Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু একজন গ্যাডফ্লাই

ব্রাত্য রাইসুকে আমি গ্যাডফ্লাই বলেছিলাম। এতে অনেকে অসন্তুষ্ট হন।

গ্যাডফ্লাই কী? আক্ষরিক অর্থে ডাঁশপোকা, এক ধরনের পোকা যা ঘোড়াকে বিব্রত করে। প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক সক্রেটিস নিজেকে বলতেন গ্যাডফ্লাই।

গ্যাডফ্লাই হলেন এমন ব্যক্তি যিনি সমাজের বিরাজমান অবস্থা বিষয়ে অস্বস্তিকর সব প্রশ্ন করেন, এবং অথরিটিকে বিব্রত করেন।

চিন্তার জগতে অনেককেই গ্যাডফ্লাই বলেছেন কেউ কেউ, এই গ্যাডফ্লাইদের মধ্যে আছেন ফুকো, দেরিদা, কীয়ের্কেগার্ড, নাসিম তালেব। কীয়ের্কেগার্ড অবশ্য স্বজ্ঞানে গ্যাডফ্লাই পন্থা অনুসরণ করেন, কারণ তিনি অনুসরণ করতেন সক্রেটিসের চিন্তা-জীবন। তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা যে সব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পছন্দ করেন, গ্যাডফ্লাইরা সে সব প্রশ্ন ধরেই টান দেন।

মুরাদুল ইসলাম

সাধারনত এই গ্যাডফ্লাই শব্দটি দুইভাবে ব্যবহার হয়। এক, নেগেটিভ ভাবে ঐ ব্যক্তিকে অসম্মান করতে, এবং দুই, সম্মানজনক সামাজিক দায়িত্ব পালনরত এক ব্যক্তিকে বোঝাতে।

যদ্যপি আমার গুরুতে আমরা দেখতেই পাই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, “লেখার ব্যাপারটা অইল পুকুরে ঢিল ছোঁড়ার মতো। যত বড় ঢিল ছুঁড়বেন পাঠকের মনে তরঙ্গটাও ততো জোরে উঠব এবং অধিকক্ষণ থাকব।”

লেখক এই ঢিলটা ছোঁড়েন পাঠকের মানস পুকুরে। ব্রাত্য রাইসু তার ছোট ছোট লেখার মাধ্যমে বড় ঢিল ছুঁড়তেই সমর্থ হন পাঠকের মনে। কাজের ফর্ম কী (সাইজে কত বড়, ফেইসবুক স্ট্যাটাস না অন্য জায়গায় প্রকাশিত ইত্যাদি) সেদিকে লক্ষ না দিয়ে ভাবা দরকার কাজটি তার কাজ করতে পারল কি না। সেদিক থেকে দেখলে ব্রাত্য রাইসুর চিন্তামূলক লেখালেখি সফল।

গ্যাডফ্লাই যিনি, তার কাজ সব সময় এটা না যে সমস্যার সমাধান দেয়া। জিজেক দর্শনের কাজ কী বলতে গিয়ে বলেন, দর্শনের কাজ নয় সমস্যার সমাধান দেয়া, কাজ হলো আমাদের দেখানো যে, আমরা সমস্যাটিকে যেভাবে দেখি, সেটাই সমস্যার এক অংশ হতে পারে। ব্রাত্য রাইসুর চিন্তার মধ্যে এই জিনিস পাওয়া যায়, সে হিসেবে তিনি দার্শনিকও।

কগনিটিভ সাইন্সের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলিতে দেখা যাচ্ছে, মানুষেরা তার সামাজিক গ্রুপের মত ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে যুক্তিনির্ভর সত্য বলতে চায় না। কারণ এমন কাজের জন্য তার সামাজিক গ্রুপ তাকে তিরস্কার করে এবং তাকে বের করে দিতে চায়। ফলে আইডেন্টিটি জনিত একটি সমস্যায় ব্যক্তিটি পড়ে যায়। এই ভয়েই মানুষেরা তার সামাজিক গ্রুপের মন রক্ষা করে চলে, তাদের মত ও বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলে বাহবা পায়।

ব্রাত্য রাইসু এই পথে হাঁটেন না। ফলে, তার সামাজিক গ্রুপ তথা সামগ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতির দলটিতে তার প্রতি বিদ্বেষ লক্ষ করা যায়।

তবে আমার মনে হয় এতে তিনি বিশেষ ব্যথিত নন। কারণ এটাই গ্যাডফ্লাইদের নিয়তি।

প্রথম পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ব্রাত্য রাইসুর প্রতি শুভেচ্ছা; ভালো থাকুন, এবং সুস্থ দেহ মন লয়ে ঘোড়াদের বিব্রত করতে থাকুন।

১৫ নভেম্বর ২০১৭

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুরে গুনার টাইম নাই

রাইসুরে নিয়া আসলে সময় খরচ করতে চাই নাই। তবু কয়েকজনের তাগাদায় লিখলাম।

ব্লগে লিখতে গিয়া নিজস্ব একটা ভাষারীতি খাড়া করাইছিলাম। ফেবুতে যখন একটু পরিচিত হইয়া উঠছিলাম তখন প্রথম জানতে পারি রাইসু নাকি এই ভাষারীতির প্রবক্তা। যদিও তার আগে রাইসু সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।

এরপর তার নেয়া কয়েকটা সাক্ষাৎকার পড়লাম অনলাইনে। তেমন আহামরি ব্যতিক্রমী কোনো মুন্সিয়ানা সেই সব সাক্ষাৎকারে পাই নাই। তবু এই সময়টায় আমি তারে ফেসবুকে ফলো দিছিলাম। তখন তার অল্প কথার কিছু চটকদার স্টাটাস পড়ছি। এই সময় তারে অকারণে ছটফট করা বালক মনে হইছে আমার। কেডা কেডা তার পোস্টে লাইক কমেন্ট দেয় আর কেডা কেডা দেয় না সে সব খবর রাখার মত টাইমও তার হইত।

দিপ্র হাসান

ইনবক্সে টুকটাক কথা হইত। কী কী কথা হইত এখন আর মনে নাই। একদিন মনে হয় দেখা করার আগ্রহ জানাইছিলাম, আরেকদিন সম্ভবত সমকালীন একটা উপন্যাস পড়ছে কিনা জিগাইছিলাম। যাই হোক কিছুদিনের মইদ্যেই আমি তার প্রতি আগ্রহ হারাই ফেলি। এবং তার সাথে আমার এখন পর্যন্ত দেখা হয় নাই। আর দেখা হবার সম্ভাবনাও সম্ভবত নাই।

তার সমালোচনা কইরা কি একটা বা একাধিক স্টাটাস দিছিলাম সম্ভবত। তখন তার কিছু ভক্তের কবলে পড়ছিলাম। একজন রাইসু কত বড় দার্শনিক এইটা বুঝাইতে গিয়া তখন আমারে কইছিল, সে ছফারে স্বমেহন করে কিনা এই প্রশ্ন করছিল। বুঝলাম দার্শনিক হইতে হইলে প্রশ্ন করতে পারাটা একটা বড় গুণ। রাইসুর সেই গুণ আছে!

আমি আসলে এহনো বুঝি না এই লোকরে পাবলিক কোন বিবেচনায় দার্শনিক বলে। চিন্তার ক্ষেত্রে তার অভিনবত্ব কী সেইটাও আমি ক্লিয়ার না।

বাংলাদেশে দার্শনিক ব্যাপারটা অনেকটা পীর মুরিদীর মত। একজন দার্শনিক মারা গেলে তার ভক্তদের মধ্য থেকে একজনরে পরবর্তী দার্শনিক বানানো হয়। এভাবে এখানে দার্শনিকদের সিলসিলা চইলা আসছে। প্রফেসর রাজ্জাক, ছফা, মজহার, সলিমুল্লাহ, রাইসু এইভাবে সিলসিলা চলছে। দার্শনিকের ভক্ত বা ছাত্র হওয়াই যেন এইখানে দার্শনিক হবার একমাত্র শর্ত।

বেশকিছু মোটামুটি মানের প্রতিভাধর লোক যারা মূলত ছফা-মজহার কেন্দ্রিক একত্রিত হইছে, এই রকম একটা গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় রাইসু বেশ বড় একটা সুবিধা পাইতাছে। সামান্য যোগ্যতা দিয়াই সে অনেক বড় কামেল হিসাবে আমাদের সামনে হাজির হইতে পারতেছে। বাঘ নাই বনে শিয়াল রাজার মত রাইসু এই গোষ্ঠীর তরুণ অংশের মইদ্যে রাজত্ব করতাছে। এমনকি মাঝে মাঝে সে প্রবীণ অংশ মানে সলিমুল্লাহ মজহাররেও খারিজ কইরা দিতাছে।

একদল তরুণীর মইদ্যে সে অবশ্য নিজ গুণেই এরশাদের চরিত্র নিয়া হাজির হইতে পারছে। কচি মেয়েদের প্রতি ভালবাসা সে প্রকাশ্যেই জানান দেয়। হ এই একটা জায়গায় আমি তারে ঈর্ষা করি। আমি কচি তো দূরে থাক কোনো বয়সের মেয়েই পটাতে পারি না। তবে তার এই ফুলের মত চারিত্রিক ব্যাপারটা সাম্প্রতিক ফেসবুক তোলপাড় করা ক্যাচালের আগে জানা ছিল না আমার। আমার বিশ্বাস রাজনীতি করলে তার এই প্রতিভার কাছে এরশাদ ফেল মাইরা যাইত।

সবশেষে একটা কথাই বলব, এই দেশে গোষ্ঠীবদ্ধতা একটা লোকরে কোথায় নিয়া যাইতে পারে রাইসু তার জীবন্ত উদাহরণ।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুর প্রতি বিরাগ ও অনুরাগ

ব্রাত্য রাইসু আমারে তাঁর পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষে কিছু লিখতে বলছে। বুঝলাম এটা কোনো বিশেষ অনুরোধ না। একটা গড়-দায়সারা একটা অনুরোধ।

তবে রাইসু এই রকমই।  এটা ধইর‍্যা নিলে আর তার কথায় সামাজিকতা বা সৌজন্য না খুইজ্যা না পাইলে  অবাক হইতে হইবে না। রাইসু কেবল নিজের ইচ্ছা আদায় করতে বা পাইতে খুবই আগ্রহী। কিন্তু অন্যে কেন তার খায়েশ পূরণে আগাইয়া আসবে, কেন আগাইয়া আসতে পারে সেইসব নিয়া রাইসু ভাবার পক্ষপাতি না।

রাইসু সমাজে থাকে, অবলীলায় সমাজের সামাজিকতার সুবিধা ও একটা সমাজ থাকার সুবিধা পুরাটাই সে নেয়। এত সুবিধা যে সমাজ রাইসুরে দেয় সেই সমাজ টিকানোরও কিছু দায় তাহলে তো রাইসুরে নিতে হয়। না সেইটা নিয়া ভাবার দায় রাইসু মাথায় আনে না।

এইটা রাইসুর বেলায় সেটা ঠিক স্বার্থপরতা নয়। যদিও তাই মনে হইতে পারে। রাইসু আসলে সামাজিকভাবে দলেবলে কিছু করতে আগ্রহী না। সেইজন্য ফাইনালি রাইসু কেবল পাইতে চাওয়া এক লোক হিসাবে আমাদের সামনে এপিয়ারড হয়।

পিনাকী ভট্টাচার্য

আমার সাথে রাইসুর দেখা হইছে একবার। আমার মনে হইছে খুব লাজুক একটা ছেলে। মনে হইছিল বয়সে আমার চাইতে ম্যালা ছোট। কিন্তু এখন বুঝি সে আমার সমবয়সীই বলা যায়। সম্প্রতি আমি যেই লেখালেখি করি, যেই লাইনে চলাফেরা করি, আমি আসলে এই জগতের মানুষ ছিলাম না। আমি ২৪ ঘণ্টা মাথা গুঁজে কাজ করা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ ছিলাম। রাইসুরে আমার চেনার কথাও না।

আমি অল্পবিস্তর লেখালেখি করতে শুরু করি ২০১২-তে। রাইসুর লগে দেখা ২০১৩-তে শাহবাগের শেষ দিকে। রাইসু সম্পর্কে আমারে একজন খুব মেধাবী আর চৌকস প্রবাসী যুবক কইছিল, আমাদের সময় ‘রাইসুর সময়’ বলে পরিচয় পাবে; সে একজন কাল্ট লাইক ফিগার।

আমি রাইসুর এমন উচ্চ প্রশংসা শুইন্যা খুব অবাকই হইছিলাম। একবার একজন কোনো এক অনুষ্ঠানের আয়োজক একজন বিশেষ বক্তা খুঁজতেছিলেন, আমার মনে হইল রাইসুই রাইট পারসন হইতে পারে।

আমি কইলাম রাইসুরে নাও। সেই আয়োজক মুখ বাকাইয়া কইলো, দাদা, রাইসুরে নিলে যেই বিপদ সেইটা হইতেছে সে গোল পোস্ট পাইলেই গোল দেয়, সেটা কোন দলের গোলপোস্ট বা কোন দলে সে খেলতেছে তা আর তার খেয়াল থাকে না।

এই কথাটাই আমি আমার এক বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করছিলাম যে, আচ্ছা, রাইসু তাঁর পরস্পরবিরোধী এত কন্ট্রাডিকশন নিয়া থাকে কীভাবে? ওর তো মাথায় জট লাইগ্যা যাওয়ায় কথা।

তিনি আমারে কইলেন, রাইসু তার  নানান কন্ট্রাডিকটারি আইডিয়াগুলারে কম্পার্ট্মেন্টালাইজ কইর‍্যা রাখে। ট্রেনের কামরার মত। যাতে তাদের মধ্যে ঠোকাঠুকি না লাগে। কারণ কন্ট্রাডিকটারি আইডিয়াগুলারএক জায়গায় এক ঘরের মধ্যে রাখলে বা থাকা মানেই তারা ঠোকাঠুকি কইর‍্যা পরস্পর পরস্পরকে ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ মানে কাটাকুটি কইর‍্যা নাই কইর‍্যা ফেলবে। তাই একেক আইডিয়া একেক কম্পার্ট্মেন্টে রাখে বলে তার নিজের কাছে একটার সাথে আরেকটার কনফ্লিক্ট হয় না।

যারা কন্ট্রাডিকটারি আইডিয়া হোল্ড করে তারা এভাবেই চলে। আমরা আইডিয়াগুলারে কো রিলেইট করি, তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব রিসলভ কইর‍্যা রেসালটান্টটা আকড়ায় ধরি। আর সে আইসলেইট কইর‍্যা রাখে। এই হল ফারাক!

রাইসু মেগালোম্যানিক। একেক সময় নিজেরে নিয়া এমন বিশাল ধারণা নিয়া থাকে, যা অন্যকে ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ জ্ঞান করে ফেলে বলে তা রিয়েলিটির সাথে মেলে না। এইগুলা তার ওয়ান ওয়ে এক্সপেকটেশন।

রাইসু যেভাবে সামাজিকতার ধার ধারে না; এর পালটা হিসাবেই কী অন্যেরাও তার উপরে সুবিধা নিয়া নেয়?

রাইসুকে দাওয়াত কইর‍্যা নিয়া গিয়া অবলীলায় তারে না খাওয়াইয়া গলা ধাক্কা দিতেও তাদের বাধে না? ব্যাপারটা কি তাই?

