Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

চেনা, আধ-চেনা অথবা না-চেনা ব্রাত্য রাইসু

উনি যখন লাগাতার এই বিষয় নিয়াই লেখতে থাকে তখন এক ধরনের অভ্যস্ততা কাজ করে। আস্তে আস্তে বার্তার মধ্যে ঢুকতে থাকি।

আমি সাধারণত সেলিব্রেটিদের নিয়ে ঘাটাঘাটি করি না। কম ঘাটাঘাটি করে আমি তাদেরকে শান্তিতে রাখতে চাই আর নিজেও শান্তিতে থাকতে চাই। যাই হোক, ব্রাত্য রাইসু কি সেলিব্রেটি?

আমার মনে হইছে ‘হ্যাঁ’। তাই আমি কখনোই তাকে ঘাটাঘাটি করি নাই।

তাইলে পরিচয় হইল কেমনে?

আমার ইউনিভার্সিটির এক বড় ভাইয়ের ফেসবুকের স্ট্যাটাসের  কারণে। সেই ভাইয়ের বেশি ভাগ স্ট্যাটাস দেখলেই কেন জানি গা গিরগিরানি রাগ ওঠে। দুনিয়ার সকল লোকের উপরেই সে মহা বিরক্ত আর সেইসব তার স্ট্যাটাসের মূল বিষয়। ঐ ভাইয়ের এ রকম কোনো এক স্ট্যাটাস আমি একদিন নাকমুখ কুঁচকায়ে দেখতেছিলাম। আমার কাছে কোনো শক্ত জবাব ছিল না। কিন্তু ব্রাত্য রাইসু তাকে একটা কঠিন কিছু বললেন; খুশীতে আমি তাতে লাইক দিলাম। তার পর পরেই তিনি আমাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠালেন।

আমি সেলিব্রেটিদের ত্যক্ত করি না এইটা ঠিক, কিন্তু তারা আমাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ করবে আর আমি গ্রহণ করব না এত বড় বুকের পাটা আমার নাই। আমি লাফাইতে লাফাইতে অ্যাকসেপ্ট করলাম।

ফারজিনা মালেক স্নিগ্ধা

এমনে করেই কিছুদিন গেল। সেলিব্রেটি লোকদের বন্ধু আমি—এই সুখেই আমি সুখী। কখনোই ত্যক্ত করি না তারে। শুধু তার স্ট্যাটাস পড়ি। কোনো কোনো দিন বানের জলের মত স্ট্যাটাস আসে নিউজ ফিডে। মধ্যে মধ্যে ভাবি এই লোকটার সিনামা বানানো আর সিনামা দেখানোর মধ্যে কোনো সেন্সর বোর্ড নাই। যাই মনে আসে তাই লেখে। নাইলে এ রকম এক ঘণ্টায় পাঁচটা ছয়টা স্ট্যাটাস আসে কেমনে?

আবার একটু পরে মনে হইছে, ভাগ্যিস সেন্সর বোর্ড নাই। যা ভাবে তাই লিখতে পারে। আমি তো কাটাকাটি করতে করতে এমন একটা লেখা লিখি যে পরে মনে হয়, এই রকম কিছু তো আসলে আমি ভাবি নাই। যা ভাবলাম তা তো নাই হয়ে গেল! যাই হোক ব্রাত্য রাইসুর স্ট্যাটাসে আসি আবার।

অনেকগুলো স্ট্যাটাসই খুব বিরক্ত লাগে। যেমন ধরেন একদিন দেখা গেল লেখছে “আমার থেকে বড় বুদ্ধিজীবী আর কে আছে এই দেশে?” পড়লেই মেজাজ খারাপ হয়; কী উদ্ধত! মন চায় দেই একটা গালি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গালি তো দূরের কথা একটা অ্যাংরি ফেইজও দেই না।

দুইটা কারণে নির্লিপ্ত থাকি আমি। প্রথম কারণ, ঐ যে আমার ‘ভদ্র’ ‘সভ্য’ ‘সেন্সর বোর্ড’! কাটাকাটি করা যার কাজ। পেটের ভিতর থেকে সব কিছু বাইর হইতে দেয় না। দ্বিতীয় কারণটা আমার জন্য একটু লজ্জার। কেননা, আমি সত্যিই জানি না ব্রাত্য রাইসুর থেকে আরও ভাল বুদ্ধিজীবী আছে কিনা এই দেশে। যদি মতামতে বলি যে আপনি একটা ছোট বুদ্ধিজীবী, তাইলে তো আমাকে বড় বুদ্ধিজীবী কারা এবং কেন তা দেখাইতে হবে।

ঠিক এই পয়েন্টে এসেই ব্রাত্য রাইসুর উপরে আমার রাগ খানিকটা কমে। আমার মনে হইতে থাকে সে ইচ্ছা কইরাই উস্কায়া দেয় লোকজনরে। “আয় আমার সঙ্গে তর্ক করতে আয়” এইরকম একটা ভঙ্গী থাকে কথায়। আর কারও সঙ্গে তর্ক করতে গেলেই তো আপনাকে সেই বিষয়ে জানতে হবে—ওইটাই মনে হয় তার খেলা। যাই হোক, এই সবই তো আমার মনে হওয়া। খুব দূর থেকে মনে হওয়া।

