Categories
গল্প

ফাস্ট ফুড

ffood

চাপা দুর্গন্ধ সেইখানে খাবারের। ঢোকার সময় কী জানি নাম আমার জাস্ট আগের বান্ধবীর বান্ধবীরে দেখলাম রেস্টুরেন্টটার দুয়ারে দাঁড়াইয়া থাকতে। বয়ফ্রেন্ডের জন্য অপেক্ষা করতেছিলেন কি? হায়! কয়েক বছর আগে একবার দেখছিলাম ওনারে। তখন আমি প্রথম বা দ্বিতীয় দেখা করতে গেছিলাম তখনও বান্ধবী হয় নাই কিন্তু পরে বান্ধবী হইছে এমন সেই বান্ধবীর লগে। তো বান্ধবীর অফিসে ঢুকতে গিয়া দেখলাম দুই উৎসাহী তরুণের লগে দ্রুত বাইরাইতেছেন উনি। আমার মুগ্ধতা হইল তার দাঁতের গঠন দেইখা। আমি অবলীলায় হুদা হুদাই ভাইবা নিলাম তিনিই আমার বান্ধবী। বললামও, যাইতেছেন গা যে! ও আপনি ও না! ঠিক আছে দেখা হবে।

তো আমরা–তুর্কি মেয়েটার কী জানি নাম ছিল–সে আর আমি খাবারের দোকানটায় বইসা কী জানি একটা খাইতেছিলাম। সর্বভারতীয় চটপটি কি? বাজে। ঠাণ্ডা চটপটিই বোধহয় গরম কইরা দিছিল। ওরা, ওই চটপটিরা–নাকি অন্য কারা–দ্রুত ঠাণ্ডা হইয়া আসতেছিলেন। খাইতে খাইতেই। আগলি খাবার। মোটা মেয়েটা (কালো না) মানবাধিকার নিয়া কথা কইতেছিল। কী যে বলছিলাম মনে পড়তেছে না। শিক্ষা নিয়া বলতেছিলাম কি? যে শিক্ষা কেন খারাপ। কেন ফকিন্নির বাচ্চাদের পড়াশোনা করাইতে হবে না রাষ্ট্রে।

চটপটি (নাকি অন্য কিছু) যখন আর খাইতে পারতেছিলাম না আমরা তখন একটা ছোটলোকদের স্কুলে আমি আর্ট শিখামু কিনা জিগাইলেন উনি। আমি না বললাম। উনি সংযোগহীন হইয়া রইলেন তারপরে। উনি কি দেশে? নাকি টার্কিতে। নাকি ইন্ডিয়া গেলেন!

বেরনোর সময় শ্বদন্ত মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড তখনও আসে নাই বইলা তিনি তখনও অবলা দুবলা সন্ধ্যার আগে আগে–যেন আমার সঙ্গে কথা বলতেও অসুবিধা তার নাই। জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন রাইসু ভাই। ওর সঙ্গে দেখা হয় আপনার?

২৯/৯/২০১১

Flag Counter

Categories
গল্প

মজিব কই রইলা রে

মজিব কই রইলা রে বাংগালিগো থুইয়া
বাংগালিরা মরতে আছে ছিডা গুললি খাইয়া
মজিব কই রইলা রে!

এইটা একটা গানের শুরু। মতলবের ছেঙ্গার চরে নানাবাড়িতে গিয়া শোনা এই গান। ১৯৭৪ সালে। বড় মামা আওয়ামী লীগের এমপিগিরি করতেন তখন। আগে শেখ মুজিবের লগে জেল খাটছেন কয়েকবার। নারায়ণগঞ্জে বিস্তৃত বাড়িতে বসবাস করতেন। আম্মার লগে মনে হয় দুই বার গেছিলাম ওই বাড়িতে। ‘৭৫-এর আগে। চাকর বাকর আর সরকারে ঠাসা বাসা। দেখতাম মামার ছোট ছেলে মুখ আর হাতভরা খাবার খাইতে খাইতে রুমের পর রুম থপ থপাইয়া দৌড়ায়। পিছনে চাকরের দল। আমরা গরীব মানুষের নিরব ছেলের মতো শান্ত যাইতাম ওই বাসায়।

