Categories
স্মৃতি

আমার দাদির মৃত্যু

আমি ব্যক্তিগত ভাবে কাছের মানুষের মৃত্যুতে তেমন দুঃখ পাই না। আমার দাদির কাছ থিকা এই শিক্ষা আমি পাইছি। মনে হয় আব্বাও পাইছিলেন। দাদি আশপাশের মানুষ মরলে দেখতেও যাইতেন না। বলতেন, মানুষ তো মরবই!

আমার দাদা মারা গেছেন হয় ছিয়াশি নাইলে ঊনানব্বই সালে। আমি তখন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে দাদাবাড়িতে বেড়াইতে গেছিলাম।

দাদা মারা গেছিলেন সন্ধ্যার পরে। একলা একটা ঘরে মারা গেছিলেন উনি। দুসম্পর্কের এক ফুপু তারে মৃত অবস্থায় প্রথমে দেখতে পান। তিনি চীৎকার দিয়া উঠলেন, জ্যাডায় তো আর নাই!

আমরা হারিকেন জ্বালাইয়া আরেকটা ঘরে গল্প করতেছিলাম। মৃত্যুর আগে কী একটা অসুখে উনি ভূগতেছিলেন। ওনারে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয় নাই। অসুস্থ ছিলেন বইলা সেই সময় আমিও খুব কাছে ভিড়ি নাই ওনার। এমনকি এখনও আমি জানি না কী হইছিল ওনার। আমার তখন তো কম না বয়স। ঊনিশ বা বাইশ। কিন্তু আমরা এই রকমই ছিলাম।

দাদার মৃত্যুর পরে দাদিরে কানতে দেখি নাই। উনি প্রথমেই যা করলেন—সবুজ বা নীল, এখন আর মনে নাই, শাড়ি বদলাইয়া সাদা একটা শাড়ি পরলেন।

পরদিন আব্বা-আম্মা ভাইবোনরা বাড়িতে আসল। দেখলাম আব্বা কর্তব্য কাজগুলি করতে ধরলেন। উনি কান্নাকাটি করছিলেন তেমন মনে পড়ে না। এবং আমিও কান্দি নাই। আমারে আব্বা পাঠাইলেন টাঙ্গাইলের এলাসিনে। ফুুপুরে নিয়া আসতে। ফুপুদের বাসায় ফোন নাই। খবর দেওয়া যাইতেছে না।

দাদারে কবর দেওয়ার অনুষ্ঠানে থাকা হয় নাই আমার। একলা একলা টাঙ্গাইল যাইতে হইল। ফুপু আসার আগেই দাদারে কবর দেওয়া হইয়া গেছিল। যেন এই সবই স্বাভাবিক—এই ভাবেই আমরা ভাবতে শিখছিলাম।

পরে আমার দাদি মারা গেছেন ২০০৬ সালে। আমি কোনোদিন ওনারে দাদার কথা বলতে শুনি নাই। এমন না যে ওনাদের সম্পর্ক খারাপ ছিল। আগেরকার পারিবারিক সংস্কৃতি হয়তো এই রকমই ছিল। বা আমি হয়তো ডিটাচড ছিলাম সবার থিকাই।

দাদি ওনার নিজের আসন্ন মৃত্যুরেও খুব স্বাভাবিক ভাবে নিছিলেন।

আমি তখন পান্থপথে স্কয়ারের উল্টাদিকের ষোলো তলার বাসাটায় থাকতাম। একদিন শুক্রবারে হইতে পারে, বাড্ডায় গেছি আব্বা-আম্মার বাসায়। দাদি একটা রুমে শুইয়া ছিলেন দুপুরবেলায়। আমি ওনার ঘরে ঢুকতেই শোয়া থিকা উইঠা বসলেন। ডাইকা কাছে বসতে বললেন। বিছনায় বসতেই আমার হাত ধরলেন ওনার শুকনা দুই হাত দিয়া। বললেন, বাই রে খবর আইয়া পড়ছে। আর দেহা অইত না।