পরে অবশ্য আর একটু কাছ থেকে যোগাযোগ হল তার সাথে। সেটাও একটা স্ট্যাটাস এর জের ধরেই। “বান্দরের মানুষ হওয়া, সেই মানুষের সভ্য হওয়া, আর সভ্যতারে বুইড়া আঙুল দেখানো”—এইরকম কিছু একটা বিষয় নিয়া স্ট্যাটাস দিছিলাম কোন এক কালে। সেইখানে ব্রাত্য রাইসু একখানা হাসিমুখ দিছিল। আমার দেখা ওইটাই উনার সবচাইতে ভাল কমেন্ট।

আমি তো পুরাই খুশী। কারণ আমার কোনো লেখক বা বুদ্ধিজীবী বন্ধুবান্ধব আমার লেখায় লাইক-কমেন্ট দেয় না। আমি ধইরাই নিছি, ওরা উঁচা জাতের আর আমি ওঁচা জাতের। যাই হোক আমার খুশী ভাব আরও একশ গুণ বেড়ে গেল যখন তিনি আমাকে টেক্সট করলেন আর আমার কাছে লেখা চাইলেন shamprotik.com এর জন্য।

দিলাম লেখা। তারপরের ঘটনা আরও অদ্ভুত! উনি বললেন “লেখা ভাল হইছে।”

আমি তখনও বুঝতে পারি নাই যে উনি এত ভাল করে (আমার ভালর মাপকাঠিতে আর কি!) কথা বলতে পারেন। তারপরে মাঝে মধ্যেই ইনবক্সে কথা হইত। হিজিবিজি সব বিষয়ে। লেখা পাঠান, লেখা দিচ্ছি, ঢাকায় আসলে বইলেন আড্ডা দিব নি—এই ধরনের কথাবার্তা।

এর মধ্যেই এক স্ট্যাটাসে লিখলেন, তারে যেন ইনবক্সে বেশি বিরক্ত না করা হয়। সে ইনবক্সে জবাব দেয় না—এইসব কী সব জানি।

আমি চুপ কইরা যাই। আবার কিছুদিন পরে হয়ত উনিই নক করে, লেখা চায় বা আমি নিজেও কিছু লিখলে তাকে জানাই। কিন্তু তার চাঁছাছোলা ব্যক্তিত্বের কারণে একটা দূরত্ব বজায় রাখি। কী না কী বইলা ফেলে আবার! ভয়টা কেমন বেশি ছিল তার একটা কাহিনি বলি?

একদিন উনি আমাকে ফোন দিছে কোনো একটা লেখার বিষয়ে। কথা হইল অনেকক্ষণ। শেষে যখন ফোন রাখলো, তখন আমারে বলল, “আপনার সাথে কথা বলে অনেক ভাল লাগল।” বিশ্বাস করেন… আমার পুরা কয়েক সেকেন্ড লাগছিল বুঝতে যে ব্রাত্য রাইসু এই ভাবে কথা বলছে। উনার সম্পর্কে আমার ধারণা এতটাই অন্যরকম ছিল! (“অন্যরকম” কথাটা লিখেই মনে হল এটা নিশ্চই আমার সেন্সর বোর্ডের কাজ!)

যাই হোক, উনাকে আমি চিনি/জানি বলতে এগুলাই। দেড়/দুই বছর ধরে স্ট্যাটাস দেখা আর ইনবক্সে কথা বলা। এর মধ্যে যে কতবার কত স্ট্যাটাস দেখে মেজাজ খিচড়ায়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নাই। তবে আমার তার মধ্যেও একটা জিনিস খুব মজা লাগছে। উনি প্রথমে কিছু একটা বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়; ধরেন—ঢাকা ক্লাব থিকা আমাকে বাইর কইরা দিছে অথবা ১৮ থেকে ২১ বছরের মেয়েদের প্রতি আমার আগ্রহ অথবা আমার জন্মদিন নিয়া আমি হ্যান করব আমি ত্যান করব—এই ধরনের কিছু একটা।

প্রথমে স্ট্যাটাসটা পড়েই আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল। তারপর উনি যখন লাগাতার এই বিষয় নিয়াই লেখতে থাকে তখন এক ধরনের অভ্যস্ততা কাজ করে। আস্তে আস্তে বার্তার মধ্যে ঢুকতে থাকি। একটা সময় পরে আর খারাপ লাগে না। বরং নিজেকে ইনক্লুডেড ফিল করি। ঘটনার পরের ধাপ জানতে ইচ্ছা করে। এইটা মনে হয় উনার একটা ক্ষমতা।

আর কী? উনারে নিয়া দুই একটা ভাল কথা লিখতে ইচ্ছা করতেছে। কিন্তু আমি আসলেই ব্রাত্য রাইসুরে জানি না খুব বেশি। উনার একটা বইও পড়ি নাই এখন পর্যন্ত। এই মাত্র যে লাইনটা লিখলাম তারপরেও যে উনি আমার এই লেখাটা ছাপাইতে দিতাছে শুধুমাত্র এই কারণেই ব্রাত্য রাইসুরে ভাল লাগতেই পারে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *