Categories
শব্দকল্পদ্রুম

শব্দকল্পদ্রুম: ‌‌’বুদ্ধিজীবী’

গণতান্ত্রিক সমাজে, সাধারণ মানুষের চাইতে কম কাণ্ডজ্ঞান ও অধিক তথ্য ধারণকারী অর্গানিক বস্তুদশার নাম বুদ্ধিজীবী।

একই ধরনের কথা কে কে আগে বলছেন তার হদিস প্রদানের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্ব ও উৎকর্ষ নির্ণীত হয়।

এই বর্গের স্তন্যপায়ীরা সাধারণত রাজধানীতে ঘাপটি মেরে থাকে। এরা ইউনিভার্সিটি গ্রান্ড কমিশন, ভিনদেশি সাহায্য সংস্থার অদরকারি অনুবাদ ও খবরদারি উপার্জন পদ্ধতিতে বারোমাস নিষিক্ত থাকে।

আপন মুখনিসৃত বাণীসমূহের ব্যাপারে এই জৈববস্তুটি সবচাইতে নিশ্চিত ধারণা পোষণ, প্রমাণ ও প্রচার করে।

প্রধানত প্রতিপত্তি ও দ্বিতীয়ত অর্থের বিনিময়ে জনস্বার্থের অবিরল গোয়া মারাই বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক অবদান।

সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে বুদ্ধিরা হানা দিয়ে থাকে। তুলনায় অধিক বুঝদার গণমানুষের মগজ ধোলাইয়ের নিমিত্তে এরা সেখানে অন্য বুদ্ধিদের সঙ্গে তথ্য ও নিশ্চিতি বিনিময় করে। লোকে এই লেনদেনকে ‘টকশো’ নামে অভিহিত করে থাকে।

১৩/১/২০১৪

Categories
বই

পোড়া বইগুলা ও জলে ডোবা মাঠে

sh1

পোড়া আর আধপোড়া বই দিয়া বাগান সাজাইয়া রাখছে বইমেলা কর্তৃপক্ষ। ইনস্টলেশনের মতো লাগলো। চারদিকে বেড়া দেওয়া। অন্ধকার। শিক্ষার বিকল্পময় পেশাগত আধা গাম্ভীর্য লইয়া কয়টা পুলিশ খাড়ানো। পুকুর পাড় থিকা আবার ঘুইরা যাইতে হইল অন্যদিনের স্টলে। সিদ্ধার্থদার বইটা কিনতে গেছিলাম । ‘জলে ডোবা মাঠে, সারারাত’।

সঙ্গে হুমায়ূনের রেখে যাওয়া বই কিনলাম–দেয়াল, হিজিবিজি। মাজহারুল ইসলামের ‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নয় রাত’ কিনলাম। মাজহার ভাই বলেন, আপনি কেন কিনতে গেলেন! তিনি বললেন, এখন দুইটা বই এমনি নিয়া যান। আমি পছন্দ করলাম শাকুর মজিদের ‘নুহাশপল্লীর এইসব দিনরাত্রি’ আর মাজহার ভাই দিলেন ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেরা পাঁচ উপন্যাস’।

‘হিজিবিজি’টা শুচিস্মিতা তিথিরে দিলাম। তারে পঞ্চাশ টাকা দামের একটা বই কিনা দিব বইলা ধইরা বাইন্ধা মেলায় নিয়া গেছিলাম, যেহেতু। তিথি পারমিতার বোন। বাসায় আইসা সিদ্ধার্থদার বইটা খুইলা প্রথমে দেখলাম ‘বরিশাল’ কবিতা। কী সুন্দর ঘোরলাগা বর্ণনা:

প্রপেলার ঘুরে চলে, ঘুরে চলে, ঘুরে ঘুরে প্রপেলার

ঢুকে যায় ঘুরে ঘুরে চলার চিন্তায়,

নদীপাড় ঘুরে আসে জলরব, তারাদের ছুঁয়ে এসে, জল কেটে,

পুনরায় পানির ভিতরে ঢোকে, বের হয়, পথ ভ্রষ্ট হয়ে একা

আপন উৎস থেকে ভেসে ভেসে জলচাকা কোথায় যে যায়;

 

আমার আবার পোড়া বইগুলারে মনে পড়ে। ওরা–বিক্রি হইতে না পারা বইগুলা ছিন্ন, বিধ্বস্ত, হতাশ, উল্টাপাল্টা পইড়া রইছে মাটিতে। পুলিশ ওদের পাহারা দেয় কেন!

২৭.২.২০১৩

Categories
ব্লগ

মা রে!

এইখানে এই স্কয়ার হাসপাতালের কোনাকুনি দক্ষিণ দিকটায় ষোলো তলায় আমি থাকি সাত বছর। নিচে হাসপাতালে ঢোকার রাস্তাটা আর তার পাশের রেস্টুরেন্টের কোনাটা দেখা যায় বারান্দা থিকা। আমার বারান্দায় একটা করমচা গাছ, একটা লেবু গাছ, বেলি ফুলের রোগা একটা গাছও আছে। ওনার পাতারা খয়েরি হইয়া যাইতেছে। এক চিলতা বারান্দা, তাই আমি আর সেইখানে তেমন দাঁড়াইও না। প্রায়ই রাতে লোকজন কান্নায় হঠাৎ ভাইঙ্গা পড়ে নিচে স্কয়ারের কূলে। শুনছি হাসপাতালগুলি নাকি দিনে লাশ ডেলিভারি দেয় না। বা রাতে ছাড়া নাকি মৃত্যুসংবাদও দেয় না হাসপাতালঅলারা।

তো, আজকে রাত বারোটার পর থিকা অনেকক্ষণ ধইরা একটা লোক নাকি ছেলে ওই স্কয়ার হাসপাতালে ঢোকার মুখটায়, রেস্টুরেন্টটার কোনায় বইসা দুইহাতে হাটু ধইরা মাথা নাড়াইতেছে আর চিল্লাইতেছে–‘মা মারে!’ ‘মা মারে!’

