Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

সেইসব রাইসু

রাইসুর সাথে আমার পরিচয় হয় ৯০ সালে, আমার ঢাকায় আসার পর। মনে হয় শাহবাগের সিলভানা রেস্তরাঁতেই দেখা হইছিল। কিংবা পিজির সামনে।

রাইসু ৫০ বছরে পড়ছে এই জন্য অল্প কিছু কথা এইখানে স্মরণ করব। রাইসু জন্মদিন ১৯ তারিখ আমার জন্মদিন ২১ তারিখ, প্রায় কাছাকাছি। এইসব জন্ম তারিখের বিজোড় সংখ্যা ভালো লাগে আমার। আমরা বৃশ্চিক রাশির লোক। ফলে কমন গ্রহ-তারার কমন কিছু অনুগ্রহ পাইতে থাকি যেন আমরা পৃথিবীতে!

স্মরণ করতে গেলে লিখায় অতীতের কথা আসে। আর তাতে প্রয়াণময়তার ঘ্রাণ আসি হাজির হয়। অতীত আসক্তি, অতীতের মধ্যে ভ্রমণ যা মূলত নাই, শুধু নিজের কিংবা যৌথ স্মৃতির ভিতর নির্বাসন মনোভাবে ঘোরা। স্থান ও কালে ভ্রমণের দায়বদ্ধতা বোধ হয়।

তখন আশি আর নব্বইয়ের কয়েকজনের আড্ডা হইত নিয়মিত। গাণ্ডীবের লেখকদের কারো কারো সাথে বসতাম। সিলভানাতে কবি ফরিদ কবির আসতেন। ওনার সাথেই বেশি বসতাম আমি। উনি সদালাপী ও অন্যের চিন্তার প্রতি সহনশীলতা ছিলেন। সিনিয়রদের মধ্যে উনার সাথে চলাফেরায় শান্তি পাইতাম। আস্তে আস্তে ৯০ এর দশকের অনেক কবিদের সাথে দেখা হইতে থাকে নতুন আজিজ মার্কেটে।

জহির হাসান

অন্য কবি বন্ধুদের চাইতে আমার রাইসুকে অন্যরকম লাগত। রাইসুর সাথে সিনিয়র কবিদের আর্টিস্টদের বেশি যোগাযোগ ছিল। আড্ডা হইত আজিজে পিজির পিছনে। রাইসু তখন সাজ্জাদ ভাইয়ের (সাজ্জাদ শরিফ) সাথেই বেশি ঘুরত। অল্পবয়েসী সুন্দর বুদ্ধিমতী মেয়ে বন্ধুদের সাথে রাইসু নিঃশব্দে ঋতু বদলের মতো প্রেমে পড়ত, প্রেম চালাইত! ওর মেয়েবন্ধুদের সাথে যন ঘুরত আমাদের সাথে সেইসব মেয়েদের পরিচয় করাইয়া দিত! আবার কখনো কখনো আমাদের পাত্তাই দিত না! ওর কাছে সরলরেখার মতো একটানা কোনো আচরণ পাওয়া কঠিন ছিল।

নানা সার্কেলের সাথে ওর একটা যোগাযোগ ছিল। ওর বেশভুষা কথাবার্তা সব সময়ই আলাদা। ও তাই সবার নজর কাড়ত। ট্র্যাডিশনাল চিন্তারে আগাগোড়ায় ও গলা কাটত। সবকিছুরেই ক্রিটিক্যালি দেখত। সাদা-কালো অবস্থানের বাইরে গিয়া একটা ৩য় বা ৪র্থ অবস্থান নেওয়া সম্ভব ছিল ওর পক্ষে, যা রাইসু এখনো নেয়।

একবার মনে পড়ে পাঠক সমাবেশের (এখন জুসবারের দোকানটা যেইখানে) সামনে বসি আলাপ পাড়তেছি আমরা কারা কারা যেন। রাইসু আসল। দেখি ওর পায়ে একটা স্যান্ডেল, স্যান্ডেলের তলারতে কালার কী যেন উঁকি মারতেছে অসহায়!

আমি আবার খেয়াল করলাম। বইলাম, পা খোলেন, স্যান্ডেলটা দেখি। দেখি স্যান্ডেলে বিপ্লবী চে গুয়েভারার ছবি আঁকা। আমি কইলাম, চে-রে এইভাবে মাড়াইতেছেন পায়ে?

ও হাসল।

বুঝলাম, চে ফ্যাক্টর না। যে কোনো বিগ বিশ্বাসের খুঁটি ধরি নাড়ন-চাড়ন, ধমের্র মতো কাজ করে যেইসব অনড় চিন্তা সেইগুলারে নাড়াই দেওয়া ওর একখান মূল কাম!

কইলাম, কই পাইলেন?

থাইল্যান্ডের।

আমি কইলাম মনে মনে, থাইলান্ডঅলারা তো এই কাম করবেই!

রাইসু মাঝে মাঝে ফিতাঅলা কেডস পরত। কিন্তু ফিতা লাগাইত না! একদিন জাদুঘরে কি একটা অনুষ্ঠানে আমরা গেছিলাম। আামি জিগাস করলাম। এই কাম ক্যান করেন। ও যা কইল, তার মানে করা যায় এরকম—লোকজনরে অপ্রস্তুত রাখতে ব্যস্ত রাখতে চাই আমার ব্যাপারে!

ওর এইসব শোভিনিস্টিক বিষয়গুলি স্ট্রং চিন্তা বা কখনো খামখেয়ালির বশেও করত। ওর সাথে বন্ধুত্বের একটানা বসন্ত কারও যায় নাই। আড্ডায় তর্ক চলত সাহিত্য ধর্ম রাজনীতি নানা বিষয়ে। কবিতারও পাঠ হইত। একবার এডওয়ার্ড সাঈদের ‘রিপ্রেজেন্টশন অব ইন্টেলেকচুয়াল’ বইয়ের অংশবিশেষ পাঠ চলল। এ তো পাঠ না, সাঈদরে কোথাও প্রশংসা কোথাও ভুল ধরায়ে দেওয়ার সামিল। বড় বড় চিন্তাবিদের, বুদ্ধিজীবীদের লিখা পাঠান্তে ভাল-মন্দ দিক খুটায়ে বার করা। প্রশ্ন তুলতে পারার মধ্যেই চিন্তার আগানো পিছানোর ইতিহাস জড়িত ছিল। রাইসু প্রশ্ন তুলতে পারত। এডওয়ার্ড সাঈদের প্যালেস্টাইন ইস্যু ছাড়াও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সব কাজকে আমরা তখন অনেক মহব্বতের সাথে দেখতাম। ফুকো গ্রামসির চিন্তা উনার পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্যচিন্তার ও আলোচনার পদ্ধতিগত দিকটা উনার কাজেরে ইন্ধন যোগাইছে।

ঢাকা শহরের নানা জায়গায় নানা বন্ধুর বাসায় আড্ডায় গেছি রাইসুর ডাকে। অনেক সময় তরিকার বাইরের লোকদের বাদ দেওয়া হইত। অনেক আড্ডায় মদ পান চলত। রাইসু মদ খাইত শুধু। গাজা সিগারেট প্যাথেডিন না মারত! তার এই স্বাস্থ্য ও দেহ সচেতনমূলক অগ্রহণ আমার সাথে যাইত। আমি মদ পান করতাম না তবে হোমিওপ্যাথি ঔষধের মতো এক গ্লাস পানিতে কয়েক ফোটা মদ নিয়া না-মদ না-পানি খাইতাম। তাতেই আমার ভাল নেশা হইত! কারো কারো কাছে আমারে চরিত্রশূন্য পানপাত্রই লাগত। কিংবা নেহাতই বেরসিক!

মদপান ছাড়াও অনেক আড্ডা হইছে। আমাদের এইসব সামাজিকতা চলত অনেক রাত অবধি! শুধু একদিনের কথা বলি, (বলা ঠিক হইতেছে কিনা?) রাইসু একটা নতুন বারে অনেক মদ খাইল। ময়ুরী না, সাকুরা না। বোধহয় ইস্টার্ন প্লাজার আশেপাশে কোথাও। বোধ হয় আমরা ৩জনই ছিলাম। এক উঠতি অভিনেতা (বড়ভাই সুলভ আচরণের কারণে তারে আমার অপছন্দ), রাইসু আর আমি। রাইসুও ইতোমধ্যে একটা নাটকে নাকি অভিনয় করছে কিংবা করতেছিল। রাইসু অভিনীত নাটকটা আমার দেখা হয় নাই।

ঐদিন রাইসু মাত্রাতিরিক্ত মদ খায়। ও তখন বোধহয় অস্ট্রেলিয়া ফেরত, ভুলি গেছি! ও থাকত ওর ওয়াইফের সাথে ডলফিন গলির ভিতরে উঁচা একটা বাসায়। বারেরতে নামার পর ঐ অবস্থায় ও বাসায় যাইতে চায় নাই। একটা রিকশা নেওয়া হইল। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর আসলাম। নামলাম। লেকের পাড়ে নিচের দিকে যাই আমরা বসি। ভেজাল হইল, রিম ঝিম বৃষ্টি শুরু হইল। রাইসু কইল, জহির আমি একটু আপনার কোলে হাঁটুর পর মাথা রাখি শুই? অতিরিক্ত মদ খাওয়ায় ফলে শরীর টলকাই গেছিল ওর। আমি কইলাম শোন। অনেকক্ষণ চোখ বুজি থাকল ও। রিম ঝিম বৃষ্টির ক্ষেমতি নাই। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি কইল, জহির, জীবনে টাকা-পয়সা কিছু না! রাইসুরে হতাশ চেহরায় এইভাবে কথা বলতে কোনোদিন দেখি নাই। সেই প্রথম দেখলাম। বৃষ্টির তাড়া বাড়তেছিল। দেখলাম যে বেশি ভিজা ঠিক না! আমরা আরেকটা রিকশা নিই। যাই ওর বাসার সামনে। রাইসুরে বিদায় দিয়া আমাার কাঁঠাল বাগানের বাসায় আসব। ওর বাসার সামনে একটা সাদা গাড়ি দৌড়াই আসি রাস্তায় জমি থাকা পচা পানি আমার সাদা শার্টে ছিককায় পড়ল। প্রথমত খারাপ লাগলেও পরে দেখি যে আমি শরীর যেন একটা ক্যানভাস তাতে কাদাজলের অ্যাবসট্র্যাক্ট আর্ট আঁকা হইছে। কী করা!

মনে পড়ে আর্টিস্ট রনি আহম্মেদের বাসায় উত্তরাতে আমরা আড্ডা দিতাম। মঈন ভাইয়ের বাসায়, লিপুর বাসায়, আলী সাহেবের বাসায় ইস্কাটন গার্ডেনে, কাজী জহিরুলের বাসায়, ফরহাদ ভাই, সলিমুল্লাহ ভাইদের টোলে, আলিয়াঁসে, টিএসসিতে, জার্মান কালচারে, ছবির প্রদর্শনীতে, সিনেমার প্রদর্শনীতে, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে, মধুর ক্যান্টিনে, বাংলা একাডেমির বইমেলায়। আরো অনেক জায়গায়। শেষমেশ শেষের দিকে রাইসুর পান্থপথের ১৬ তলার বাসাতে।

এর মাঝে প্রায় ৭ বছর কোনো কবিতাই লিখি নাই। রাইসুর সাথেও ৬/৭ বছর দেখা হয় নাই। একটানা এখন কবিতায় আমরা যেমন সিরিয়াস তখন আড্ডাও হইত সিরিয়াসলি। আজ আর সেইসব পুরানা বাসাগুলির কতেক আর নাই। মনে হয় সেইসব রাইসুমিশ্রিত আড্ডাগুলি পুরাই আলাদা!

রাইসুর আরেকটা সার্কেল ছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত কেন্দ্রিক। সেইগুলায় আমি যাই নাই তেমন। তো আমার এক বন্ধু ছিল তীব্র আলী।ও ফিজিক্সে পড়ত, আমি কেমিস্ট্রিতে, পাশাপাশি ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওদের বাসাতেও আমরা আড্ডা দিতাম শাহাজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনিতে। মিলান কুন্ডেরা, কাফকার উপন্যাস ও গেয়র্ক ট্রাকলের কবিতা তীব্র খুব লাইক করত! আমারও কাফকার লিখা খুব পছন্দ ছিল! কাফকার পিতার একটা কনসেপ্ট আছে। কর্তৃত্বময় এক পিতা ঈশ্বরের মতো। কিংবা পিতাই ঈশ্বর। চাপি বসা অর্থ (মিনিং) মানুষের জীবনে নিজের তৈয়ার করা অর্থের কোনো মূল্য নাই। ব্যাক্তির উপর রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিস্তার চির জারি থাকার আ্যালিগরি। থাকার। মুক্তি স্বাধীনতার নাম সেইখানে মৃত্যু! বাট কাফকার এইসব হতাশাময় অ্যালিগরিক্যাল লিখা রাইসুর ভালো লাগত না যতদূর মনে পড়ে! এইসব নিয়া আমাদের নানা মত চলত!

নব্বইয়ের প্রথম দিকে মঈন ভাইয়ের ‘প্রান্ত’ পত্রিকার একটা ইস্যুর দায়িত্ব নিছিল রাইসু। ওর আঁকা প্রচ্ছদে ঐ সংখ্যা ছাপা হইছিল। তখন আমরা যারা নব্বইয়ের কবি তাদের একটা বিপুল অংশগ্রহণমূলক সংখ্যা হইছিল। স্যানে আমার প্রথম অণুগল্প ছাপা হইছিল। মনে পড়ে আমাদের বন্ধু মাসরুর আরেফিন আসলো আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স শেষ করি। ওর বিশ্বসাহিত্যের অনেক পড়াশুনা ছিল। মাসরুর-রাইসু অনেক অনেক খাতির হয় পরে। পরে দ প্রকাশন (রাইসুর নিজস্ব পত্রিকা ও প্রকাশনা) থেকে মাসরুরের একমাত্র কবিতার বই বার হয়।

রাইসু আগাগোড়া ছবি আঁকত। কবিতার পাশাপাশি। আমরা জানি যে রাইসুর ছবি আঁকার একটা নিজস্ব ধরন আছে। একবার আহমাদ মাযহার ছবি আঁকার এক আড্ডায় কইছিলেন আমারে, রাইসু মূলত আর্টিস্ট, কবিতা লিখার চেষ্ট করে। আমি মাযহারের সাথে একমত না! শাহবাগে মাঝে মাঝে দেখতাম ছবি আঁকার বাঁধাই করা খাতা-পেন্সিল হাতে রাইসু। আমিও আঁকতাম আমার বিশ্ববিদ্যালয় হলে সবাই ঘুমাইলে। সেইসব ছবি কাউরে দেখাইতাম না! সেইসব খাতার কিছু কিছু আজও আছে। আমাদের সময়টায় তখনও বোধ হয় স্পেশাল কিছু হওয়া নিয়া ব্যস্ত হই নাই আমরা।