এর কয়েক দিন পরে কুমিল্লা গেলেন তিনি। সেইখানে মারা গেলেন।

১৩/৩/২০১৬

Categories
স্মৃতি

অন্বেষণ

নাইনটিন নাইনটি ফাইভে আমি অন্বেষার সঙ্গে পরিচিত হই। একটি ঈদের দিনে ছফা ভাইয়ের বাসায় গেছিলাম। দুপুরে। দেখলাম ছফা ভাই ঘুমান। আমি পা ধোওয়ার নিমিত্তে পাশের ঘরে গেলাম। ধুলাবালিতে স্পঞ্জের স্যান্ডেলও ময়লা হইত তখন। দেখলাম ছোট গোছলখানার একটা পাশে বিছানো চকিতে সোজা হইয়া একটা মেয়ে ঘুমাইয়া। আমি পা ধুইতে ঢুকলাম। বাইর হইয়া দেখি—এক পাশে চুল নামাইয়া দিয়া বইসা আছে ভদ্র মেয়েটি—লম্বা কালো মাথাভরা চুল কোমর পর্যন্ত নামতেছিল। একটু মোটা—কিন্তু গা ফর্সা বইলা আমারে আকর্ষণ করলো। দেখি নড়ে না। তাকায় ছিলেন কি উনি? এতদিন পরে আর তাকানোটা মনে নাই।

অন্বেষার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল অল্প দিনের। সব মনে নাই। পর দিন গিয়া দেখলাম ছফা ভাইয়ের একটা বেগনি সিল্কের শার্ট আর লুঙ্গি পইরা বোধহয় মোড়ায় বা ছোট টুলে বইসা আছেন অন্বেষা। হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ। কিন্তু হাসেন না।

২.

অন্বেষা নিয়া বেশি বলার নাই। উনি নাচ শিখতেন তখন। দিনাজপুর থিকা পলাইয়া আসছিলেন, উঠছিলেন ছফা ভাইয়ের বাসায়। ছফা ভাইয়ের বেশ বেগ পাইতে হইছে ওনারে রক্ষা করতে গিয়া। অন্বেষা ছফা ভাইয়ের বাসায় ওঠার পরে তরুণ ও অনতিবয়স্ক সব কবি-সাহিত্যিকরা—আমরা—ঘন ঘন ছফা ভাইয়ের বাসায় যাওয়া শুরু করলাম। আগে সপ্তাহে দুই কি একদিন যাইতাম। এখন দেখি প্রতি দিনই ঘর ভরা লোক। একটা টেবিলের এক প্রান্তে ছফা ভাই, নাগরিক প্রান্তে আমি। বেতের সোফায় অন্যেরা। ছফা ভাইয়ের পাশে অন্বেষা। চা দিলে পরে আমি এই পাশের দরজা দিয়া আর অন্বেষা ওই পাশের দরজা দিয়া ঘুইরা ছফা ভাইয়ের বিখ্যাত ছাদে গিয়া দাঁড়াইতাম। চা খাইতে খাইতে যট্টুক আলাপ। এর মধ্যে ভিতর থিকা ছফা ভাইয়ের উচ্চকণ্ঠের হাক, রাইসু কোম্পানি, তোমার চা খাওয়া হইল!