অন্ধকারে তারে আবছা দেখা যায়। পাশে তিন চার জন হাসপাতালের গার্ড। আর কেউ নাই।

২৬/৯/২০১১, পান্থপথ, ঢাকা

 

Categories
ব্লগ

সত্যজিৎ রায়কে জিনিয়াস বলা হয় কেন!

সত্যজিৎ রায় (২ মে, ১৯২১ – ২৩ এপ্রিল ১৯৯২)

 

সত্যজিৎ রায় ছবি বানাইছেন বই লিখছেন, তাঁর কাজের একটা মহিমা ছিল… কিন্তু তাঁকে সকলে জিনিয়াস বলতে পছন্দ করে। কারণটা কী? কারণ কি এই যে অন্যেরা কেউ এস আর-এর কাছাকাছি ছিল না বা হইতে পারবে না এমন কুসংস্কার?

এস আর-এর কাজ ভাল, কিন্তু যে অর্থে রবীন্দ্রনাথ, পিকাসো বা দালিকে জিনিয়াস বলতে হয় সে রকম তো ওনার কাজে নিশানা নাই! নাকি আছে। ভাল কাজ মানেই জিনিয়াস-এর কাজ বললে অবশ্য অন্য কথা। বা বিদেশীদের কাছে পরিচিত করানোকেও যদি কেউ বলে…

জিনিয়াস মানে কি যারা অনেক খেটেখুটে দরদ দিয়ে কাজ করে? মনে হয় এস আর ওভার রেটেড। কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য বলি নাই, এস আর-এর বেঠিক মূল্যায়ন এস আর-কে ছোট কইরা রাখে। এইটা ঠিক এস আর-এর মৌখিক গাম্ভীর্য তাঁকে জিনিয়াস ভাবতে বাধ্য করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই দোষের শুরু সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকেই।

 

Categories
ব্লগ

কবিতার সমসাময়িক

কবিতায় আমার সমসাময়িক কারা এই লইয়া একটু ভাবনা ভাবলাম। এই যে নব্বই দশক কী আশি দশক বা শূন্য বলেন, আমি কি এদের কবি হিসাবে দেখতে পাই? পাই না। বরং ভারতচন্দ্র বলেন, মধুসূদন বলেন, রবীন্দ্রনাথ কী জীবনানন্দ বা শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা আল মাহমুদ বা ধরেন উৎপল, বিনয়, অলোকরঞ্জন বা ফরহাদ মজহার বা আলতাফ হোসেন (কিছু নাম বাদ গেল, পরে ঢুকামু)–এরা আমার সমসাময়িক কবি। এনাগো সমসাময়িক ভাবতে পারলে সুবিধা বেশি। কবিতার আর সব মাহাত্ম্য বাদ দিলেও কেবল টেকনিকের দিক থিকাও ওনাদের অনেক ব্যাপার অধরাই রইয়া গেল!

তেমন ধরনের নতুন বা পরবর্তী কবির দেখা আমি পাই নাই। কবিদের ক্ষেত্রে দশকইয়ারি হইল এক মানববন্ধনের মত, হয়তো পাশে দাঁড়ানো কঙ্কালের হাতটি ধইরা মইরা আঙুল মটকাইতেছেন–তা তো করা যাইতেই পারে, তবে যদি কবিতা লেখতে আসছেন তইলে এই কাম আপনের লয়। পরে জন্মলাভ, স্বাস্থ্যহীনতা, সংখ্যালঘুত্ব, অনাহার, প্রগতিশীলতা, গধ্যে মার মার কাট কাট, নিভৃতিচর্চা, সহজ অনুশীলন এগুলা কিছুই কবিতা দিব না আপনেরে। ছোট ভাইরা, বড় ভাইগো থিকা দূরে থাকলে কী মিশশা গেলেই কবিতা লেখন যাইব না। ভালো কবিতা লিখলে আপনি নিজেই টের পাইবেন। যেমন খারাপ লেখইন্নারাও নিজে টের পায়–আমিও পাই।

পান্থপথ, ১৫/২/২০১০
লোক, দশ বছর পূর্তি সংখ্যা, সম্পাদক: অনিকেত শামীম, ফেব ২০১০

free counters

Categories
ব্লগ

টুশির একটা ছবি

টুশি মারা গেছে তার ৭ বছর হইয়া গেল!

রোজীনা মুস্তারীন টুশির সঙ্গে আমার পরিচয় হইছিল বিশিষ্ট আবৃত্তিকার রূপা চক্রবর্তীর বাসায়। ১৯৯৩ সালে। সেই সময় আমার এক বন্ধু তার স্বামীরে তালাক দেওনের তরে দেশে আসছিল। স্বামীটির কোনো কারণে ধারণা হইছে আমার বন্ধু হয়তো আমার কথা শুনবে। সেই ভরসায় তিনি ওই সময়ে কিছুদিন আমার কাউন্সিলিং গ্রহণ করেন। কাজের কাজ হয় নাই। তালাকক্রিয়া সম্পন্ন হইছিল। পরে বন্ধুর পরিত্যক্ত স্বামী এমেরিকা চইলা গেছিলেন। এখন আর যোগাযোগ নাই আমার লগে। বন্ধু অনেক বছর পর পর দেশে আসলে দেখা হয়।

রোজীনা মুস্তারীন টুশি (৮/৪/১৯৭৮-২৭/৪/২০০২)
রোজীনা মুস্তারীন টুশি (৮/৪/১৯৭৮-২৭/৪/২০০২)