ছবি, গান, কবিতা, ফিল্ম দেখা এক সাথে সবই চলত। একটা হলিস্টিক জগৎ আমরা নষ্ট হইতে তখনও দিই নাই । সব কিছুতে রাইসু এক বিশেষ বোদ্ধা এই বিষয়টা ছিল। কারণ ও দেখতাম সব কিছুই নিত না। অনেকের অনেক দেখাশোনারে বুজরে বেদম খারিজ করত! একবার রিয়াজুর রশীদ গল্পকার, রিয়াজ ভাইয়ের বাসায় ছবি আঁকার ডাক দিল রাইসু। সবাই চেষ্টা করলেই কিছু না কিছু আঁকতে পারেই এই একটা বিশ্বাস ছিল আমাদের। ফোঁড়ার মুখ কাটলে নিচেরতে রস বার হইতে থাকে। সো আকার প্রাথমিক চেষ্টা করলে কারো ভিতর ছবি থাকলে বার হইবেই। সেই সময় রিয়াজ ভাইয়ের বাসায় ছবি আঁকতে আসত রাইসু, আমি, নাদিয়া ইসলাম, গল্পকার রাশিদা সুলতানা, ফরিদা ভাবী ও আরো অনেকে। সেইসব আঁকা ছবি সামহোয়ার ব্লগে আপলোড হইত নিয়মিত। নাদিয়ার ছবি আঁকায় ছোট বয়সেই মুন্সিয়ানার ছাপ ছিল।

এরও আগে মনে পড়ে রাইসু অস্ট্রেলিয়া থাকতে (২০০৩-৪) অনলাইন ইয়াহু গ্রুপের মাধ্যমে ‘কবিসভা’র প্রবর্তন করে। পরে বাংলাদেশে ফিরার পরেও তাহা চলিতে থাকে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কবিতা ছাপা হইতে থাকে স্যানে। লিখার পাশাপাশি কবিতার আলোচনার পাশাপাশি দলাদলিও প্রচুর হয়। শুনছি উৎপলকুমার বসুও যোগ দিছিলেন ‘কবিসভা’তে। পরে তিনি কী কারণে ঐ গ্রুপ ত্যাগ করছিলেন জানি না।

সেইখানে আমার কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিনের মন্তব্যে আমি বিব্রত হই। সবচাইয়ে আরেকটা ক্ষতিকর আলোচনায় জড়ায়ে পড়ি আমি। তখন ২০০৬ সাল উৎপলকুমার বসু ঢাকায় আসেন জাতীয় কবিতা পরিষদের আমন্ত্রণে। উনার একটা সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি আমি। উৎপল বসুরে আমি আর আমার এক আত্মীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (উৎপলের পরিচিত) উনারে উনার বাপ-দাদার ভিটা মাটি দেখানোর লাগি বিক্রমপুরের মালখা নগর গ্রামেও নিয়া যাই পরে।

যা হোক, উৎপলের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রাইসুর অনুরোধে ওর ‘কবিসভা’তে ছাপা হয়। পরে অনেকে ঐ সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য আমারে ভূয়সী প্রশংসা করে। সলিমুল্লাহ ভাই মেসেজ করি নিন্দা জানাইছিলেন! কলকাতার কবি হিসেবে উৎপলের তেমন কবিতা হয় না! ইত্যাদি।

সলিম ভাইয়ের উৎপলের কবিতা বিষয়ে এইরূপ নিজস্ব চিন্তা থাকতেই পারে। ঐ সাক্ষাৎকার নিয়া বিশাল আপত্তিকর মন্তব্য করেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। তিনি কইছিলেন, আমি কোন অথরিটি বলে উৎপলকুমার বসুর সাক্ষাৎকার নিছি? উৎপলই বা কেন আমার কাছে ইন্টারভিউ দিলেন।

সুব্রতদার এই বড়ভাই তথা দাদাগিরি মার্কা বাংলা সাহিত্যের লিজ গ্রহীতাসুলভ মন্তব্যে আমাদের কবিবন্ধু সুমন রহমানও আমার মতো ক্ষুব্ধ হইছিল। শাহবাগে সুমনের সাথে দেখা হইলে সে আমারে তা জানায়।

আমি পরে সুব্রতদারে কড়া উত্তর দিছিলাম। সাজ্জাদ শরিফ কইছিলেন, আমার নাকি প্রশ্নই হয় নাই। এছাড়া নানা রকম তাচ্ছিল্য করি মন্তব্য করছিলেন সাজ্জাদ ভাই।

মনে পড়ে ঐ সাক্ষাৎকারে আমার প্রশ্ন বিষয়ে সাজ্জাদ ভাইয়ের অন্যায্য আপত্তিগুলার উত্তর দিতে দেরি হয় আমার। কারণ তখন আমি পারিবারিক কিছু ঝামেলার মধ্যে ছিলাম। পরে রাইসুর সাথে দেখা হইলে রাইসুও সাজ্জাদ ভাইয়ের অন্যায্য আপত্তিগুলা পছন্দ করে নাই বলে আমারে জানায়। সমস্যা হইছিল সাজ্জাদ ভাইয়ের আপত্তিগুলার পাশাপাশি আমার কড়া উত্তরগুলা যোগ করি উৎপলের সাক্ষাৎকারখানা সবার নিকটে পাঠানো হয়, তা লিংকে দিছিল রাইসু। লিংক ওপেন না হওয়ায় আমার উত্তরগুলা আগ্রহীরা আর পড়তে পারে নাই।

যাহোক, সেই সময়ে রাইসুই এই দেশে প্রথম ইয়াহু গ্রুপের মাধ্যমে কাব্য-সাহিত্য চর্চার প্রচলন করে, ফলে ট্র্যাডিশনাল ছাপানো কাগুজে সাহিত্যপাতার বাইরেও তার প্রচার-প্রসার হইছিল।

তো, সাজ্জাদ ভাই আর সুব্রতদার ঐ দাদাগিরি আচরণের পর তাদের সাথে সম্পর্কও তিক্ত হয়। ক্ষুদ্র আমারে ছাড়াও যেহেতু সমাজ চলে অতএব, আমি চুপ যাই তখন।

রাইসু ভালো কবিতারে প্রমোট করত। বাজে লিখা খুব কম ছাপত। ওর সম্পাদনার একট মান থাকত। রাইসু ‘প্রথম আলো’ ছাড়ার পর ‘প্রথম অলো’র সাহিত্য পাতার দশা করুণ হইতে থাকে। রাইসু ‘প্রথম আলো’ ছাড়ার পর আমি আর কোনোদিন ঐ অফিসে গেছি কিনা মনে নাই। যেইটা ‘বিডি আর্টসে’ও দেখছি। রাইসুর ‘বিডিনিউজ’ ছাড়ার পর ‘বিডি আর্টসে’র পাতা বাজে হইতে শুরু করে। এইখানে বলা ভাল আমার ২য় কবিতার বই ‘গোস্তের দোকানে’র বইয়ের আলোচনা ছাপা হয় ‘বিডি আর্টসে’। সেইটাই ছিল ‘বিডি আর্টসে’র প্রথম বইয়ের আলোচনা। আলোচনা করছিলেন আলম খোরশেদ।

রাইসু তখন ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য পাতা দেখত। আমি ‘প্রথম আলো’ অফিসে মূলত রাইসুর সাথে আড্ডা সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাইতাম। অনেক সময় এক সাথে ৬/৭ টা করি কবিতা দিই রাখতাম। সময় সুযোগ মতো ওর ভাল লাগলে ঐসব কবিতারতে বাছাইকৃত কবিতা ও ছাপত।

‘প্রথম আলো’তে আমার যে ৮/১০টি কবিতা ছাপা হইছিল তা মনে হয় রাইসুর কারণেই। রাইসু আমার লিখারে তখন গুরুত্ব দিত তাই হয়ত আমার প্রথম বই ‘প্রথম আলো’র টপ টেনে স্থান পাইছিল।

রাইসু অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে নাকি ‘প্রথম আলো’ সাহিত্য পাতার দায়িত্বে যে পরে আসে তারে বলে গেছিল জহিরের বইটা যেন বাদ না পড়ে। পরে রনি আহম্মেদ একটা আলোচনা লিখে আমার প্রথম বই ‘পাখিগুলো মারো হৃদয়ের টানে’ নিয়া।

রাইসুর এই রকম বন্ধুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার কথাই মনে আছে। সলিমুল্লাহ খান সাহেব একবার আমার কানের কাছে মুখ আনি ‘প্রথম আলো’ অফিসে বলছিলেন, আমি আপনার কবিতার ভক্ত! তখনও ফিজিক্যালি সলিম ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ঘটে নাই। আমি অবাক হইলাম আমার মতো মুখচোরা লোকের কবিতা উনি কোথা হইতে পড়লেন। পরে জানছি রাইসুই নাকি উনারে সেই যুগের আবির্ভূত ভালো কবিতার স্যাম্পল হিসাবে আমার বইটা পড়ার তাগিদ দিছিল। যা হোক এত বিস্তারিত সেইসব বলার স্পেস কম। মোট কথা রাইসু ভাল লিখারে সবসময় আগায়ে রাখতে পছন্দ করত।

আবুল হাসান মার্কা শোকগ্রস্ত কবিতারে রাইসু সরাসরি খারিজ করত! অস্তিত্ববাদী ঘরানার শোক, আলগা ভুয়া বানানো দুঃখী, গ্লুমি, ক্লিশে উন্নয়নমূলক সাহিত্য-কবিতা রাইসুর ধারে কাছে ভিড়তে পারত না!

ফর্মের প্রতি রাইসুর অগাধ লৌকিক টান। রাইসুর কবিতায় ভাবরসের দিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে উইট আসে তার সাথে একটা হেয়ালির যোগ থাকে, ফলে প্রচলিত হাস্যরসের চেহারার মাত্রা পাল্টায় যায়। নতুন একটা রস তৈয়ার হয়। এই রসের নতুন নামও দেওয়া যাইতে পারে। এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিগনেচার ওর কবিতায়। ভবিষ্যতে হয়ত সিরিয়াস কেউ এই রস-ভাষা নিয়া কথা তুলবে আমি নিশ্চিত।

রাইসুর লিখার ফর্মের দিকটায় আমার মনে হয় পুরানা কবিতার ঐতিহ্যিক জিনিসপত্র থাকে। কিন্তু তা রূপ পাল্টাতে ব্যস্ত রহে, নতুন একটা বাস্তবতায় হাজির হয়। সূক্ষ্ম জিনিসপত্র ধরার প্রতি যত্ন লক্ষ্য করা যায়।

কবিতায় বিনির্মাণ ও অ্যান্টিলোগোসেন্ট্রিক অবস্থান নেয় রাইসু। ফলে প্রতিষ্ঠিত চিন্তা-ভাবনার সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদ অস্বীকার ও বাতিলের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সচেতন একটা ডায়নামিক্স পাওয়া যায় ওর সব কবিতাতেই। এই অবস্থায় কবিতা কার্যত হইতে হয় আক্রমাত্মক উইট, লাইটনেস আনার জন্য সিরিয়াস চিন্তারে টলায়ে দেওয়ার কার্যক্রম। ওর কবিতায় ভাড়ামির পয়দা তাই দৈব কিছু না, আবশ্যক। সেই অর্থে রাইসু কবিতায় লাইটনেসের বড় দোকানদার। সিরিয়াস চিন্তারা লাইটনেসের বাড়িতে য্যাবত খাইতে আসে।

ঘুরি ফিরি মধ্যবিত্ত প্রায় সকল লেখার যেন কেন্দ্রে আসি পড়ে। উল্লেখ করতে দোষ নাই এইসব জিনিসের কিছু আমরা উৎপলের কবিতায়ও দেখি। রাইসু এইসব অভিজ্ঞতা উৎপলেরতে নিতে পারছে কিছু মাত্রায় হয়ত। উৎপলের ভিতর ইন্টারটেক্সুয়াল ও বিনির্মাণের প্রচুর ব্যবহার আমরা লক্ষ্য করি। পিছনে গেলে ভাষার ভিতর ব্যাপক মোচড় ইনক্লুশন ভারতচন্দ্রের ভিতর এইসব বেশি পাওয়া যায়। আরবান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও লাইফ স্টাইল এমনকি প্রেম সব রাইসুর কবিতায় সমালোচিত হইতে আসে। মোট কথা অবিকশিত আরবান মধ্যবিত্ত একটা ঝোপ, তারে রাইসু নানা পদে যথেষ্ট কোপাইছে। ওর গল্পগুলাতেও এইসব আসে। মোট কথা ওর নিজের চিন্তাটাই ওর লেখায় আসে।

নিজের লিখা যেন নিজের চেহারার মতো দেখতে লাগে। এই প্রচেষ্টা ওর লিখায় আমি পাই। দেহকেন্দ্রিক সাহিত্য প্রচেষ্টা বলি আমি এইটারে। তার মানে এই নয় যে কল্পনা ফ্যান্টাসি বাদ বরং তা রাইসুর লিখাতে আমি বেশি পাই। কল্পনা দেহেরই অংশ।

সংক্ষেপে রাইসুর কবিতা আমার ভাল লাগে আগাগোড়াই। প্রকাশিত ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ ও ‘হালিকের দিন’ এই দুইটা বইয়ের সকল কবিতাই আমার পড়া। রাইসুর কবিতা পড়লে বোঝা যায় এইটা রাইসুরই। এই স্বকীয়তার প্রাপ্তিযোগ ঘটে কয়জন কবির জীবনে!

ফেইসবুকে, ছাপানো পত্রিকাসূত্রে অনেক কবিতা পড়িছি ওর। ইহকালে সময় করি একটা আলোচনা লিখব ওর কবিতা নিয়া ভাবতেছি। ওর কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ৫০ পৃষ্ঠাধিক আলোচনা আমার তত ভালো লাগে নাই। সেইখানে সুব্রত দেখাইছেন রাইসু ছন্দ অলংকারে বিশাল উস্তাদ! কবিতায় তাহার ব্যাপক প্রয়োগ ঘটিয়াছে! বরং আমি মনে করি স্পিরিটের জায়গায় রাইসু সীমা লংঘনই পছন্দ করে। বলতে গেলে সীমা লংঘনই রাইসুর কবিতা।

বর্তমানে রাইসু বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেছে। ওর যুক্তি-তর্ক, সেকুলার বিরোধিতা, নানা জাতীয় ব্যক্তিগত বিষয়ে মত রাখতেছে। এইগুলা স্ট্রাকচারড না। গোছাই এক জায়গায় করলে হয়ত একটা অর্থ কার্যকর মিনিং তৈয়ার করি চিন্তা হিসাবে দাঁড়াইতেও পারে।

এ জীবনে অনেক বন্ধু পাইছি। সবাই ক্ষণকালের। এইটাই বন্ধুত্বের বিউটি। রাইসুর সচেতন সতর্কমূলক (রাজনৈতিক) মেলামেশা চলাফেরা অনেক দেখছি। সব আড্ডায় আলোচনায় সবাইরে সে রাখতে পছন্দ করে না। অনেক সময় এইসব নিয়া সম্পর্কের তিক্ততা তৈয়ার হয় নাই এমন না! সেইসব আমি তেমন মনে রাখতে চাই না! আমার স্পিরিচুয়ালিটি আমার ধর্ম আজ আর আমার মনের আয়েশের এই সম্পর্কের এইদিকটার হেরফেরের মধ্যে আটকাই নাই!

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

কুইন্টিসেনশাল রাইসু

১৯৯৪ সালের গোড়ার দিকে একটা জিনিস আমি মনে মনে বুঝে নিয়েছিলাম: সাহিত্য করতে হলে সাহিত্যসমাজের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেই তরুণদের সঙ্গে, যারা নতুন ধরনের সাহিত্য তৈরির চেষ্টা করছে। আমার জন্যে সেটা খুব কঠিন ছিল।

আমি তখন চারুকলা ইনস্টিটিউটে (এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হয়েছি। থাকি জগন্নাথ হলে। বৃহত্তর সাহিত্য সমাজের সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। সেই যোগসূত্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে একদিন সন্ধ্যারাতে আমি যখন উপযাচিত হয়ে এগিয়ে গেলাম শাহবাগের আজিজ মার্কেটে সন্দেশের বইয়ের দোকানের সামনে ফুটপাতে আড্ডারত কয়েকজন তরুণের দিকে, তখন ওই তরুণদের একজন ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে।

শিবব্রত বর্মন

রাইসুর তখন কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল। ফুলহাতা শার্টের হাতা এলোমেলো গোটানো। এই ব্যাপারটা আমার বিশেষভাবে চোখে পড়েছিল। শার্টের হাতা ওইভাবে কাউকে কখনও গোটাতে দেখিনি আমি। পায়ে স্পঞ্জের চপ্পল। প্যান্টের নিচটা গোটানো। এই বেশভূশার সঙ্গে একেবারেই বেমানান ছিল তার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতপ্রীতি। থেকে থেকেই সে কুমার গন্ধর্বের কোনো একটা কলি উচ্চৈস্বরে গেয়ে উঠতো। মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হতো ওই সময়ের জনপ্রিয় হিন্দি গানের কলি “লোয়ে লোয়ে আজা আজা মারি।” আমার চোখে এরকম একজন তরুণ ছিল টোটালি আনপ্রেডিকটেবল। ওইদিন একগাদা বই হাতে দাঁড়ানো আমাকে উদ্দেশ করে রাইসু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনে কী পড়েন?’

আজিজ মার্কেট রেগুলারদের মধ্যে রাইসুর সঙ্গে দ্রুতই আমার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। এটা একটু অসম বন্ধুত্বই ছিল বটে। কেননা, শাহবাগে ওইসময় তরুণদের মধ্যে লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার যে স্পন্দন ছিল, তার কোনোকিছু তখনও আমার মধ্যে তৈরি হয় নি। আমার সাহিত্যরুচি তখন দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রশাসিত। রাইসু আমার ঠিক বিপরীত। সে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমি বলব, ওইসময় ওই বর্গের মধ্যে রাইসুই ছিল সর্বান্তকরণে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমার পরিচিতজনদের মধ্যে সে-ই একমাত্র ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করতে গিয়ে যে কোনো সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা করে নি। আর বিশেষ করে মানুষে মানুষে দৈনন্দিন সম্পর্ক তৈরিতে ক্ষমতাকাঠামোর যে ছায়া পড়ে, তা পরিহারে সে বিশেষভাবে যত্নবান ছিল। এর একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটতো বয়স নির্বিশেষে এক প্রজন্মের সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করার মধ্যে। বয়সে আমি তার চেয়ে বছর পাঁচেক ছোট হলেও সে আমাকে আপনি করে বলে।

রাইসুর সঙ্গে টই টই করে রিকশায় ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ানো আমার নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। মাঝে মাঝে আমি সকালবেলা বাসে করে রাইসুর মধ্যবাড্ডার বাসায় চলে যাই। সেখানে তার নতুন কেনা ঢাউস সাইজের গান শোনার যন্ত্রে আমরা খানিকক্ষণ মল্লিকার্জুন মনসুর বা ওঙ্কারনাথ শুনে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি গুলশানের দিকে। তখন ঢাকা শহরে ভিআইপি রোড বলে কিছুই ছিল না। আমরা রিকশায় করে যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। মাঝে মাঝে রাইসু আমার জগন্নাথ হলের রুমে এসে হাজির হতো। দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা ছেড়ে আমি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। আবার কখনও কখনও সে চারুকলায় গিয়ে আমাকে ক্লাসরুম থেকে বের করে আনতো। কত কত লোকজনের বাসায় যে রাইসু যেত। শান্তিনগরে মঈন চৌধুরীর বাসা, রাজারবাগে তীব্র আলীদের বাসা, বাংলা মোটরে আহমদ ছফার বাসা ইত্যাদি। মনে পড়ে রাইসুর সঙ্গে একবার হুমায়ুন আহমেদের এলিফেন্ট রোডের বাসাতেও গিয়েছিলাম। কেন যাওয়া হয়েছিল, এখন আর মনে পড়ছে না।

