপাঠী তুহিনের কাছে। সহপাঠী হলে যেমন অধিকার নিয়া বলা তেমন করেই তুহিন রাইসুর প্রসঙ্গ তুলত। সেইসব গল্পের সারাংশ দাঁড়াত রাইসু মেধাবী এবং বোহেমিয়ান।

রাইসু খিঁলগাও গভমেন্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। রাইসুর চিন্তার জগৎ বন্ধুদের অনেকের কাছে বোধগম্য হওয়া কঠিন। রাইসুর চিন্তাগুলো কোনো টেক্সটের ধারাবাহিকতায় পড়ে না। এগুলো অ্যামিবার মতো স্থিতিস্থাপক। তাঁর চিন্তা নিজের ভেতর থেকে উৎসারিত। এজন্য রাইসুর চিন্তার জায়গাটা অন্যদের থেকে আলাদা। রাইসুর কবিতা, মতামত সব তার মতই। রাইসুর কাজ পুরানো ঘর সংস্কার নয়, ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তোলা। এজন্য অনেক প্রতিষ্ঠিত ধারণা নাকচ করে বিকল্প ধারণা তুলে ধরেন।

রাইসুর জীবন সংগ্রাম কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু জীবনরে তিনি সহজ করে নিয়েছেন। ঈর্ষা ও বৈরিতা মোকাবেলা করার সক্ষমতা রাইসুর আছে। নতুন এক পরিবর্তিত সমাজে শিল্পবোধের যে পরিবর্তন ঘটায়, রাইসুর লেখায় তা প্রতিফলিত হয়।

চটি পায়ে রাইসুকে আমি যেমন দেখেছি, এখনো রাইসুকে সেই বিপ্রতীপ দার্শনিক রেখার ওপর দিয়ে হাঁটতে দেখি। আলাপে আনন্দ ও গভীরতা পাই।

ব্রাত্য রাইসুকে আমি আন্তরিক অভিবাদন জানাই।

২০/১১/২০১৭

 

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

ভড়ং সর্বস্ব বাংলা আর্ট অ্যান্ড কালচারের হিসাব গুলিয়ে দেওয়ার ম্যাজিকের নাম ব্রাত্য রাইসু

এবং হে পাঠক, রাইসুর স্তুতিমুখরতায় নিজেরে ভাসানোর তরে আমার এ গদ্য নহে। বলে রাখা ভালো, কবি, চিত্রকর ও চিন্তাবিদ ব্রাত্য রাইসু আমার ব্যক্তিগত বা অব্যক্তিগত, কোনো প্রকার বন্ধু নয়। আর তা নয় বলেই রাইসুকে নিয়ে নিজের দু’চার কথা আমি লিখে ফেলছি, তাঁর জন্মদিনের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে।

প্রথমেই এসব বলতে হোলো, কারণ, বাংলা কবিতা বা বাংলা সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির দৃশ্যমান প্রেক্ষিত বড় বেশি মিডিয়ার পয়দা করা আচরণবিধিতে গ্যাদগ্যাদে, কিংবা বলা ভালো মিডিয়ার পয়দা করা মিডিওকারদের এইসব বেঙ্গলি আর্ট অ্যান্ড কালচার মিডিওকার হ্যা-হ্যা ফ্যা-ফ্যা, গা-ঘষাঘষি ও পারস্পরিক সুড়সুড়ি নির্ভর! কিন্তু এই সুড়সুড়ি জগতের লোক রাইসু নন। রাইসু চাকরজীবী বা মঞ্চজীবী বা কবিসভাজীবী কবি বা বুদ্ধিজীবী নন যেহেতু, যেহেতু রাইসুই ‘অখণ্ড বাংলা’য় হাতে গোণা কয়েকজন স্বাধীনচেতা ও আত্মযাপনে মগ্ন লেখক, কবি, চিন্তাবিদ তাই তাঁকে নিয়ে লেখা ছাড়া উপায় নাই।  এবং তাঁর ও আমার দূরত্ব অনেক অনেক, তাই তাঁকে নিয়ে লেখা সেফ। মানে, আমি হাওড়ার কবিতালিখিয়ে, আমি যেমন ইচ্ছা তেমন অতনু সিংহ, এই ব্রাত্য রাইসুর পঞ্চাশ বছরে না লিখলে, আর কে লিখবে? এই ভাবনা থেকেই লেখা। চিয়ার্স ম্যান, রাইসু, আপ্নারে শুভেচ্ছা।

অতনু সিংহ

আমি কবিতা লিখি মূলত। কবিতা ছাড়া বাকি যা লিখি, তার কিছু কবিতার মতো আর বাকিসব হাবিজাবি, না লিখলেও চলে। তো আমি কবি ব্রাত্য রাইসুকে চিনি বহুদিন। রাইসুকে চিনি আমার বিগত এক বান্ধবীর সূত্রে ( যিনি পশ্চিমবঙ্গের এক কবি)! ২০০৯ সালের মে মাসে একদিন রাতে টেলিফোনে আলাপের সময় একদিন রাইসুর কবিতা পড়ে শোনান। এবং রাইসুর প্রতি তাঁর প্রণয়বোধের কথা জানান। তাঁদের অর্কূটে স্ক্র্যাপ বিনিময় ও চ্যাটের বিষয়েও তিনি বলেন। সেই রাইসুকে আমার চেনা শুরু।

শুরুতেই রাইসুর কবিতা আমার ভালো লাগে। তাঁর মারফৎ আমি রাইসুর উচ্চারণের সহিত পরিচিত হই। ক্রমে তাঁর কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ ও  ভালো লাগা বেশ জমাটি আকার পায়। কিন্তু আমার বান্ধবীর লগে তাঁর চ্যাট আমার মোটেও ভালো লাগেনি, মানে আমি তখন ওইপ্রকার আনস্মার্ট এবং পোজেসিভ ছিলাম, আমি ওই মেয়েটিকে, মানে আমার বান্ধবী কবিকে,  মুখে কিছু না বললেও ব্যাপারটায় বেশ… থাক সেসব… এরপর ওই বছরেই কবি উৎপল (উৎপলকুমার বসু) আমায় দেওয়া তাঁর এক সাক্ষাৎকারে তাঁর ভালো লাগা নব্বই দশকে দুই বাংলার বেশ কয়েকজন কবির কথা বলেন। সেই তালিকায় রাইসু ছিলেন। সেই তালিকায় আমার অপছন্দের অনেক কবি থাকলেও, ব্রাত্য রাইসু ও আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে আমি ও উৎপলদা সহমত ছিলাম।