আমি ঠিক শিওর না। তবে ঘটনাটার পর থিকা প্রশ্নটা আমারে তাড়া করে। রাইসুর আবার সেইটারে ফেইস করার স্টাইলটাও নতুন। সে কোনো অপমানবোধের দিকে যায় না, সেইটা অপচয় বা নেগেটিভ এই বিবেচনায়। অনেকের মনে হইতে পারে সে বোধহয় সেইটারে উপভোগ করে তাড়িয়ে তাড়িয়ে। না সেটা একেবারেই না। তবে রাইসু কোনো বিরোধে, নন-কনফ্রন্টেশনাল  (ফিজিক্যাল অর্থ বিচারে) অবস্থানে থাকে— এইটা আমার মনে হইছে।

রাইসু সবকিছুকে ভাঙতে পারে—প্রবল বিক্রমে, শক্তিতে। এটা কিন্তু এক বিরাট গুণ। যেমন চিন্তা করেন যারা এটা একেবারেই পারে না তাদেরই আমরা কনজারভেটিভ বলে ডাকি। আর ভাঙা তো আসলে এরপর গড়ার আগাম ধাপ, এই অর্থে এটা ইতিবাচক।

কিন্তু রাইসুর খারাপ গুণ হইলো সে গড়তে পারে না। সে গড়ার সৈনিক না। তাই অনেকে বলবেন হয়ত রাইসু কখনো ভাঙা বা গড়া কনোটারই সাথী হইতে পারবে না। কারণ তাদের চোখে ভাঙা বা গড়া দু’টাই পলিটিক্যাল কাজ।

রাইসু এপলিটিক্যাল, রাইসু অরাজনৈতিক। রাইসুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এটাই। রাইসু তাই যেমন কারো বন্ধু হইতে পারে না,সেভাবেই রাইসুর সম্ভবত কোনো প্রবল শত্রুও নাই। রাইসু তাই আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু বাইধ্যা রাখতে পারে না, রাইসু চায়ও না সেটা।

রাইসু তার অলীক জগতের খুবই নিঃসঙ্গ বাসিন্দা। সেই অলীক জগতে এই মাটির পৃথিবীর কোনো কিছুই রাইসুর কাছে মূল্যবান নয়। তবুও রাইসুরা থাকলে আমাদের পৃথিবী বৈচিত্র্যের স্বাদ পায়। এমন ক্ষ্যাপাটে কিছু মানুষ আছে জন্যই তো এই পৃথিবী এত বর্ণময়। আবার যখন কারোই ভাইঙ্গা ফেলার মুরোদ দেখা যায় না, বেশি বেশি চিন্তা করে বলে তখন ঐ স্বল্প পরিসরে রাইসুর একটা ভূমিকা থাকতে পারে। আমি সেই ভূমিকায় রাইসুরে পাইলে সতর্কতার সাথে খুশী হইবো।

অলীক জগতের নিঃসঙ্গ রাইসুরে জন্মদিনের অভিনন্দন।

রাইসু একবার তার ওয়ালে লিখছিল, সে আমারে ভালোবাসে। আমিও রাইসুরে ভালবাসি। তার সমস্ত অপূর্ণতা, তার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগের পরেও আমি তারে কইতে চাই—আই লাভ ইউ ম্যান!

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসু—স্বাধীন সার্বভৌম

ফেসবুকীয় জীবনে এটাই আমার সবচেয়ে বড় লেখা। রাইসুর জন্য তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে।

রাইসু, যিনি নিজেই নিজেকে প্রতি মুহুর্তে এডিট করতে পারেন। এবং পৃথিবীতে তাঁকে এডিট করতে পারেন (বদলে দেওয়া অর্থে) এমন কারো বোধহয় জন্ম হয় নাই।

জন্ম হওয়ার দরকারও নাই।

ছবির রাইসুকে দেখতে কোনো ভাবেই পঞ্চাশ বলা যায় না। হি লুকস্ ভেরি ইয়াঙ্গার দ্যান হিজ এইজ। ‘মেন্টাল এইজ’ অর্থাৎ রাইসুর মানসিক বয়স যে কোনো কিছুই বলা যায়। ১১, ১৯, ২২, ২৭, ৪৩, ৬৫, ৭৬।  যে কোনো কিছু। কিন্তু ফিজিক্যালি হি লুকস্ ট্যু ইয়াঙ।

এইটা আমি। ছবিটায় আমি আমাকে দেখি। যখন ছবিটা আঁকা তখন রাইসু আমাকে চিনতেন না। কিন্তু নিশ্চয়ই কোনো সংযোগ ছিল।

অত্যন্ত মেধাবী রাইসু, যার আঁকা ছবি এক ধরনের ঘোর তৈরি করে। সব প্রতিভার মধ্যে আঁকা ছবির প্রতি আমি অনেক বেশি আকর্ষণ বোধ করি। না না তাঁর হাসি, তারপর আঁকা ছবি।

হি হি।

তারপর তাঁর বাণী এবং পরিশেষে কবিতা।

যদিও খুব বেশি কবিতা পড়া হয় নাই। পড়ব।

ভালো খারাপের ব্যাপারটা আপেক্ষিক হলেও প্রত্যেকেরই ভালো খারাপের ব্যাপারে এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমার মতে, যেই মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কারো ক্ষতি করে না সেই ভালো মানুষ। তাই আমার ধারণা ব্রাত্য রাইসু প্রচণ্ড রকমের ভালো মানুষ।

এবং তিনি কন্যাদের প্রেমে ফেলানোর অস্বাভাবিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করছেন বা সেই ক্ষমতা নিজেই তৈরি করছেন। দুই-ই হইতে পারে।

তাহুয়া লাভিব তুরা

অারেকটা ব্যাপার হলো প্রভাবিত করা। তাঁর লেখা স্ট্যাটাস বিভিন্ন ভাবে অামাদের প্রভাবিত করে। যেমন তিনি বলছেন, “আমার অনেক বিষয়েই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আছে—কারণ আমি মানুষ। দেবতা বা শয়তান না আমি।”

দলবদ্ধ হয়ে থাকা, অনুসরণ করা, অন্যকে দেখে বা তাঁর মত করে জীবনধারণ করা ইত্যাদি পশুপাখির স্বভাব। কিন্তু বেশিরভাগ লোকই তাই করে। রাইসু করেন না। এইজন্য তাঁকে এত বেশি পছন্দ। মানুষ তাঁর নিজের মতন চলবে এইটাই স্বাভাবিক ব্যাপার।

অামরা বিক্রেতা। অামরা তেল, মেধা, শ্রম, সাধনা, ভালবাসা ইত্যাদি বিক্রি করে থাকি। তাই সেইসব লোকদের অামি পছন্দ করি যারা এটা স্বীকার করেন। ব্রাত্য রাইসু সেই ব্যক্তিত্বের একজন। সম্ভবত তিনি একমাত্র একজন।

তাঁর এবং ফেসবুকের ঘনিষ্ঠ প্রেম আমাকে বিস্মিত করে। আমার বিস্মিত হবার ক্ষমতা নাই বললেই চলে। আমার  কিছুই ভাল্লাগে না। তাই সবসময়ই বেঁচে থাকার এবং ভাল্ লাগার কারণ খুঁজতে থাকি। সেইক্ষেত্রে প্রায় সাতশ কোটি ধরনের লোকের মধ্যে ব্রাত্য রাইসু এক ধরনের। যেই ধরনটা আমার খুব পছন্দ।

তাহুয়া লাভিব তুরা

যদিও শুধুমাত্র ফেসবুকীয় রাইসুকেই আমি চিনি। যিনি তাঁর পঞ্চাশ নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত।

যা বলতে চাই বা মাথায় ঘুরে তা আমি কোনোদিনই গুছিয়ে লিখতে পারি না। তবুও লিখছি। ভবিষ্যতে এত বড় লেখা কখনো লিখতে পারব কিনা সেটাও জানি না।

রাইসু, অাপনার সম্পর্কে যতদূর পড়েছি, একেক জন একেক রকম বলে। এটাও বেশ ফ্যান্টাসটিক একটা ব্যাপার। কিন্তু আপনার লেখা এবং আপনার সম্পর্কিত অন্যান্য লোকের লেখা পইড়া মনে হচ্ছে আপনি দারুণ একজন মানুষ। সবাই বলছে আপনাকে ছকে ফেলা যায় না। কথাটা হয়ত ঠিক। কিন্তু তারপরেও আপনাকে নিঃসন্দেহে যে কোনো ভালোর ছকে রাখা যায়।

আপনার সাথে ভার্চুয়াল রিলেশান হওয়াটাও আমার জন্যে একটা বিরাট ব্যাপার রাইসু।

আপনার জন্যে এটা কোনো ব্যাপারই না। ব্যাপার হওয়ারও কথা না। কিন্তু আমি খুব খুশি। খুব খুশি।

আপনার মেধা, প্রতিভা, দাঁত, চোখ, চুল, হাসি, আঁকা ছবি ইত্যাদি সবই পছন্দ। পঞ্চাশ সংখ্যাটা আপনার পছন্দ অনুযায়ী একটা সংখ্যায় গিয়ে পৌঁছাক এই কামনা থাকল।

পঞ্চাশ এবং ব্রাত্য রাইসু।

ধন্যবাদ।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

পরিচয়

রাইসুর সাথে আমার পরিচয় অল্পদিনের। চার-পাঁচ মাস হবে পরিচয় হইছে। রাইসু কে, কেমন চিন্তাধারার মানুষ, মানুষ হিসাবে কেমন—কিছুই জানতাম না। তবে, ফেসবুক টাইমলাইন ঘাইটা ধারণা হইছিল, উনি গুরুত্বপূর্ণ কেউ। উনার লেখা ভাল্লাগতো, কবিতার কিছু লাইন অদ্ভুত বিষণ্ণ করত মন। অ্যাড দিলাম, রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট হইল। সাথে সাথে একটা টেক্সটও আসল।

আমি আলাপের ব্যাপারে সাবধান থাকলাম। উনি যে বাদবাকি পাঁচজনার মতন না এই ব্যাপারটাই আমারে সতর্ক কইরা তুলছিল। রাইসুরে সকলের থিকা আলাদা করছে তার বুদ্ধিমত্তা, তার স্পষ্টবাদিতা। এইটা তার সাথে প্রথম পরিচয়েই যে কেউ বুঝবেন।

রাইসুর সাথে প্রথম দিন ফোনে আলাপ হইল অন্যান্য সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের নিয়া। আমি ছফা পড়ি, তাই ছফার আলাপও হইছে। এই আলাপের আগের দিন আমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের দূরবীণ শেষ করছিলাম। বলছিলাম রাইসুরে। আমার পড়ার প্রশংসা করছিলেন।

আমি ওনার ফ্যামিলির কথা জিজ্ঞাসা করব কি করব না এই নিয়া দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লাম। কথা শুইনা মনে হইতেছিল সাধারণ গড়পরতা ফ্যামিলি ওনার নাই। আবার এমন হইতে পারে—বিয়া করছিলেন, পরে সেপারেশন হইয়া গেছে।

এইসব একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় তাই আমি আগাইলাম না। কিন্তু আমারে অবাক কইরা দিয়া রাইসু ঐদিনই সব বললেন। এমন ঠাণ্ডা গলার স্বরে একজন মানুষের সত্যি কথা বলার ধরন আমারে অভিভূত করছিল।

সানজিদা আমীর ইনিসী

এই কথাবার্তার পরে আমার আইডি ডিএক্টিভেট ছিল। কথা হইছিল সকালের দিকে। আইডি ডিএক্টিভেট করছিলাম দুপুরে। পরের দিন সকালে আবার আইডি এক্টিভ করলাম। একটা স্ট্যাটাস চোখে পড়ল ওনার। প্রথম ফোনালাপে কথাপ্রসঙ্গে যখন হুমায়ূন আহমেদের কথা উঠছিল, আমি হুমায়ূন আহমেদ নাকি আহমদ এই নিয়া কনফিউজড ছিলাম। এই ব্যাপারটা রাইসুর স্ট্যাটাসের মূল উপজীব্য ছিল। আমি স্ট্যাটাস দেখার পর এক মিনিটও দেরি না কইরা রাইসুরে ফোন দিলাম। বললাম, আপনি নিজেরে যতটা সোজাভাবে দেখান, আপনি আসলে তেমন না।

উনি ব্যাখ্যা চাইলেন।

আমি বললাম, কাল ফোনেই আমার ভুল ধরায়া দিতে পারতেন, আমার কনফিউশান ছিল, আপনি সঠিকটা বললে কনফিউশান থাকত না।

রাইসু হো হো কইরা হাইসা উঠলেন।

বললেন—ও আচ্ছা! আপনার পারমিশান নেওয়া উচিত ছিল আসলে।

যেহেতু আমার নাম উল্লেখ নাই, তাই পারমিশান নেওয়া দরকার আমি মনে করি নাই। পরে অবশ্য আর এই নিয়া কথাবার্তা হয় নাই। উনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জানেন। কিন্তু রাগ হইয়া কথা বলতে কি জানেন? জানলেও যে তিনি রাগ কইরা কথা কন না এতটুকু আমি নিশ্চিত। এত দীর্ঘ কথাবার্তায় বা আমার অজস্র ভুলের জন্য কখনো রাইসু আমার সাথে রাগ কইরা কথা বলেন নাই।

আমার লেখালেখি শুরু হইল। রাইসু না থাকলে হইত কিনা সন্দেহ! আমি যে লিখতাম না, তা না। লিখতাম, কিন্তু এই নিয়া কোনোদিন ভাবি নাই, কোনো স্বপ্ন দেখি নাই। রাইসু জানেন, কোথা থিকা শুরু করা উচিত, কীভাবে শুরু করা উচিত।

আমাদের মাঝেমধ্যে ফোনে অনেকক্ষণ আলাপ হইত এইসব লেখালেখি নিয়া। আমি কিছুই জানি না সেইসময়। নানান রকম প্রশ্নবাণে জর্জরিত হইয়াও রাইসু কোনোদিন অধৈর্য্য হন নাই। এত ধৈর্য্য কোত্থিকা পাইছেন উনি কে জানে!

লেখালেখির আলাপ ছাড়াও আমার আলাপ, আমার ফ্যামিলি বিষয়ক আলাপ, রাইসুর জীবন, রাইসুর বিভিন্ন সময়ের প্রেম নিয়া কথাবার্তা হইত। নিঃসন্দেহে রাইসু এবং রাইসুর জীবনের ঘটনাগুলি ইন্টেরেস্টিং।

রাইসুর বলার ধরন চমৎকার। আমি আশির দশকের অনেক তথ্য রাইসুর এইসব গল্প থিকা জানছি। মাঝেমধ্যে উনারে গল্পের মাঝখানেই প্রশ্ন করি। উনি বিরক্ত হন না। প্রশ্নের উত্তর দিয়া আবার বলতে শুরু করেন।

ব্লগের নাম নিয়া (সাম্প্রতিক ডটকমে) আমি প্রতিবার টানাপোড়েনে পড়ি। রাইসু আমারে নাম ঠিক করার জন্য সময় বাইন্ধা দেন। আমি ভাবতে থাকি।

একটু পরে: “এইটা হইতে পারে?”

রাইসু—না।

আবার খানিক বাদে: “এইরকম?”

রাইসু—না।

আমি ততক্ষণে অধৈর্য্য হইয়া যাই।

ফোন দিই।

রাইসু নামের ব্যাপারে পাঁচ মিনিটের একটা বক্তব্য রাখেন। আমি প্রত্যেক কথার পরে “হু” “হু” কইরা ফোন রাইখা পুনরায় চিন্তা করি।

আবার কিছুক্ষণ পরে কিছু অপদার্থ নাম প্রস্তাব করি, তখন রাইসু ভবিষ্যৎ বাণী কইরা কন—“আপনার ছেলেমেয়েরা নামের সংকটে ভুগবে।”

আমার লেখালেখির জন্য গুগল ডক আর জিমেইলের অ্যাকাউন্টের দরকার হইল। উল্লেখ্য, আমি অ্যাকাউন্ট খুলতে জানি না। রাইসু আধা ঘণ্টা ধইরা আমারে বুঝায়া বললেন কী কী করতে হবে। মেসেনজারে স্ক্রিনশট পাঠাইলেন।

আমি কিছুক্ষণ চেষ্টা কইরা ক্ষান্ত হইলাম। ফোন কইরা বললাম, আমি পারতেছি না। সাহায্য করেন।

না, তারপর আর উনি আমারে কী কী করতে হবে বইলা সাহায্য করেন নাই একাউন্ট খুলতে।

নিজেই একাউন্ট খুইলা দিছেন।

খালি একবার কইছিলেন, “এত ব্যাকডেটেড হইলে কি চলব? এইসব শিখেন না কেন?”

ঐদিন দুপুরে শুইয়া শুইয়া ভাবতেছিলাম, রাইসুর জায়গায় আমি হইলে নিশ্চয়ই রাগ কইরা যা-তা বলতাম। শুধু আমি না, অধিকাংশ মানুষই রাগ করতেন, রাগ করাই স্বাভাবিক ছিল। আর এইটাই রাইসুর সাথে অন্যদের পার্থক্য। এইটাই রাইসুরে আলাদা করছে অন্যদের থিকা।

রাইসুর সাথে আমার পাশের বাসার আন্টিরে নিয়াও আলাপ হয়। আমাদের আলাপের বিষয় নির্দিষ্ট না। তবে, আলাপের বিষয়বস্তুর তাৎপর্য আছে। পাশের বাসার আন্টি প্রতিদিন তার গৃহকর্মীরে মারধর কইরা আমাদের আলাপের বিষয়বস্তু হইয়া উঠছিলেন।

রাইসু সবসময় ফোন কইরা প্রথমে জিগান—“কী খবর বস? আজকে কী কী হইল?”

আমি আমার কোচিং এর বৃত্তান্ত থিকা শুরু কইরা আমার আশেপাশে কী কী হইছে তার বৃত্তান্তও দিই। রাইসু শুইনা যান, কোনোরকম বিরক্তি বোধ ছাড়া অনর্গল কথা শুইনা যান।

রাইসু কথার ফাঁকফোকরে মাঝেমধ্যে জানতে চান, আমার প্রেম হইল কিনা কারও সাথে। আমি প্রত্যেকবারই একইভাবে কট্টর কণ্ঠে বলি—নাহ, হয় নাই। শস্তা নাকি!

এই জানতে চাওয়ার আর উত্তর দেওয়ার মধ্যে আগ্রহের চেয়ে কৌতুক বেশি। কেন হয় নাই, কেন মানুষের ব্যাপারে আমার ছ্যা ছ্যা বেশি, রাইসুর আমার আদৌ প্রেম হইবে কিনা এই নিয়া সন্দেহ। আমি প্রেমের ব্যাপারে কনজারভেটিভ আর তামাম(!) জীবনে একখান মাত্র প্রেম করায় রাইসুর সন্দেহ যুক্তিযুক্ত। এইসব নিয়া আমরা সিরিয়াস কণ্ঠে কিন্তু মনে কৌতুক পুইষা আলোচনা করি।

আমার মাঝখানে একজিমা হইছিল। রাইসুরে বলার পর রাইসু সমস্ত দোষ বরাবরের মত আমার খাওনদাওনের উপর চাপাইলেন। আমি কম খাই, প্রত্যেক বেলায় ঠিকমতো খাই না, ডিম দুধ খাই না, কলা খাই না—এইজন্যেই আমার অসুখ হয় বইলা রাইসুর ধারণা।

রাইসুর ধারণা অবশ্য ঠিক। শুধু যে, অসুখ হইলে আমারে উনি খাওয়াদাওয়া নিয়া বলেন, তা না। ডেইলি বলেন—“ডিম-দুধ খায়ো, বাবু!”

বাসায় বড় বড় সমস্যা হইলে পরে আমার মেজাজ খারাপ থাকে। যেহেতু আমার ফ্যামিলির সাথে আমার সম্পর্ক স্বাভাবিক না, তাই বিভিন্ন রকম ঝামেলা হইতে থাকে। রাইসু তখন মাথা গরম করতে মানা করেন, অন্তত কয়েকবার কইরা বলেন, “বস, মাথা গরম করবেন না। উনারা যা কইবেন, শুনবেন শুধু।”

রাইসুরে ভালো মানুষ মনে হওয়ার প্রথম কারণ উনার কথায় কোনোরকম লুকোচাপা নাই। নিজেরে ভালো প্রমাণ করার ঝঞ্ঝাট নেন নাই দেইখাই রাইসু ভালো মানুষ।

রাইসুর পরিচয় পাওয়া শেষ হয় নাই এখনও, আমি প্রতিদিন নতুন কইরা ওনারে জানি। আমি যেইভাবে কথা বলি, সেইভাবে লিখলে যে একটা চমৎকার জিনিস হয়, এইটা কি রাইসুর সাথে পরিচয় না হইলে জানতাম?

জানতাম-ই না হয়ত!

এইক্ষেত্রে রাইসুরে এক নতুন দ্বার উন্মোচনকারী বলা যায়। রাইসু তার সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের থিকা আলাদা, অনেক দিক থিকা আলাদা।

রাইসুরা দুর্লভ, রাইসুরা প্রতিদিন জন্মান না।

পঞ্চাশ হইলো সবে বয়স, রাইসু?

বয়সের প্রভাব থিকা আপনি মুক্ত। এই দুইটা ডিজিট দিয়া আপনার কিচ্ছু যায় আসে না—আমি জানি। আমি আরও কয়েক বছর আগে জন্মাইলাম না বইলা আফসোস হয়। বিশ বছর আগের রাইসু—যে মাইলের পর মাইল খালি পায়ে হাঁটতেন, তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে সহস্র বার তার প্রেমে পড়া যাইত। এখন যেমন আমরা পরের জন্মের জন্য প্রেম মূলতবি রাইখা দিছি, এমন মূলতবি রাখতে হইত না।

সামনের পঞ্চাশেও লেখা দিতে চাই, তখন নিশ্চয়ই আরও অনেক লিখতে পারব প্রিয় কবির সমন্ধে। আমার এই পৃথিবী যাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমন আদর আদর কণ্ঠে আমার হাসিরে ভালোবাইসা আমারে ‘সুহাসিনী’ ডাইকা যাইয়েন। আপনি না ডাকলে কে ডাকবে, কন?

আমি নিজেরে ধন্য মনে করতেই পারি। রাইসুর সাথে আলাপ না হইলে  আজকের দিনটা ঠিক আজকের হইত না আমার জন্য।

২২ নভেম্বর ২০১৭

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

সাম অ্যানেকডটস ফর ব্রাত্য রাইসু

১. দুই শ্রেণীর সংযোগ, অব্যয়

এইটা ২০১৫ সালের ঘটনা। ২০১৫ এর একেবারে লাস্টের দিকে। ডিসেম্বরের ১৭-১৮ তারিখ ছিল মনে হয়। একটা কাজে রাইসু ভাই’র সাথে আমার কারওয়ান বাজারে দেখা হইল। দুপুরে, ২ টা বাজে নাই তখনো। সোনারগাঁও এর উলটা দিকে। রাইসু ভাই জানাইলেন ওনার এক বন্ধু আসছে বিদেশ থেকে, ওনার সাথে দেখা করতে চাইছে, এখান থেকে উনি তার সাথে দেখা করতে যাবেন। আমারে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি যাবেন কোথায় এখন, কাজ আছে এরপরে?

আমি বললাম, সাড়ে পাচটা-ছয়টা পর্যন্ত আমি ফ্রি।

উনি বললেন, তাইলে চলেন আমার সাথে।

আমি বললাম, ওকে।

রাইসু ভাই একটা রিকশা ঠিক করলেন তেজগাঁও রেলগেট নাকি তেজগাঁও বাজারের উদ্দেশ্যে, আমার এক্স্যাক্ট মনে নাই। রিক্সায়  ওঠার পরে আমাকে জানাইলেন যে তার এই বন্ধুর সাথে বেশ অনেক বছর দেখা নাই। এই বন্ধুটা মেয়ে । বিদেশে থাকে।

আশরাফুল আলম শাওন

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তেজগাঁওয়ে কেন?

উনি বললেন, ওইখানে তার ফিল্মের কাজ করতেছে, শ্যূটিং মনে হয়।

রিক্সায় ওঠার আগে আমরা বারিস্তার স্যান্ডউইচ বা র‍্যাপ জাতীয় কিছু খাইছিলাম। রিক্সায় উঠে রাইসু ভাই বললেন, বাইরের খাবারের এই এক সমস্যা, এখন ভাল লাগতেছে না। ওরা টেস্ট বাড়ানোর জন্য কী জানি একটা বেশি দেয়। এই জন্যেই বাইরের খাবার খাইতে চাই-ই না।

আমি বললাম, এই কারণেই আমি বাইরে সাধারণত কিছুই খাই না। সেদিন কবে জানি আফতাবের না কার পাল্লায় পইড়া বনানীতে বিরিয়ানি খাইতে হইল। মোটামুটি পশ জায়গা, ডিশটা দেখতে খুব সুন্দর, শুরুর দিকে খাইতেও টেস্টি। কিন্তু বাসায় যাওয়ার পরে মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেল। আমি খেয়াল করছি, যেদিনই আমাকে এরকম বাইরের বিরিয়ানি খাইতে হইছে, সেদিনই পরে আমার মাথা ব্যথা শুরু হইছে। অদ্ভুত না?

রাইসু ভাই বললেন, কেন? এইটা কি বিরিয়ানির তেলের কারণে?

আমি বললাম, কী জানি? হইতে পারে। গত এক বছরে দুই বা তিনবার এরকম হইছে।

রাইসু ভাই বললেন, বাইরে খাইলে, পরে টায়ার্ড লাগে।

আমি বললাম, হু, মুড অফ হইয়া যায়। ইভেন কোনো দাওয়াতে গেলেও।

বাইরের খাবার থেকে বেন অ্যাফ্লেকের একটা সিনেমা, সেইখান থেকে বিল মাহের এইসব নিয়ে কথা বলতে বলতে রিকশা বস্তির মত একটা এলাকায় ঢুকল। আমি যেহেতু আগে কোনোদিন বস্তির ভিতরে যাই নাই, আনকমফোর্টেবল লাগতেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী নিয়ে ফিল্ম, গরীব মানুষ?

রাইসু ভাই বললেন, ডকুমেন্টারি মনে হয়।

আমি ভাবতেছিলাম এইটা মনে হয় বস্তি না, বস্তি মনে হয় আরো নোংরা আর স্যাতসেতে হয়। জায়গাটা পরিষ্কার আছে।

এরপরে উনি ফোনে কার সাথে যোগাযোগ করলেন। আমরা জায়গামত পৌঁছাইয়া গেলাম। ৩০-৩২ বছর বয়সী এক লোক এসে আমাদের রিসিভ করল। রাইসু ভাই ওনাকে চিনে।

সেই লোক আমাদেরকে কয়েকটা বাড়ির পিছন দিয়ে আরেকটা বাড়িতে নিয়ে আসল। ছোট একটা গেট। গেটের ভিতরে ঢুকলে ছোট একটা করিডোরের মত, উপরে আকাশ। ডান পাশে ঘর। বাম পাশে অন্য বাড়ির দেয়াল। এই বাড়ির ঘরের দেয়াল আর অন্য বাড়ির দেয়ালের মাঝখানের জায়গাটাই আসলে করিডোরের মত মনে হয়। অন্য বাড়ির দেয়াল হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে করিডোর শেষপর্যন্ত আর করিডোর থাকে নি, মনে হয় ঘরের দরজার সামনে উঠানের মত সামান্য জায়গা।

আমাদেরকে নিয়ে বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে সেই ৩০-৩২ বছর বয়সী লোক রাইসু ভাই’র বন্ধুকে ডাক দিলেন, আপা, সী হু হ্যাজ কাম।

সেই বন্ধুটি আসলেন। উচ্ছ্বসিত হয়ে, তিনি তার মত করে, তার বন্ধু অর্থাৎ রাইসু ভাইকে সম্ভাষণ জানালেন। আমি পরিচিত হলাম। উঠানের মত জায়গায় শ্যূটিং এর আরো লোকজন। একজন বিদেশী সিনেমাটোগ্রাফার।

আমাদেরকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হইল। খুবই ছোট একটা ঘর। ঘরে রিমার্কেবল কিছুই নাই, তবে অনেক জিনিসপত্র। এবং এই একটা ঘরই আসলে এই একটা বাড়ি। অনেক বড় একটা খাট বা চৌকি, পাশে একটা শোকেস। চৌকির পায়ার নিচেও ইট দেওয়া, শোকেসের পায়ার নিচেও ইট দেওয়া। ঘরের চাল কীসের, দেওয়াল কিসের এইগুলা আমার মনে নাই। তখন বোধহয় ধরতেই পারি নাই এইগুলা কীসের। তবে ফ্লোর কনক্রিটের, এইটা মনে আছে।

রাইসু ভাই চৌকিতে বসলেন, আমারে একটা চেয়ার দেওয়া হইল। অপরিচিত পরিবেশ এবং সঙ্গের লোকের পরিচিত  কিন্তু আমার অপরিচিত  মানুষের সামনে আমি যে রকম হয়ে যাই, এক্সট্রিমলি স্টিফ, অলরেডি অনেক আগে থেকেই, মানে রিকশা থেকে নামার পরেই সেই অবস্থায় চলে গেছি। তখন আমার এক্সপ্রেশন, জেশ্চার খুবই আনফ্রেন্ডলি।

রাইসু ভাই তার সেই বন্ধুটির সাথে খোঁজ-খবর, পুরাতন দিনের কথা, আরো কয়েকজনের কথা এইসব আলাপ করলেন। যা জানা গেল, সেই বন্ধুটি ১৯৭১ এর বীরাঙ্গনাদের নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করছেন। এখন একজন বীরাঙ্গনাকে নিয়ে কাজ চলছে। এইটা তারই ঘর।

যার ঘর তিনি আসলেন একটু পরে। বৃদ্ধা মহিলা। কিন্তু খুব দ্রুত চলাচল করেন। সবসময় কথা বলতেছেন। তার সাথে তার মেয়েও আসল। সেই বৃদ্ধা মহিলা রাইসু ভাই এর প্রতি রিমার্কেবল মমতা দেখাইলেন। বললেন, এইটা আমার বাবা। মাথায় হাত বুলাইলেন। বললেন, এই বাবারে আমি কই জানি দেখছি। একটু পরে আবার বললেন, বাবার অন্তরডা খুব ভাল। এই কথা শুইনা রাইসু ভাই সরলভাবে হাসতেছেন। কিছুটা যেন অপ্রস্তুত। রাইসু ভাই আমার দিকে তাকাইয়াও হাসলেন।

সেই বৃদ্ধা সিগারেট ধরাইলেন। এলাকার কাকে ধমক দিছেন, কে তাকে সম্মান করে, এইসব কথা বলতেছিলেন। উনার মেয়ে আবার তার কথা স্পষ্ট করার জন্য মাঝে মাঝে ব্যাখ্যা করতেছিলেন।

রাইসু ভাই এর সেই বন্ধুটি সেই বৃদ্ধাকে খালা ডাকতেছিলেন। ইতোমধ্যে কয়েকবার জড়িয়ে ধরছেন। তার কথায়, এক্সপ্রেশনে স্পষ্ট হয় যে এই বৃদ্ধার পরিবারের প্রতি তিনি মমতা বোধ করেন।

আমাদেরকে জানানো হইল যে, আজকে তাদের শ্যূটিং শেষ হয়ে যাচ্ছে এই উপলক্ষ্যে সবাই আজ কাচ্চি বিরিয়ানি খাবে। আনতে লোক গেছে। আমাদেরকেও খাইতে হবে। এই বইলা রাইসু ভাই এর সেই বন্ধুটি ঘরের বাইরে চলে গেলেন।

রাইসু ভাই আমার দিকে তাকাইয়া, এই জোক যেন আগেই শুইনা ফেলছেন সেই রকম একটা হাসি দিয়া বললেন, আল্লাহ, বস আমরা না রিকশায় আসতে আসতে বিরিয়ানির বদনামই করলাম!

