আমার বন্ধু মাসরুর

মাসরুরের সঙ্গে আমার দেখা আজ থেকে প্রায় ২৭ বছর আগে। যত দিন গেছে তার চাইতে কমই ছিল তখন আমাদের বয়স। মাসরুরকে তখনও এখনকার মতই একটু গম্ভীর তরুণ লাগতো, বুদ্ধিদীপ্ততার কারণে বয়স বোঝা যাইতো না। আর তাছাড়া সেসময় আমরা প্রায় সব বয়সের বড় ভাইদের সঙ্গে মিশতাম। সেও একটা কারণ ছিল কারো বয়স না বুঝতে পারার। আমরা তখনও পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধই ছিলাম বটে।

তবে এখন যখন ভাবতে যাই তখনকার সময় নিয়া বা নিজেদের নিয়া, মনে হয় একদল বড় ভাইদের নিয়া ভাবতেছি, যারা শাহবাগের অদৃশ্য একটা নদীর কিনারে বইসা সারা জীবন সেইখানে কাটাইয়া দিয়া যে যার চাকরিতে ঢুইকা গেছে।

এবং অবশ্যই কেউ আর বাঁইচা নাই।

আমি মাসরুরের সঙ্গে ওদের খুলনার বাসায় গিয়া হাজির হইছিলাম সেই ১৯৯২ বা ৯৩ সালে, অনেক ভোরবেলা, রাতই হয়তো ৪টা, সাড়ে ৪টা তখন। ওদের বাসার বাইরে একটু সুপারি বাগান মত ছিল, সেখানে শ্যাওলামাখা ইট বসানো ছিল কি? সুপারি গাছগুলি বেয়ে অসংখ্য শামুক বৈদ্যুতিক আলো আর গাছেদের মিলমিশ অন্ধকারের মধ্যে উপরের দিকে উঠতেছিল। আমি অবাক হইছিলাম। শীতকাল তখন? হয়তো না, তবে রাত্রির গভীরতায় শীতকালই মনে হইতেছিল সবকিছু। এখনও আমি যখন পুরাতন মাসরুরকে ভাবতে যাই ওই শীতকাল আর ওই দৃশ্য আমি একটু ঠাণ্ডাসহ দেখতে পাই।

মাসরুরের খুলনার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হইছিল তখন। পরে তাদের অনেকেই ঢাকায় থিতু হইছেন। খুলনায় দুই তিনদিন ছিলাম মনে হয়। পরে আমরা ট্রেনে কইরা রাজশাহী গেলাম। হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে দেখা করতে কি? সেইখানে ওই যাওয়ার বছর খানেক আগে আমি আরেকবার গেছিলাম রাজশাহী, আমার তখনকার বন্ধু লীসাদের সঙ্গে। লীসার বাবা ছিল রেলওয়ের ওই অঞ্চলের জিএম।

ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারে পুকুর পাড়ের একটা বাড়িতে থাকতেন হাসান আজিজুল হক। লীসা ডাকতো হাসান কাকু। লীসাদের বাসায় একটা দাওয়াতে আসছিলেনও উনি। ওনার সঙ্গে তখন দেখা হয় নাই। পরের বার যখন গেলাম মাসরুরেরই আগ্রহে হাসান ভাইয়ের বাসায় মাসরুর একটা বা দুইটা বই হাসান ভাইকে পড়তে দিয়া আসছিল। একটা কি ছিল গুন্টার গ্রাসের ট্রিন ড্রাম উপন্যাস? কী জানি। মনে হয় না কোনোদিন আর ফেরতে নিতে সেখানে গেছিল সে। আমরা তারপরে কীভাবে কীভাবে ঢাকায় আসি না কই গেলাম সে আর মনে নাই।

কিন্তু আমি ভাবি সে কেন হাসান ভাইকে বিদেশী উপন্যাস পড়তে দিছিল?

এই জিনিস তার শুরু থেকেই আছে। মারুফ রায়হানের ‘মাটি’ পত্রিকায় অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে বিদেশী সাহিত্য নিয়া চমৎকার গদ্য লিখতো মাসরুর।

আমি ইংরাজি পড়তে পারিও না, আগ্রহও নাই বিধায় বিদেশী সাহিত্যের বাইরেই থাইকা গেছি মোটামুটি। তবু মাসরুরের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে ভাটা পড়ে নাই। শাহবাগে প্রায় সবার সঙ্গেই মাসরুরের তুই-তুমি সম্পর্ক, অথচ আমার সঙ্গে সেই শুরু থেকেই আপনি-আপনি বজায় আছে, যদিও আমরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আমাদের দুইজনের প্রথম কবিতার বই একই টাইমে বের করছিলাম আমরা। আমার ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ আর মাসরুর আরেফিনের ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’। বই দুইটা বের হইছিল আমার তত্ত্বাবধানে, দ প্রকাশনা থিকা। বইয়ের তেমন মার্কেটিং করা না হওয়ায় মাসরুরের বইটা কম লোকের কাছে পৌঁছাইছে। আমার ধারণা এই বিষয়ে মাসরুরের একটু খারাপ লাগা আছে বা ছিল।