আমার শার্ট আর হাফপ্যান্ট আম্মা হাতে চলা সিঙ্গার শিলাই মেশিনে তৈরি করতেন। আরো পরে, ক্লাশ সেভেনে পড়ার সময়ে, ১৯৮০ হবে বা, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধর্লা নদীর পারে ধর্লা নামের গ্রামে একবার আমার ফুপুর টাঙ্গাইল শহরে বসবাস করেন এমন আত্মীয়রা আমার এই হাতে বানানো শার্ট পরা লইয়া কিছু হাসাহাসি করছিলেন। আমি তখন দিনে-দুই-বই-শেষ-করা লেখকম্মন্য পাঠক। ওই বাড়িতে পাওয়া কৃষণ চন্দরের আমি গাধা বলছির অনুবাদ পড়তাম আর বিকালে যাইতাম নদী দেখতে। ফুপুর দেবররা ঢাকার সদরঘাট বাংলাবাজারে প্রুফ দেখতেন একটা সময়। হয়তো সে কারণেই অনুবাদ সাহিত্যের এই ধর্লা ভ্রমণ। তো নদীপাড়ে গেলেই আমার মনে পড়তো “তোমার বগা বন্দি হইছেন ধর্লা নদীর পারে রে!…”

তো ধললা নদী–ওই নামেই পার হইতাম নদী, যখন এলাছিন নাগরপুরে যাইতাম। ফলে হাসি আমারে ধরাশায়ী করতে পারে নাই। আমার সেই আমলের একটা ড্যাবডেবা ফটো আছে। খুঁইজা পাইতে হবে।

মুজিব যেদিন মারা যান সেদিন কী কারণে জানি না ছোট মামা আমাদের বাড্ডার বাসায় আছিলেন। বাড্ডায় আমাদের বাসাটা থাকতো রাস্তার পাড়ে।

শীতে কয়েক ইঞ্চি পুরা ধুলার রাস্তায় অল্প গাড়ি চলতো আর গরমে প্যাক আর প্যাক। তাতে মানুষের পায়ের ছাপ গিজগিজ করতো। আর কাদার মধ্যে কী একটা গাছের বেগনি রঙের ফুল পইড়া থাকতো। বাসার চারদিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া। পাশে বড় খালাম্মাদের বাসায় যাওয়ার জন্য খোলা জায়গা। এই বেড়া দেওয়ার সময় কামলা নেওয়া হইত। আব্বা তাদের সঙ্গে কাজ করতেন। তারা বাঁশ কাইটা বেড়া গাঁথলে পরে বাঁশের খুঁটি গাইড়া তাতে বেড়া লাগানো হইত। দুপুরে কামলারা খাইতে গেলে আব্বা আমারে রাস্তার ধারটায় দাঁড় করাইয়া ভিতর থিকা বেড়ার ফাঁকেতে তার দিতেন, আমি খুঁটির দূরত্ব আন্দাজ কইরা তার ফেরত দিতাম। আমরা তার বলতাম, আমার খালাত ভাইরা বলতো গুনা।

পেয়ারা গাছ থাকত একটা উঠানের পাশে, চাপকলটা থাকত তার নিচে। বরই গাছও একটা, বাড়ির সামনে ছিল, রাস্তা ঘেইষা। যুদ্ধের পরে যখন আমরা কুমিল্লা থিকা ঢাকায় আসলাম তখন আমার খালাতো ভাইবোনরা সবাই সার বাঁইধা ওই বরই গাছের নিচে দাঁড়ায় ছিল, যতদূর মনে পড়ে। তবে বরই গাছ নিজেও তখন ছোটই ছিল।

কাঠের একটা চেয়ার পাইতা রেডিও শুনতেছিলেন মামা। এর আগে ছোট খালাম্মা আর উনি মিলা একদিন দরজার দুই পাল্লায় চাপা দিয়া একটা বিড়াল মারছিলেন। বিড়ালের মরণ চিৎকারে আমরা ভাইবোনরা সন্ধ্যার পড়া থুইয়া হত্যাদৃশ্য দেখতেছিলাম। অনেক আনন্দ নিয়া ওনারা বিড়াল মারতেছিলেন। বিড়াল যতই ছটফটায় ওনারা দরজার পাল্লা শক্ত কইরা ধইরা ছিলেন, ছাড়েন নাই। মরার পরে প্রাণহীন বিড়াল দরজা থিকা ঝইড়া মাটিতে পড়ছিল। আমাদের বাসায় ছিল টিনের চাল, ফ্লোর মাটির, মাঝে মাঝে তা লেপা হইত। লেপলে মাঝারি মাঝারি বৃত্ত তৈরি হইত মেঝেতে। গোবর মেশানো কাদামাটির একটা গন্ধ তখন থাকত। সে আমলে এবং পরে আরো বহুদিন আমি ঘরের চালে উইঠা দূরের বর্ষা দেখতাম।