ওই ঘনঘটার টাইমে একদিন বন্ধুটির লগে রূপা চক্রর বাসায় গিয়া দেখি সুন্দর লাগতেছে এই রকম এক মেয়ে ড্রয়িংরুমে একটা দোলনায় বইসা আছে। তারে ইশারায় ডাকলাম আমি। টুশি ওইখানে আসছিল আবৃত্তি শিখবে বইলা। নাম জিগ্যাশ করলাম। পরে ফোন নম্বর চাইতেই দিয়া দিল। দিয়া দোলনায় গিয়া বসতেই চাইর পাশের কয়েকটা মেয়ে কী জানি বলল। কিছুক্ষণ পরে টুশি আইসা বলে ফোন নম্বর যে সে দিছে এইটা ভুলে দিছে।

এখন যাতে আমি নাম্বার ফিরত দিয়া দেই। টুশিরে আমি নাম্বার ফিরত দিছিলাম কিনা মনে নাই। বোধহয় ফোন করছিলাম না।

চাইর পাঁচ দিন পরে রূপা চক্রর বাসায়ই দেখা হইতে টুশি কইল তার মা সাহিত্য চর্চা করেন। আমি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায়। নাসরীন জাহানের বাধ্য হিসাবে চাকরি করি, সাহিত্য পাতার সেবা করি। আমি বললাম তাইলে ওনার লগে আমি দেখা করি। চক্রগো বাসা থিকা ওইদিন শিক্ষালাভের পরে টুশি আমারে নিয়া গেল কাছেই এলিফ্যান্ট রোডে। ভোজ্যতেলের পাশে একটা বিল্ডিঙের পাঁচ বা ছয় তালার উপরে। ওইখানে টুশির মায়ের সঙ্গে আলাপ হইল। কোনো একটা সাহিত্য বিষয়ক পাঠ চলতেছিল ওইখানে। সেইটা এখন মনে নাই। পরে মাঝে মাঝে টুশির লগে দেখা সাক্ষাৎ হইত নানা কালচারাল ভেনুতে। আমরা জুয়েল আইচের একটা ইন্টারভিউও নিছিলাম।

আমি সেই আমলে দুপুর বেলায় অন্যের বাসায় খাইতাম প্রায়ই। টুশিদের বাসায়ও যাইতাম। ওরা তখন থাকত মোহাম্মদপুরে তাজমহল রোডে। পরে বাইর হইলো ওরা নাসরীন জাহানের এক রকমের আত্মীয়। ওই সময়, ১৯৯৪ সালে, টুশির একটা ফটোগ্রাফ দেইখা আমার পছন্দ হইছিল। টুশি সেইটা আমারে দিয়া দেয়। ও মারা যাওয়ার পরে অনেক খুঁজছি ছবিটা। পাই নাই। কিছুদিন আগে হঠাৎ পাইলাম।

আইজকা প্রথম আলো পত্রিকায় টুশির মা রিফাত আরা শাহানা-র একটা লেখা ‘টুশি নামের মেয়েটি’ পইড়া টুশির কথা মনে পড়লো। ভাবলাম ছবিটা আপলোড করি।

২৭/৪/৭
টুশিরে নিয়া ওর মায়ের লেখাটা যুক্ত করলাম:


টুশি নামের মেয়েটি

রিফাত আরা শাহানা

২০০২ সালের ২৭ এপ্রিল টুশির মৃত্যু হয়। ১৯৭৮ সালের ৮ এপ্রিল তার জন্ন। মিষ্টি, দুষ্টু, কৃষ্ণচুড়া মেয়েটি কৃষ্ণচুড়া ফুলের আবেশে তাকিয়েই হারিয়ে গেল পৃথিবী থেকে। আমি তখন চট্টগ্রামে। বাবা মৃত্যুশয্যায়। অক্সিজেন, স্যালাইন এবং শেষশয্যার মানুষটির যাবতীয় কার্যক্রম।

২৬ এপ্রিল বাবার জন্য নাইট ডিউটি ছিল রোশনার। ভোরে চট্টগ্রামে বাবার বাসা হালিশহর থেকে গোসল সেরে ক্লিনিকে পৌঁছায়। রোশনা আমাকে বলল, ছোট ভাইয়ার ছোটবেলার বন্ধু কামাল ভাই বুটের ডাল আর চাপাটি পাঠিয়েছে। খাও। বললাম, বাসা থেকে (হালিশহর মায়ের বাসা) খেয়ে এসেছি। তুমি খাও। তুমি তো এখনো নাশতা করোনি। রোশনা আদর করে আমাকে মুখে তুলে খাওয়াল। আর আমিও বললাম−হ্যাঁ, খুব মজা হয়েছে। চেয়ে দেখিনি যে রোশনার মুখটা কেমন চুপচাপ। আসলে আমার জন্য ২৭ এপ্রিল কী ভয়ঙ্কর একটা বাস্তব সত্য অপেক্ষা করছে। আমি কিছুই জানি না।

রোশনা বলল, আপা, একবার ঢাকায় যাবে? চলো, ঘুরে আসি!

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, তোমার বাচ্চা ছোট, তুমি যাও ঘুরে এসো। আমি থাকি।

আচ্ছা! রোশনা আর কোনো কথা বলল না। কী বলবে, কেমন করে বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না।

তখন দেখি, ছোট খালা মানে চট্টগ্রাম অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার আনোয়ারা বেগম (নিগার) এসে হাজির।

রোশনা আর ছোট খালা ক্লিনিকের বাইরে কথা বলছে। আমরা আব্বার দুই রুমের ক্লিনিকে। অপর রুমে আব্বা ঘুমুচ্ছে। আব্বাকে নাকে পাইপ দিয়ে খাওয়ানো হয়। আমি একবার উঁকি দিয়ে বাবার খাট দেখলাম। এ রকম মুমূর্ষু রোগীকে ফেলে কি ঢাকায় যাওয়া যায়!

রোশনা আমার কাছে এল। বলল, আপা যাবে? চলো আমরা দুজন যাব, আবার কালই চলে আসব।

হঠাৎ করে বুকটা ঢাকার জন্য মোচড় দিয়ে উঠল। রোশনা বলল, টুশি হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে।

কী! এতক্ষণে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ প্রায়।

রোশনা বলল−না, না তেমন কিছু নয়! ও এখন ভালো আছে!

আমরা দুজন আব্বাকে এক রকম অসুস্থ রেখেই ২৭ এপ্রিল হালিশহর এলাম। ছোট ভাইয়ার বন্ধুরা গাড়ি দিল। এয়ারপোর্টে ফসিভাই, স্বপন ভাই সবাই আমাদের বিমানে তুলে দিল। এক ঘণ্টা দেরি করল বিমান ছাড়তে।

আবার ঢাকা! এয়ারপোর্ট। আমার স্বামী আসেনি। তবে অফিসের পাজেরোটা পাঠিয়েছে। রোশনার হাতে মোবাইল। আমি কেমন চুপচাপ। প্লেনেও দুই বোন পাশাপাশি এসেছি। দুঃসংবাদের পর দুঃসংবাদ। একদিকে আব্বাকে রেখে এসেছি। তারপর আবার এদিকে টুশিও হঠাৎ ‘ফেইন্ট’ হয়ে গেছে!

আচ্ছন্নতা আমায় ঘিরে থাকল। গাড়ি চলছে। রোশনার দুলাভাই বারবার ফোন করছে, তোমরা কোথায়! রোশনা মোবাইলে বলে চলেছে, এই তো এখানে−এখন মহাখালী…।
এখন ফার্মগেট…গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। গাড়ি পরিবাগের গেট দিয়ে ঢুকছে! ওয়াপদা অফিসার্স কলোনি। যে বাড়িটায় আমরা দীর্ঘ দশ বছর কাটিয়েছি। এবার আমাদের বাসার সামনে গাড়ি। আমি সিঁড়ির নিচ দিয়ে তাকালাম, ওখানে এত মানুষ! ওই যে আমার স্বামী।

এবার আমি চিৎকার দিয়ে উঠি, কী হয়েছে? এখানে এত মানুষ কেন। রোশনা বলো।

আমার স্বামী এগিয়ে এল। পরম মমতায় আমাকে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। আমার তখন মাথায় কোনো কিছু কাজ করছে না। দোতলায় এলাম। বোরখা খুললাম। আমার স্বামী আমাকে ধরে বসে আছে। কী হয়েছে!

ধীরে খুব ধীরে জানাল, তোমার টুশি না পড়ে গেছিল। আর নেই!

আমি বললাম, ওকে তো সুস্থ রেখে গেলাম, কী হয়েছে?

মাথায় কিছু কাজ করছিল না! কিন্তু আমি চিৎকার দিলাম না! মৃতের বাড়িতে কত দিন গেছি। স্বজনদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছি, তোমরা কেঁদো না। দোয়া করো। মৃত আত্মা কষ্ট পায়। আজ এ কী ভয়ানক বাস্তবতা আমার সামনে। আমি সত্যিই আর চিৎকার দিলাম না। মনে হচ্ছিল চিৎকার দিয়ে কাঁদলে মনে হয় খুব শান্তি লাগত। কিন্তু আমি কাঁদলাম না। নিঃশব্দে চোখের পানি ঝরে যাচ্ছিল। আসলে তখন আমার মাথায় বুদ্ধি কাজ করছিল না। নির্বাক ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

আর একটু পরেই টুশির শরীর ধুয়ে ধবধবে কাপড়ে মুড়ে আমাদের সামনে। আমার স্বামী এসে আমাকে টুশির পাশে বসাল, দোয়া পড়ো। দেখো, তোমার টুশি। আমি বললাম−না, দেখব না।

চোখ তুললাম, চেয়ে দেখলাম নিথর প্রাণহীন দেহ। এ দেহ তো আমি চিনি না। আমি এক সেকেন্ড তাকালাম। বাঁ দিকে চেয়ে দেখি আসাদুজ্জামান নুর, মুখ ঢেকে কাঁদছেন।

আমি কী বলছি, জানি না। কী দোয়া পড়ছি, জানি না। ওই মুহুর্ত সে কী কষ্ট… দুঃসহ! অথচ আমি নির্বাক!

দেখলাম কবরস্থানে যাওয়ার পথে মানুষ, মানুষ আর মানুষ, সবাই কি টুশিকে এত ভালোবাসতো!

প্রথম আলো অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল টুশির ট্রাক−ওরা ফুল দিলো, আরও কত কত…

কবরস্থান!

চেয়ে চেয়ে দেখছি সুর্য ডুবছে একটু একটু করে। আর ওরা সবাই শুইয়ে দিচ্ছে শেষবারের মতো। আর কি কথা বলার আছে। ডানে বামে সবদিকে মানুষ আর মানুষ। টুশিকে এত মানুষ ভালোবাসে।

আমার আর কোনো দুঃখ নেই। এত ভালোবাসায় যে শয়ন করে, তার তো কোনো দুঃখ থাকতে পারে না।

পরদিন খবর এল আমার বাবা আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুর রউফও ইন্তেকাল করেছেন।

আমরা এখনো বেঁচে আছি। আমি, ওর বাবা, বোন, ছোট মিশুক।

(সম্পাদকীয়/উপসম্পাদকীয়, প্রথম আলো, ২৭/৪/৭)

