ভাড়া বাড়ি

ওই বাসায় থাকাকালীন আমি মোট ৫টি গভীর প্রেম করেছিলাম। সে অনেক কথা, হায়! কে আজ কোথায়?

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে আমার পান্থপথের ষোলো তলার ভাড়া বাসাটি ছাইড়া দিতে বাধ্য হই আমি।

ওইটা সুন্দর একটা বাসা ছিল। অনেক উপর থিকা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাইতো। পশ্চিম দিকে তাকাইলে আকাশে রায়ের বাজারের বা ঢাকা শহরের বেড়ি বাধের শেষটা।

ওখানকার একটা ব্রিজও আবছা দেখা যাইতো, এত দূর থিকাও রাতে ব্রিজের লাইটগুলির পিট পিট চোখে পড়তো।

সবই কেমন কাছে ও দূরে ছিল। নিচে ছিল স্কয়ার হাসপাতাল, ডান দিকে রাস্তার অন্য পাড়ে।

আমি ওই বাসায় ছিলাম ১০ বছরের একটু বেশি। ২০০৪ এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি। অনেক দিন।

অস্ট্রেলিয়া থেকে আইসা ওই বাসায় উঠি আমরা। আমার স্ত্রী অজএইডের স্কলারশিপ পাইছিলেন। ওনার সঙ্গে আমি আগের বছর অস্ট্রেলিয়া যাই। ২০০৭ সালে আমাদের দুইজনেরই আকাঙ্ক্ষিত বিবাহ বিচ্ছেদটি কার্যকর হয়। তার আগেই আমার স্ত্রী এই বাসা ছাড়েন। উচ্চশিক্ষার্থে কানাডা গমনের পর থেকে বাসাটিতে আমি একলাই থাকতাম। পরের প্রায় ৭ বছর।

ওই বাসায় থাকাকালীন আমি মোট ৫টি গভীর প্রেম করেছিলাম। সে অনেক কথা, হায়! কে আজ কোথায়?

যাই হউক, বাসাটিতে আমার অনেক বন্ধুদের যাতায়াত ছিল। অনেকেই আমাকে ওই বাসাসহ আইডেনটিফাই করেন, এখনও করেন, দেখা যায়। যেন আমি এখনও অস্ট্রেলিয়া থাকি, আবার যেন ওই পান্থপথের ষোলো তলায়ও থাকি!

তো ওই বাসার বাড়িওয়ালি (ফ্ল্যাটমালিক) আমারে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেন ২০১৫ সালের জানুয়ারির ১৫ তারিখে। কম্পিউটার প্রকৌশলী ও লেখক আশরাফুল আলম শাওনের স্মৃতি থেকে ধার কইরা বললাম।

শাওনের স্মৃতিমতে বাড়ি ছাড়ার আগে আমরা—শাওন, অন্তরা, কামরুল, সাঈদ ও আমি—shamprotik.com এর জন্যে নবীন-প্রবীন লেখকদের ইন্টারভিউ করতে বইমেলায় যাইতাম প্রতিদিন।

তো বাড়িওয়ালি ভদ্রমহিলা থাকতেন কানাডায়। বছরে একবার আসতেন। সুন্দরী দুই মেয়ে ছিল ওনার। উনিও সুন্দরীই ছিলেন। মেয়েদের কাউরে একজনরে আর কেয়ারটেকাররে সঙ্গে নিয়া ওনাদের মালিকানাধীন ফ্ল্যাটগুলি রেকি করতে আসতেন বছরে একবার। ফলে ওনার আগমন কখনোই বাড়িওয়ালি জনিত রূঢ় কিসিমের বা ধমকাধমকির মত কিছু ছিল না।

কখনো ওনার স্বামী, রাজশাহীর ওই বিনয়ের অবতার কেয়ারটেকাররে সঙ্গে নিয়া একলা আসতেন। মানে মেয়েরা থাকতো না তখন। ভদ্রলোকও যথেষ্ট বিনয়ের ছিলেন। আমি ভাবতাম বা জানতাম উনি কানাডায় কোথাও কিছু পড়ান হয়তো বা।

খুব ভালো মানুষ ছিলেন ওনারা। যখন আসতেন ঘরে কিছুক্ষণ বইসা আমাদের ফ্ল্যাট দেখা হইয়া গেছে আচ্ছা এইবার যাই ধরনে এক কাপ চা খাইয়া চইলা যাইতেন। প্রতি দুই বছরে ভাড়া বাড়তো বাড়ির। ১৪ হাজার দিয়া থাকতে শুরু করি আমরা। ছাড়ার সময় আমি একলা ছিলাম, তখন বোধহয় ২৮ হাজারের কাছাকাছি হইছিল ভাড়া। মনে নাই।

অনেক দিন ওই বাসায় থাকার পরে একবার মজা করতে গিয়া ভদ্রমহিলাকে বললাম, আপা, ১০ বছর একই ফ্ল্যাটে থাকলে নাকি বাড়ির মালিকানা ভাড়াটিয়ার হইয়া যায়, জানেন নাকি কিছু এই ব্যাপারে?

ওইটা কাল হইল। ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পরে আমারে নোটিশ দিলেন উনি। ২০১৫ সালে মার্চের শুরুর দিন বাসা ছাড়তে বাধ্য হইলাম।

আমি কবিগিরি করতে গিয়া অন্য কোনো বাসা না খুঁইজা বা ঠিক না কইরাই বাসা ছাইড়া দিলাম।

পরে কবি সঞ্জীব পুরোহিত আমারে উদ্ধার করলেন। ওনার সেন্ট্রাল রোডের একটা অন্ধকার ভুতুরে বাড়িতে এক দুই মাস কাটাইছিলাম আমি। ওই বাসার বাড়িওয়ালিরে নাকি কাজের লোকে খুন করছিল। ফয়েজ আহমদের আমার নেওয়া একটা ইন্টারভিউতেও (২০০৬) এই রকম একটা খুনের গল্প আছে। এই গল্পটা রক্তাক্ত বীভৎস। সে আরেক কাহিনি। আমার সন্দেহ ফয়েজ ও পুরোহিত দুইজনই একই মহিলার গল্প বলছেন আমারে।

তো সঞ্জীবের মালিকানাধীন স্টুডিও হাউজের একট চিকনা রুমে দুই মাসের মতো থাকার পরে মনে হইল এইবার একটু ভালো ভাবে থাকি। পরে উঠলাম সেন্ট্রাল রোডের মাসুদ ভাইয়ের বাসায়। সেই বাসাও গুমোট, গরম, ছোট, দুই রুম। ওঠার পরে ছাইড়া দিতে চাইছিলাম। মাসুদ ভাই কীসব চুক্তি ফুক্তি বইলা আরো ৩ মাস রাখলেন। ওইটা একটা অসহ্য বাসা ছিল।

এই বাসার সঙ্গে মিল পাই হইল একটা ঘটনার। নাইনটি ফাইভের দিকের। তখন আরামবাগ বা ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির কাছে একটা এক চিলতা আবাসিক হোটেলে উঠছিলেন রাজশাহীর বিখ্যাত গল্পলেখক ও জীবনসাধক শামসুল কবীর কচি ভাই। ওনার অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল সেই সময়। পিজির পিছে বা ভিতরে গাঞ্জা বাহিনির সদস্য বেশির ভাগ। আমি যেহেতু গাঞ্জা বা সিগারেট খাইতাম না তাই দূরে থাকতাম তাদের। কিন্তু কমন কিছু বন্ধু ছিল আমাদের। তো কার লগে জানি গেছিলাম ওনার ক্ষুদ্র রুমখানিতে। ঘরভর্তি সাহিত্য ভাবাপন্ন তরুণ যুবকেরা। সেই রুমের মধ্যে আরো ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র একটা টয়লেট লাগোয়া ছিল। এইটা আশ্চর্যই।

টয়লেট থাকলে আপনাকে টয়লেট করতে হবে। লোক বেশি থাকলে কেবল মুতার উপর দিয়া কাজ সারবেন আপনি। তো আমি টয়লেটে গিয়া মুতকর্ম সারার পরে বাইর হবো দেখি দরজা বন্ধ বাইরে থিকা। আমি ধাক্কাই পরে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, কবি, বলতেছেন আমারে উনি ‘তুমি’ কইরা ডাকবেন এই অনুমতি দিলে এবং তারে যথারীতি ‘আপনি’ কইরা বলার ব্যাপারে অবিচল থাকলে উনি ছিটকানি খুলবেন নাইলে খুলবেন না।

আমার দমবন্ধ হাসফাঁস অবস্থা। নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া আসতেছে, সঙ্গে ভ্যাপসা গরম, মুতের গন্ধ, পানি পইড়া পিছলা হইয়া যাওয়া টয়লেটের মেঝে… ইত্যাদিতে আমি ভাবলাম, ‘তুমি’ কইরা বলতে দিলে কী এমন ক্ষতি।

তো মাসুদ ভাইয়ের এই দমবন্ধ বাসা অবশ্যই ওই টয়লেটের চাইতে প্রশস্ত কিন্তু উপমাগত ভাবে ওই কয়মাস আমার একই ফিলিংস হইছে ওই বাসায় থাকতে গিয়া।

তো ওই বাসায় থাকার শুরুতে ওইখানে বাসার কাজ আর রান্নাবাড়ি করার জন্যে আমিনাকে জোগার কইরা দিলেন মাসুদ ভাই। মাসুদ ভাই যে কিপটা মানুষ তা জানতে পারলাম আমিনার অনুযোগ থিকা।

আমিনা খুব ভালো রানতেন। এত ভালো আর কাউকেই রানতে দেখি নাই। খুব গোছানো, পরিষ্কার ও টেস্টি রান্না রানতেন উনি।

ময়মনসিংহের লোক। একদিন সাঈদ রুপুর সঙ্গে সাম্প্রতিকের হোম অফিস করতেছি। সন্ধ্যা হইয়া গেছে তখন। রুটি বানাইতেছিলেন আমিনা। বাড়ি থেকে ওনার ফোন আসছে, আর উনি চীৎকার কইরা কান্দা শুরু করলেন। জানা গেল, ময়মনসিংহে এলাকার বাজারে ওনার বাবার মাথায় চাউলের বস্তা ফুটা করার লোহার শিক দিয়া বাড়ি দিয়া তারে মাইরা ফেলাইছে! উনি ওই সন্ধ্যায়ই দেশে যাইবেন। আমি অনেক অনুরোধ কইরা সাঈদরে পাঠাইলাম ওনারে সায়দাবাদ পর্যন্ত আগায় দিতে।

আমিনারে হেল্প করতো আরেকটা বাচ্চা মেয়ে। আমিনারে “মা” ডাকতো। উনি বলতেন, ওনার ভাইয়ের মেয়ে।

আমি বিশ্বাস করতাম না, ভাবতাম কোনো জটিল কারণে মিথ্যা বলতেছেন। আসলে হয়তো ওনারই মেয়ে। একদিন ভুল ভাঙলো।

একদিন হঠাৎ রাত ৯টার দিকে সেই মেয়ে আইসা হাজির। দরজা ঠকঠকাইল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার এত রাত্রে তুমি!

সে বললো, কথা আছে স্যার।

আমি বললাম, দরজার বাইরে থিকা বলো।

সে বললো, স্যার ভিতরে না ঢুকলে কথা বলতে পারমু না।

আমি দরজা খুললাম।

মেয়েটা বললো, ফুপুরে আমি “মা” ডাকি। কিন্তু আমার একটা ছেলে আছে স্যার। আমারে ঢাকায় নিয়া আসছে মা। আমার ছেলেরে আমি দেখতে যাইতে পারি না। এইখানে কাজ কইরা পয়সা পাঠাই দেশে।

আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারি নাই এই রকম একটা বাচ্চা মেয়ের নিজেরও বাচ্চা থাকতে পারে।

ওর অনুযোগ খুব সাধারণ, ওদের দুইজনরে দুইটা মোবাইল ফোন কিনা দিছিলাম শস্তায়। তো হইছে কী, ওর ফুপু ওর কাছ থিকা ওর মালিকানাধীন ফোনটা কাইড়া নিয়া গেছে। এখন আমার কাছে বিচার দিতে আসছে মেয়েটা।

আমি কী করবো বুঝতে পারলাম না। জিগাইলাম, আমি কি তোমার ফুপুর কাছ থেকে ফোনটা নিয়া তোমারে দিবো?

ও বললো, না, আমি যে আপনার বাসায় আসছি-না, এইডা আপনে মা’রে কইবেন না!

—ব্রাত্য #রাইসু ২৫/৬/২০১৯ – ১/৮/২০২০

(ছবিতে ২০০৪ ও ২০১৫ সালের আমি। ফটো. Danny Mustafa ও Kamrul Hasnat )

Leave a Reply