তো ছোট মামা উঠানে রৌদ্রের মধ্যে কাঠের চেয়ারে বইসা রেডিও শুনতেছিলেন। হঠাৎ শেখ মুজিবের হত্যাসংবাদ শুইনা চিৎকার দিয়া কান্দা শুরু করলেন। চোখ দিয়া পানি পড়তে ছিল তার।বয়স্ক লোকদের কান্না, এখনও দেখছি, কসমিক হতাশা তৈরি করে আমার মধ্যে। আর আমি তো তখনও বাচ্চা। তার কিছু দিন আগে আমার খালাতো ভাই মোহাম্মদ আলী ও লিয়াকত আলী শেখ মুজিবের লগে হ্যান্ডশেক কইরা আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব বাড্ডাতেই কোথাও খেলাঘরে আসছিলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে হাত মিলাইতে। আমি কেন যে খেলাঘরে ভর্তি হইছিলাম না তখন তা নিয়া দুঃখবোধ হইছিল। খালাতো ভাইরা কথা দিছিল, এরপরে প্রধানমন্ত্রী আসলে আমারে হ্যান্ডশেক করতে নিয়া যাবে। ছোট মামার আহাজারি দেইখা বুইঝা ফেললাম এই জীবনে আর শেখ মুজিবের লগে দেখা হইতেছে না।

শৈশবের অপ্রাপ্তিজনিত দুঃখবোধ আমার আরেকবার হইছিল। সেইবার গেছিলাম দাদাবাড়িতে। কুমিল্লার বাশরা গ্রামে।আমি তখন বোধহয় ক্লাশ টু কি থ্রিতে পড়ি। স্কুলের ছুটিতে গ্রামে গেছি। মাসখানেক ছিলাম কি সেইসময়? সবচেয়ে খারাপ লাগতো সূর্য না ওঠা। আর পুকুরে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে হইত। বিকালেও সূর্য নাই। সেই সময় একদিন আমি আর আরেকটা ছেলে–নাম খাইয়া ফেলছি–টিনের চালে উইঠা শিম পাড়তে ছিলাম। নতুন টিন। পিছলা। এক সময় সঙ্গের ছেলেটা পিছলাইয়া স্লো মোশনে ঘরের চাল থিকা মাটিতে পইড়া গেল। পইড়া অজ্ঞান। তো লোকজন করলো কী ওরে ধইরা নিয়া পাশের পুকুরের পানিতে ফেলাইয়া দিল। পানিতে পইড়া সাতরাইতে সাতরাইতে ওর হাড়গোর ঠিক হইয়া থাকবে। ও সাতরাইয়া উল্টা পাশে গিয়া উঠলো।

সে সময়ই মনে হয়, একদিন আমি দাদির সঙ্গে গেছি কোনো এক আত্মীয়ের বাসায়। পাঁচ ছয় মাইল দূরে। দাদি আর আমি হাঁইটা হাঁইটা যাইতাম। অনেক ক্ষেত, রাস্তা, আইল, নদী, খাল, চক পার হইয়া আমরা যাইতাম। একদিন ওইখানে ছিলামও। গ্রাম আমার ভালো লাগতো না। বিষণ্ণ লাগতো। পরদিন ফিরা আইসা শুনি আব্বা আসছিলেন। আমারে না পাইয়া আবার চইলাও গেছেন। আমি এই ঘটনায় অনেক দুঃখ পাইছিলাম। একটা বিস্কুটের প্যাকেট আব্বা নিয়া আসছিলেন আমার জন্য। আমি সেই প্যাকেট হাতে নিয়া ফোপাইতে ফোপাইতে অনেক কানছিলাম। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় বাচ্চা বয়সের দুঃখ অনেক গভীর, শারীরিক। কারণ বাচ্চাদের কোনো ওয়ে আউট থাকে না। দুঃখে বাচ্চাদের গলা আটকাইয়া যায়।

তো মুজিবের মৃত্যুর পরে বড় মামা নিঃশেষ হইয়া গেছিলেন। অন্য মামাদেরও দাপট কমতে থাকে। উনি আর দল বদল করেন নাই। পরে আওয়ামী লীগেরও কৃপা তিনি কেন জানি পান নাই আর।

মামারা লঞ্চ ভাড়া কইরা নারায়ণগঞ্জ ঘাট থিকা মতলবের ছেঙ্গার চরে যাইতেন। চুয়াত্তরে ওনাগো লগেই গেছিলাম আমরা–আমরা ভাইবোন তখন ছিলাম তিনজন; আর আম্মা। আব্বা ছুটিতে আসবেন। লঞ্চের জানালা থিকা নদীর ঘোলা ঘোলা পানি দেখতাম যাইতে যাইতে। আর ভট ভট শব্দ। লঞ্চ গজাইরা পার হইয়া ছেঙ্গার চর বাজারে ভিড়ত, ছোট মামা টুপ কইরা নাইমা যাইতেন। আর সবাই লঞ্চে বইসা থাকতাম। লঞ্চ অতি ধীরে ঘুইরা উল্টাপার্শ্বে আসলে দেখতাম মামা বাজারে পাবলিক মোলাকাত সাইরা লঞ্চে উইঠা আসছেন। তখন জিনিসটা বিভ্রম লাগতো। কেমনে যে উনি ডাঙায় নাইমা আবার লঞ্চে উঠতেন তা বেশ যেন হয় নাই হয় নাই লাগতো। আমি তো তখনও পৃথিবী গোল হইলে যে বাজারে নাইমা আবার চলন্ত লঞ্চেই উইঠা পড়া যায় তা জানতাম না। তো মামা নাইমা আবার কীভাবে লঞ্চে উঠলেন শৈশবের সেই বিস্ময়রে বয়স্ক লোকরা পাত্তা দিত না। ওই সময় অনেক দিন ছিলাম নানাবাড়িতে। তখন এই গানটা শোনা হইত। সকালের দিকে রোদ একটু উঠলে গানটা গাইত ছেলেটা। নিজে নিজেই। কেউ শুনতোও না সেইভাবে। পোলিও হইছিল বোধহয় ওর। উঠানে মাটিতে রাখলে ঠাণ্ডা লাগবে ভাইবা বোধহয় ঘরের চালে রইদে দিয়া রাখতো ওরে। ওইখানেই গানটা গাইত।

মামারা নাকি যুদ্ধের পরে রাজাকার ধইরা পুকুরে চুবাইয়া মারতেন। চুয়াত্তরে শোনা। বড় মামার ভোটের উপলক্ষে নানাবাড়িতে গেছি। মামারা হ্যাজাক জ্বালাইয়া নির্বাচনী আবহাওয়ায় বইসা থাকতেন। আমরা বাচ্চারা ঘরের কার থিকা দুর্ভিক্ষের টাইমে সাহায্য হিসাবে আসা স্বাস্থ্যবান ফুটা ফুটা বিদেশী বিস্কুট চুরি কইরা খাইতাম আর পটকা নিয়া উঠানে ফুটাইতাম। তেমন একদিন সন্ধ্যাবেলায় বন্দুক পরিষ্কার করতে ছিলেন মামার এক চাচাতো ভাই। তাদের ঘরের বারান্দায় বইসা। ওনার নাম বোধহয় ছিল মোস্তফা। তো তার বন্দুক থিকা গুলি বাইর হইয়া এই মামার—ফেরদৌস মামা– উরুতে গিয়া লাগে। পরে বস্তা বস্তা পাহাইড়া লতা চটকাইয়া তার রস দিয়া রক্ত বন্ধ করতে হইছিল।

একটা ঘটনা নিয়া বেশ উত্তেজনা হইছিল তখন। বাড়ির পাশ দিয়া যে খাল গেছে তার মধ্যে খাটা পায়খানা আছিল একটা। পানি বেশ নিচুতে। দুই পাশে ঝোপঝাড়। বাঁশগাছ। পাশাপাশি ফেলায় রাখা দুইটা মোটা বাঁশ দিয়া সেইখানে পৌঁছাইতে হইত। দুই কামলা মহিলারে কে জানি দেখছিল পায়খানা থিকা এক লগে বাইরাইতে। তা নিয়া বেশ উত্তপ্ত অবস্থা। আমরা বুঝতে পারি নাই এই নিয়া এত উত্তেজনা করার কী আছে!