আমি বললাম, আয়রনি অব নেচার।

সেই বন্ধুটি আবার ঘরে আসলেন। বৃদ্ধার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার মা’টা কই? অর্থাৎ বৃদ্ধার মেয়ের মেয়ে সম্পর্কে, মানে বৃদ্ধার নাতনি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন।

১০-১২ বছরের সেই মেয়েটিকে ডেকে আনা হইল। রাইসু ভাই’র সেই বন্ধুটি তাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার মা’টাকে কতক্ষণ ধরে খুঁজতেছি! কই গেছিলা মা!

বাচ্চা মেয়েটা একটু লজ্জা পাইতেছিল।

এরপরে রাইসু ভাই’র দিকে তাকাইয়া তার সেই বন্ধুটি বললেন, জানো, ওরে নাকি স্কুলের ওর এক স্যার গান গাইতে মানা করছে, বলছে যে তোমার গান গাওয়ার দরকার নাই।

রাইসু ভাই কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞেস করলেন, কেন, মানা করছে কেন?

সেই বন্ধুটি, ওই বাচ্চা মেয়েটার মা, অর্থাৎ বৃদ্ধার মেয়ের দিকে তাকায়া জিজ্ঞেস করলেন, কেন মানা করছে?

আমি ততক্ষণে মনে মনে আশংকা কইরা ফেলছি যে, সম্ভবত গলা খারাপ, স্যারে মনে হয় কনজার্ভেটিভ না।

ঘটনা সেই রকমই। মেয়ের মা বলল, স্যারে বলছে যে তোমার গলা ছেলে মানুষের মত, তাই তোমার গান গাইতে হবে না।

রাইসু ভাই এর সেই বন্ধুটি বলল, শয়তান স্যার। বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকাইয়া বলল, তুমি কিন্তু গান থামাবা না মা, তুমি গান করবা বুঝছো।

ততক্ষণে কাচ্চি বিরিয়ানি চইলা আসছে। বিরিয়ানির প্যাকেট দেইখাই বুঝলাম, এতক্ষণ আশঙ্কা ছিল শুধু বিরিয়ানি নিয়া, কিন্তু সংকট আরো গভীর। বিরিয়ানির মান নিয়াও আশঙ্কা  করা উচিৎ। আমার চেহারা দেইখাই সম্ভবত রাইসু ভাই সাহস দিলেন, কিন্তু তিনিও তো সমান সঙ্কটে। আমারে আস্তে কইরা বললেন, কী আর করা, ফর্মালিটি রক্ষার জন্য যতটুকু পারলেন আর কি, দেখানোর জন্য। নাইলে খারাপ দেখাবে। আমি বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ, প্রোবলেম নাই।

রাইসু ভাই’র সেই বন্ধুটি আবার ঘরে ঢুকলেন। বৃদ্ধাকে বললেন, খালা আপনি খেয়ে নেন তাড়াতাড়ি, আপনার ক্ষুধা লাগছে তো! অনেক বেলা হইছে।

তারপরে বৃদ্ধার মেয়েকে বললেন, খালাকে আগে দাও। খালা কাচ্চি বিরিয়ানি খাইতে চাইছে, সেই জন্যই তো আজকে বিরিয়ানি আনা হইল।

খাওয়া দাওয়া শেষ। গল্প-কথাবার্তাও মোটামুটি শেষ। একটু পরেই সন্ধ্যা পড়বে।  ঘরের ভিতরে সেই বৃদ্ধা। আর কেউ নাই। কিছুক্ষণ পরেই আমি আর রাইসু ভাই চলে আসব এখান থেকে। ঘরের সামনের সেই করিডোরে, অন্য বাড়ির পিছনের সেই দেয়ালে হেলান দিয়ে রাইসু ভাই দাঁড়ায় আছেন। তার পাশে তার সেই বন্ধুটি, ডকুমেন্টারি নির্মাতা দাঁড়ায় আছেন। আমি তাদের সামনে দরজায় দাঁড়ায় আছি। আমার জ্যাকেটের পকেটে হাত, আমি প্রথম দিকের মতই চুপচাপ, মুখ চোখ গম্ভীর করে দেখতেছি সবকিছু। রাইসু ভাই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো, অল্প অল্প হাসতেছেন। হঠাৎ, একটু উপরের দিকে মাথা তুলে, খুবই শান্ত অথচ ডীপ কসমিক টোনে, যেন প্রকৃতিকে শোনাইতেছেন, এমনভাবে বইলা উঠলেন—দুই শ্রেণীর সংযোগ, অব্যয়।

এই কথা শুইনা, আমি বুঝতে পারার আগেই দেখি আমি হাসতে হাসতে বাম দিকে কাত হয়ে গেছি।

রাইসু ভাই’র সেই বন্ধুটির মুখ দেখি কালো হইয়া গেছে। উনি সামান্য পরেই নিজেকে সামলে নিছেন। ফান বুঝতে পারছেন, এমনভাবে একটু হাসলেন, রাইসু ভাই’র হাতে চড় দেওয়ার ভঙ্গি করলেন, আস্তে বললেন, যাহ! তবে মুখে স্পষ্ট কালো ছায়া।

আর আমি তখনো হাসতেছি। আর চিন্তা করতেছি—কোনো পলিটিক্যাল স্পেস তৈরি হওয়ার সুযোগ না রেখে, ক্লাসের হায়ারার্কিরে অদৃশ্য কইরা রাইখা, সোসাইটিতে, ইকোনোমিক্যালি দুই প্রান্তের দুই শ্রেণীর এইরকম অ্যারেঞ্জড, সাজানো-মেশামেশি বা সংযোগের মাধ্যমে যা তৈরি হয়, সেইটা যে অপব্যয়—এই জিনিসটা উনি এতক্ষণ ধরে কী সুন্দর পর্যবেক্ষণ করলেন। হাসতে হাসতে দেখতে দেখতে। আর প্রকাশ করলেন কী রকম এক্সপ্লোসিভলি!

এরপর বের হয়ে, মেইন রোডে এসে দুইজন দুইদিকে চলে যাই। তার একদিন পরে আমি ঢাকার বাইরে চলে যাই। তারও পরের দিন রাতে ফেসবুক খুলছি, দেখি রাইসু ভাই পোস্ট দিয়ে জানাইছেন যে, ডকুমেন্টারির কাজ শেষ হয়ে যাওয়া উপলক্ষ্যে রাইসু ভাই’র সেই বন্ধুটি  একটা পার্টি দিছিল। পার্টি মানে পার্টি। রাইসু ভাইরেও নাকি সেই জায়গায় দাওয়াত দেওয়া হইছিল। উনি সেইখানে গেছে। এবং ওইখানে কোনোকিছু না ঘটা সত্ত্বেও রাইসু ভাইকে নাকি সেই ভদ্র মহিলা সেখান থেকে বের করে দিছে।

 

২. কাশি হইছে

এইটা কয়েক বছর আগের ঘটনা। বইমেলায়। সেই বারের পরে আমি আর বই মেলায় যাই নাই। এমনিতেই যাই নাই। যাই হোক, বই মেলায় আমি আর মুনতাকীম ভাই বসে ছিলাম। মুনতাকীম ভাই মানে মুনতাকীম চৌধুরী, রাইসু ভাই’র ছোটবেলার বন্ধু। তারা একসাথে স্কুলে পড়াশোনা করছেন। যাই হোক, আমি আর মুনতাকীম ভাই বসে ছিলাম, সম্ভবত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণার দিকে। রাইসু ভাই’র আসার কথা, আইসা আমাদের সাথে জয়েন করবেন।

আমরা একটা বেঞ্চে বসে ছিলাম।  ওইদিকে ভিড় নাই, বইয়ের দোকান-টোকানও একটু দূরে। একটু পরে দেখলাম রাইসু ভাই আসতেছে। উনি হাসতেছেন। গায়ে সোয়েটার, গলায় মাফলার পেঁচানো। উনি কাছাকাছি আসলে মুনতাকীম ভাই তারে জিজ্ঞাসা করলেন, কীরে, দেশের কী অবস্থা? যেন সামান্য সমস্যায়ই পড়ছেন, এমন টোনে, রাইসু ভাই খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন—ভালো না, কাশি হইছে।

এইটা শুইনা আমি আর মুনতাকীম ভাই দুইজনেই হাসতেছিলাম।

 

৩. রইদে দেওয়া প্লাস্টিক

ব্রাত্য রাইসু’র এইরকম উইটি রিপ্লাই বা রিফ্লেকশন দেওয়ার ঘটনা যে কতশত!

রাইসু ভাই’র বাসায়। দুপুরে খাওয়ার সময় হইছে। আমরা খাইতে বসতেছি। আমরা বলতে আমি আর রাইসু ভাই। আর কেউ নাই।

আমি অলরেডি বইসা পড়ছি। উনি বসার আগে দরজার পর্দা সরাইয়া দিচ্ছিলেন। বাম পাশের দেয়ালের পুরোটাই কাচের স্লাইডিং ডোর। অনেক উপরের বাসা। পর্দা সরাইয়া দেওয়ার কারণে সুন্দর রোদ এসে ঘরে ঢুকছে। বিভিন্ন জিনিস নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা আমাদের পরিচিত দূরের এক ভদ্রলোকের বিষয়ে আলাপ করতেছিলাম। রাইসু ভাই পর্দা সরাইয়া দিয়া আমার সামনে আইসা দাঁড়াইছেন। কথার এক পর্যায়ে আমার কথা ছিল, …আর ওনার বউটারে দেখছেন, এমন ভাব করে, অথচ দেখলে মনে হয় প্লাস্টিক।

রাইসু ভাই আমার সামনে বসতে বসতে উত্তর দিলেন, বলছে আপনেরে! খালি প্লাস্টিক! প্লাস্টিক রইদে দিলে যেইটা হয়! এই কথা বইলা একটা অমায়িক হাসি দিলেন।

 

৪. বীন উইদ হোয়াইট রাইস

আমার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বন্ধু জাওয়াদ আহমেদ অর্ক একদিন রাইসু ভাই’র বাসায় গেছে। জাওয়াদ আহমেদ অর্ক দাবি করে সে অনেক বড়লোক ফ্যামিলির সন্তান। যদিও অর্করে দেখলে বা তার লাইফস্টাইল দেখলে কাউরে পয়সা দিয়াও এই কথা বিশ্বাস করানো যাবে না। তবে তার সাথে একটু মিশলেই বোঝা যায় সে টাকা, শিক্ষা ও সম্মানওয়ালা ফ্যামিলির সন্তান, এবং সে খুবই আরবান। আরেকটু স্পষ্ট করি, ঢাকা শহরের উচ্চ মধ্যবিত্ত বা অ্যাফ্লুয়েন্ট মিডল ক্লাস বলতে যা বোঝায়, অর্করা তাই। লালমাটিয়ায় নিজেদের লাক্সারিয়াস ফ্ল্যাট, গাড়ি, বারিধারা ও উত্তরায় নিজেদের জায়গা… ইত্যাদি। যদিও সে সারা মাসে এক হাজার টাকাও খরচ করতে পারত না সেইটা আলাদা আলাপ। তাইলে, ডিফারেন্ট ক্লাসেস অ্যান্ড দেয়ার সাইকোলজি টু দেয়ার চিলড্রেন—এইটা নিয়ে আলাপ করতে হবে। উই শুড লীভ দ্যাট নাউ।

অর্ক রাইসু ভাই এর সাথে দেখা কইরা আলাপ করতে চাইতেছিল, পরিচিত হইতে চাইতেছিল। আমি বলছিলাম, আমি এরমধ্যে কোনো একদিন গেলে তরে ফোন দিয়া ডাকব।

একদিন বেলা এগারোটার দিকে অর্করে ডাকা হইল রাইসু ভাই’র বাসায়। অর্করে দিয়া ইলাস্ট্রেশনের কাজ এবং লোগো ডিজাইনের ব্যাপারে তারে ডাকা হইল।

কিছুক্ষণ কথাবার্তা হইল। অর্ক রাইসু ভাইয়ের সাথে আলাপ করল। কাজের আলাপ না, এমনি কথাবার্তা। কিছুক্ষণ পরে অর্ক আমারে আলাদাভাবে জানাইল যে বাসাটা তার খুবই পছন্দ হইছে। এই কথা পরেও সে আমারে অনেকবার বলছে। এরপরে সে আমারে আস্তে আস্তে বলল, ওপেন আছে, স্টিফ না।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী, বাসা?

সে বলল যে, না, রাইসু ভাই, মানুষ হিসাবে।

এমন টোনে বলল যে মনে হয় রাইসু ভাইরে এভালুয়েট করাটাই ছিল তার আজকের দিনের একমাত্র উদ্দেশ্য।

যাই হোক, এর বেশ কয়েকদিন আগে একদিন বাইরে কোনো এক সুপারশপে কিছু বাজার করার সময় আমি রাইসু ভাইরে বীন দেখায় দিলে উনি বীন, মানে রাজমা কিনে আনছিলেন। সেইদিন দুপুর একটার সময় উনার হঠাৎ মনে পড়ছে সেই কথা, আমারে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা বস, সেদিন যে বীন আনলাম, আমরা বীন খাব না?

আমি বললাম, হ্যাঁ, খাওয়া তো যায়ই। আপনি এখনো খান নাই?

উনি বললেন, না, কিন্তু ওইগুলা রানবে কে? কেউ তো ওইগুলা রান্না করতে পারে না।  আপনি বীন রানতে পারেন?

আমি বীন রান্না করতে পারতাম। কিন্তু অস্বীকার করলাম। বললাম যে, পারি না, আমি যেগুলি বাসায় নিয়ে গেছি, ওইগুলি তো ওইভাবেই আছে। কারণ, আমি যদি বলতাম যে আমি পারি, কিন্তু করতে চাই না। উনি কোনোভাবে আমারে কনভিন্সড কইরা ফেলতেন বীন রান্না করার জন্য। তখন রাইসু ভাই অর্করে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি পারেন?

অর্ক সুন্দর একটা হাসি দিয়া ডানে বামে মাথা নাড়ল। মানে, না।

উনি বললেন, ওহ! নেট আছে না! গুগল আছে কী জন্যে? আমার দিকে তাকাইয়া বললেন, আপনার মাথায়ও এইটা আসে নাই। সার্চ দিলেই তো পাওয়া যাবে।

রাইসু ভাই সার্চ দিয়া বীন রান্নার সিস্টেম বের কইরা ফেললেন। এরপরে বাসায় থাকা একজনরে ডাক দিয়া জিনিসটা বুঝায় দিলেন।

বীন রান্না শেষ। দুপুর দুইটা বাজে তখন। দুপুরে খাওয়ার সময় হইছে, আমরা খাইতে বসছি। রাইসু ভাই এর আর বীনের কথা মনে নাই। টেবিলে সব খাবার আসছে। বীন রান্নাঘরে।

আমি রাইসু বললাম, বীন বিকালে রান্না করাইলেই তো পারতেন।

উনি চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন, এই, বীন কই? বীন আমরা কখন কীভাবে খাব?

আমি বললাম, এখন ভাত খাওয়ার টাইম, বীন দিয়া কী করবেন? বীন তো এমনি খাইতে হবে।

অর্ক আস্তে আস্তে বলল, ভাত খাওয়ার সময়ে বীন তো খাওয়া যাবে না।

রাইসু ভাই এর চোখ আনন্দিত হয়ে উঠল, অর্ক’র দিকে প্রাণখোলা একটা হাসি দিয়া বললেন, কেন, আমরা ভাতের সাথেই খাব। যেন র‍্যাম খুইলা রাইখা কম্পিউটার অন করতে বলা হইছে, এমন একটা হাসি দিয়া অর্ক বলল, এইটা কীভাবে সম্ভব?