রাইসুকে আমি তাঁর লেখা দিয়েই দেখেছি। ব্যক্তি রাইসুর সাথে আমার ইনবক্সে দুই-তিন লাইনের বেশি কথা হয় নাই। হয় নাই ফোনালাপ, মুখোমুখি সাক্ষাৎ, চা কিংবা মদ্যপান, বরং ফেসবুকের কমেন্টে কথাকাটাকাটি হয়েছে, আমার সমালোচনা ও আমার বিরুদ্ধে ওনার প্রতি-আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, আমায় ব্লক করেছেন, পরে তা খুলেওছেন, কিন্তু নো বাক্যালাপ… তাই দিয়ে ওনার কবিতা, লেখালিখি বা চিন্তাজগতের মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে আমি কোনো কুণ্ঠাবোধ করছি না। কেননা, কবিতা, শিল্প, সাহিত্যের ক্ষেত্রে দুই বাংলায় যে কয়জন আমার তাৎক্ষণিক পূর্বসূরী ও সমসাময়িকদের কবিতা, গদ্য, বা শিল্প বা নন্দনচিন্তার সঙ্গে আমি নিজেকে রিল্যেট করতে পারি তার মধ্যে ঢাকার ব্রাত্য রাইসু একজন।

পশ্চিমবঙ্গে শূন্য দশকে অর্থাৎ ২০০০-২০১০ এই সময়কালে আমার লেখালিখির শুরুর দিকের অনেকটা। মূলত কবিতা লিখতে লিখতে  আমার আগের দশকের যে কয়জন কবির কবিতায় আকৃষ্ট হয়েছি, রাইসু তার মধ্যে অন্যতম। এর কারণ, রাইসুর লেখায় পূর্বনির্ধারণ নাই, রাইসুর লেখায় আরোপিত গাম্ভীর্য নাই, রূপক ও অলঙ্কারের লাচালাচি লাই, আছে মুহূর্ত, মুহূর্তের ইমেজ, আছে সমুদ্র সীমারেখা ভেঙে দেওয়ার চারকোলের বিনির্মিত অক্ষর জ্যামিতি (তাঁর চিত্রশিল্পের মতোই), যে কারণে আমার উৎপলকুমারের ‘টুসু আমার চিন্তামণি’ ভালো লাগে, সে কারণেই আমি মাঝেমধ্যে চুপচাপ পড়ে ফেলি জনাব শ্রী ব্রাত্য রাইসুর কবিতা।

‘দোরা কাউয়া পেয়ারা গাছে’ যেভাবে কু কু করে আর পেয়ারা গাছের পাতা ঝরে যায়, সেইভাবে বাংলা কবিতায় ব্রাহ্মবাদীদের উপনিষদীয় গাম্ভীর্য আর কর্পোরেট গা-চুল্কাচুল্কির সামনে রাইসু লিখে যান তাঁর বাক্য, তাঁর কবিতার লাইন ঢিল হয়ে টোকা মারে বাংলা কবিতার ক্যালকুত্তা-গেজের কাচে, অথবা বঙ্গ-একাডেমির বঙ্কিমীয় সুজলাং-সুফলাং মলয়জ শীতাতপ আরামের সামনে এক পশলা অনির্ধারিত অন্তর্বাস্তবতাকে হাজির করেন রাইসু। কেননা, আর্ট অ্যান্ড কালচারের নামে এইসব সুরভিত ক্যালকাটা ও ঢাকা ক্লাব থেকে খল বল করে কীভাবে বেরিয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় দাঁত, যে দাঁত এগিয়ে যায় রামপালে, যে দাঁত থেকে পোশাকে ঝরে পড়ে রক্ত, আর রাইসু গুনগুন করে লিখে রাখেন—

তোমার দাঁতগুলিরে নদীর তীরে
ধুইতে নিয়ো
তোমার রক্তমাখা দাঁতগুলিরে
নদীর তীরে ধুইতে নিয়ো

তোমার শিশুর রক্তে মাখা
দিনগুলি যায়
বেতন ছাড়াই

তোমার শিশুর রক্তে মাখা
বসন তুমি ধুইতে নিয়ো
নদীর তীরে

তোমার শিশুর রক্তে রাঙা
তোমার দাঁতগুলিরে
নদীর তীরে
ধুইতে নিয়ো

(‘তোমার দাঁতগুলিরে’, ব্রাত্য রাইসু )

 

রাইসুর বাক্যের মধ্যে অন্তর্লিরিক খেলা করে কিন্তু আমার মতে তা লিরিকের বঙ্গীয় ইয়্যুরোপ চেতনা নয় বরং এই চরাচর বাংলার লোকগাথা, বাংলার ন্যারেটোলজির নানা প্রকরণ ও তার জৈব উপাদানগুলি আমাদের কৃষিসমাজের যে সমষ্টিগত নির্জ্ঞানকে ধারণ করে, বাংলার সেই নির্জ্ঞানই মাঝে মধ্যে সুর হয়ে বয়ে যায় রাইসুর বাক্যের শিরা-ধমনী বেয়ে।

এইখানে রাইসুর একটা কবিতা পাঠ করা যাক:

যে সব উদ্বাস্তু সঙ্গে প্রেম ছিল
ভাবের বাণিজ্য গুরুতর
তারা আজ
অন্য কারো প্রতি মজি
দুর্দান্ত প্রণয়ে উচ্চতর; কাহ্নুগীতি
প্রাহ্নানন্দে গায়

১.
স্থগিত। তোমার দৃষ্টি। অন্তরীণ ।
খোলো চোখ
দেখো যত স্বপ্নের চরিত্র
রয়েছে তোমাকে ঘিরে—পাঠ করছে—অবান্তর
শয্যার বর্ণনা

২.
শোনো আজ এই ভ্রম প্রস্তাবিত,
কুণ্ঠায় রচিত
ছিল, আমাদের প্রেম মাত্র ভাষা ব্যবহারে
ছিল তোমার উদ্ভাস
ভ্রান্তিময়;
একথা সংশয়ে বলি ক্লান্তিকর লৌকিক ভাষায়

৩.
এই যে পথের পার্শ্বে
যাদের চরণচিহ্ন—
অনর্থক ভাষার মারপ্যাঁচ;
স্তব্ধ হোক। তুমি চোখ তোলো।
দেখি, কোথায় অযথা বাক্য
থেমে যায়;
অবলীলাক্রমে

৪.
ধরো এই হাত আমি
অন্ধের জ্যেষ্ঠভ্রাতা
হেঁটে যায়, আগাছার সাথে কার
সম্পর্ক তেমন?
যাহা তোমার প্রশ্রয়ে হই
প্রগল্‌ভ;
—সহনশীলতা! তব সঙ্গে লহ,
অগ্র হও, না করো পশ্চাৎ


ওগো ছলোছলো চক্ষু
স্নেহপসারিণী—
ওগো প্রণয়সম্ভব করো প্রতারণাযোগ্য তুমি
না রাখো সংশয়;
আমি যথাবাক্যস্থলে,
তোমার বন্দনা করব, উদ্বৃত্ত কথায়

৬.
না করো করুণা শোনো স্থিরজলে আর্তপ্রতিকৃতি
পক্ষপাতে ভেসে যায়…
করুণা তোমাকে করে; না ভাঙে
হঠাৎ বায়ু-প্ররোচনা শুনে
চোখ রাখে সন্দিহান তোমার নয়নে;
তোমার বিচ্যুতি করো! পা রাখো অস্থির
দুই নৌকার গলুই-এ
যাহা বর্জ্য বেঁধে রাখো দুর্বল প্রতিমাপুঞ্জ, দীর্ঘ এপিটাফে।

৭.
বলো করো কেন কুণ্ঠা গুণ্ঠন লুটাও আধোলীনা।
যদি পথভ্রষ্ট তুমি
দষ্ট হও, ক্লেশ করো, অর্ধযতি হও!
স্বেচ্ছাচারে নত হও, পোড়াও অঞ্চল
তুমি পূর্ণরতি হও!
ও যার দ্বিধার মাত্রা হিমাংকেরও নিচে
তারে শুধাও কুশল
তারে জনসভা ডেকে
করো গো চুম্বন, তুমি হীনেগতি হও!

৮.
না হয় বিরহ বলো,
বলো তবে হৃদয় মধ্যাহ্ন
আমি তোমার যাতনা স্মরি
তব দুখবর্ষ আজি উদযাপন করি।

(‘প্ররোচনা’, ব্রাত্য রাইসু )

এবং যেহেতু এই নদী ও কৃষি সমাজের উত্তরমূখের প্রগতিতে রাইসুর যৌবনের দিনকালগুলি মেট্রো সিটি ঢাকাকে কেন্দ্র করে, তাই রাইসুর মধ্যে শহরও আসে সহজভাবেই, সহজ কেননা, কেননা তা আরোপিত বা পূর্বনির্ধারিত নয়। সহজ কেননা, তা বর্ষামঙ্গলের মতো জৈবিক।

আমরা ছয় তলাতে ফ্লাট
আমরা ঘরের মধ্যে নদী
আমরা নদীর মধ্যে বাউয়া ব্যাঙে
করছি চোদাচুদি

(‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ কাব্যগ্রন্থ, ব্রাত্য রাইসু)

হীনম্মন্য ও প্রিটেইনশাস মধ্যবিত্তদের ট্যাবু-পরিখা ভেদ করে ঢুকে গিয়ে কবিতার স্পর্ধা ওড়ান রাইসু, তাঁকে আগলে রাখে মায়ার স্তনযুগল, তাঁকে ভরসা দেয় স্তনের জৈবমহিমা। অবেচতনের চোদনামিকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে মন্দিরগ্রাত্রে খোদাই স্তন ও নাভির সমস্ত উপাদানকে বাক্যের ভিতরে নিয়ে এসে মুহূর্তের যৌনতাকে মিথিক্যাল আকার দিয়ে ফেলেন ব্রাত্য রাইসু। জৈব অনুভূতি, জৈব ও যৌন-নন্দনের কোনো টেলিভিশন নাই, সভা-সমিতি-আকাদেমিয়া নাই, কর্পোরেট স্পনসর নাই, বেবিফুড বিজ্ঞাপন নাই, বিলবোর্ড নাই, আছে অনন্তের দশমহাবিদ্যা, আছে নব-নব ডায়ামেনশন, আবিষ্কারের নেশা…

পড়া যাক:

স্তন । এই নারীবাক্য অধিক বিশেষ্য। মহাপ্রাণ ধ্বনিতে নির্মিত মাত্রা -জ্ঞান -শূন্য গোলক। অদৃশ্য বলয়যুক্ত যাদুঘর। ক্রমস্ফীতি। মেটাফিজিক্স। গোলক–যা বর্তুল, প্রাণময় । এই স্তন ধর্মসংক্রান্ত।

প্রিয় স্তন, খুলে বক্ষবন্ধনী আজ আব্রু রক্ষা করো ।

ঐ স্তন দ্যাখো লাফিয়ে উঠেছে শূন্যে — মহাশূন্য: বিপরীতে সামান্য শূন্যের। ওই ভীত শিশুদের জন্ম হচ্ছে যত্রতত্র –তারা গান গাইছে জ্যামিতির–করুণামিতির। হেসে উঠছে বর্তুলজাতক। কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে, বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়।

কেন এই স্তন বার বার! বাৎসল্যবিহীন যারা, লক্ষ করো, কীভাবে ব্যক্ত হয়ে উঠছে বাহুল্য; ওই ব্যক্তি হয়ে ওঠে স্তন–নারীবাদিনীর, ছুঁড়ে ফেলা ছিন্ন স্তন ফুঁসে উঠছে স্বীকৃতিসংক্রান্ত। তাকে দাও অধিকার– বিন্যস্ত হবার; তাকে শিশুদের হাত থেকে রক্ষা করা হোক!

ঐ স্তন ঘিরে ঘুরে আসছে মারাত্মক ভাবুক প্রজাতি। ভয়ে ও বিনয়ে, নুয়ে পড়ছেন অধ্যাপক–বিশুদ্ধ জ্যামিতি। ঐ স্তন ঘিরে উঠেছে সংক্রামক নগরসভ্যতা; ফেটে পড়ছে ত্রিকোণ-গোলক–

ঐ স্তন জেগে উঠেছে চূড়ান্ত —

ডাকো স্তন, হীনম্মন্যদের!

(স্তন, ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ কাব্যগ্রন্থ, ব্রাত্য রাইসু)

হীনম্মন্যদের দিকে রাজনৈতিক আর্ট ও কালচারে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বসেন রাইসু। যে সকল হীনম্মন্য নবীন ও প্রবীন কবিরা ঘোরাফেরা করেন, সামলান পারস্পরিক হিসাবের জাব্দা খাতা, লেখেন ডেবিট-ক্রেডিট, আর সাঁতরায় আহাউহু কাব্যে। আর ইনবক্সে বলপ্রয়োগ বাক্যে জানতে চান শরীরের মাপ, পিতামহ কবিদের সেইসব নাতিপুতি কবিদের মাঝে রাইসু ঢুকে পড়েন আর ঘেঁটে দেন উহাদের সমাজবাস্তব, আর হিহি হিহি লিখে রাখেন:

দেখো বয়স্ক আর হাড্ডিশুখনা রামকবিদের দল
পরস্পরের পাখনা ধরে ঘোঁট পাকিয়ে পরস্পরে
রাজার ক্ষেতের পাড়ে
যেন উবে যাওয়ার আগমুহূর্তে
পায়ের পাতা শক্ত করল
মার্তৃগর্ভ ছেদন করল
তারপর তারা দাঁড়াল ভয়ঙ্কর।

যারা জায়গা পায় নি সামনাসামনি
রাজার চাইতে একটু বয়স কম
তারাও ক্ষেত ছাড়ে না
ক্ষেতের পাশেই একাডেমি
সেথায় সভার কাছেই
রাজার দিকে তাদের লম্বা হাত বাড়ানো
কাউয়া এসে বসেছে দীঘল হাতে—
তাদেরও আশা পূর্ণ হলো
রাজাটি যখন হাসিল উত্তরে।

আর ওই যে বাচ্চা কবির তরুণ ছবির করুণ দেখা পাওয়া—
তাও যাচ্ছে পাওয়া।
ওরাও, তেমন তরুণ যদিও নয়,
তবু বড় কবিদের লাগোয়া দল ওরা—
ওরা ছাপাই দঙ্গল—
ওরা নাতি কবি নাতনি কবি
আরো কবিদের সঙ্গে নিয়ে
ফুলের দণ্ডসম ওই তো ঝকমকাচ্ছে—
যেন ফুলের দলটি
কাকে দেবে আর কাকে দেবে না
নিজেদের ওরা ঠিক রাখতে পারছে না।

এরই মধ্যে
এদের মালিক যারা
ইন্ডিয়ারা
যেই,
বিমান থেকে নামিল ঢাকা ক্লাবে—
প্রথমে একজন পদ্মশ্রীই তো দৌড়ে গেলেন
তারপর গেল ফুলের দলটি
ততঃপরে মাঝারি কবি হেলতে দুলতে
বড় কবিরা রাজাটি সঙ্গে করে।

না, মহাভারত থেকে মোদীর সঙ্গে
পাইকার কোনো কবি আসে নি তাই
আপাতত তারা কুর্নিশিবেন ক্লাবে,
দেবেশ রায়ের দ্বারে।

(‘কবির দল’, ব্রাত্য রাইসু)

এভাবেই রাইসুর লিখে ফেলা কবিতা, এভাবেও ঠিক নয়, হয়তো ঢাকা শহরের চারিপাশে যেভাবে বিছায়ে আছে নদী, সেই নদীই হয়তো রাইসুর বাক্যে, রাইসুর বাংলা কবিতায়, সে নদীপথেই তিনি হয়তো গুরুসঙ্গ করেন অথবা করবেন বা করেছিলেন কোনোকালে অথবা সেই নৌকাতেই দেহের সাঁতার… তবে আপনারা নৌকাকে আওয়ামী লীগ ভাইবেন না ভায়েরা… কিংবা ধানের প্রসঙ্গ এলে প্লিজ জিয়াটিয়া নট…

বলে রাখা ভালো রাইসুর সঙ্গে আমি সমাজ-রাজনীতির নানা বিষয়েই সহমত নই। অবস্থান  আলাদা। কিন্তু ভাষা-রাজনীতির ক্ষেত্রে কিংবা ভাষার অন্তরালে পরিচিতিসত্তার যে কার্নিভালিয় লড়াই রয়েছে, তাহাতে আমি রাইসুর সঙ্গে নানা বিষয়েই সহমত। আবার কিছু ক্ষেত্রে নয়।

তাই আমরা বরং আসি রাইসুর সেই পরিচিত আলাপে, প্রমিত ভাষার সম্প্রসারণবাদের কথায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে কলকাতার লোক না হলেও কলকাতায় পড়াশুনা, সাহিত্য, ছাত্র রাজনীতি ও চাকরবৃত্তি করা লোক। যদিও আমার জন্ম ও প্রাথমিক-মাধ্যমিক পড়াশুনা হাওড়া জেলায়। আমি জানি, কলকাতার প্রমিত বাংলা ভাষা ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে বাংলার ভাষাবৈচিত্র্য ও ভাষার সার্বভৌমত্বকে গ্রাস করে আসছে।  কবিতাসাহিত্যের ক্ষেত্রেও এটা সঠিক। কলকাতা ঠিক করে দেয় ঢাকার কারা কারা কবি। ঢাকার লোকেরাও কইলকাত্তাইয়া-খেলায় সাদরে অংশ নেন। এর নানা হিসেবনিকেশ আছে। কিন্তু প্রমিত ভাষা, ভাষার একমাত্রিক আবেদনের বিরুদ্ধে ব্রাত্য রাইসু ও তাঁর মতো কয়েকজনের নিরন্তর আলাপ কিছুটা হলেও প্রমিত ইন্ডাস্ট্রিকে থমকে দিয়েছে বলে আমি মনে করি। যদিও এক্ষেত্রে রাইসুর বিরুদ্ধে আমার তীব্র সমালোচনা, কলকাতার ভাষা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে গোটা পশ্চিমবঙ্গকে তিনি মিলিয়ে ফেলেছেন।

এমনটা আমার বহুবার মনে হয়েছে। আসলে কলকাতা যে একমাত্রিক ও একরৈখিক সাহিত্যের যে ভাষাগত উচ্চারণকে প্রোডিউস করে তা ততটা কলকাতার ভাষাও নয়। তা বাংলার দিল্লিমুখি কৃত্রিম এক বাংলা ভাষা। কেননা, পুরোনো কলকাতায় বা কলকাতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সুতানাটি-গোবিন্দপুরের লিঙ্গ্যুইস্টিক কালেক্টিভ আনকনশাস টের পেলে বোঝা যাবে  কলকাতার ভিতরে কলিকাতারও উচ্চারণের নিজস্বতা আছে, আছে বাক্যের নিজস্ব বটতলা, আছে, আছে চটির উথাল, আছে মাকালী ও বড়ঠাকুরের থান , আছে পাগলাবাবার মাজারে কাওয়ালি বঙ্গের দিলখোলা হাওয়া… তাছাড়া হাওড়া, হুগলী, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, দুই ২৪ পরগণার উচ্চারণও আলাদা। যেভাবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়ময়সিংহ, বরিশাল, নোয়াখালি, পুরোনো ঢাকা-সহ গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের একেক জায়গার উচ্চারণ একেকরকম। কিন্তু সেইসকল উচ্চারণের ভিন্নতাকে এক ছাঁচে ফেলতে চায় বাংলা একাডেমি।