বাড়ি থিকা একটু দূরে কবরস্থানে গেছিলাম একদিন। নানা-নানির কবর দেখতে। ওই একবারই কবর দেখছি ওনাদের। নানানানি বইলা কোনো স্মৃতি বা সম্পর্কের বোধ তৈরি হয় নাই আমার মধ্যে কখনো। তবে সৎ নানি আছিলেন একজন। কেউ একজন জ্বিনের গল্প করছিল। যে জ্বিনরা নাকি বাড়ির এক কোনা থিকা কবরস্থানে উইড়া আসে বরই কাঁটা হইয়া। এর পরে অনেক দিন আমি ভাবতাম যে আমি নিজেই বরই কাঁটা উড়তে দেখছি কবরস্থানের দিকে।

তো ওই গায়ক ছেলেটার নাম আর মনে নাই আমার। গানটার বাকি লাইনগুলাও। এই গানটা আমার খুব প্রিয় একটা গান। শেখ মুজিবের নামও ঐ প্রথম শোনা। এখন তো ঐ নাম তেমন শোনা যায় না আর। এখন কেবলই বঙ্গবন্ধু।

২.
একদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ থিকা নামতেছি শাহবাগ যাব। সিঁড়িতে গান গাইতেছিলাম ‘মজিব কই রইলা রে’…

তো আমি তো বুঝি নাই নিচে হলরুমে সামওয়ান মুজিব একজন বইসা থাকবেন। উনি এই গান শুইনা ব্যক্তি আক্রমণ হিসাবে নিবেন। আর আমারে সেই দিনই শাহবাগে, সিলভানায়, ছোট গল্পকার সেলিম মোরশেদ আর ছোট কাগজ গাণ্ডীবের প্রকাশক হোসেন হায়দার চৌধুরীর সামনে ঘুষাইতে থাকবেন। তা বেশ আগের দিনের কথা। ১৯৮৯ সালের। ইশতিয়াক মুজিব অনেক দিন থিকাই কানাডায়। উনি বেশ লম্বা ছিলেন। ফলে তেরছা ঘুষি কম কম আঘাত করছিল আমারে।

৩.
১৯৮৯ সালেই বোধহয় আনোয়ার শাহাদাতের আসেদিনযায় পত্রিকায় প্রকাশিত একটা লেখার কারণে আমার বন্ধু ফাকরুল ইসলাম চৌধুরীর ফাঁসির দাবিতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের মিছিল হয় শুক্রবার বাদ জুমা। ফাকরুল তখন অবস্থা রেকি করতে ইসলাম চৌধুরী নাম ধইরা গোলাম আযমের লগে সাক্ষাৎ কইরা আসছে। এবং ঢাকার খারাপ অবস্থায় সিলেট চইলা গেছে। আমার একদিন পরে যাওয়ার কথা। আমি অগ্রিম টিকেট কাইটা আইসা শাহবাগে বইসা আড্ডা দিয়া রাতে বাসায় ফিরছি। বাসায় গিয়া দেখি ট্রেনের টিকেট আর পাই না। সাজ্জাদ ভাইরে ফোন করলাম। যে ভুলে ওনার বইপত্রের লগে টিকেট গেছে কিনা। উনিও এই টিকেট দেখেন নাই। পরে ভোর চাইরটার সময় খুঁজতে আসছি শাহবাগে টিকেট–যদি পাই! দেখি নর্দমায়–পানিতে–ভাসমান–টিকেট–স্থির। হিঃ হিঃ, টিকেট ধুইয়া আমি কমলাপুর রওনা দিছিলাম। তখন ঐ সকালে বা আরো পরে ঐ একই জায়গায় এক টোকাইরে দেইখা বাক্যালাপের ইচ্ছা হইল। আমি জিগাইলাম–কারণ তখন অনেক এক্সপেরিমেন্ট আমার–আইচ্ছা বলো দেখি ‘সাহিত্য’ কারে বলে? সেই টোকাইর বাচ্চা টোকাই বলে কী: “সাহিত্য অইল–তোমার বাসা কোথায়?”!

ঢাকা, ৭/২/২০১১ – ৬/৩/২০১১

Categories
গল্প

সিডনিতে এপ্রিলে

আমি সিডনি গেছিলাম এপ্রিলের ২৫ তারিখে। ২৮ তারিখে ফিরছি। সুব্রত দা’র [সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ] বাসায় ছিলাম। ভালোই। অপেরা হাউস দেখাইতে নিয়া গেছিলেন। তারপরে একটা বীচেও গেছিলাম।

সুব্রত দা’র বাপমাবইন সকলেই সিডনি থাকে। দুই বইনের বড়জন আগে সিডনি যখন আইছিল, অস্ট্রেলিয়ান খ্রিস্টান (উনিও খ্রিস্টান) যুবকরে বিয়া কইরা পরে এহন অনেক দিন থিকাই এইখানে থাকে। তাঁর সন্তানাদির সকলকেই গড শাদা অস্ট্রেলীয় গাত্রবর্ণ দেওয়ায় উনি সুখি হইছেন। খাওয়া-দাওয়া (দাওয়া যদি গোসল হয় তবে তার খবর আমার রাখা অঠিক হয়) সবই নাকি অজিদের (মানে অস্ট্রেলাবাসীদিগের) মত করেন। সুব্রত (দা)-র বাপ বললেন তাতে নাকি আনন্দ অনেক।