Categories
ছবির বিবরণ

ছহি বড় লবণহাঁটা

gandhi_salt-march

সমুদ্রে নাইতে নেমেছেন গান্ধি

১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারছিলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তো ভারতে খুব অত্যাচার করতেছে! অত্যাচারীর দায়িত্ব লাঘব করতে মহারাণীর মহাশাসন শুরু হইলো ভারতবর্ষে। ১৯৩০-এ আইসা রাণী গরীবের প্রধান খাদ্য লবণের উপরে ট্যাক্স বসাইয়া দিলেন। ভূভারতে গরীবের সংখ্যা আগেও বেশিই ছিল—আর লবণ এমনই খাদ্য, তুমি যতো কাঙ্গালের কাঙ্গাল হও, লবণ তোমাকে খাইতেই হবে। অতএব সদাশয় সরকার আইন কইরা লবণের নেটিভ উৎপাদন বন্ধ কইরা দিলেন।

অহিংস বিপ্লবী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি (১৮৬৯-১৯৪৮) কইলেন, ‘ঘিয়ের উপরে, মদের উপরে, তামাকের উপরে ট্যাক্স বসাইলে আপত্তি আছিল না—অবস্থা এমন দাঁড়াইছে বাতাসের উপরে যে ট্যাক্স বসায় নাই সেইটাই আমাদের ভাগ্য। কিন্তু আমরা ট্যাক্স দিব না।’ ব্রিটিশরে চ্যালেঞ্জ করলেন গান্ধি, ‘পারলে আমারে কয়েদ করো।’

এইসব অহিংস হুংকারের পরে গান্ধি লং মার্চের ঘোষণা দিলেন। ঠিক হইলো গুজরাটের আহমেদাবাদ থিকা ডাণ্ডির সমুদ্র পর্যন্ত ৩৮৮ কিলোমিটার (২৪১ মাইল) রাস্তা পায়ে হাঁইটা পার হইবেন তারা। সেইখানে গিয়া গান্ধি নিজেই লবণ বানাইবেন। গান্ধির সঙ্গে যোগ দিল ৭৮ বিপ্লবী। ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ  থিকা ৬ এপ্রিল হাঁইটা তারা সমুদ্রে পৌঁছলেন। ইতিহাসে এই ঘটনার ইংরাজি নাম দি গ্রেট সল্ট মার্চ।

ক্যামবে উপকূলে আইসা সমুদ্রের পানি জ্বাল দিয়া লবণ উৎপাদন শুরু করলেন গান্ধি আর তার অনুসারীরা। ছবিতে সত্যাগ্রহ ঘোষণার ঠিক আগে দিয়া বাপুজি আরব সাগরের নুন-পানিতে গোছল সারতেছেন। এরপর এক খাবলা দরিয়ার নুনের সঙ্গে ডাঙার মাটি মিশাইয়া ডাক দিলেন লবণ সত্যাগ্রহের।

সারা ভারতে ছড়াইয়া পড়লো নুনের আন্দোলন। নুনাবতার ব্রিটিশ রাজ এতসব সহ্য করবেন তা হইতে পারে না। তিনি মে মাসের ৫ তারিখে গান্ধিরে গ্রেপ্তার করলেন।

পরে আন্দোলনের ঘনঘটায় আপসহীন ব্রিটিশরাজ পর সালের ২৬ জানুয়ারি ছাইড়া দিলেন গান্ধিরে। ৪ মার্চ গান্ধির সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হইল ব্রিটিশ সরকার—ঠিক হইল লন্ডনে গোল টেবিল হবে। সেইখানে প্রজাদের দুঃখের কারণ নিয়া শান্তিমতো অনেক আলোচনা করা যাবে!

লিংক: Original footage of Gandhi and his followers marching to Dandi in the Salt Satyagraha

(ছুটির দিনে, প্রথম আলোতে ২০০১ বা ২০০২ সালে লেখাটি শুদ্ধ ভাষায় প্রকাশিত হইছিল, এখানে ২০০৬ সংস্করণ)

Flag Counter

Categories
ছবির বিবরণ

দি বার্নিং মংক

“আমি সেদিকে আবার তাকালাম, কিন্তু একবারই যথেষ্ট ছিল। শিখাগুলি বের হয়ে আসছিল একটা মানব অবয়ব থেকে। তার দেহ শুকিয়ে ছোট হয়ে আসছিল, মাথা পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। বাতাসে ভাসছিল মানুষের মাংস পোড়ার গন্ধ; মানুষ অবিশ্বাস্য দ্রুত পোড়ে। সামনে জড়ো হতে থাকা ভিয়েতনামিজদের আহাজারি শুনতে পাচ্ছিলাম। এত ধাক্কা খেয়েছিলাম যে কাঁদতে পারছিলাম না, বুঝতে পারছিলাম না নোট নেবো কিনা, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবো কিনা, এত হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম যে কিছু ভাবতেও পারি নি…যখন তিনি পুড়ছিলেন মাংসপেশীর কোনো নড়াচড়া ছিল না তার, কোনো শব্দ করছিলেন না তিনি, তার অবিচলতা তার চারপাশের হাহাকারকারী জনতার সম্পূর্ণ বিপরীত একটা অবস্থান হয়ে উঠেছিল।”

ডেভিড হালবারস্টাম, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৯৬৩

আমেরিকান মদদপুষ্ট দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী নগো দিন্হ দিয়েম (১৯০১-১৯৬৩)-এর বৌদ্ধ সন্ন্যাসী নিধনের বিরুদ্ধে এটি ছিল সন্ন্যাসী থিচ কুয়াং দুক (১৮৯৭-১৯৬৩)-এর একটি জ্বলন্ত প্রতিবাদ।

the-burning-monk
ম্যালকম ওয়াইল্ড ব্রাউনির (১৯৩১-২০১২) ছবি ‌’দি বার্নিং-মংক’। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৬৩ তোলা এই ছবি সে বছরের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অফ দি ইয়ার ঘোষিত হয় ও ১৯৬৪ তে পুলিৎজার পায়।

৮ মে ১৯৬৩ তারিখে দিয়েম সরকারের সেনারা হু শহরে একটি বৌদ্ধ সমাবেশ ছত্রখান করতে গিয়ে ৯ সন্ন্যাসীকে হত্যা করে। সরকার দায় চাপায় কমিউনিস্টদের ওপর। এ ঘটনার পর জুনের ১১ তারিখে আর এক দল সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসীনি শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় একটি হালকা নীল অস্টিন গাড়ির পিছু পিছু সায়গনের জনাকীর্ণ রাস্তায় হাজির হয়। তারা যেন ইঞ্জিনে সমস্যা হয়েছে এমন ভান করে গাড়ি থামিয়ে দেয় রাস্তায়। সন্ন্যাসীরা দ্রুত গাড়িটিকে ঘিরে একটি বৃত্ত তৈরি করে। গাড়ি থেকে নেমে আসেন ৬৭ বছর বয়সী থিচ কুয়াং দুক। বৃত্তের মাঝখানে পদ্মাসনে ধ্যানের ভঙ্গিতে বসে পড়েন তিনি। অন্য একজন সন্ন্যাসী গাড়ি থেকে পাচ গ্যালনের কনটেইনারভর্তি গ্যাসোলিন বের করে তার গায়ে ঢেলে দেন। তিনি পদ্মাসনে অনড় থেকে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আপন শরীরে অগ্নিসংযোগ করেন।

ভিয়েতনামের সে সময়ের ফার্স্ট লেডি মাদাম নু এ ঘটনার পর মন্তব্য করেছিলেন, তিনি এমন আরেকটা মংক বারবিকিউ শো দেখতে পেলে হাততালি দেবেন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এ ঘটনায় এত মর্মাহত হয়েছিলেন যে ওভাল অফিসে কুয়াং দুকের ছবি টাঙিয়েছিলেন। আমেরিকা দিয়েম সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ায় সব রকম সহযোগিতা রদ করে। এবং বছরশেষে কেনেডি সরকারের গোপন সম্মতির ভিত্তিতে ভিয়েতনামিজ জেনারেলরা উৎখাত করে দিয়েম সরকারকে। তারা নভেম্বরের ২ তারিখে দিয়েম ও তার তরুণ ভাইকে হত্যা করে। কাকতালীয় ভাবে এর ২০ দিন পরে প্রেসিডেন্ট কেনেডি আততায়ীর গুলিতে নিজ দেশে নিহত হন।

সূত্র: যায়যায়দিন, ১২/১০/২০০৬

 

Categories
ছবির বিবরণ

দালি অ্যাটমিকাস

daliatomসালভাদর দালির পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি–দালি অ্যাটমিকাস ১৯৪৮; বিড়াল,পানি ও বস্তু সমাহারের পরাবাস্তব বিন্যাসে। ছবি. ফিলিপ হালজম্যান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্পেনের স্যুররিয়ালিস্ট আর্টিস্ট সালভাদর দালির (১৯০৪-১৯৮৯) চিত্রশিল্পে পরমাণুর উপস্থাপন দেখা যাইতে থাকে। তিনি প্রোটন ও ইলেকট্রনের মধ্যকার সম্পর্ক এবং সেই কারণে সব কিছুর এক অন্তহীন ঝুলন্ত অবস্থার আইডিয়া নিয়া ছবি আঁকতে থাকেন।

দালির বিখ্যাত পেইন্টিং লেডা অ্যাটমিকায় দেখা যায় লেডা তার রাজহাঁস ও চারপাশের বস্তুসমুদয় লইয়া শূন্যে স্থির। এই ছবি দিয়া উদ্বুদ্ধ হইছিলেন ফটোগ্রাফার ফিলিপ হালজম্যান। তিনি ১৯৪৮ সালে নিউ ইয়র্কের স্টুডিওতে দালির একটা শূন্যে স্থির হইয়া থাকা ছবি তুলতে চেষ্টা করেন।

ছবি তোলার আগে ইজেল, দালির দুইটা পেইন্টিং-এর ফটোগ্রাফ (যার একটা লেডা অ্যাটমিকা), একটা স্টেপ টুল সিলিং-এর লগে তার দিয়া ঝুলাইয়া দিলেন। ওনার ওয়াইফ নির্দিষ্ট দূরত্ব থিকা চেয়ারের একটা পা ধইরা রাখছিলেন যাতে মনে হয় চেয়ারও শূন্যে ঝুইলা আছে। এরপরে হালজম্যান ওয়ান টু থ্রি ফোর এইভাবে গুনতে বসলেন। থ্রি গোনার সঙ্গে সঙ্গে তার তিন সহকর্মী নির্দিষ্ট দূরত্ব থিকা তিনটা বিড়াল এবং বালতিভর্তি পানি তাঁর দেখানো পথে শূন্যে ছুইড়া দেন। পানিপ্রবাহ বক্রপথে এবং বিড়ালগুলি পাঁক খাইতে খাইতে যে মুহূর্ত তৈরি হইল তার মধ্যে তিনি ‘ফোর’ বললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দালি লাফ দিয়া মাধ্যাকর্ষণবিরোধী ভূমিকা (!) গ্রহণ করলেন! এভাবেই হালজম্যান তাঁর দালি অ্যাটমিকাস ছবিটা তোলেন।

ফিলিপ হালজম্যান (১৯০৬-১৯৭৯)
ফিলিপ হালজম্যান (১৯০৬-১৯৭৯)

হালজম্যান লিখছেন, এই ছবি তুলতে তাঁর ৬ ঘণ্টা লাগছিল। ২৮ বারের বার পছন্দের ছবি তুলতে সক্ষম হন তিনি। ছবিতে ফ্লোরের পানির অস্তিত্ব না থাকায় কেউ কেউ ছবির পানি বিষয়ে সন্দেহ ধইরা রাখছেন। তাদের ধারণা ফটোগ্রাফার পানির ছদ্মবেশে অ্যাক্রেলিক নাইলে রেজিন শুকাইয়া লইছিলেন। এছাড়া ছবিতে দালির সামনের ইজেলের মধ্যেকার বিড়ালের ছবি আর লাফ দেওয়া বিড়ালের লেজ ও থাবার গঠনের সমিলতার কারণে অনেকের সন্দেহ ফটোগ্রাফ তৈরি হওয়ার পরে দালি হয়তো ওই অংশে খানিক টাচ কইরা দিছিলেন।