মাসরুর মূলত সাহিত্যিক মানুষ। লেখাই তার লেখার অনুপ্রেরণা। যতটা সূক্ষ্মতা ও দার্শনিকতা বজায় রাইখা সে লেখালেখি করে আমি এই রকম কম দেখছি। জীবনের উপরে সাহিত্যকে এত মূল্য আমি দেই না। বন্ধু মাসরুর আরেফিন আর বন্ধু রাজু আলাউদ্দিনকেই আমি এতটা সাহিত্য অন্তপ্রাণ হইতে দেখছি। এবং অদ্ভুত ভাবে তারা দুইজনই বিদেশী সাহিত্য বিষয়ে অতি আগ্রহী।

নানা বয়সে আমার নানা রকম বন্ধু ছিল। মাসরুরের সঙ্গেই বলা যায় সবচাইতে দীর্ঘদিনের গুড বন্ধুত্ব আমার বজায় আছে। আমাদের পরস্পরের একটা অদৃশ্য দূরত্ব প্লাস সাহিত্য বিষয়ে সমমনষ্কতা হয়তো এই সম্পর্ককে রক্ষা করে। আমি এই দূরত্ব ও বন্ধুত্বকে সম্মান করি।

লেখাটার সঙ্গে পুরনো একটা চিঠি থাকলো, মাসরুরের পাঠানো চিঠি। ওনার পাঠানো দ্বিতীয় চিঠি কি এইটা? প্রথমটা কই? মহাকাল জানে।

কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, ব্যাংকার ও বন্ধু মাসরুর আরেফিনের ৫০ হওয়ার এই একাকী পর্যায়ে আমি তার সঙ্গে থাকতে চাই। প্রতিটি ৫০ হওয়া মানুষই একটু একলাই—মৃত্যুকে অন্তত ৫০ বছর ফাঁকি দিতে পারা একলা দিশাহারা মানুষ।

—ব্রাত্য #রাইসু ৯/১০/২০১৯
পশ্চিম রাজাবাজার, ঢাকা

মূল চিঠি ছবিতে। নিচে চিঠির টেক্সট:

সুপ্রিয় রাইসু,

কেমন আছেন? শুভেচ্ছা নিবেন।

বাসায় এসে একদিন বিশ্রাম নিয়েই অনুবাদ ক’রে ফেললাম সালমান রুশদীর প্রবন্ধটি। অনুবাদ করবার সময় বারবার হেসে উঠেছি রুশদী কিভাবে উমবের্তো একোকে বাঁশ দিয়েছে, সেটা লক্ষ্য ক’রে। আসলেই, ফর্মের নতুনত্বের নামে যে অর্থহীন শব্দস্তূপ রচনা করেছেন একো, তার প্রেক্ষিতে এরকম একটি বাঁশের প্রয়োজন ছিলো। তবে, ইউরোপীয় লেখকরা কেন এভাবে মাটি-মানুষ ছেড়ে কম্পিউটার গেম আর কল্পকথাকে উপন্যাসে স্থান দিচ্ছেন, তার একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অবশ্যই তাদের কাছে রয়েছে। হতে পারে, প্রযুক্তি-প্রগতি তাদের ওখানে খুব বেশী দূর এগিয়ে গেছে বলেই প্রচলিত শব্দগুলো হারিয়ে ফেলেছে তাদের প্রথাগত মর্যাদা ও অর্থ, এবং সে কারণেই অর্থহীনতাই বোধহয় রূপলাভ করেছে অর্থময়তায়। যাই হোক, এক বিখ্যাত লেখককে নিয়ে আরেক বিখ্যাতের এই লেখাটি ইন্টারেস্টিং লাগবে বলেই আশা করি।

আমার দিন যাচ্ছে অসম্ভব ব্যস্ততার মধ্যে। বেশ কিছু লেখার চাপ পড়েছে একসাথে। জানি না সময়মতো সবগুলো শেষ করতে পারবো কিনা। আপনার পত্রিকাটি কবে বেরুচ্ছে? এক কপি পাঠাবেন কিন্তু। অথবা ঢাকা এলে আমি নিয়ে নেবো।

ভাল থাকুন। সুস্থ থাকুন। অনন্ত শুভকামনায়।

মাসরুর আরেফিন
২৯.১২.৯২

ঠিকানা : মাসরুর আরেফিন
২৪ আহসান আহমেদ রোড, দোতলা
(সেন্ট যোসেফ স্কুলের বিপরীতে)
খুলনা-৯১০০
ফোন (বাসা): ২০৫১১ [ডিসেম্বর ৩১ পর্যন্ত ফোন নং: ৬০৪৪৭]

পুনশ্চ: প্রাপ্তি সংবাদটা আমাকে জানাবেন কিন্তু।


Leave a Reply