আমি ওনাগো দুইজনরে (সু’র মাবাপ) কইছি, পোলারে দেশে পাঠান। আপনেগো বয়স বাড়ছে বইলা শান্তি চান, সেইটা অস্ট্রেলিয়ায় আছে; ছেলে তো আপনের সাহিত্য করে। তার দেশ দরকার, বন্ধুবান্ধবী দরকার। তারা আমার যাওয়া উপলক্ষে ভালো রান্নাবান্না করছিলেন। আঙ্কেল রানছিলেন বাইলা মত মাছ, সঙ্গে আলু ছিল। সালাদ কাটছিলেন। গরুর মাংস ছিল তরকারি হিসেবে। আন্টি চিংড়ি মাছ রানছিলেন। কিন্তু আমার বক্তব্যে ওনাদের শান্তি কিনচিৎ বিঘ্ন হইছিল। ওনারা যে আমারে আর ডাকবেন না, সে আমি বুঝছি। বোঝার পরে আমি আরো কিছু কথা ওনাদেরকে বললাম। বললাম, ঢাকায় আপনেগো বাড়ি আছে, সেইটা আপনেরা বেচতে চাইতেছেন কেন? আপনের পোলা মাইয়ারা গেলে কই থাকব? অস্ট্রেলিয়ায় এতেক শান্তি থুইয়া তারা যে দেশে যাইব না, এই ব্যাপারে তাদের তো বটেই, আমারও সন্দেহ নাই। খালি লেখক পোলারে নিয়া তাদের অস্বস্তি।

আংকেল বিক্রমপুর গেলে এখনও নাটক করেন। কইলেন, কেন্, তুমি তো আছোই। আরো যারা তোমাগো লেখক বন্ধু আছে তাদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়া আসো। আমি কইলাম, আমি তো আসছি এক বছরের লাইগা। আর লেখকরা এইখানে আইসা কী বাল ফালাইবো। অস্ট্রেলিয়ার নিজের লেখকরা আছে না।

আসলে বাল ফেলানোর কথাটা ওনারে আমি বলি নাই। এখন লেখতে গিয়া আসলো, থাকুক। নাকি কাটুম? অস্ট্রেলিয়ার নিজের লেখকরা থাকলে বাংলাদেশের লেখকরা এইখানে আসাতে কী ক্ষতি, তা নিয়া আংকেল কোনো প্রশ্ন আমারে করেন নাই। করলেও তার কী জবাব আমি দিতাম? বাংলাদেশের লেখকরা এইখানে না আইসা ওইখানে থাইকা কী বালটা ফালাইতেছে। দেখলাম বাল ফেলানোর প্রসঙ্গটা এইখানে বেশ যুইৎ মতো বসে। বেহুদা মুরব্বি ভদ্রলোকরে এই রকম অশ্লীল শব্দের মুখোমুখি না করাই ভালো। তায় তিনি সুব্রতদার জনক। আবার উনি আমাদের জন্যও রান্নাও করছেন। রান্না ভালোও হইছে।

এখন আমি অস্ট্রেলিয়া নিয়া আর কী লেখুম। কই কই গেছিলাম লেখন যায়। তা তো লেইখা মজা নাই। আমি তো আর ট্রাভেলার না। এমনকি ভ্রমণকাহিনীর লেখকও না। যে আমি লেখলাম আর ওই পইড়া কম পয়সায় পত্রিকা কিন্নাই দেশের লোকরা ভ্রমণ সারলো।

ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া, মে ২০০৩

 

Categories
গল্প

শুনো মোর প্রেমেরো কাহিনী

১.
মিয়া চিঠি এত দেরি করলা! আমি তো খালি তোমার কথাই ভাবি। ভাবতে গিয়া দেখি খুব কিছু ভাবি না। ভাবি—তুমি। ভাবি—দেখা হইলে ভালো হয়।

কালকে মদ খাইলাম। তোমার দুঃখে। দুঃখটা এই রকম: আমি যা বোঝাইতে চাই তুমি খালি বেশি বেশি বোঝো। বানোয়াট কথা। এমনেই খাইলাম। তবে তোমার কথা তখন মনে হইল। মনে হইল তুমি যে কোন ক্লাসে পড়ো তা আমি জানি না।

তারপর ধরো তুমি এখন কেমন? তোমার নেপালী বন্ধুরা। আমি অবশ্য জানতে চাইতেছি না। এমনেই জিগ্যেশ করলাম। ওরা কি আগের চেয়ে বোকা হইছে? এমনিই জানতে চাইলাম। রাগ করলা না তো? তুমি রাগ করলে তো আমার আর কেউ থাকে কই?