আসলে আমার মতে সাহিত্যের ভাষাকে প্রমিতকরণের মূল কারণ হল, সাহিত্যের ভাষাকে মাস মিডিয়ার ভাষা করে তোলার কর্পোরেট প্রয়াস। এবং আজকের বহুজাতিক কর্পোরেটের যে ভাষা-রাজনীতির যে প্রোজেক্ট, তা আসলে জমিদার বর্ণহিন্দুর বঙ্গীয় সমাজ-রাজনীতির সামন্তবাদী ও উপনিবেশিক আবহের উত্তরমুখ। এবং সেই উপনিবেশিক ও বর্ণবাদী রাজনীতির কেন্দ্র হল কলকাতা। তাই তার লিঙ্গুইস্টিক পোলিটিক্সও মূলত ঔপনিবেশিক এবং সেই সূত্রে আজ তা বহুজাতিক কর্পোরেটের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত, যে ইশারা আসলে দিল্লির আসলে ম্যারিকার, আসলে শেয়ার বাজারের… আমি যতটা বুঝি, এর বিরুদ্ধে রাইসু ও আরও হাতে গোনা দুয়েকজন অনেকটাই লড়ছেন। কেউ জেনে বুঝে লড়াই চালাচ্ছেন অথবা কেউ অজ্ঞাতসারে। ব্রাত্য রাইসুর জন্মদিনে তাঁর এই লড়াইকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু আবারও তাঁকে বলব, গোটা পশ্চিমবঙ্গকে ‘কলকাতা’র সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত নয়। যেভাবে পশ্চিমবঙ্গকে ইন্ডিয়া বলা উচিত নয়।

ব্রাত্য রাইসুর ভাষা-রাজনীতি নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়লো, রাইসুকে ডেডিকেট করে বছরখানেক আগে একটি কবিতা লিখেছিলাম, সেটি এই লেখার শেষ পেশ করে, এই লেখায় ইতি টানছি। আসলে ইতি বলে কিছু হয় না। হয়তো পর্বান্তরে পরবর্তী সময়ে রাইসু ও তাঁর বাঙালী মুসলমান পরিচিতিসত্তা আর সামাজিক পরিসরে তাঁর অবস্থান ও অবস্থানের বদলে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে কিছু লিখবো। তবে শেষে এ কথা বলি, রাইসু নিরন্তর নিজেকে বদলে বদলে চলতে পছন্দ করেন, অথবা, তিনি আসলে তিনিই, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সমাজ বাস্তবতাকে নানাভাবে ঠোক্কর দিতে নিজের সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু ধাঁধা তৈরি করেন, তৈরি করেন ধোঁয়াশা। যা আমাদের কখনো কখনো বিরক্ত লাগে, আবার কখনো মনে হয় ইহাই রাজনীতি। আবার এটাও মনে হয়, পুরোনো অবস্থান থেকে তিনি তখন বদলে যান, যখন তাঁর মনে হয় নতুনটাই নতুন প্রবাহের বার্তা। আবহমানের প্রবাহে অনেক অনেক নতুনে যাত্রা করুন ব্রাত্য রাইসু। পঞ্চাশ বছরে আপনাকে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন, চিয়ার্স।

এবার রাইসুকে লেখা আমার কবিতা:

ভাষা
(ব্রাত্য রাইসুকে)

ভাষার নৌকা গুরু ভাসায়েছো
কোন তীরে
একা একা আলেয়ায়
আলেয়ার গাছগুলি
দ্যাখো একা একা
তোমার মতই খুব
ফিসফিস মন্ত্রণা দিয়ে
ভাষার তাবিজ বানায়
ভাষার নৌকা গুরু ভাসায়েছো
রাঙা মেয়ে বর্তুলে
মাটির বেদনা ঘিরে
পাকাধান আমনবেলায়
তোমারে ডেকেছে বিকেল
একা একা ঝাউবনে
জন্ম জন্ম গুরু
দেয়ালায় দেয়ালায়
এই নৌকা জানে, মতস্যবাহার জানে
ডুবো জলে কবিরেই
একা একা ভেসে যেতে হয়
গুরু, লোকমুখে ভাষায় ভাষায়

হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ,  ১৯ নভেম্বর ২০১৭

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসুর কবিতা ও রাষ্ট্রযন্ত্র তটস্থ সমাজে মৃত্যুর মচ্ছব

ব্রাত্য রাইসুর বয়সের সংখ্যাটি পঞ্চাশে পৌঁছুবে এ বছর, এই উপলক্ষে কবিকে নিয়ে এই প্রথম কিছু লেখার অবকাশ হলো আমার।

আমরা নব্বইয়ে যারা সাহিত্য ও চিন্তার উঠানে পারা দিয়েছি তাদের মধ্যে একে অন্যকে উদযাপন না করাই রীতি। বন্ধুর কীর্তি উদযাপন করাকে নব্বই নির্বিশেষে নাম দিয়েছিল বন্ধুকৃত্য—ফলে আমার উপর ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুর বারণ ছিলো তাদের সৃষ্টি নিয়ে লেখা—কারণ ওরা জানে আমার পর্যালোচনা আস্বাদনবাদী—প্রকাশিত কাজের মধ্যে যা আমার ভালো লাগে তা নিয়ে বলি, যা ভালো লাগে না তা নিয়ে বলার প্রয়োজন মনে করি না—ফলে তা বন্ধুকৃত্য বলে তকমা পেতে বাধ্য।

সমসাময়িকদের কাজ নিয়ে লেখা সেই শর্ত রাইসুতে প্রযোজ্য নয়—কেননা ওর সঙ্গে বাতচিতের সাক্ষাৎ হয়েছে আমার একবার, যদিও ওর কবিতার পাঠক আমি প্রায় কুড়ি বছর ধরে। বলা দরকার যে, রাইসুর চিত্রকলারও আমি ভক্ত এবং ওর চিন্তাবাহী কুতর্কেরও আমি গ্রাহক, তবে সে বিষয় আজ বলব না। আজ ওর মনুষ্য জীবনের অর্ধশতাব্দী পূর্তির এই লগ্নে ওর কবিতা পাঠ থেকে আমার কিছু অভিজ্ঞতার কথা পাঠকের সঙ্গে বাটোয়ারা করব।     

আহমেদ শামীম

তখন আমি জাহাঙ্গীরনগরে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র—নীলক্ষেতে যাই চৌধুরীর দোকানে, একটা বই দিয়ে আরেকটা বই নিয়ে সবুজ বাসে করে ফিরি সবুজ ক্যাম্পাসে—আই এ রিচারড, এফ আর লেভিস, টি এস এলিয়ট আর টেরি ইগলটনদের সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করি—কোথাও দাঁত বসাতে পারি কোথাও পারি না—ফলে তথাকথিত গ্রুপ স্টাডি করি। একদিন গ্রুপের একজন রাইসুর কথা পাড়ল—ঠিক কী বলেছিল মনে নেই—তবে ইতিবাচক কিছু নয়—ধরা যাক বলেছিল—”বঙ্গে ব্রাত্য নামে এক কবি আইছে, আর ঘোষণা দিয়া কইছে, “বেংলা কবিতার মায়রে চুদব।” আরও যা বলল কবির কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে তাতে তথাকথিত চ-বর্গের ওই শব্দ দিয়ে একটা চলচ্চিত্র যেন তৈরি হল।

আমরা হাসলাম, দাশের “গলিত স্থবির ব্যাঙের” পাশে রাইসুর “আমরা নদীর মধ্যে বাউয়া ব্যাঙে করছি চোদাচুদি” রেখে আমরা হাসলাম, আর বললাম—বেংলা কবিতার বাপ এসে গেছে।

তার অনেকদিন পর, রাইসুর এক গুচ্ছ কবিতা পড়লাম একা—ভাবলাম রাইসুর কবিতা গ্রুপে পড়ার জিনিশ না। তারপর থেকে, রাইসুর কবিতা নীরবে পড়ে গেছি—যখনই হাতের কাছে পেয়েছি—বুঝতে চেয়েছি নব্বইয়ে সে কোথায় দাঁড়ায়, জানতে চেয়েছি বাংলায় কবিতায় রাইসুর স্ট্যাটাস। তো, কবি নিজে জানাচ্ছেন:   

“নিতান্ত শায়িত আমি

কোথা আছি

কেউ তা জানে না শুধু মাছেদের রাষ্ট্রযন্ত্র তটস্থ সমাজ

তারা জানে আমার স্ট্যাটাস” (‘জলে মৃত্যু’-২)

এই পঙ্ক্তি রাইসু সম্পর্কে এটা অন্যরকম জানার আহ্বান করে। রাইসুর কবিতার বিষয়বস্তু ও কাব্যভাবের অনেক বৈচিত্র্যের মধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা তটস্থ সমাজের পর্যালোচনামূলক ভাষ্য অন্যতম অথচ এই নিয়ে আমরা বন্ধুমহল বলতে গেলে নীরবই ছিলাম।

এর কারণও ছিল। রাইসুর হরেক রকম কবিতার মধ্যে কিছু কবিতা আড্ডা জমানোর উপাদান হিসাবে কাজ করত, ওগুলোই আলোচনাই আসতো বেশি—ওগুলো দিয়েই রাইসুকে চেনা ও চেনানোর চেষ্টা চলতো। চটুল রাইসু, চ-বর্গের পদাবলীর চলচ্চিত্রকার রাইসু এইসব। এইরূপ সাধারণীকরণের মধ্যে রাইসুর অ-সাধারণ কবিতাগুলো আমাদের কাছে থেকে দূরে লুকিয়ে থাকতো। রাইসু হয়তো এসব টের পেত, তাই লিখল—”হায় সাধারণীকরণ, ভাষাবিজ্ঞানের জাজ্জ্বল্য সমস্যা” (ছাগল)। রাইসুকে চটুল ভাবার আরও একটি কারণ হয়তো ছিলো ওর সোফিস্ট তরিকা এবং ভাঁড়ের ভূমিকা। কুতর্ক ও রসসিক্ত পর্যালোচনার কদর ছিল অতীতে একসময়, রাইসু তাদের বর্তমান প্রতিনিধি, ফলে নিজেকে নিজের গ্রাহক তৈরি করতে হয়েছে, তৈরি গ্রাহক সে পায় নি।

কবিতায় বেলায় হয়তো রাইসুর অত কষ্ট করতে হয় নি, কবিতার পাঠক তৈরি ছিল—তবে আরসব কবিদের মতো রাইসুরও সামনে চ্যালেঞ্জ হিসাবে ছিল জীবনানন্দ দাশ—আর তাঁর তৈরি করে দেয়া পাঠকের কাব্যরুচি। কী এক মজার কারণে দাশকে বাংলার পাঠক নাগরিক কবি হিসেবে নিতে নারাজ—অথচ দাশের চৌদ্দ আনি নাগরিকতা নিয়ে। ব্রাত্য রাইসু আগাগোড়াই নাগরিক কবি—সেই বাবদে দাশের পাঠক রাইসুকে নিতে না পারলে রাইসুর উষ্মা জাগাই স্বাভাবিক:  

“পথেই তোমার দিবস ফুরাবে

বড়জোর তুমি জীবনানন্দের

গ্রেট কবিতাই পড়তে থাকবা

ভাবতে থাকবা গ্রামে গেছো গিয়া।

গ্রামে কারা পড়ে জীবনানন্দ? (রাস্তায়)

আমি ব্যক্তিগতভাবে জীবনানন্দের কবিতার ভক্ত। আমার কাছের বন্ধুদের মধ্যে একটা কমন বিষয় হল সকলে জীবনানন্দের নিবিড় পাঠক। জীবনানন্দ কেন ভালো লাগে এই কথার উত্তর আমাদের বন্ধুদের মধ্যে প্রায় একই রকম—পড়তে যেমন ভালো লাগে, তেমন পড়ার পর অনেক কথা মনে জাগে। বন্ধুদের বাইরে শহীদ কাদরীকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এই প্রশ্ন—তিনি বলেছিলেন জীবনানন্দ তাঁকে সিডিউস করে। ব্রাত্য রাইসুর কবিতা কেন ভালো লাগবে? বা লাগে?  

তখন পর্যন্ত রাইসুর কবিতা নিয়ে আলোচনা যা পড়েছি তা ছিল ওর ভাষা নিয়ে, স্টাইল নিয়ে। বাংলা কবিতার নতুন বাঁক ব্রাত্য রাইসু—থেকে শুরু করে ব্রাত্যর কবিতা হয় নাকি পর্যন্ত পেয়েছি—তবে সেগুলোর ভরকেন্দ্র ছিল  ভাষার এবং বিষয়ের ট্রিটমেন্ট বিষয়ক, ভাব বা বিষয়বস্তু নিয়ে নয়। কবিতা প্রসঙ্গে নব্বইয়ের বিশ্বাসই ছিল হীরার কাটটাই হীরা, বস্তুটা নয়। আমি অবশ্য মনে করি কাট এবং বস্তু দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ। কাটের কথা অনেক হয়েছে, আজ তাই, কেবল বস্তু নিয়েই কথা বলব। কথা বলব রাইসুর দেখা স্বপ্ন ও বাস্তব নিয়ে।

“কেন সরু রাস্তা হেঁটে গেলে

হসপিটাল দেখি?