রাইসু ভাই পালটা হাসি দিয়া বলল, সম্ভব। খাইতে ভালো লাগবে, দেখেন। অর্ক আর কিছু বলল না।

ততক্ষণে ভাত খাওয়া অলরেডি শুরু হইয়া গেছে। আমি লালশাক দিয়া কিছুদূর খাইয়াও ফেলছি। রাইসু ভাই কাউরে রান্নাঘর থেকে বীন আনতে বললেন। সে বীন নিয়া আসল। রাইসু ভাই নিজে সেই বীন ভাতের সাথে নিলেন। অর্করে দেওয়া হইল। সবাই নিল। আমি নিলাম। আমি যেহেতু এই উইয়ার্ডনেসের সাথে পরিচিত এবং আমার একটা ব্যাখ্যা আছে যে রাইসু ভাই কেন এমন করলেন, এই ব্যাপারটা আমার কাছে সারপ্রাইজিং কিছু ছিল না।

আরবান মিডল ক্লাস বা আপার মিডল ক্লাসের নিজেদের শ্রেণী অবস্থান ও লাইফস্টাইল নিয়ে যে আর্টিফিশিয়াল প্রাইড এবং শো-অফ সেই ব্যাপারটারে ডিসটর্ট করার জন্যই রাইসু ভাই এই ধরনের কাজ করেন।

পরে যখন অর্ক আমার সাথে নিচে নামল সন্ধ্যায়, ততক্ষণে বীন ব্যাপারটা আর আমার মাথার মধ্যে নাই। নিচে নাইমা অর্ক প্রথম কথা বলল, ভাতের লগে বীন খাওয়ায় দিল, এইটা সম্ভব!

পরে অর্ক এই জিনিসটা অনেক বার রিপিট করছে। হাসতে হাসতে বলত, হায় হায়! ভাইরে ভাই, সাদা ভাতের সাথে বীন খাইছিলাম। কী মানুষরে! এই এক ডায়লগ কতবার যে দিছে! আমি তখন রাইসু ভাইরে সাপোর্ট কইরা বলতাম, উনি ইচ্ছা কইরাই এ রকম কাস্টোমাইজ করছে। অর্ক বলত, রাখ তর কাস্টোমাইজ, আমারে বুঝাও, না!

এরপরে একবার একদিন অর্ক তাচ্ছিল্যের এক্সপ্রেশন দিয়া বলছিল, রাস্তার পুডিং! রাইসু ভাই সেদিন তখনি অর্করে নিয়া রাস্তার পুডিং খাইছিলেন। অর্ক সেই পুডিং খাইতে খাইতে বলছিল, এই পুডিং! আর আমাদের বাসায় যে পুডিং রান্না করে!

 

৫. কফি উইদ ব্রাত্য রাইসু

একদিন আমি আর রাইসু ভাই কফি খাইতে ঢুকছি। বারিস্তায় অথবা কফি ওয়ার্ল্ডে। আমার এক্স্যাক্টলি মনে নাই, তবে দুইটার একটা। দুপুর বেলা। রাইসু ভাই আমারে জিজ্ঞাসা করলেন, কফির সাথে কিছু খাবেন না?

আমি বললাম, না, আমি বের হওয়ার আগে দুপুরে খেয়ে বের হইছি। উনি বললেন, আমিও অবশ্য খাইয়া বের খাইছি। শুধু কফিই অর্ডার করি তাইলে।

আমি আমেরিকানো অর্ডার করলাম, উনি লাটে অথবা মকা অর্ডার করলেন। এরপরে আমার দিকে তাকাইয়া বললেন, একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করি? উনাদের স্যান্ডউইচ ভালো বস।

আমি বললাম, আপনি খাইতে চাইলে করেন। তারপর কাউন্টারে তাকায়া বললেন, ভাইয়া আপনাদের ভালো স্যান্ডউইচ কোনটা আছে? এরপর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করলেন। দুপুর বেলা। লাঞ্চের সময়। অনেক ভিড় জায়গাটায়। সবাই কথা বলতেছে।

আমরা একটা টেবিলে বসলাম। কথা বলতে বলতে কফি দিয়া গেল। স্যান্ডউইচটা দুই ভাগ কইরা রাইসু ভাই বললেন, অর্ধেক অর্ধেক খাই।

আমি বললাম, পারব না খাইতে।

উনি বললেন, আরে পারবেন। আমার প্লেটে অর্ধেক স্যান্ডউইচ দিলেন।

কফি খাইতে খাইতে কথা বলতেছি। যেন আমারে ভাতের সাথে সালাদ নিতে বলতেছেন, এমন সহজ টোনে ও পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ভিজাইয়া খান, ভালো লাগে।

আমি তখন খেয়াল করলাম যে উনি খুব সুন্দরভাবে ওনার স্যান্ডউইচ মগের কফিতে ভিজাইয়া খাইতেছেন। এত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে বললেন যে আমি অলমোস্ট কনভিন্সড। কিন্তু আমার কফি তো আমেরিকানো, কীভাবে ভিজাইয়া খাই! ফলে এইটা নিয়া আমি আর সেকেন্ড থট দিলাম না। তবে আমেরিকানো না হইলে হয়ত চিন্তা করতাম।

আমি বললাম, না, আমারটা তো ব্ল্যাক!

রাইসু ভাই বললেন, ওহ! তাইলে তো পারবেন না।

উনি ওনার মত খাইলেন। আমি আশেপাশে তাকাই নাই। এক দুইবার আশেপাশে চোখ পড়ায় দেখলাম, দুই একজন হয়ত ওনার দিকে তাকাইয়া আছে। আমি ভাবছি এমনি তাকাইয়া আছে, এ রকম চোখ তো পড়েই। তখন আমার কিছুই মনে হয় নাই, কিছুই সন্দেহ হয় নাই। দুইদিন পরে আমি জিনিসটা ধরতে পারলাম। কফিতে স্যান্ডউইচ ভিজাইয়া খাইলে টেস্টি লাগে—এই কারণে রাইসু ভাই কাজটা করেন নাই। ওই যে এর আগের ঘটনায় বললাম, আরবান মিডল ক্লাস বা আপার মিডোল ক্লাস একটা লাইফস্টাইল ফলো কইরা বা কিছু সার্টেইন জিনিস কনজ্যুম করে নিজেদের ক্লাসের ব্যাপারে যে প্রাইড নেয়, সেই জিনিসটারে ডিসটর্ট করার জন্য, সেই প্রাইডরে যে উনি পাত্তা দেন না, দুই নম্বরি মনে করেন—সেই জায়গা থিকা তিনি ইচ্ছা করেই কাজটা করছেন।

 

৬. বিরিয়ানি অ্যাগেইন

একদিন আমি আর রাইসু ভাই কোথা থেকে যেন আসছি। পান্থপথে আসছি। রাইসু ভাই সেইখান থেকে তার বাসায় চলে যাবেন, আর আমি আমার বাসায় আসার জন্য একটা সিএনজি নিব। রাত ৯টা পার হইছে। ৯টা দশ বা পনের বাজে। রাস্তায় আসতে আসতে উনি বলতেছিলেন, কী খাওয়া যায়? ভালো খাওয়ার জিনিস কী আছে? আমি বললাম, কিছুই তো নাই। কী খাবেন? রাইসু ভাই প্রোবলেম সলভ করতে হবে—এই টোনে বললেন, তাইলে ভালো খাবার কোথায় পাওয়া যায়? এত বড় একটা শহর আর আমরা খাওয়ার উপযুক্ত একটা জিনিস খুইজা পাবো না, এইটা কথা!

তখন আমি সম্ভবত অন্য কিছু ভাবতেছিলাম, বেখেয়ালে বইলা ফেললাম, বিরিয়ানি খাবেন? বলার সাথে সাথে আমি চিন্তা করলাম, এইটা কী করলাম আমি! কিন্তু যা হওয়ার তা তো আমি বইলাই ফেলছি। খেয়ালে বা বেখেয়ালে—দ্যাট ডাজন’ট ম্যাটার।

রাইসু ভাই বললেন, তাইলে চলেন, বিরিয়ানি খাই।

আমি বললাম, এখন কি বিরিয়ানি ভালো লাগবে?

রাইসু ভাই বললেন, ভালোই লাগবে। চিকেন বিরিয়ানি খুঁজি চলেন।

আমি তখন নিজেরে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম, সাড়ে নয়টার মত বাজে তো, অনেক জায়গায় রাতের জন্য ফ্রেশ বিরিয়ানি রান্না করে। এই টাইমের দিকেই রান্না করে।

উনি বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম ফ্রেশ। বাসী-টাসী, দুপুরের-টুপুরের গুলা না।

রাস্তায় তো অনেক দোকান, অনেক রেস্টুরেন্ট। যেইটাকে একটু যোগ্য মনে হয় সেইটার দিকে আগায়া যাই। আমি জিজ্ঞাসা করি বিরিয়ানি আছে? চিকেন? আর রাইসু ভাই জিজ্ঞাসা করে, ফ্রেশ? কেবল রান্না করা?

চিকেন পাওয়া যায়, কিন্তু ফ্রেশ পাওয়া যায় না। অধিকাংশ দুপুরের দিকের। আবার ফ্রেশ পাওয়া গেলে সেইটা আবার চিকেন না।

যাই হোক একটা রেস্টুরেন্ট পাওয়া গেল, যেইটায় চিকেন এবং ফ্রেশ। ওয়েটার খুব বিনয়ের সাথে বলল যে কেবলই, দুই মিনিট হইল, চিকেন বিরিয়ানির ডেগচি চুলা থিকা নামানো হইছে। রাতে তাদের অনেক কাস্টোমার, এইজন্য প্রতিদিন তাদের রাত দশটার দিকে নতুন বিরিয়ানি রান্না হয়। রাইসু ভাই বললেন, কই দেখি! সেই ওয়েটার কাছে নিয়া যাইয়া ডেগচির ঢাকনা তুলে দেখাইল।

আমরা অর্ডার করলাম। রাইসু ভাই বললেন, ভালোই মনে হচ্ছে, না? আমার মাথায় তখন ঘড়ি চলতেছে, বাসায় যাব কখন? আমি বললাম, হুম।

আমরা বসছি। ওয়েটার বিরিয়ানি দিয়া গেছে। আমার মাথার ভিতরে বাসায় ফেরার তাড়া। আমি বিরিয়ানিতে হাত দিলাম। ডিমটা মাঝে দুই ভাগ করে কুসুম আলাদা কইরা ফেললাম। এখন জাস্ট মুখে তুলব।

আমার সামনে বসা রাইসু ভাই ধীরস্থির। উনি বিরিয়ানির দিকে তাকাইলেন। হয়ত মনে মনে সন্দেহ করলেন। তারপর জ্বর দেখার মত কইরা আলতো কইরা বিরিয়ানীর কপালে হাত রাখলেন। হ্যাঁ, তাই, বিরিয়ানির জ্বর।

উনি আমারে বললেন, বস বিরিয়ানি তো বাসী। যেইটা দেখাইছে ওইটা তো দেয় নাই আমাদের।

আমার মাথায় চিন্তা আরো জটিল হইতেছে, বিরিয়ানির চিন্তা না, রাত, সিএনজি এবং বাসায় যাওয়ার চিন্তা। আমি বিরিয়ানির ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার চেষ্টা কইরা বললাম, কী বলেন?

উনি বললেন, দেখেন, হাত দিয়া দেখেন।

আমি তো হাত আগেই দিছি, ডিম পর্যন্ত ভাইঙ্গা ফেলছি। তবু আমি নতুন করে হাত দিলাম। রাইসু ভাই বললেন, তাই না, দুপুরের জিনিস দিছে না? দেখছেন! ওঠেন বস। অন্য রেস্টুরেন্ট দেখি। আর ওই লোক কই?

আমি সেই ওয়েটাররে দেইখা ইশারা করলাম। সে আসল। রাইসু ভাই তারে বললেন, আপনে তো আমাদের নতুন বিরিয়ানি দেখাইয়া বাসী বিরিয়ানি দিছেন। এই কাজ কেন করলেন?

সেই ওয়েটার বলে, না স্যার, যেইটা দেখাইছি, ওইটাই দিছি।

রাইসু ভাই বললেন, আমরা কি পয়সা দিয়া খাব না? নাকি পয়সা কম দিব? চাইছি এক জিনিস, আপনি দিছেন অন্য জিনিস। আপনি কখনোই সেইটা দেন নাই।

ওয়েটার বলল, না স্যার, ওইটাই দিছি।

রাইসু ভাই বলল, মিথ্যা বলতেছেন। এই জিনিস তো ওভেনে গরম করা।

ওয়েটারের চেহারা এইবার বদলাইয়া গেল। বলল, স্যার, আমি দেখতেছি, দেওয়ার সময় মনে হয় ভুল করছে। স্যরি, আমি এখনি বদলাইয়া দিতেছি।

রাইসু ভাই বললেন, না না, আমরা এইখানে খাবই না তো আর। আপনি তো বাটপারি করছেন।

আমরা বের হইয়া আসলাম সেইখান থিকা।

আরেক রেস্টুরেন্টে যাইয়া জিজ্ঞাসা করলাম, সেখানে আমাদেরকে জানানো হইল সন্ধ্যার, না না, বিকালের দিকে রান্না করা হইছে। রাইসু ভাই আমার দিকে তাকাইলেন। তখন আমাদের আর এনার্জি এবং মুড কোনোটাই আর নাই। জাস্ট বিরিয়ানিকে দেওয়া কথা রক্ষা করতে হইবে। আমি বললাম, দেরি হইয়া গেছে, বাসায় ফিরতে হবে।

রাইসু ভাই বললেন, চলেন, ওদের যা আছে ওইটাই নেই। সেই বিস্বাদ বিরিয়ানি খাইতে খাইতে উনি আমারে জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদেরকে ওইখানে ফ্রেশ জিনিস দিল না কেন?

আমি বললাম, ব্যবসা করতে চাইছে।

উনি বললেন, না না, ইচ্ছা কইরাই দুই নম্বরি করছে, ভাবছে আমরা ধরতে পারব না।

এরকম আরেকদিন অন্য একটা জিনিস খাওয়ার প্রসঙ্গে আরেকটা জায়গা থেকে বের আমরা বের হয়ে আসছিলাম। সেদিন অবশ্য তিনজন ছিলাম। আমি, ব্রাত্য রাইসু আর নাসিফ আমিন।

 

৭. গ্যাংস্টার’জ প্যারাডাইজ

এইটা মনে হয় ২০১৩ সালের ঘটনা। কোনো এক শুক্রবার। আমি কম্পিউটার গেমস নিয়া কথা তুলছি। বললাম, সাইটে (shamprotik.com) তো গেমস নিয়া লেখা থাকা দরকার।

রাইসু ভাই বললেন, হ্যাঁ, দরকার তো। আমরা গেমস এর ক্যাটেগরি রাখব। নতুন গেমস কী কী আছে?

আমি বললাম, জিটিএ-ফাইভ আসছে।

উনি বললেন, এইটা নিয়া তো একটা লেখা দেওয়া দরকার। কে লেখতে পারবে। কম্পিউটার গেমস নিয়া কেউ তো আপনার চাইতে ভালো লেখতে পারবে না, আপনি লেখবেন জিটিএ-ফাইভ নিয়া?