কেরদানি করতেছি আসলে। লেখক না আমি! ক্ষমতার টের দেখতেছি। ভনিতা করতেছি। দেখি আবেগ হয় কিনা। হয় নাকি আপু? হইলেও তো আপনে বলবেন না। আপনে তো খালি আমারে দেখতে পারেন না। আমার সেই লাইগা কত দুঃখ। আমি তাই কানছি। আমার কান্না আর কে বুঝবে। আমি তো আর অত কাঁদতে পারি কই? আমি সেই-যে না কানছিলাম তখন কত চাইছি তুমি আইসা বলো কান্দে না বাবু কান্দে না বাবু নেও দুদ খাও…।

আমি তো দুদ খাই আর সে বলে পাগল, পাগল, এত জোরে টানে না! শেষে দুধ ছিঁড়া গেলে আমি দুধ পামু কই? আর তুমিই বা তখন কী খাইবা, তখন তো না খাইতে পাইয়া মারা যাইবা!

আমার তখন আরো কত দুঃখ। আমি মারা গেলে শেষে কত দুঃখ হইব! সেই দুঃখে আবারও কান্দি কান্দি তখন সে বলে আমার সোনা, আমার নুংকু!

আমি বলি সেইটা তো আমার। তোমার তো নাই।

সে খুব তখন বলে সিমন দ্য বভোয়া!

আমি বলি তাই?

সে বলে জটিল হইছে এতক্ষণে খুব জটিল হইছে!

২.
তো বাবু, তোমারে চিঠি লিখতে গিয়া সাহিত্য করতেছি। এ ভাবেই লিখে যেতে ভালো। তুমি পড়তে গিয়া কীভাবে নেও এই লেখা? তোমার কাছেই যে লিখতেছি তা কি মনে হইতেছে, অপরিচিত লাগতেছে না তো আমারে?

সে তো সবসোমায়ই লাগে।

তুমি এইভাবে কইতে পারলা?

না, বলি নাই তো। আর অপরিচিত বইলাই তো তোমারে এত ভালোবাসি।

বাসো?

হেঁ, বাসি।

ঘোঁট পাকাইতেছ?

পাকাইতেছি, মম রইছউদ্দিন!

মম কেন?

আমি জানি না রাইসু, আমি জানি না!

৩.
বাবু দুপুর হইছে তো তাই ক্ষুধা লাগছে এখন খাইতে যাবো কালকে রাতে তো বাসায় ছিলাম না তাই এখন ক্ষুধা লাগছে তাই রাত্রে মদ খাইছি তো মনজুর ভাই মদ খাওয়াইছে তো খুব ভালো লাগতেছিল তখন তোমার কথাই কত ভাবতেছিলাম শেষে একটা কাগজের উল্টা পিঠে কী সব কী সব লিখলাম হয়ত ধরো লিখলাম আমি তোমার কাছে চিঠি লিখতে বসছি আর আমার তখন কত ভাল্লাগলো খালি মাথার দুই পাশে কান বন্ধ হয়ে আসছে চোখ বন্ধ করলে নিচের দিকে পড়ছি পড়ছি পড়ছি চোখ খুললে ঝাক্ করে হোঁচট, আবার লিখলাম ‘বাবু’, তাতেই কত ভাল্লাগলো মনে হইল বাবু খালি শরীরের কথা বলে কেন বয়স তো অপ্ল অত কেমনে বুঝবে যথা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক যথা সময় কাটানো যথা শিল্প যথা আমি যেভাবে তারে গ্রাহ্য করি…।

তুমি আমারে গ্রাহ্য করো? চুদলাম না তোমারে! তুমি কে? হু আর ইউ? স্টুপিড! খুব জানুয়া হইয়া গেছো তুমি?