ওই সময় আমাদের যাওয়ার আরেকটা জায়গা ছিল গ্যাটে ইনস্টিটিউট। ফিল্ম সোসাইটিগুলি তখন দারুণ সক্রিয় ছিল। তারা নিয়মিত ছবি দেখাতো। ফেলিনি, ত্রুফো, গদারের ছবি দেখে গ্যাটে ইনস্টিটিটিউটের ছাদে চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে অভ্যাগতরা ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ঘরানা ও প্রবণতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতেন। সেই পরিবেশে রাইসুর উপস্থিতির সঙ্গে আমি মিল খুঁজে পেতাম দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে উপন্যাসের লর্ড হেনরি চরিত্রটির। লর্ড হেনরি লন্ডন শহরের ভিক্টোরিয়ান কালচারকে কটাক্ষ করতেন। রাইসু তার সময়কার কালচারের নির্মম ক্রিটিক করতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কটাক্ষের লক্ষ্যবস্তু হতো যাবতীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং তাদের সাহিত্যতত্ত্ব। সে সময় দেরিদা আর ডিকনস্ট্রাকশন শব্দগুলো আজিজ মার্কেটের করিডোরে খুব ধ্বনিত হতো।

আমার সঙ্গে রাইসুর যখন পরিচয়, তখন রাইসু মঈন চৌধুরী সম্পাদিত লিটল ম্যাগ প্রান্ত-এর দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার জন্য উপকরণ সংগ্রহ করছে। আমাকে সে হাইডেগার অনুবাদ করতে দিলো। আর বললো, গল্প দেন। প্রান্ত ম্যাগাজিনে আমার গল্প ছাপা হয়েছিল। তাতে লিটল ম্যাগাজিনের ওই সময়কার ভাষাভঙ্গির অনেক ছাপ ছিল, বুঝতে পারি।

পরিচয়ের মাসখানেকের মধ্যে আমাকে একবার গ্রামের বাড়ি যেতে হয়েছিল। ট্রেনে যাবো। রাইসুকে বলামাত্র সে বললো সেও যেতে চায়। আমি বাড়িতে চিঠি লিখে দিলাম যে, এবার আমার সঙ্গে ঢাকার একজন কবিবন্ধু থাকবেন। কাজেই বাসাটা যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাফসুতরো দেখায় এবং আমার বন্ধুর অপরিপাটি বেশভূশায় তারা যেন অবাক না হন।

রাইসু আমার সঙ্গে আমার সৈয়দপুরের বাসায় গিয়েছিল। সেবার আমরা নানান জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছি। ডোমার উপজেলায় আমার নানাবাড়িতেও গিয়েছিলাম। তাছাড়া গিয়েছিলাম রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। ঠাকুরগাঁওয়ে সিংরা ফরেস্ট নামে একটি শালবন আছে। সেই বন রাইসুর ভালো লেগে গেল। আমরা কান্তজীর মন্দিরও দেখতে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ে রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পর আমার বাবা রাইসুকে হারমোনিয়াম সহযোগে অনেকগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শুনিয়েছিল। রাইসুও দুয়েকটা গাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এখনও বাবা ঢাকায় এলে জিজ্ঞেস করেন, ব্রাত্য রাইসু কেমন আছে? ও কি ওরকমই আছে? আমি বলি, ওরকমই আছে। বলতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, ২৩-২৪ বছর ধরে একটা লোক সম্পর্কে কত অনায়াসে আমি শব্দটা প্রয়োগ করতে পারছি।

ইত্যবসরে রাইসুর জীবনাচরণে পরিবর্তন খুব অল্পই এসেছে। তফাতের মধ্যে তার চারপাশের ঢাকা শহরটা বদলে গেছে। বদলে গেছে সামাজিক মেলামেশার ধরন। এখন মেলামেশাটা ভার্চুয়াল জগতেই বেশি হয়। রাইসু এই জগতের অতিসক্রিয়দের একজন। তাতে একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন এই হয়েছে যে, রাইসুর পরিচিতি ঢাকার বাইরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর দ্বিতীয়ত এই ভার্চুয়াল জগতে রাইসুর উপস্থিতি একটি লিখিত বা টেক্সুয়াল উপস্থিতি। রাইসু তখনই অস্তিত্বশীল যখন সে কোথাও কোনো দেয়ালে কিছু লিখছে। এই প্রকারে রাইসু একটি সাব-কালচারের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। অনেকে মনে করেন, এই সাব-কালচার মূলত রাইসুর ভাষাভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। আমি বলবো, ব্যাপারটা শুধুই ভাষাভঙ্গির নয়। রাইসুর বক্তব্যের কনটেন্টই এই সাব-কালচারের মূল চালিকাশক্তি। এই কনটেন্টের একটি স্পর্শযোগ্য বস্তুগত রূপ দেখতে পাওয়া যায় কুতর্কের দোকানের মধ্যে। আমি মনে করি, কুইন্টিসেনশাল রাইসুকে খুঁজে পাওয়া যাবে কুতর্কের দোকানের পোস্টগুলোর মধ্যে। এগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার।

মোহম্মদপুর, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