আমরা, চা খাওয়া যেহেতু হইয়া যাইতো, গিয়া আবার বসতাম যার যার চেয়ার ও মোড়ায়—নাকি টুলে? এগারো সালে শুনলাম, অন্বেষা নাকি বিলাতে অন্বেষা কোম্পানি খুলছিলেন, একটা নাচের স্কুল।

৯/৮/১৩

Categories
স্মৃতি

আওয়ার ছফা অ্যান্ড আজাদ

sofaazad
ছবিতে পাশাপাশি হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ ছফা

আমি ছফা আজাদ দুইজনরেই পছন্দ করি–করতাম। আজাদের বাসায় একাধিকবার গেছি। মেইনলি ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্যে। এছাড়াও গেছি। একবার মনে আছে, বিকালের দিকে, বোধহয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের দিকে হাঁইটা ওনাদের কলোনি পার হইতেছিলাম আমি আর সাজ্জাদ শরিফ ভাই। তখন আমি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে উপন্যাস লিখি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়– যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক। সাজ্জাদ ভাই ভোরের কাগজে আছেন। তো স্যার–স্যার নামেই ডাকতাম ওনারে–আমাদের দেখতে পাইলেন রাস্তায়। বললেন, কী ব্যাপার তোমরা! এখানে কী করছো! ওনার কণ্ঠস্বর, ‘এখানে কী করছো’ ভালো লাগল না আমার।

আমি বললাম, স্যার বিকাল বেলা মেয়ে দেখতে বাইর হইছি!

উনি প্রথমে অপ্রতিভ হইলেন–পরে সপ্রতিভ হইয়া হাইসা ফেললেন। বললেন কী বলো এগুলো, ওরা তো আমাদের মেয়ে! আমি বললাম, হ্যাঁ স্যার, ওদেরই দেখতে বাইর হইছি!

উনি বললেন, চলো, কাজ না থাকলে বাসায় চলো। আমরা ওনার বাসায় গিয়া চা বিস্কুট খাইলাম।

হুমায়ুন আজাদ স্যার সাবলীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ওনার সঙ্গে নানান জায়গায় দেখা হইত। প্রধানত আজিজ মার্কেট শাহবাগে। উনি সাদা কেডস, নেভি ব্লু জিনস আর সাদা টি শার্ট বা কখনো হাফ শার্ট পইরা আসতেন। আমারে আর সাজ্জাদ ভাইরে পারতপক্ষে ঘাটাইতেন না।

আমি ওনার একটা সাক্ষাৎকারের বই নিয়া একটা আলোচনা লিখছিলাম বাংলাবাজার সাময়িকীতে, ১৯৯৪ বা ৯৫-এ। বইটা যে পড়ি নাই তখনো তার উল্লেখ আছিল আলোচনায়। (সে বই অবশ্য এখনো পইড়া উঠি নাই। পড়মু।) সাক্ষাৎকারদানকারীদের ও ওনার চশমার বর্ণনা, কে কার দিকে চাইয়া আছে প্রচ্ছদে সে সব লিখছিলাম। উনি পইড়া খুশি হইছিলেন। বলছিলেন, তুমি না পড়েই যা লিখেছো, ওরা তা পড়েও লিখতে পারবে না।

ওনার অনেক গল্প আছে, আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বইলা সব মনে পড়ে না। সাজ্জাদ ভাইয়ের দেখছি অনেক কিছু মনে আছে। ওনারে জিগাইলে আবার আমারও মনে পড়বে। তেমন মনে পড়া ঘটলে আরো লিখব। ছফা-আজাদ দুই জনেরই আদর্শবাদ আছিল। যে যে আদর্শের তার কাছে তাঁর তাঁরটা হয়তো ভালো লাগবে। আমার আদর্শবাদ ওইভাবে কখনোই ছিল না। দুইজনের সঙ্গেই আমি মিশতে পারতাম। তবে ছফা ভাই যেমন পুত্রবৎ জ্ঞান করতেন আজাদ তেমন করতেন না–তিনি জ্ঞান করতেন ছাত্রবৎ। কিন্তু আমি কখনোই তার ছাত্র তো ছিলাম না, বৎও ছিলাম না। কোনো একটা ইন্টারভিউতে আমাদের ফাজিল সম্বোধন করছিলেন আজাদ স্যার। আমরা–অন্তত আমি তাই ছিলাম। এখনও আছি। ভদ্রলোকদের অফাজিল ভদ্রতার মায়রে বাপ!