স্বপ্নে আমি এত বার হাসপাতাল দেখি!” (স্বপ্নে আমি কে)

মৃত্যুর চেয়ে মারাত্মক বিষয় আর কী হতে পারে। কবি কেন এত বার হাসপাতাল দেখেন স্বপ্নে? যে কবি কবিতায় চ-বর্গের পদাবলীর চলচ্চিত্র চলে বলে জেনে এসেছি, তার স্বপ্নের উপাদান তো অন্য কিছু হবার কথা ছিল, গুলশান বনানীর বেডরুম, নিদেনপক্ষে নিষিদ্ধপল্লীর কামরা, হাসপাতাল কেন, এত বার কেন? এইটা কি তার মৃত্যুচিন্তাপ্রসূত? ফ্রয়েড তা ভালো বলতে পারবেন। তবে, রাইসুর কবিতায় এমন ইঙ্গিত আছে যা পাঠে অনুমান হয়, এ কেবল ব্যক্তির মৃত্যুচিন্তাপ্রসূত নয়, এমন স্বপ্ন রাষ্ট্রযন্ত্র তটস্থ সমাজের মানুষের মুহুর্মুহু মৃত্যু ঘটনা দ্বারা আলোড়িতও বটে। মৃত্যু যে কী নৈমিত্তিক বিষয় এখন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা যায় প্রায় সকল মৃত্যুই অপমৃত্যু—অপঘাতে মৃত্যু। কিছু মানুষ মরছে অবলীলায়, কিছু মানুষ যার ক্ষমতা আছে অর্থ আছে বিত্ত আছে তারা হয়তো ঠেকায় রাখছে মৃত্যু কিছু কাল। ফলে মৃত্যুতেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। কবি রাইসু সেটা ভেঙে দিচ্ছেন কবিতায়, বলছেন, “সকলের মৃত্যু ভালো/ তাই মৃত্যু হোক সকলের—।” এমনসব মৃত্যু চাইছেন কবি, পড়ে মনে হবে এ কোনো কবি নয় বরং এক হৃদয়হীন হায়বানের অভিসম্পাত। কিন্তু, এমন কী করে হয়! তার জবাব আছে ওই কবিতাতেই: প্রতিদিন শত শত অপমৃত্যু মানুষকে অবশ করে দিয়ে গেছে, তাই—

“একটি মৃত্যুও আর

মৃত্যুরূপে প্রতিভাত

না হয় কখনো।” (মরণ ভালো)

স্বপ্নভঙ্গের মৃত্যুমুখর রাষ্ট্রেই অমন কবিতা সম্ভব। কবি দেশ কালে বাস করেন, স্বদেশ সমকালের সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় আশয় থেকে বিমুখ থাকা তার সম্ভব হয় না—কবিতায় কখনো উপমায় কখনো সরাসরি হাজির হয় কালিক অভিজ্ঞান। আমাদের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তকেরা কেমন ভূমিকা রাখে তা গুরুত্বপূর্ণ। গজদন্তের মিনারবাসী শিল্প-জগতের মানুষের কাছে সেই সত্য সহজে ধরা পড়ে না। নব্বইয়ের কবিদের মধ্যে যাদের কবিতায় রাষ্ট্রচিন্তার পর্যালোচনা উঁকিঝুঁকি দেয় তাদের মধ্যে রাইসুর অন্যতম। রাইসুর কবিতার মধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ছবি দেখি। একটি সমাজ যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্রাসে তটস্থ থাকে তখন বুঝতে হয় সেই সমাজের বৈষম্য এমন এক পর্যায়ে আছে যেখানে প্রকৃতির নেয়ামত বৃষ্টিও শ্রেণিবিভক্তির চিত্র আঁকে। ‘এই দেশে বৃষ্টি হয়’ এবং ‘এই যদি গ্রামবাংলা’ কবিতাদ্বয় থেকে  সেই চিত্রগুলো পাশাপাশি সাজানো যাক—তিনটি চিত্রে তিনটি শ্রেণির বর্ষা যাপনের চিত্র চোখে পড়ার মত:

চিত্র ১:

“… আমরা বিনীত জনগণ

নিমীলিত নেত্রে দেখি ভাবের জগতে

সদা বৃষ্টিপতনের

কী এক মহড়া চলছে! রুইকাতলারাঘববোয়াল

সব ভেসে উঠছে চারিধারে, বারিধারা ভেসে যাচ্ছে

মুহুর্মুহু পয়সার ঠেলায়…” (‘এই দেশে বৃষ্টি হয়’)

চিত্র ২:

“…আমরা গরিষ্ঠ জনগণ

অনাহারে অর্ধাহারে ভেসে যেতে চাই মেঘ

তোমার মতন; তবু

ভাসার ব্যাপারে হায়, আমাদের কিছুমাত্র

নিয়ন্ত্রণ নেই” (‘এই দেশে বৃষ্টি হয়’)

চিত্র ৩:

“হাঁটছে মাটির রাস্তায়

সিক্ত ছাগলের পাল—আর

ট্রেনের জানলায়—দেখা যাচ্ছে

মধ্যবিত্ত—জর্জরিত মধ্যবিত্ত

চিপস খাচ্ছে—চিপস খাচ্ছে—চিপস খাচ্ছে—আর

দেখে নিচ্ছে গ্রামবাংলা—আজিও বর্ষার ।” (‘এই যদি গ্রামবাংলা’)

এমন শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রাদুর্ভাব ঘটে। আমরা সেই ঘটনার ঘনঘটা দেখি বাংলাদেশে—বিশেষ করে ঢাকা শহরে। ঢাকা শহরটা সকলেই জানে মুমূর্ষু—এর নাগরিকগণ যেন সেই মৃত্যুপথযাত্রী আত্মীয়ের সঙ্গ ছাড়তে চাইছে না। আবার এই মুমূর্ষু শহরে সবই যেন মরণাপন্ন। নানান রকম মরণ। রাইসুর  ‘কোন প্রবীণ বুদ্ধিজীবীর সরকারপন্থী অকাল মৃত্যুতে’ কবিতার নামের মধ্যেই আছে একটা তির্যক মন্তব্য, সেখানে আমরা টের পাই—প্রবীণের অকাল মৃত্যু নয়, বরং বুদ্ধিজীবিতার অকাল মৃত্যু, সেটা হয় সরকারপন্থা অবলম্বনের কারণে। ওই তির্যক ইঙ্গিত কবিতায় অঙ্কিত হয় আরও বিস্তারিতভাবে—মোসাহেবির সমালোচনা:

“তারা, যা শুনতে চায়, না হয় আজকে তুমি তা বললা

তবে, তোমার কথা কবে তুমি বলবা গো?”