আমি বললাম, তা না হয় লেখলাম।

তখন জিটিএ-ফাইভ কম্পিউটার ভার্সন কেবল নামছে। গেমস নিয়া একটু ইনটেনসড আলোচনা হওয়ার কারণে আমার গেমস খেলার পুরাতন নেশা একটু একটু জীবিত হইতে চাইতেছে তখন। আমি বললাম, আমি তো জিটিএ-ফাইভ এখনো দেখিই নাই। কোনো আইডিয়া নাই। আমার তো গেমসটা একটু দেখতে হবে।

রাইসু ভাই প্রবল উৎসাহের সাথে বইলা উঠলেন, জিটিএ-ফাইভ তো আমাদের খেলাই উচিৎ।

আমি বললাম, ডেফিনেটলি। আমি পরিচিত একটা দোকানে ফোন করলাম ডিভিডির জন্য। রাইসু ভাই একজনরে বললেন আসার পথে ওই দোকানে যাইয়া জিটিএ-ফাইভের ডিভিডি নিয়ে আসার জন্য।

দুই-তিন ঘণ্টা পরে জিটিএ-ফাইভের ডিভিডি আসল। রাইসু ভাই বললেন, বস, গেমস পরে। অন্য কাজের প্রায়োরিটি বেশি। এই কাজ শেষ হইলে পরে গেমস নিয়া বসেন। ডিভিডি ড্রয়ারে রাইখা দেন, নাইলে ওইদিকে আপনার মনোযোগ চইলা যাবে। আমি আমার উত্তেজনা কিছুক্ষণের জন্য চাপা দিলাম।

গেমসের সাথে আমার আর দেখা হইল না সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় বাসায় আসার সময় আমি গেমসটা নেওয়ার আগেই রাইসু ভাই বললেন, আমার কথা শোনেন, গেমসটা নিয়েন না। নাইলে আপনে সারারাত গেমস খেলবেন। কাল তো শনিবার, এইখানে তো আসবেনই, তখন ইনস্টল কইরেন।

আমিও ভাবলাম, গেমসটা নিলে রাতে আর পড়াশুনা হবে না। আমি জিটিএ-ফাইভ রাইখাই চইলা আসলাম।

পরেরদিন শনিবার। আমার ক্লাস নাই। সকালে গেলাম। অনেকক্ষণ পরে সেকেন্ড কম্পিউটার অন করে দেখি সেইখানে জিটিএ-ফাইভ ইনস্টল করা। আমি অবাক। আমি রাইসু ভাইরে জিজ্ঞাসা করলাম, জিটিএ-ফাইভ ইনস্টল করল কে ওই পিসিতে। উনি উত্তর দিলেন, খেলার জন্য, আমিই করছিলাম কাল রাতে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, খেলা যাইতেছে?

উনি বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন? উনি বললেন, ভালো আছে, গ্রাফিক্স অনেক উন্নত।

আরেকবার বাইরে গেছি, কী এক প্রসঙ্গে গেমসের কথা উঠছে। তখন মনে হয় আমি টম্ব রাইডার খেলতেছিলাম। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, এখনো গেমস খেলেন?

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, টম্ব রাইডার খেলছেন আগে কখনো?

উনি বললেন, না। আমার গেমস খেলা এজ অব এম্পায়ার পর্যন্ত।

একবার রাইসু ভাই সাথে ছিলেন। প্রিন্স অব পার্শিয়া সিনেমার পোস্টার দেইখা বললাম, এইটা আমার খুব প্রিয় একটা গেমস।

উনি বললেন, ভালো লাগে নাই।

আমি অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি খেলছেন প্রিন্স অব পার্শিয়া?

উনি বললেন, খেলতে নিছিলাম অনেক আগে, ভালো লাগে নাই। লাফাইয়া লাফাইয়া এক জায়গা থিকা আরেক জায়গায় যাইতে হয়।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু—আমার ব্রা-রা

ব্রাত্য রাইসুকে আমি চিনতাম না আগে। আসলে বিপণনকৃতদের বাইরে কোনো কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদককেই চিনতাম না। রাইসুও  যে বিশ্ববিদ্যালয়-পাশ হাবাগোবাদের বিশেষ চিনতে আগ্রহী ছিল তাও মনে হয় না। বিশেষ করে তথাকথিত ভাল রেজাল্টওয়ালাদের। তথাপি ১৯৯২ সালে রাইসু ও আমি বিরল এক উপায়ে সহকর্মী ছিলাম অল্প কিছুদিন, এবং খুব জটিল উপায়ে। এই যে এই ঘটনাটি রাইসুর সম্ভবত মনেই নাই, আর আমি যে যাকে বলে ‘হৃদয়ের মণিকোঠায় যতন করে রেখেছি’ এটাই রাইসুর মত চৌম্বক-ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার মত বস্তুরাজিসম মানুষদের পার্থক্য।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তখন ‘এই সময়’ নামের একটি সাপ্তাহিক সম্পাদনা করেন। আমি সেখানে পাশ করার পর নিতান্ত ফুটোকড়িহীন অবস্থাতেও বিনি-বেতনে যোগ দিই। অধ্যাপক চৌধুরীর পত্রিকার তখন বা এখন এমনই শান, বেতন ছাড়াও লোকের জান-কুরবান। আমি রাজনৈতিক থেকে ক্রিকেটিয় কলাম লেখক হবার বাসনাকাতর। আর ‘এই সময়’ তখন সকলকে বেতন দিতে অপারগ। আমরা উভয়পক্ষ খুশিমনেই যুক্ত।

মানস চৌধুরী

যাহোক, কোনো এক সন্ধ্যায় এলিফেন্ট রোডের অফিসের সামনের শানবাঁধানো জায়গায় সিগ্রেট খেতে খেতে আবিষ্কার করলাম এই মুহূর্তে সুদর্শন যে যুবকটি সকলের সঙ্গে সারামুখ হাসিময় কথা বলছেন তিনি কেবল বেতনভুকই নন, বরং প্রায় সকলের আগ্রহভাজন, মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। কথা বলছেন বললাম বটে, তিনি মুখ্যত কথা ছিটাচ্ছিলেন, আর আমাদের থেকে মুরুব্বিরা, সিগ্রেট খেতে খেতেই, সেসব ছিটানো কথা থেকে টুকরো টুকরো কথা কুড়িয়ে নিচ্ছেন। সীবীচে যেভাবে কিছু ঝিনুক আকর্ষণীয় বিবেচনা করে লোকজন কুড়িয়ে থাকেন আর কি! এই সুদর্শন যুবকটি ছিলেন ব্রাত্য রাইসু। এখনও আছেন।

আমার প্রায় নিশ্চিত মনে পড়ে ওই আড্ডায় একমাত্র সিগ্রেটহীন লোকটি ছিল রাইসু। আর একমাত্র গৌণ মিঁউ মিঁউ লোকটি ছিলাম আমি। তা যদি কিছু সন্দেহ থেকে থাকে, অন্তত রাইসুর মনোজগতে সবচেয়ে কম গুরুত্বের লোকটি ছিলাম আমি। বিশ্বাস না হয় আপনারা ওকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। ও মনেই করতে পারবে না।

‘এই সময়’ আমার জন্য দীর্ঘ সময় বয়ে আনে নি, স্বল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। টাকাপয়সার টানাটানিতে কলামলেখক হবার স্বপ্ন দুরূহ কেবল তাই নয়, আরও কারণ ছিল। তার মধ্যে পত্রিকার সেকেলে সম্পাদকীয় অনুশীলন একটা অন্যতম কারণ। কলম দিয়ে কেটে-কেটে লেখার মেরামতি, আমার লেখা হোক বা আর কারো, হজম করার মতো মাথা আমার ছিল না, তা আমি কাগজে কলমে যতই সিস্টেমের ভাল রেজাল্টধারী হই না কেন। যা হোক পরিশেষে অধ্যাপক চৌধুরীর অমিত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যলাভ আর দারিদ্র্যের মধ্যে শেষোক্তটি বিজয়ী হলে আমি আর ওই পত্রিকায় যাই না, লিখি না। কিন্তু অনেকদিন আমার এই কৌতূহল যায় নি যে কীভাবে এত সনাতনী পদ্ধতির (কনটেন্ট নয়, কার্যরীতি) একটা পত্রিকা ও তাঁর সম্পাদক রাইসুকে এত মুখ্য গুরুত্ব দিয়ে সেবন করে থাকেন।

পরের বছরগুলোতে নিজের প্রচেষ্টায় আমি আবিষ্কার করেছিলাম প্রকাশনা ও তদীয় ব্যবস্থাপনায় রাইসু প্রায় রত্ন একটা। ওর রচয়িতাগুণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যকে স্বতন্ত্র রেখেই বলছি। অল্প সময়েই আমি ঢাকার কথিত ছোটকাগজ ও তার উৎপাদন সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ জ্ঞানগম্যি লাভও করেছিলাম বটে।

আমার কিছু স্বভাবের/অভ্যাসের (এই দুয়ের সম্পর্ক নিয়ে আপনাদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ লাগতে পারে) কারণে রাইসুকে আমার অনায়াসে অপছন্দ করতে পারার কথা ছিল। ঈর্ষার কথা বলছি না, বরং বলছি বিদ্বেষ বা ঘৃণা, হুম অপছন্দই নম্রার্থে। কিন্তু আমার মনে পড়ে অত অনায়াসে আমি তা করতে পারি নাই। বরং, লোকটাকে নিয়ে আমার কৌতূহল জাগরুক হয়েছিল। এত বছর পর মনে হয় সেটার কারণ আমি অনায়াসে বলতে পারি। চলতি ভাষায় সহজ করে বললে একে বলে বাকস্ফূর্তি। কিন্তু আমি আরেকটু ঘন করে বলব যে ওর বলার সাবলীলতার পাশাপাশি অনায়াসে প্রচলিত ক্যাটেগরি ও প্রিমাইজ (বর্গ ও অনুকল্প) ভাংচুর হতে থাকে। সেটা আমাকে কৌতূহলী ও আকর্ষিত করেছে যুগপৎ।

নিজের রুটিরুজি, ঢাকা শহরে টিঁকে থাকার দুর্নিবার সংগ্রাম, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কামারা বেয়াদব সাব্যস্ত হবার হকিকত নিয়ে পরের বছরগুলোতে লোকটাকে আর দেখা হয় নাই। আরও একটা গুরুতর কারণ আছে। কোনো না কোনো কারণে সাহিত্য-শিল্প-ললিত-কারু-বৌদ্ধিক ইত্যাকার চক্রসমূহে আমার কখনোই আরাম না-লাগা। উত্তরকালে আমি আবিষ্কার করেছি রাইসুও বিশেষ আরাম পায় না। অন্তত তাই মনে হয়েছে আমার। তবে পার্থক্য হলো ও ‘দাবিনামা’সমেত সে সবে থাকে, বা বিরাজ করে। আমি সশরীর হাজির হতেই অনীহ। আমাদের দেখা হয় নাই। হতোও যদি রাইসু আমাকে বিশেষ মনে রাখত বলে আমি ভরসা পাই না। যাক গে!

১৯৯৭/৯৮/৯৯ বা ২০০০/২০০১ এর কোনো এক বইমেলায় রাইসুর পিছনে আমি ছিলাম ভিড়ে। ও আমাকে দেখে নাই, বা দেখলেও ওর কিছু আসে যায় না ধরনের আমি তখন। দুই সদ্যস্নাতক সাংবাদিক ওর পিছু নিয়ে মাইক্রোফোন হাতে ওর একটা সাক্ষাৎকার নিতে চেষ্টা করছেন। মিনি-সাক্ষাৎকার। বুঝলাম ইন্টারনেট তিনি কেন ব্যবহার করেন, নেটের কী উপকারিতা এ রকম জিজ্ঞাসাকে সামনে রেখে। বলাই বাহুল্য, ইন্টারনেট তখনো দুর্লভ এবং রাইসু বরাবর প্রথম জমানার প্রকৌশল ব্যবহারকারী, নেটেরও। অম্লান বদনে রাইসু যখন একগাল হেসে, চুল নাড়িয়ে বলল “নেটে আমি পর্ন দেখি” তখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে এই বচন হজম করা দুরূহ লাগল। আমার যদি লেগে থাকে, ওই সাংবাদিক যুগলের এতটুকু কম লাগে নি আমি নিশ্চিত। ওরা প্রশ্ন পুনরায় বললেন। এটাই একমাত্র কারণ কিনা জানতে চাইলেন। রাইসু হাসিসমেত এবং ছাড়া দৃঢ়তার সঙ্গে জানান দিলেন এটাই কারণ। এই লোককে আপনি উপেক্ষা করতে পারবেন না।

রাইসুর সঙ্গে একটা কার্যকরী পেশাদার যোগাযোগ হয় আমার ২০০১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান হামলার কালে। বইমেলার ঘটনা তার তাহলে আগেই হয়েছে। আমি ইমেইল ব্যবহার করি তখন, এবং বিস্ময়করভাবে একটা ল্যান্ডলাইন ফোনও আমার আছে তখন, আমার একমাত্র সম্পত্তি ওই সময়ে। রাইসু আমার একটা অনুবাদ প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় ছেপেছিলেন। তালিবানপন্থী বলে কথিত ওই রচনা প্রকাশনার কারণে আমার তো বটেই, আমার ধারণা রাইসুরও ব্যাপক হুজ্জত পোহাতে হয়েছে। রাইসু কখনোই ওর হুজ্জত আমাকে বলতে যায় নাই। সম্পাদক রাইসু বরাবরই তাই ছাপেন যা তাঁর জরুরি মনে হয়। এই সরল সাহস (আর কোনো শব্দের অভাবে বললাম, হয়তো এটা অন্য একটা পরিস্থিতিতে সাধারণ পেশাদারিত্ব হতে পারত) রাইসুকে ক্রমাগত আকর্ষণীয় করেছে আমার কাছে।

ব্রাত্য রাইসুকে নিয়ে কয়েক হাজার শব্দ লিখতে পারলে আরাম পেতাম আমি। কিন্তু মুস্কিল হলো কোনো কিছুই আমার লেখা হয়ে ওঠে না। কোনো একদিন হাজার হাজার শব্দ লিখে ফেলা হবে এই ভরসায় আজকের এটুকু না লেখার মূর্খতা করতে আমি রাজি নই। আমি সেদিন একটা ফেসবুক কমেন্টে লিখেছিলাম: “রাইসু আমাদের সমকালীন সাহিত্য-শিল্প আত্মার প্রায় একমাত্র নির্মোহ আয়না। ও সামনে থাকলে আমরা যে যা তা বুঝে ফেলি।” কথাটা একটা পরিস্থিতিতে বলা। কিন্তু কথাটা পুনর্বার বলতে আমি পারি। সমকালীন শিল্প-সাহিত্যে এমন নন-প্রিজুডিসড, এমন শব্দখেলুড়ে, এমন মুডভাঙানি, ক্যাটেগরি ও প্রিমাইজের এমন বারোটা-বাজানোদার থাকায় আমি আনন্দ বোধ করি কেবল তাই নয়, আমি ভরসা বোধ করি। মৈত্রী বোধহয় একে বলা যায়।

আদাবর, ১০ নভেম্বর ২০১৭

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুর লগে যা যা হৈছে

রাইসুরে নিয়া লেখতে বসছি, রাইসুর ভাষায়ই লেখি। এই ভাষায় যে আমার লেখতে ইচ্ছা হয় না তা কিন্তু না। তবে আমি মনে করি লেখকের দায়িত্ব হৈল শুদ্ধ ভাষা শেখানো, তাই আমি প্রমিত বাংলার চর্চা করি।

সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি। আমি তখন বাড্ডায় থাকি, উত্তর বাড্ডায়। রাইসুরা থাকত পূর্ব বাড্ডায়, পোস্টঅফিস গলির দিকে কোথাও। আমি কখনো রাইসুদের বাড়িতে যাই নাই, রাইসুও আমাদের বাড়িতে যায় নাই।