১৯/৭/২০১৩

Categories
স্মৃতি

আমার শিল্পচর্চার খানিকিতিহাস ২

১.

১৯৮৪ এবং ‘৮৫ সালে আমি দুইবার ঢাকার আর্ট ইনসটিটিউটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়া ফেল করছিলাম।

ডিজাইন নিয়া একটা প্রশ্ন ভুল বোঝনে শেষের বার, আর কী কারণে জানি না আগের বার টিকতে পারি নাই।

(ভালোই হইছে!)

ভর্তি হওনের লাইগ্যা অনেক দৌড়াদৌড়ি করছিলাম। মনে আছে কোনো আর্টিস্ট বড় ভাইয়ের লালবাগের বাসায় গেছিলাম খোকা (মাহবুবুল ইসলাম) বইলা আমার ছোট কালের এক বন্ধুর লগে। তারপরে রণবীর এক অনুজ আত্মীয়রে লইয়া ওনার বাসায়ও তদবির করছিলাম।

কাজ হয় নাই। আল্লাহ আমারে অ্যামেচার আর্টিস্ট বানাইয়া রাখছেন।

১৯৮৮ সালে ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাইতে শুরু করি। ওইখানে বেশ কিছু বইপত্র পড়া শুরু হয়। বিদ্যোৎসাহী তরুণ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ শুরু হইল।

ওয়াও। ওই সময়ে আমি আমার প্রায় মধ্যবিত্ত বলয়ের বাইরে অল্প বিস্তর স্বচ্ছল ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের নিকটবর্তী হওয়া শুরু করি। ওইখানে আমার প্রতিভা বিক্রয়টা জরুরি ছিল।

আগে গান শিখতাম (’৮৪); কিছুদিন আগে নাটকের দলে (’৮৬) অভিনয় করছি। এখন স্বচ্ছলতর সংস্কৃতিসেবীরা দেখলাম আবৃত্তি করে। আমার কবিতা লেখা শুরুর (’৮৭) বছর দুয়েকের মইধ্যে ছবি আঁকার শুরু। ১৯৮৯ সাল থিকা আমি নিউ মার্কেটের মডার্ন নামের দোকান থিকা নিয়মিত ছবি আঁকনের খাতা কিনতাম। যেহেতু খাতা কিনতাম, ছবি আঁকতাম। দিনমান আমি ওই খাতা লইয়া ঘুরতাম। আর স্ট্যাডলার ২বি পেনসিল দিয়া ঘইষা ঘইষা ছবি আঁকতাম।

ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আর শাহবাগের আজিজ মার্কেট আছিল আমার সীমানা। এ ছাড়া যখন যেথায় যাইতাম খাতা থাকত সঙ্গে।

sketch-1989_5070125229_o
স্যুররিয়ালিজমের ক্রিটিক করছেন দুইজন মৎস্য ও আমাদের যৌক্তিক গাণিতিক নৈসর্গচিন্তা, ১৯৮৯

২.
তবে আমার শিল্পচর্চার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ছোট কালে যখন পড়ালেখা শুরু করছি তখন স্কুলে পরীক্ষার সময় বছরে একবার পাখি বানাইয়া লইয়া যাইতাম। আমার আম্মা খুব সুন্দর মাটির পাখি বানাইতেন। কাদা দিয়া কীভাবে বানাইতে হয় আমি সেগুলি শিখতাম। ওই পাখিদের গায়ে মাখার জন্য নীল ও লাল রঙ বানাইতে হইত কী কী দিয়া জানি। সম্ভবত নীল দপর্নের নীল আর জর্দার রঙের লগে কিছু একটা মিশাইয়া লাল রঙ বানাইতাম। মনে আছে পাকিস্তান থেকে আসা পাড়াতুতু এক খালাম্মার কাছে সুতা দিয়া হাতপাখার নকশা করা শিখছিলাম। অনেক কঠিন সেই কাজ। এত ছোট কালের সেই ব্যাপার যে আমি ওনার পাশে শুইয়া শুইয়াই সুতার সেই নকশা করতাম। আবিদ আজাদের খালাম্মা আমার ভয় করে জাতীয় কিছু ছিল না সেইটা। মানে তখনও ততটা বয়স আমার আয়ত্তে আইসা পড়ে নাই।

আমাদের খিলগাঁও সরকারী হাই স্কুলের (১৯৭৯-৮৫) আর্টের শিক্ষক মোল্লা স্যারের সবিশেষ পিকিউলিয়ার পারসোনালিটি ছিল। উনি ছাত্রদের বিশেষ পাত্তা দিতেন না। এখন বুঝি (তখন বুঝতাম না) আর্টিস্টরা ওই রকম হইয়া থাকেন। সে সময়ও আমার ভিতরে আর্টের উপকৃতি সাধন হইয়া থাকতে পারে।

আরেক ঘটনা মনে আছে। এইটা সামাজিক ছবি আঁকনের। আমাদের বাড্ডায়, এক ভদ্রলোক আছিলেন স্ট্যাম্প বিষয়ে যার নাম প্রায়ই উচ্চারিত হয়—যার বাসায় বিদেশী লোকরা আসতো। একদিন ওনার দুই ছেলে শামীম-শাহীন আইসা আমগো কয়েকজনরে বাসায় নিয়া গেল। যে ওনারা ছবি আঁকনের জিনিসপাতি দিব, আমরা ফ্রি ছবি আঁকতে পারমু। মনে আছে সেদিন বর্ষাকাল আছিল। ও দুই ভাইদের বাসার ছাদ থিকা দিকচক্রবালে বর্ষা ঘনাইতেছিল।

আমি তা আঁকছিলাম। অন্যেরাও এই পরিবেশ প্রকৃতিই আঁকছিল।

ওদের ওই ছাদের ঘরের কাঠের দরজাটা গাঢ় নীল রঙের ছিল বইলা মনে পড়ে। আঁকনের পরে আমরা ছবি ওই বাসায় রাইখাই চইলা আসি। আবার পরের দিন আঁকনের কথা আছিল। তবে সেটি আর হইয়া ওঠে নাই। এখন আমার ধুরন্ধর মন বলে ওই ঘটনাটা আছিল কোনো এনজিও কার্যক্রমের অংশ নিশ্চয়ই।

দুই ভাইয়ের লগে বছর বিশেক ধইরা দেখা নাই। ওরা আমেরিকা থাকে।

৩.
১৯৮৯ সালে খাতা কিনা ছবি আঁকতে গিয়া বুঝতে পারি যে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে আমি প্রতিভা বিশেষ। কবিতার প্রতিভাও তখনই বুঝতে পারতেছিলাম।

কেবলই পেনসিলে ছবি আঁকতাম। একবার মিনার মাহমুদের অনুরোধে তার বিচিন্তা পত্রিকার জন্য কী একটা কার্টুন টাইপ ছবি আঁকতে গিয়া প্রতিভা হারাইয়া ফেলি। পরে এখন মাঝে মাঝে তা আসে মাঝে মাঝে আসে না।

’৯৫ সালে ফোজিয়া খান একটা খাতা আমারে উপহার দিছিল বোধহয় জন্মদিনে। সবুজ রঙ-এর মলাটঅলা। ওই খাতায় কিছু অবিস্মরণীয় ছবি আমি আঁকছিলাম। সে কারণে ফৌজিয়ারে কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমার বিশ্বাস গজাইছে আর্ট মাধ্যমে কী কবিতা লেখায় অন্যের কথা একদম শুনতে নাই। কেউ প্রশংসা শুরু করলে নিজের প্রশংসা নিজেই করতে ধরবেন। এইটাই বাঁচনের উপায়।

ভোক্তা আপনের আর্ট ধইরা ফেললে খবর আছে। তখন ঐতিহ্য বিক্রয় থিকা আরম্ভ কইরা দেয়ালের সাইজ, বিবিধ মাধ্যম, বেঙ্গল, আলিয়স ফ্রসেজের কৃপাভিক্ষা ইত্যকার জিনিসের আড়ালে ছবি কেবলই ছবি হইয়া রবে। প্রফেশনাল ছবি আঁকা লোকদের জন্য আমার সবিশেষ সহানুভূতি। প্রফেশনাল হইয়াও যে ছবি আঁকতে পারতেছেন ওনারা সেইজন্য। কত কিছু করতে হয়!

পান্থপথ, ঢাকা, বাংলাদেশ ১৪/৮/২০০৮

(আমার শিল্পচর্চার খানিকিতিহাস ১)

Categories
স্মৃতি

আমার শিল্পচর্চার খানিকিতিহাস ১

১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখ শনিবার দুপুর বেলায় আমি নিউ মার্কেট থিকা একটা ড্রয়িং খাতা কিনছিলাম।

গবেষকদের মতন যে তারিখ কইতে পারলাম সেইটা নাজিব তারেকের কৃপা।

আমি ড্রয়িং খাতা লইয়া হাঁইটা যাইতে ছিলাম শাহবাগে। জাদুঘরের সামনে আর্ট কলেজের তৎকালীন ছাত্র নাজিব তারেক-এর লগে দেখা হইল। উনি আমার খাতা নিয়া প্রথম পাতায় একটা ছবি আইঁকা দিলেন ঝট কইরা। বিরক্ত হইছিলাম। পরে বুঝছি আর্ট করতে পারেন যারা তাদের অনেকেরই এইটা একটা কর্তব্যবোধ। তো ওইদিন আমি টব আর কাপ লইয়া দুই পৃষ্ঠা ঘ্যাচঘুচ করলাম। ছবি আঁকন যে কঠিন কাম বুঝতে পাইরা অফ মাইরা গেছিলাম। পরের দিন এই ছবিটা আঁকি। ছবির নাম দিছিলাম ‘দি ম্যান উইথ দ্য মিরর’।

স্যুররিয়ালিজম ঘরানার ছবি। স্যুররিয়ালিজমরে তখন ঢং কইরা কইতাম সাররিয়ালিজম। এই ঘরানা আর্ট কলেজের বিদ্যার্থী এবং বিদ্যাদাতারা বিশেষ ভালো চোখে দেখেন না বইলা আমি তখন টের পাইছি। তৎপরে বয়সে বড় আর্টিস্টরা কইছে রাইসু, এগুলি পাশ্চাত্যের অনুকরণ। মাটি কই?

ওনাগো কথা শুইনা পরে মাটি-পানি এগুলিও আঁকছি ছবির মইধ্যে। আমার জীবন যাপন যেহেতু পাশ্চাত্যের অনুকরণে আমি সেই নিয়া বিব্রত হই নাই। যারা মাটি নিয়া ছবি আঁকছেন, দেখছি একবার ভারতের শান্তিনিকেতনের মাটি নিয়া আঁকছেন, জাপান-জার্মানি ঘুইরা আইসা ওই অঞ্চলের মাটি নিয়া আঁকছেন।

আর্ট কলেজে টিকতে না পারলে কী হইব ওই সময়ে অভিজিৎ (অভিজিৎ এখন শাহবাগ আজিজ মার্কেটে বস্ত্র ব্যবসা ‘তারা মার্কা’র স্বত্বাধিকারী। আমরা বাংলাবাজার পত্রিকায় এক লগে আছিলাম।), জুয়েল, টগর (পরের দুইজন এহন আর্ট কলেজের মাস্টার) এগো লগে দেখা করতে যাইতাম।