আমেরিকার পশু নির্যাতন আইনের বাধার কারণে মোরগ না নিয়া তিন বিড়াল নিছিলেন তাঁরা এবং ছবি যেহেতু ইউরোপেও প্রচারিত হবে তাই দুধের অপচয় না কইরা পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন হালজম্যান। নাইলে হয়তো এই ছবিতে দুধ আর মোরগের ঝুলন্ত দশা দেখা যাইতো।

হালজম্যান প্রায় তিরিশ বছর দালির লগে কাজ কইরা গেছেন। তাঁর দালিস মুসটাস (Dali’s Mustache, Simon & Schuster, 1954) একটা ফটোগ্রাফির বই আছে। হালজম্যান বিশ্বাস করতেন যার ছবি তোলা হইতেছে তারে অবস্থান থিকা সরাইয়া নিয়া কিংবা গর্জিয়াস দৃশ্যাবলীর মধ্যে চালান কইরা দিয়া সাবজেক্টের চরিত্র তুইলা আনন যায় না। বরং সাবজেক্টের ম্যানারিজম আর মুদ্রাদোষের ভিতর দিয়াই ধরন লাগে তারে।

ledaatomicaলেডা অ্যাটমিকা, ১৯৪৭-৪৯; ক্যানভাসে তেল, ৬১.১ x ৪৫.৩ সেমি। সালভাদর দালি।

Flag Counter

Categories
ব্লগ

রবীন্দ্রবিরোধীদের ভাত নাই অথবা ফররুখ আহমদের ‘কাঁচড়াপাড়ায় রাত্রি’

কাঁচড়াপাড়ায় রাত্রি

কাঁচড়া পাড়ায় রাত্রি। ডিপোতলে এঞ্জিন বিকল—
সুদীর্ঘ বিশ্রান্ত শ্বাস ফেলে জাগে ফাটা বয়লার,
—অবরুদ্ধ গতিবেগ। তারপর আসে মিস্ত্রিদল
গলানো ইস্পাত আনে, দৃঢ় অস্ত্র হানে বার বার।

জ্বলন্ত অগ্নির তাপে এই সব যন্ত্র জানোয়ার
দিন রাত্রি ঘোরে ফেরে সুদুর্গম দেশে, সমতলে
সমান্তর, রেলে রেলে, সেতুপথ পার হয়ে আর
অভীষ্ট লক্ষ্যের পানে দার্জিলিংয়ে আসামে জঙ্গলে।

আহত সন্ধ্যায় তারা অবশেষে কাঁচড়া পাড়াতে।
দূরে নাগরিক আশা জ্বলে বালবে লাল-নীল-পীত;
উজ্জীবিত কামনার অগ্নিমোহ-অশান্ত ক্ষুধাতে;
কাঁচড়া পাড়ার কলে মিস্ত্রিদের নারীর সঙ্গীত।

(হাতুড়িও লক্ষ্যভ্রষ্ট) ম্লান চাঁদ কৃষ্ণপক্ষ রাতে
কাঁচড়া পাড়ায় জাগে নারী আর স্বপ্নের ইঙ্গিত।

প্রথম প্রকাশ: সওগাত, ১৯৪১
সূত্র: হে বন্য স্বপ্নেরা (১৯৭৬), ফররুখ আহমদ; সম্পাদনা : জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী [ফররুখ আহমদের মৃত্যুর দুই বছর পরে প্রকাশিত]

farrukh 8
(ফররুখ আহমদ, জন্ম: মাঝআইল, যশোর ১০/৬/১৯১৮; মৃত্যু: ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা ১৯/১০/১৯৭৪)

ফররুখ আহমদ ১৯৪৫ সালে রচিত ও মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত ‘উর্দ্দু বনাম বাংলা’ কবিতায় লিখতেছেন:

দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন
বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দ্দুকেই করিয়াছি নিকা
বাপান্ত শ্রমের ফলে উড়েছে আশার চামচিকা
উর্দ্দু নীল আভিজাত্য (জানে তা নিকট বন্ধুগণ)।
আতরাফ রক্তের গন্ধে দেখি আজ কে করে বমন?
খাঁটি শরাফতি নিতে ধরিয়াছি যে অজানা বুলি
তার দাপে চমকাবে এক সাথে বেয়ারা ও কুলি
সঠিক পশ্চিমী ধাঁচে যে মুহূর্তে করিব তর্জন।

পূর্ণ মোগলাই ভাব, তার সাথে দু’পুরুষ পরে
বাবরের বংশ দাবী—(জানি তা অবশ্য সুকঠিন
কিন্তু কোন লাভ বলো হাল ছেড়ে দিলে এ প্রহরে)
আমার আবাদী গন্ধ নাকে পায় আজো অর্বাচীন
পূর্বোক্ত তালাক সূত্রে শরাফতি করিব অর্জন;
নবাবী রক্তের ঝাঁজ আশা করি পাবে পুত্রগণ।

ফররুখ আহমদ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই সওগাত পত্রিকায় ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ নিবন্ধে লেখেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে, এ নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা হয়েছে। জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং, এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তা-ই হয়; তবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।”

মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ফররুখ-রচনাবলী প্রথম খণ্ড-তে [আহমদ পাবলিশিং হাউস, অক্টোবর ১৯৭৯] কবি জীবনী অংশে দেখা যায়:

ফররুখ আহমদের জীবনে দারিদ্র ও দুঃখ দুর্দশা বিশেষ ভাবে নেমে আসে ১৯৭১ সালের পর। তিনি সাবেক পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন, তিনি পাকিস্তানীমনা ও তমদ্দুনের কবি—এমনি ধরনের অলিখিত অভিযোগ তোলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। একটি দৈনিক পত্রিকায় তাঁকে আক্রমণ করে দু’একটি প্রবন্ধও লেখেন জনৈক বিশিষ্ট সাহিত্যিক। বস্তুতঃ, এসব কারণে সে-সময় ফররুখ আহমদের বেতারের চাকুরি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, বেতন বন্ধ হয়, তিনি হয়ে পড়েন বেকার। এ-সময় আহমদ ছফা দৈনিক ‘গণকণ্ঠে’ ‘কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ?’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে ফররুখ আহমদের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগসমূহের দাঁত-ভাঙা জবাব দেন, এবং এসবের অসারতা বিশ্লেষণ করেন। বেকার কবি ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের দুঃখ-দুর্দশার বিবরণ দিয়ে তিনি লেখেন :

খবর পেয়েছি বিনা চিকিৎসায় কবি ফররুখ আহমদের মেয়ে মারা গেছে। এই প্রতিভাধর কবি—যাঁর দানে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে—পয়সার অভাবে তাঁর মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে পারেন নি, ঔষুধ কিনতে পারেননি। কবি এখন বেকার। তাঁর মৃত মেয়ের জামাই, যিনি এখন কবির সঙ্গে থাকছেন বলে খবর পেয়েছি, তাঁরও চাকুরি নেই। মেয়ে তো মারাই গেছে। যাঁরা বেঁচে আছেন, কি অভাবে, কোন অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনগুলো অতিবাহিত করছেন, সে-খবর আমরা কেউ রাখিনি। হয়তো একদিন সংবাদ পাবো না খেতে পেয়ে বৃদ্ধ কবি মারা গেছেন অথবা আত্মহত্যা করেছেন।

farrukh 11
ঢাকা বেতারের একটি কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে (বাম থেকে) : কবি আহসান হাবীব, কবি ফররুখ আহমদ, কবি আবুল হোসেন, কবি বেগম সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান ও কবি আবদুল কাদির

ফররুখ আহমদের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগ সমূহের দাঁত ভাঙা জবাব এইটা হইল কিনা জানি না। হয়তো ঐ লেখার সবটা পড়তে পারলে বোঝা যাইত। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে অনাহারে অর্ধাহারে বিনা চিকিৎসায় মারা যান ফররুখ আহমদ।

ফররুখ আহমদের জীবনে ইসলামী ভাবধারা আসছে (উনি নাকি আগে বামপন্থী এবং বিপ্লবী এম এন রায়ের তরিকপন্থী ছিলেন) হইল গিয়া তৎকালীন যুগের ইসলামী বিষয়ে সুপণ্ডিত ও ইংরেজি ও আরবীতে এম-এ ফার্স্ট ক্লাশ অধ্যাপক আবদুল খালেকের কল্যাণে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চতুরা-নিবাসী আবদুল খালেকের সঙ্গে ফররুখ আহমদ তিন দিনের একটা যুক্তিতর্কে গেছিলেন। পরে ফাইটে হাইরা গিয়া ইসলামী জীবনাদর্শে ঈমান আনেন। এর রেজাল্ট হিসাবে তার সিরাজাম মুনীরার কবিতাগুলা লেখা হয়। এবং বইটা তিনি তার ‘পীর’ ‘আলহাজ্জ মৌলানা আবদুল খালেক সাহেবের দস্ত মুবারকে’ উৎসর্গ করেন।

বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭; এর বিক্রয় বন্ধ আছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মার্চ ২৬/২৭ বিতর্ক শোধরাইয়া নাকি বাজারে আসবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে আরেক প্রস্থ এটির বিপণন বন্ধ থাকবে আশা করা যায়।) বলতেছেন, ফররুখ আহমদ “পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাস স্থাপন” করছিলেন। “রবীন্দ্র-সঙ্গীত পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী এই বক্তব্য উপস্থাপন করে ১৯৬৭-র ২২ জুন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন জাতীয় পরিষদে এক বিবৃতিতে রেডিও ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্র-সঙ্গীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে মন্ত্রীর সেই সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন” করছিলেন তিনি।

হায় সমর্থন! রবীন্দ্র-বিরোধিতা করতে গিয়া অভাবে-দুর্দশায় মরতে হইল ‘ইসলামী ভাবাদর্শের’ এই কবিরে। রবীন্দ্র-ভক্তরা মাফ না করলেও রবীন্দ্রনাথের মত দরদী কবি নিশ্চয়ই এই অনুজ স্বার্থপর কবিরে চাকরিতে বহাল রাখতেন। আফটার অল না খাইয়া মরতে দিতেন না। অবশ্য ১৯৭৪ সালে কবি-না বা পাকিস্তানপন্থী-না বা রবীন্দ্রবিরোধী-না এই রকম অনেক লোকও না খাইয়া মরছেন। সেইটাও চাইলে মনে রাখন যায়।

ওনার মৃত্যুর পরে কবি শামসুর রাহমান জানাইতেছেন, “তিনি মারা গেছেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়।… তাঁর মতো অসামান্য কবি খুবই সামান্য একটা চাকুরি করতেন।” জসীম উদদীন লেখতেছেন, “ঐ পাগলার জীবনে এমন আশ্চর্য ঘটনা আছে। ইউনেসকো থেকে তাকে স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছিল। বছর খানেক বিদেশের সাহিত্যিকদের সঙ্গে মিলতে মিশতে। কিন্তু পাগলা গেল না।”

বোঝা যাইতে পারে, অনাহারের কালে অন্য কবিরা তার খবর নেন নাই।

ঢাকা ৯/৩/২০০৬