রাইসুর সঙ্গে আমার দেখা হয় কামরুজ (এডভোকেট সাইদুর রহমান কামরুজ) ভাইয়ের বাসায়। কথিত আছে, মুক্তিযুদ্ধের পরে কামরুজ ভাই এক কাঁধে অস্ত্র আর অন্য কাঁধে বুলবুলি ভাবিকে তাদের বাড়ি থেকে তুলে আনেন। সত্তরের দশকে কামরুজ ভাইকে বাড্ডার লোকেরা সমীহ করত, আশির দশকে দেখেছি তাকে সবাই ভালোবাসে, এই ভালোবাসায় কোনো ভীতিজনিত কারণ ছিল না। বুলবুলি ভাবির ছোটো ভাই রব্বানী রাইসুর বন্ধু ছিল। ওরা আমার চেয়ে এক বা দুই ক্লাস নিচে পড়ত। প্রথম দিনই রাইসু আমারে ‘তুমি’ কৈরা বলে।

কাজী জহিরুল ইসলাম

আমি তখন কলেজে পড়ি, ওরা মেট্রিক পরীক্ষা দিবে বা এই রকম কিছু। বুলবুলি ভাবি সাথে সাথে রাইসুরে সতর্ক করে দিয়ে বলে, বাদল (আমার ডাক নাম) তোমার সিনিয়র না? ‘আপনে’ কৈরা কইবা। রাইসু তার সেই লোকভোলানো হাসি দিয়া কয়, ‘তুমি’ ঠিকই আছে।

আমি ছোটোবেলা থেকেই সব মেনে নেই, রাইসুর ‘তুমি’ও মেনে নিলাম। আমরা তখন বাড্ডায় একটি সাহিত্য সংগঠন করতাম, কবি জসীম উদদীন পরিষদ। রাইসুরে বলি, তুমি আমাদের সভায় আসো। রাইসু আসে। কিন্তু ওইসবে রাইসুর পোষায় না। রব্বানীর সাথে কিন্তু আমার কোনো বন্ধুত্ব হয় নাই, রাইসুর সাথে কিছুটা হৈছিল। বন্ধুত্ব হওয়ার পেছনে কিছু একটা কারণ তো আছেই, দুইজনই লেখালেখি করি এইটা একটা কারণ হৈতে পারে।

একদিন আমি আর রাইসু হাঁটতে হাঁটতে রামপুরা ব্রিজে যাই। তখন সন্ধ্যা। ব্রিজের রেলিঙয়ে অনেকক্ষণ বৈসা থাকি। আমি তখন একটা দীর্ঘ কবিতা (তখনও লেখা শেষ হয় নাই) লেখতেছিলাম। যেইটুকু লেখছি তা পৈড়া শোনাই। রাইসু বলে ভালো হয় নাই। তবে “খেলা করে বিশ্রামরত মস্তিস্কটা নিয়ে” এই লাইনটা খুব ভালো হৈছে।

আমি রাগ করি নাই। আমার লেখা কেউ ভালো বললে খুশি হৈতাম কিন্তু মন্দ বললে রাগ করতাম না। রাইসু আমারে বলে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ কী, এইটা আমারে শিখাও। আমি জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইনকে বিশ্লেষণ করে ওকে অক্ষরবৃত্তের পর্ববিন্যাস শিখাই। আমার মনে হৈল রাইসু ছন্দটা ঠিক ধরতে পারে নাই। নিজেরে ব্যর্থ শিক্ষক মনে হৈল।

এর কিছুদিন পরে একদিন রাইসু আমারে কয়, আবদুল মান্নান সৈয়দ অনেক বড় কবি। পরাবাস্তব কবিতা লেখছে। তাঁর সাথে দেখা করন লাগব। চলো তাঁর লগে দেখা করতে যাই।

আমি কই, তারে কই পামু?

রাইসু কয়, ঠিকানা আছে। গ্রীন রোডে থাকে।

আমরা গুলশান এক নম্বর গোল চক্কর থাইকা ছয় নম্বর বাসে চৈড়া ফার্মগেইট যাই। সম্ভবত বাস ভাড়া আমি দিছিলাম (আমার ভুলও হৈতে পারে)।

আমরা মান্নান ভাইয়ের গ্রীন রোডের বাসায় যাই। অনেকক্ষণ দরজার বেল বাজাই, কড়া নাড়ি। এক লোক বাইর হৈয়া আসে। যতদূর মনে পড়ে বুড়া লোক।

কাকে চাই?

আবদুল মান্নান সৈয়দকে চাই।

তিনি নাই।

নাই কেন?

বাইরে গেছে।

কই গেছে?

খাড়ান।

বুড়া লোক দরোজা বন্ধ কৈরা ভিতরে যায়। অনেকক্ষণ পরে আবার আসে। শিল্পতরু অফিসে গেছে, ঐখানে পাইবেন।

আমরা ঐখানে যাই। গ্রীন রোড থেকে ভূতের গলি বা কাঁঠালবাগান (কোনো কাঁঠালগাছ চোখে পড়ে নাই) দিয়া হাঁটতে হাঁটতে শিল্পতরু অফিসে যাই। গিয়া দেখি মান্নান ভাই নাই। আমরা আবার হাঁটতে হাঁটতে মান্নান ভাইয়ের বাসায় আসি। দরজা খোলে বুড়া লোক।

আমরা বুড়া লোকরে বলি, ওইখানে নাই।

তাইলে ঐন্যখানে গেছে।

কই গেছে?

কই গেছে জানি না।

কখন আসবে?

রাত দশটার পরে আসবে। দশটার পরে আইসেন।

আমরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসি। গ্রীন রোডে ঘোরাঘুরি করি। আমার মনে হৈছিল মান্নান ভাই ভেতরেই ছিলেন, দেখা করতে চান নাই। আমাদের খিদা লাগে। রেস্টুরেন্টে গিয়া পুরি সিঙ্গারা খাওয়া যায় কিন্তু আমাদের পকেটে যথেষ্ট পয়সা নাই।

আমি বলি, রাইসু চলো ফিরা যাই।

রাইসু কয়, না ফিরা যাওয়া যাবে না। মান্নান সৈয়দের সাথে দেখা করতেই হবে।

রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করি।

আমি বলি, আমার টায়ার্ড লাগতেছে।

রাইসু বলে, চলো আমার মামার (বা খালার, এখন ঠিক মনে পড়ছে না) বাসায় যাই, কাছেই। ওইখানে গেলে খাওয়াবে।

আমি বলি, না অচেনা বাসায় যামু না। তুমি থাকো, আমি গেলাম। (পরে জেনেছি ওইদিন আবদুল মান্নান সৈয়দের সাথে রাইসুর দেখা হয় নাই। নব্বুইয়ের দশকের শেষের দিকে একদিন সাপ্তাহিক পূর্ণিমা পত্রিকার অফিসে বৈসা মান্নান ভাইরে এই গল্প কৈছিলাম। খুব মজা পাইছিল। মান্নান ভাই কয়, তাই নাকি? রাইসু তো কোনোদিন এটা বলে নি?)

আমি রাইসুকে ছেড়ে চলে আসি।

আমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়ি। টিউশনি করি। ছোট ছোট ভাইবোন আছে। তাদের ভবিষ্যৎ আমার ওপর। এলোমেলো জীবন আমারে দিয়া হবে না। আমি রাইসুরে ছাড়লাম।

অল্প কয়দিনের আড্ডায়/ঘোরাঘুরিতে বুঝলাম, রাইসু ভিন্ন মাল। ওর সাথে আমার পোষাবে না। সে বলে শিল্পের জন্য শিল্প। কবিতা দিয়ে মানুষের কোনো কল্যাণ হবে না। কবিতায় থাকবে শিল্প।

আমি বলি, কবিতা জীবনের জন্য। সবকিছুই মানুষের জন্য। মানুষের কামে না লাগলে সবই অর্থহীন।

আমরা দুই মেরুর মানুষ।

একদিন দেখি রাইসুর হাতে কিছু কাগজপত্র। বোধ হয় একটি পত্রিকা বেইর করার প্রস্তুতি। সেইসব কাগজে লেখার চেয়ে আঁকিবুঁকি বেশি। রাইসুর নিজের হাতে আঁকা। ছবিগুলি বিমূর্ত এবং অপ্রচলিত।

অনেক বছর পরে, ১৯৯৫ সালের ২১ জানুয়ারি আমি একটি কবিতা লেখি, “তুমি দক্ষিণে আমি উত্তরে”। কবিতাটা আমি রাইসুকে উৎসর্গ করি।  তোফায়েল পারভেজ বলে এক তরুণ ছিল বাড্ডায়। সে নিয়মিত কবি জসীম উদদীন পরিষদে আসত। সব বিষয়ে তার খুব উচ্ছ্বাস ছিল। সে যখন মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কোনো একটা চাল বুঝে ফেলল, সে কী উত্তেজনা তার। “তুমি দক্ষিণে আমি উত্তরে” কবিতাটি আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পুরুষ পৃথিবী’তে ছাপা হয়। তোফায়েল একদিন আমাকে বলে, “আমি রাইসুকে এই কবিতা দেখাইলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কাজী জহিরুল ইসলাম কি আপনার বন্ধু? রাইসু বললেন, জহির বিখ্যাত হওয়ার লাইগা আমারে বন্ধু কয়। সে আমার বন্ধু না।”

আমি এই কথা রাইসুকে কোনোদিন জিজ্ঞেস করি নাই। কবিতাটি এইখানে দিতেছি:

তুমি দক্ষিণে আমি উত্তরে

তুমি আমি কত কাছাকাছি।

একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু আমাদের

তুমি শিল্পের উপকরণ খুঁজতে দক্ষিণে প্রসারিত করো যাত্রাপথ

আমি জীবনের সন্ধানে এগোই উত্তরে

পরস্পর এই বিপরীতমুখী যাত্রায় কে কতটা এগিয়ে

সে হিসেব সময়ের কাছে সমর্পিত

তোমার সামনে অবারিত সমুদ্র

শুভ্র ঢেউয়ের ভাঁজে খুঁজে ফেরো শিল্পের উপকরণ

আমি অরণ্য সঙ্কুল পর্বতে দাঁড়িয়ে

ফলবতী বৃক্ষের কাছে প্রার্থনা করি সোনালি জীবন

আমাদের মাঝখানে দুই যৌবন দূরত্ব।

অথচ এক সময় আমার পিঠ ছিল তোমার পিঠের ওপর।

আবার আমরা মিলিত হবো

তুমি সমুদ্র পেরুলেই

আমি অরণ্য পেরুলেই

উল্টো পৃথিবীতে আমরা মুখোমুখি দাঁড়াবো।

বাড্ডা, ঢাকা, ২১ জানুয়ারি ১৯৯৫

ইয়াহুতে রাইসু ‘কবিসভা’ নামে একটা গ্রুপ করেছিল। ২০০৪-০৫ সালের কথা। সেই গ্রুপে আমি নিয়মিত ‘উড়ালগদ্য’ লিখতাম। ‘উড়ালগদ্য’ ছোট ছোট ভ্রমণ রচনা। তখন আমি আইভরিকোস্টে কাজ করি। আমার মনে হয় নাই, আমারে বন্ধু পরিচয় দিতে রাইসুর কোনো সমস্যা আছে।

একদিন রাইসু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার কবিতা কই? (মানে তাকে যেইটা উৎসর্গ করছিলাম)। কবিসভা থেকে আমার লেখাগুলো নিয়ে ঢাকার অনেক দৈনিক/সাপ্তাহিক কাগজ ছাপত। প্রথম আলোর ‘ছুটির দিনে’ বিভাগে অনেকগুলো লেখা ছাপে। এভাবেই ছুটির দিনের সাথে আমার যোগাযোগ হয় এবং অনেক দিন লিখি ওই বিভাগে। ছুটির দিনে দেখত তখন ইকবাল হোসাইন চৌধুরী। পরে ইকবাল আমার নিকেতনের ফ্লাট ভাড়া নেয়, পাঁচ বছর ছিল সেই ফ্লাটে। কবিসভা গ্রুপ থেকে নিয়ে আমার কিছু কবিতাও নানান জায়গায় ছেপেছিল অনেকে। এর মধ্যে ‘হাটুনাথ রায়’ নামের একটি কবিতা জনকণ্ঠের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। এইগুলি আমি জানতাম না, পরে কেউ কেউ স্ক্যান করে আমাকে পাঠাইছিল। একবার ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটিতে ঢাকায় যাই। বইমেলায় যাই। দেখা হয় আহমাদ মাযহারের সাথে। এর আগে তাঁর সাথে আমার পরিচয় ছিল না। আমিই ‘উড়াল গদ্য’র লেখক কাজী জহিরুল ইসলাম, এইটা জানতে পেরে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। রাইসুর ‘কবিসভা’ গ্রুপ আমারে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

রাইসু যখন ‘দৈনিক বাংলাবাজার’ পত্রিকায় কাজ করত তখন আমার একটি গল্প ছাপে। গল্পের নাম ‘তিনি আসবেন’। গল্পটা আমি রাইসুকে দেই নাই। দিছিলাম নাসরীন জাহানকে। তখন বাংলাবাজারের অফিস ছিল গ্রীন রোডে। নাসরীন জাহান ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। রাইসু যখন লেখাটি ছাপে তখন ‘বাংলাবাজার’ তেজগাঁয়ে। রাইসু তখন সাহিত্য সম্পাদক। অথবা নির্মলেন্দু গুণ সাহিত্য সম্পাদক। রাইসু তাঁর সহকারী। অথবা দুইজনই যৌথভাবে সাহিত্য সম্পাদক। কে কোন পদে আছে, এইসব তখন আমি খুব কম বুঝতাম।

ছুটিতে ঢাকায় এলে রাইসুর সঙ্গে দেখা হয়। সম্ভবত ২০০৭ সাল হবে। রাইসু তখন কাজ করে ‘দৈনিক যায়যায়দিন’ পত্রিকায়। আমি একদিন দেখা করতে যাই তেজগাঁর অফিসে।  রাইসু আমাকে শফিক রেহমানের সাথে পরিচয় করায়া দিতে চাইল। যারা বিদেশে থাকে স্যার তাদের খুব পছন্দ করে। রাইসুর মুখে ‘স্যার’ কথাটা কেমন বেমানান লাগল। আমরা গেলাম শফিক রেহমানের ঘরে। তিনি তখন ছিলেন না। পরের দিন রাইসু তার দলবল নিয়া আমার বাসায় আসে। নিকেতনের বাসায়। শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীও ছিলেন সেই দলে। আমার মদের বোতলগুলি ওরা উজাড় করে। অনেক লম্বা সময় ধৈরা আড্ডা হয়। আমার ধারণা রাইসু তখন মার্ক্সবাদ খুব মন দিয়া পড়তেছিল। ওর কথায় মার্ক্সবাদি অনেক বিষয় আসছিল।

লক্ষ করতেছিলাম রাইসুর মধ্যে গুরু গুরু একটা ভাব আসছে। সে সব তর্কের একটা কনক্লুশন দিতে চায়। যেন চূড়ান্ত জ্ঞান কেবল তারই দখলে। অন্যকে তুচ্ছ করার মৃদু প্রচেষ্টাও লক্ষ করেছি।

রাইসু আমার বই চাইল, আমি দিলাম। সে তাঁর একটা বই দিল আমারে। ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’।  আমি তার বইটা পড়ছি। ভালো এবং মন্দ দুইটাই লাগছে।  তার ভাষায় আমার আপত্তি নাই, কিন্তু অশ্লীল ইমেজের অশ্লীল প্রকাশ আমি নিতে পারি নাই।

রাইসুরে আমি পছন্দ করি। পছন্দ করি এজন্য যে সে সত্য অকপটে বলতে পারে। কী পামু আর কী হারামু এই ডর রাইসুর নাই। রাইসুর সাথে তাই মন খুইলা কথা বলা যায়। গালিও দেওয়া যায়।

এই বিষয়টা আমি সব সময় রাইসুর কাছ থিকা শেখার চেষ্টা করি। সম্প্রতি এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে রাইসু কৈছে, আমার ঘৃণা নাই। আমি কাউরে ঘৃণা করি না। এইটা আমারও কথা। আমি মনে করি রাইসুর সাথে আমার এইটা একটা গ্রেট মিল। এই মিলের কারণে রাইসু আমার আজীবনের বন্ধু হৈতে পারে।