আবার যেসকল বুদ্ধিজীবী বলে, লেখে, বক্তৃতা দেয়—প্রভাষক-অধ্যাপক তারা যেন অনেক কথা বলে গিয়েও অবলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশ্লেষণ তারা হাজির করেন ঠিকই—কিন্তু সাধারণের কাছে সেটা দলীয় লেজুড়বৃত্তি হিসাবে ধরা পড়ে। লেজুড়বৃত্তি কথাটা কুকুরের সঙ্গে সম্পর্কিত—প্রভু দেখলে কুকুর লেজুড় নেড়ে লয়ালটি প্রকাশ করে। সেই বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখি আর কর্মকাণ্ড দেখলে কুকুরের সেই লেজুড় নাড়ানো কথাই মনে পড়ে। ব্রাত্যের ভাষায়—  

“বাসা পাহারা দেওয়ার জন্যে কুকুরেরা গলায় বেল্ট পরে বাসার সামনে চরকির মত ঘুরতে থাকে। তখন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবলা বুদ্ধিজীবীদের মত দেখায়।” (আমাদের সহজ পৃথিবী)

কেবল বুদ্ধিজীবী নয়, অন্যান্য দলগুলোর, বিশেষ করে বামদলের এবং তাদের উচ্চকণ্ঠ কর্মীদের ব্যাপারেও সমাজে নানাবিধ মূল্যায়ন হাজির আছে। বিপ্লবের গান তারা গায়, তারা সবাই যে নিয়মিত তা নয়, পার্ট টাইমার আছে, এ-দলের বি-টিম আছে, আবার বি-দলের আছে সি-টিম। তারা নিজ নিজ প্রভু-দলের বিপরীতে নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ করে। ছোটো খাটো অসফল ঘটনা আর অঘটন বাদে এটাই বলতে গেলে বাংলাদেশের ইতিহাস—তারও ক্রিটিক রাইসুর কবিতায় জায়াগা পেয়ে যায়:

“তবু আমার মধ্যে তুমি

যত চাও পাইতে পারো

মিষ্টি অস্বীকার—

নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ

আর

সরকারী হুঙ্কার।” (পার্টটাইম বিপ্লবীর গান)

এ তো গেল রাষ্ট্রের ভেতরটা। আধুনিক রাষ্ট্র তো আর ভেতরেরই কেবল নয়, বাইরেই বিছিয়ে থাকে। এ কালে বাংলাদেশকে বোঝা সম্পূর্ণ হবে না যদি ভারতের সঙ্গে এর সম্পর্ক মুলতুবি রেখে পাঠ করা হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ কেমন হবে সেটা বাংলাদেশের সরকারের উপর অনেকটা নির্ভর করবে এটাই সত্য—এটাই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক রাজনীতি-কূটনীতি প্রথম কথা। ফলে ভারত যদি বাংলাদেশের উপর চড়াও হওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করে, সেটা তৎকালের সরকারের ব্যর্থতা বলেই পরিগণিত হবে। সেবাদে রাইসুর পদে পাই—”ভারত বিরোধিতা বলে কিছু নেই/ আছে সরকার বিরোধিতা” (ভারত বিরোধিতা)। ভারতের প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসকমহলের, তাদের মোসাহেবদের সঙ্গে নিজের দুরত্ব তৈরি করেন কবি—রাজনৈতিক বক্তৃতায় নিশ্চয়ই নয়, তার কাব্যে-উপমায়। ভারত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, কোলকাতার সঙ্গে ঢাকার সাহিত্য ও রাজনীতির সম্পর্ক—যেন ইলিশের প্রতীকে রাইসুর কাব্যজালে আটকা পড়ে:

“নাকি কোনো গভীর জলে

একাকী গোপন ইলিশ,

কলকাতা যাব না!

আমার মানবজন্ম হেলায় গেল

ধুলাতে-বালিতে।” (‘আমি কি ফুল ফুটবো নাকি’)

অবশ্য রাইসুর রাজনীতি উপমার ভেতরেই শেষ হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে সরাসরি হাজির হয় কবির রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং নিজের তৎপরতার ধরন। এই সমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপিয়ে দেয়া মৃত্যুকে বরণ করে নেয়, লজ্জায় কিছু বলতে পারে না, চাইতে পারে তার অধিকার। এটা আত্মহত্যা। সমাজ যখন মনে করে রাষ্ট্র বড় তখনই ঘটে বিপত্তিটা। রাইসুর বয়ানে পাই, “যারা অন্যদের নিজের চাইতে বড় ভাবে তারাই লজ্জা পায়, তারাই আত্মহত্যা করে।” এটা গরিবী বিহ্বলতা। নিজের শরীর না দেখতে পাওয়া হাতির ম্রিয়মানতা। একটি কিশোরী ভাতের অভাবে আত্মহত্যা করলে সে পুরো সমাজের উপমা হয়ে ওঠে। খবরের পাতা থেকে সে খবর রাইসুর কবিতার খাতায় জায়গা নেয়, তার রাজনৈতিক দর্শন ও সে দর্শন বাস্তবায়নের পন্থাসহ:

“জগতের সব কিছুতে সবার সমান অধিকার।

আসেন ঠিক করি, আমরা ভাত চাইতে আর লজ্জা করব না কোনোদিন। কারণ ওই ভাত আমাদেরও।”

(‘একটু ভাত দিবেন’)    

রাইসুর কাব্য ভাণ্ডারে বিবিধ রতন, তবে মানবের মুক্তির মণিমুক্তাগুলোর আলাপ তেমন হয় না বলে আজকে আমার আলোচনার মালা গেঁথেছি সেগুলোতে। এতে হয়তো দুই বসুর, সুভাষ ও বুদ্ধদেব, দুই রকম প্রতিক্রিয়া হবে—রাইসুর কবিতা নিয়ে, কিন্তু সেখানেও বিবেচনা দরকার—এটা রাইসুর কবিতার অন্যতম প্রধান ধারা বটে তবে একমাত্র নয়। রাইসুতে অবগাহনের আরো ধারা আছে। আজ কেবল একটি নিয়ে আলোচনা হল। এবার একটি পুনর্বিবেচনা দিয়ে শেষ করা যাক। রাইসুর কবিতা আসরেও পড়া যায়। নিউইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগুয়ার্ডিয়া কলেজে আধুনিক বাংলা সাহিত্য পরিচয়ের ক্লাসে বাংলাদেশের নব্বইয়ের কবিতা পাঠের একটা ব্যবস্থা করেছিলাম। সেখানে বাইশজন শিক্ষার্থীর সামনে পড়েছিলাম ব্রাত্য রাইসুর ‘মরণ ভালো’ কবিতাটি। পড়া শেষ হলে, সকলে করতালিসহ উঠে দাঁড়িয়ে কবিতাটিকে সম্মান জানিয়েছিল। সে এক অভিজ্ঞতা বটে।