’৮৬ সালে নির্বাচনের সময় আমগো বাড্ডায় অনেক মারামারি হইতেছিল। আমি সেই সময় কিছুদিনের জন্য আর্ট কলেজের শাহনেওয়াজ হলে জুয়েলের কৃপায় থাকি।

ওইখানে ওর লগে কার্ড আঁকতাম। আমার হাতের লেখা সুন্দর আছিল বইলা ওই কার্ডের লগে আবার কবিতার লাইনও জুইড়া দিতাম। কার কার লাইন মনে নাই। আবুল হাসান বা হেলাল হাফিজের লাইন হওনের সম্ভাবনা বেশি। তো ওই কার্ড বেচতাম বইমেলায়। তারপরে ওই টাকা দিয়া ভাত খাইতাম।

একদিন জুয়েল টাইম মতন ভাত খাওনের টাকা না দেওয়ায় পরে কার্ড বেচনের শৌখিন ব্যবসা বন্ধ কইরা দেই।

বইমেলায় এর আগে আমি যাই নাই। আমি যেইখানে কার্ড বেচতাম তার পাশেই ছিল এক ফিলোসফারের স্টল। প্রেক্ষিত বইলা একটা ছোট কাগজ বেচতেন উনি। নাম মফিজুল হক (মফিজ ভাই বেঙ্গল চিত্রালয়ে আছেন। ওনার সন্ত্রাসের ব্যাকরণ বইলা একটা বই মাঝখানে মৃদু সাড়া জাগায়ছিল।)

ওনার লগে আলাপ-সালাপ করতাম। মেলা চক্কর দিতে গিয়া পরিচয় হইল কবি জাহিদ হায়দারের লগে। উনি কবিতার বই বেচতেছিলেন একটা টেবিল লইয়া। কইলেন শিল্প হইল একটা মাস্টারবেশন। ওই বয়সে এই রকম শুনতে বেশ আনন্দ লাগছে।

শিল্পচর্চার আনন্দ পরে ম্রিয়মাণ হইয়া গেছে। ওই বছরই ফরিদা হাফিজ এবং আদিত্য কবিরের লগে পরিচয় হয়। পরে সেইসব পরিচয় কালের অতল গহবরে দুই বছরের লাইগা হারাইয়াও যায়। শেষে আমি যখন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মৌলিক উৎকর্ষ কার্যক্রম বইলা এক বিদ্যাসভায় যোগ দেই তখন সবার লগে সহিভাবে পরিচয় হয়। আমি সাহিত্য ও শিল্পকলারে এর তৎকালীন মাতব্বরদের নিয়ন্ত্রণের জায়গা থিকা দেখতে অভ্যস্ত হই।

যাই হউক, আমি কথা কইতেছিলাম স্যুররিয়ালিজম লইয়া। স্যুররিয়ালিজম লইয়া সকলেই হাসে। কিন্তু স্যুররিয়ালিজম নামের আন্দোলনটি আর্টের যেই ঘরানাটারে দখল কইরা ভাবসম্প্রসারণ করছে সেই জিনিস সেই ভঙ্গি বহুকাল আগে থিকাই আছে। আপনেরা হিয়েরোনিমাস বস্‌চ্-এর (১৪৫০-১৫১৬) ছবি দেখতে পারেন। মনে হইতে পারে স্যুররিয়ালিস্ট ছবি। কিন্তু উনি অনেক আগেই আঁকছেন, এবং সেইটারে কোনো আন্দোলনে যুক্ত করেন নাই।

ছবি আঁকতে গেলে ইমেজের সমাজসম্মত বা রীতিসম্মত ধারণায় ব্যাতিচার ঘটে, সেই জিনিসরে স্যুররিয়ালিজম বইলা নির্দেশ করা সহজ। হয়তো এই দোষে আমার ছবি দুষ্ট। হউক গা!

পান্থপথ, ঢাকা ১০/২/২০০৬

(আমার শিল্পচর্চার খানিকিতিহাস ২)