৫০ পূর্তিতে রাইসুরে শুভেচ্ছা জানাই।

নিউ ইয়র্ক, ৬ নভেম্বর ২০১৭

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

কুইন্টিসেনশাল রাইসু

১৯৯৪ সালের গোড়ার দিকে একটা জিনিস আমি মনে মনে বুঝে নিয়েছিলাম: সাহিত্য করতে হলে সাহিত্যসমাজের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেই তরুণদের সঙ্গে, যারা নতুন ধরনের সাহিত্য তৈরির চেষ্টা করছে। আমার জন্যে সেটা খুব কঠিন ছিল।

আমি তখন চারুকলা ইনস্টিটিউটে (এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হয়েছি। থাকি জগন্নাথ হলে। বৃহত্তর সাহিত্য সমাজের সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। সেই যোগসূত্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে একদিন সন্ধ্যারাতে আমি যখন উপযাচিত হয়ে এগিয়ে গেলাম শাহবাগের আজিজ মার্কেটে সন্দেশের বইয়ের দোকানের সামনে ফুটপাতে আড্ডারত কয়েকজন তরুণের দিকে, তখন ওই তরুণদের একজন ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে।

শিবব্রত বর্মন

রাইসুর তখন কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল। ফুলহাতা শার্টের হাতা এলোমেলো গোটানো। এই ব্যাপারটা আমার বিশেষভাবে চোখে পড়েছিল। শার্টের হাতা ওইভাবে কাউকে কখনও গোটাতে দেখিনি আমি। পায়ে স্পঞ্জের চপ্পল। প্যান্টের নিচটা গোটানো। এই বেশভূশার সঙ্গে একেবারেই বেমানান ছিল তার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতপ্রীতি। থেকে থেকেই সে কুমার গন্ধর্বের কোনো একটা কলি উচ্চৈস্বরে গেয়ে উঠতো। মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হতো ওই সময়ের জনপ্রিয় হিন্দি গানের কলি “লোয়ে লোয়ে আজা আজা মারি।” আমার চোখে এরকম একজন তরুণ ছিল টোটালি আনপ্রেডিকটেবল। ওইদিন একগাদা বই হাতে দাঁড়ানো আমাকে উদ্দেশ করে রাইসু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনে কী পড়েন?’

আজিজ মার্কেট রেগুলারদের মধ্যে রাইসুর সঙ্গে দ্রুতই আমার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। এটা একটু অসম বন্ধুত্বই ছিল বটে। কেননা, শাহবাগে ওইসময় তরুণদের মধ্যে লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার যে স্পন্দন ছিল, তার কোনোকিছু তখনও আমার মধ্যে তৈরি হয় নি। আমার সাহিত্যরুচি তখন দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রশাসিত। রাইসু আমার ঠিক বিপরীত। সে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমি বলব, ওইসময় ওই বর্গের মধ্যে রাইসুই ছিল সর্বান্তকরণে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমার পরিচিতজনদের মধ্যে সে-ই একমাত্র ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করতে গিয়ে যে কোনো সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা করে নি। আর বিশেষ করে মানুষে মানুষে দৈনন্দিন সম্পর্ক তৈরিতে ক্ষমতাকাঠামোর যে ছায়া পড়ে, তা পরিহারে সে বিশেষভাবে যত্নবান ছিল। এর একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটতো বয়স নির্বিশেষে এক প্রজন্মের সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করার মধ্যে। বয়সে আমি তার চেয়ে বছর পাঁচেক ছোট হলেও সে আমাকে আপনি করে বলে।

রাইসুর সঙ্গে টই টই করে রিকশায় ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ানো আমার নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। মাঝে মাঝে আমি সকালবেলা বাসে করে রাইসুর মধ্যবাড্ডার বাসায় চলে যাই। সেখানে তার নতুন কেনা ঢাউস সাইজের গান শোনার যন্ত্রে আমরা খানিকক্ষণ মল্লিকার্জুন মনসুর বা ওঙ্কারনাথ শুনে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি গুলশানের দিকে। তখন ঢাকা শহরে ভিআইপি রোড বলে কিছুই ছিল না। আমরা রিকশায় করে যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। মাঝে মাঝে রাইসু আমার জগন্নাথ হলের রুমে এসে হাজির হতো। দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা ছেড়ে আমি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। আবার কখনও কখনও সে চারুকলায় গিয়ে আমাকে ক্লাসরুম থেকে বের করে আনতো। কত কত লোকজনের বাসায় যে রাইসু যেত। শান্তিনগরে মঈন চৌধুরীর বাসা, রাজারবাগে তীব্র আলীদের বাসা, বাংলা মোটরে আহমদ ছফার বাসা ইত্যাদি। মনে পড়ে রাইসুর সঙ্গে একবার হুমায়ুন আহমেদের এলিফেন্ট রোডের বাসাতেও গিয়েছিলাম। কেন যাওয়া হয়েছিল, এখন আর মনে পড়ছে না।

ওই সময় আমাদের যাওয়ার আরেকটা জায়গা ছিল গ্যাটে ইনস্টিটিউট। ফিল্ম সোসাইটিগুলি তখন দারুণ সক্রিয় ছিল। তারা নিয়মিত ছবি দেখাতো। ফেলিনি, ত্রুফো, গদারের ছবি দেখে গ্যাটে ইনস্টিটিটিউটের ছাদে চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে অভ্যাগতরা ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ঘরানা ও প্রবণতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতেন। সেই পরিবেশে রাইসুর উপস্থিতির সঙ্গে আমি মিল খুঁজে পেতাম দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে উপন্যাসের লর্ড হেনরি চরিত্রটির। লর্ড হেনরি লন্ডন শহরের ভিক্টোরিয়ান কালচারকে কটাক্ষ করতেন। রাইসু তার সময়কার কালচারের নির্মম ক্রিটিক করতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কটাক্ষের লক্ষ্যবস্তু হতো যাবতীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং তাদের সাহিত্যতত্ত্ব। সে সময় দেরিদা আর ডিকনস্ট্রাকশন শব্দগুলো আজিজ মার্কেটের করিডোরে খুব ধ্বনিত হতো।

আমার সঙ্গে রাইসুর যখন পরিচয়, তখন রাইসু মঈন চৌধুরী সম্পাদিত লিটল ম্যাগ প্রান্ত-এর দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার জন্য উপকরণ সংগ্রহ করছে। আমাকে সে হাইডেগার অনুবাদ করতে দিলো। আর বললো, গল্প দেন। প্রান্ত ম্যাগাজিনে আমার গল্প ছাপা হয়েছিল। তাতে লিটল ম্যাগাজিনের ওই সময়কার ভাষাভঙ্গির অনেক ছাপ ছিল, বুঝতে পারি।

পরিচয়ের মাসখানেকের মধ্যে আমাকে একবার গ্রামের বাড়ি যেতে হয়েছিল। ট্রেনে যাবো। রাইসুকে বলামাত্র সে বললো সেও যেতে চায়। আমি বাড়িতে চিঠি লিখে দিলাম যে, এবার আমার সঙ্গে ঢাকার একজন কবিবন্ধু থাকবেন। কাজেই বাসাটা যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাফসুতরো দেখায় এবং আমার বন্ধুর অপরিপাটি বেশভূশায় তারা যেন অবাক না হন।

রাইসু আমার সঙ্গে আমার সৈয়দপুরের বাসায় গিয়েছিল। সেবার আমরা নানান জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছি। ডোমার উপজেলায় আমার নানাবাড়িতেও গিয়েছিলাম। তাছাড়া গিয়েছিলাম রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। ঠাকুরগাঁওয়ে সিংরা ফরেস্ট নামে একটি শালবন আছে। সেই বন রাইসুর ভালো লেগে গেল। আমরা কান্তজীর মন্দিরও দেখতে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ে রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পর আমার বাবা রাইসুকে হারমোনিয়াম সহযোগে অনেকগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শুনিয়েছিল। রাইসুও দুয়েকটা গাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এখনও বাবা ঢাকায় এলে জিজ্ঞেস করেন, ব্রাত্য রাইসু কেমন আছে? ও কি ওরকমই আছে? আমি বলি, ওরকমই আছে। বলতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, ২৩-২৪ বছর ধরে একটা লোক সম্পর্কে কত অনায়াসে আমি শব্দটা প্রয়োগ করতে পারছি।

ইত্যবসরে রাইসুর জীবনাচরণে পরিবর্তন খুব অল্পই এসেছে। তফাতের মধ্যে তার চারপাশের ঢাকা শহরটা বদলে গেছে। বদলে গেছে সামাজিক মেলামেশার ধরন। এখন মেলামেশাটা ভার্চুয়াল জগতেই বেশি হয়। রাইসু এই জগতের অতিসক্রিয়দের একজন। তাতে একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন এই হয়েছে যে, রাইসুর পরিচিতি ঢাকার বাইরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর দ্বিতীয়ত এই ভার্চুয়াল জগতে রাইসুর উপস্থিতি একটি লিখিত বা টেক্সুয়াল উপস্থিতি। রাইসু তখনই অস্তিত্বশীল যখন সে কোথাও কোনো দেয়ালে কিছু লিখছে। এই প্রকারে রাইসু একটি সাব-কালচারের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। অনেকে মনে করেন, এই সাব-কালচার মূলত রাইসুর ভাষাভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। আমি বলবো, ব্যাপারটা শুধুই ভাষাভঙ্গির নয়। রাইসুর বক্তব্যের কনটেন্টই এই সাব-কালচারের মূল চালিকাশক্তি। এই কনটেন্টের একটি স্পর্শযোগ্য বস্তুগত রূপ দেখতে পাওয়া যায় কুতর্কের দোকানের মধ্যে। আমি মনে করি, কুইন্টিসেনশাল রাইসুকে খুঁজে পাওয়া যাবে কুতর্কের দোকানের পোস্টগুলোর মধ্যে। এগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার।

মোহম্মদপুর, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

রাইসুনামার কিয়দংশ

আমাদের সাহিত্য ও ফেসবুক-সমাজে ক্রমশ রাইসু একটি কৌতূহল-জাগানো চরিত্র হয়ে উঠেছেন। তবে ফেসবুক-যুগের আগে ও পরে—এই দুই কালপর্বে রাইসুর আত্মপ্রচার এবং চিন্তা ও সত্তার প্রসারণ স্পষ্টত দুই জাতের। তাঁকে অপছন্দ করা চলে, উপেক্ষা বা অস্বীকার নয়। এই নষ্টভ্রষ্টভণ্ড ও কূপমণ্ডুক সমাজে নিঃসন্দেহে রাইসু এক ধরনের বিরল ব্যতিক্রমী ব্যক্তি হিসেবে অস্তিত্বমান। কখনো কখনো তাঁর সত্যোচ্চারণে কেঁপে ওঠে মানব-বামনের প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তি-প্রাসাদ। কখনোবা তাঁকে পায়ে দলে যায় অর্থ-অনীতি। আর প্রায়শ তাঁকে সতর্ক সাগ্রহে এড়িয়ে চলে ‘সামাজিক’ শুদ্ধতা।

মারুফ রায়হান

হুমায়ূন তাঁর সৃষ্ট হিমু চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন রাইসুকে। কে জানে রাইসুকে দেখেই তিনি হিমুকে জন্ম দিয়েছিলেন কিনা। অবশ্য আমার কাছে রাইসু রাইসুই। রাইসুর এক কর্মস্থলে একবার চেহারায় তাঁকে আমার চিত্রকর অ্যালব্রেখট ডুরার বলে মনে হয়েছিল। সামনে ছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। তিনি সায় দিয়েছিলেন আমার কথায়। যদিও এইসব মিলটিল ধর্তব্য নয়। রাইসু এক একক সৃজন। তিনি কারো মতো নন, তাঁকে কোনো গোত্রেও ফেলা যাবে না। এই স্বকীয়তা বা স্বাতন্ত্র্য দুর্লভ। একইসঙ্গে তিনি বিনোদন ও ব্যবচ্ছেদ, বিভা ও নেভা, ব্যক্তি ও ব্যক্তিগত-ঊর্ধ্ব।

রাইসু পঞ্চাশ উদযাপন করছেন কিছুটা স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা-আয়োজনের ফর্মে (প্রয়াত লেখকের ক্ষেত্রে অন্যেরা যেমন করেন আরকি); ঠিক এর আধা দশক আগে এই নভেম্বরেই আমিও ‘হাফ সেঞ্চুরি স্টোন’ ফেলে এসেছি স্বরচিত কুণ্ঠায়। সে যাক। বিচিত্র বিস্তর ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছি বলে দ্রুত কয়েকটি বাক্য লিখে উঠতে চাইছি, যাতে রাত বারোটা এক মিনিটের আগে নিশ্চিতভাবেই তাঁকে এটি পাঠনো যায়।

রাইসুর কবিতা ভাবে-ভাষায়-ভঙ্গিতে কিছু অভিনবত্ব উপহার দিয়েছে। পূর্ববর্তীরা লেখেন নি, দেখেন নি এমন কিছু উপাদান তাঁর ভাণ্ডারে। আমরা মৌলিক বলতে যা বুঝিয়ে থাকি কবিতাবিচারের বেলায়, এমন বিষয়আশয় রাইসুর কবিতায় রয়েছে। জাত কবিরা রাইসুর কবিসত্তাকে অভিনন্দিত না করে পারবেন না। যেমন, জয় (গোস্বামী) ঢাকায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে অনুরোধ করেছিলেন রাইসুর সঙ্গে যেন তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দিই। তখনো পর্যন্ত রাইসুকে তিনি স্বচক্ষে দেখেন নি। রাইসুর বেশ কিছু কবিতার চরণ তখন তাঁর ঠোঁটস্থ।

অনলাইনকে বাংলা কবিতাঙ্গন করে তোলা ও অনলাইনে কবিতার প্রসারে পথিকৃতের মর্যাদা তাঁকে দিতে আমার কার্পণ্য নেই। দেড়-দু’দশক আগে ‘কবিসভা’ ফোরাম তিনি গড়েছিলেন অনলাইনে কবিতা ও কবিতা বিষয়ক আলোচনা শেয়ারের জন্যে। সেটি ছিল অনলাইনের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার। পরে আরো সক্রিয়তা বাড়িয়েছেন তিনি এই আকাশজমিনে। পথিকৃৎ অনেক সময় আর পথিক থাকেন না, এখানেও রাইসু ব্যতিক্রম।

এমন একটি কবিতা-গুমকারী কবিতাকরুণ কালে রাইসুর জীবনের বিশেষ একটি সময় এসে উপস্থিত হয়েছে যখন প্রকৃত কবিসত্তাকে বিবিধ ব্যাধির সংক্রমণমুক্ত রাখা এক জটিল চ্যালেঞ্জ। শুধু এটুকু বলতে চাই, রাইসুকে আমি ভালোবাসি। তাঁর কোনো উপকারে না আসতে পারলেও তিনি ভালো নেই এমন ইংগিত পেলে আমার ভেতরে তাঁর জন্যে এক ধরনের সহমর্মিতা জেগে উঠেছে সবসময়। যদিও ভাবনা আসে—এসব দীর্ঘশ্বাস কি যুগপৎ আমাদের নিয়তি ও অর্জন নয়? আমি রাইসুর সর্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনা করি। আর চাই, যত দিন যত বছর ইচ্ছা তিনি যেন এই মৃতপ্রায় ঢাকা নগরীতে স্বরূপে জারী থাকেন। তাঁর যেন চরিত্রচ্যুতি না ঘটে।

রাইসু, শুভ জন্মদিন। ভালো থেকো।

১৮ নভেম্বর ২০১৭