জানুয়া হই নাই তো বাবু। জানুয়া হই নাই। আমি ভালোবাসতে জানি না তো তাই এই রকম বলছি। তুমি অন্যভাবে নিও না।

তুমি সবসময় খোঁচা দিয়া কথা বলো। আমার দাঁত আছে, সেই লাইগা আমি হাইসা উড়াইয়া দেই। আর তুমি ভাবো ও তো শসতা, ও তো আমার জন্য পাগল হইছে। থুঃ!

আমার তো ভালোবাসা নাই তাই এই রকম হয়।

নাই তো আমারে বলো কেন? সব কথাই তুমি আমারে বলো। আমি তোমার কে যে সব তুমি আমারেই বলবা!

না, আমি তো আরো লোকজনরে বলছি তো।

বলবাই তো। আমি তোমার চরিত্র জানি না! খালি ভালোবাসছি তাই…

সেই তো, আমার চরিত্র তুমি শুনবা? তোমার কাছেই বলি। তুমিই তো আমার একমাত্র বন্ধু। তখন কত আগে। অনেক আগে। আমার তখন বয়স চৌদ্দ হইছিল। তাই পাশের বাড়িতে গেছিলাম। তখন সন্ধ্যা হইছিল। তখন বারান্দায় সেই বাড়ির পিতা আর এক ভদ্রলোক কথা কয়। আমি ঘরের মধ্যে ঢুকছি। আমার বয়স অল্প ছিল যে তারা আমারে দেখতে পায় নাই। তারপর ঘরের মধ্যে গেলে আরেকটা ঘর ছিল। তখন ওইখানে দেখি দুইটা মেয়ে। ওরা রংপুর থাকে তো তাই বেড়াইতে আসছিল। ওরা সোজা সোজা হইয়া শুইয়া ছিল, ঘুমাইয়া ছিল। আমি তখন দুই জনের বুকের মধ্যে হাত দিছি। কিন্তু ওরা তো চোখ বন্ধ রাইখা মুখ খুললো। দেখি ওদের দাঁত লাল। ওরা ওইখানে বেড়াইতে আসছিল। রংপুর থাকে তো তাই বেড়াইতে আসছিল। ওদের চেহেরাও দেখি নাই ভালো কইরা। সত্যি! সত্যি!

তুমি ওদের দাঁতে হাত দেও নাই তো?

না, মাথা খারাপ! আমি তো ভয় পাইছিলাম তো।

এইসব তুমি আর করবা না। তোমার বুকে হাত দিতে ইচ্ছা করলে আমারে বলবা। দেখো না আমার কত বুক!

দেখি তো, দেখি… কিন্তু আমার যে অনেক খিদা লাগছে বাবু।

সে বলে, তোমার যে খিদা লাগছে আর কাউরে বলো নাই তো?

আমি বলি, না, বলি নাই।

সে বলে, আসো, আমার সঙ্গে আসো।

আমি যাই। আমরা ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামতে থাকি। সে আমারে ভাত খাওয়ায়। মুখে তুলে দেয়। বলে, বুঝছো? বুঝছো? তুমি যে বাচ্চা তাই এইভাবে তোমারে খাওয়াই। বুঝছো? রাগ করো নাই তো?

আমি বলি, না। তারপর ঘাড় কাত করি।

৪.
সে, আমার ঘাড়ে কামড় দেয়।

ঢাকা, রচনাকাল ১৯৯৩;প্রকাশ. সংবেদ ১৯৯৪

 

Categories
গল্প

ফুল বিষয়ক অবধারণ

এক.

যখন রাত্রি হয় তিনি আসেন। হাতে ফুল। দেখি হাসছেন। আমিও হাসলাম। তিনি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলেন। জিজ্ঞেস করলেন ভালো আছি কি-না। নাম জিজ্ঞেস করায় বললেন ‘ফুলিস’।

পরে জেনেছি, ফুল ভালোবাসেন বলেই এ-নাম। ভদ্রলোক এসেছেন দায়িত্ব পালনের জন্যে। জানতে চাইলেন কয়বার হয়েছে। আমি ‘না’ বলতেই তিনি দপ করে গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, ‘যান গিয়া ঢোকেন এখনই।’

আমি টয়লেটে ঢুকতেই তিনি বাঁশি বাজাতে শুরু করলেন।

 

দুই.

মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক এলেন ফুল নিয়ে। ‘কী ব্যাপার, ফুল কেন!’ তিনি বললেন, ‘আই লাইক ইউ ভেরি মাচ, দয়া করে ফুলটুকু ফিরিয়ে দেবেন না।’

আমি নিলাম তাঁর ফুলটুকু, ‘আপনার বউবাচ্চা কিছু নেই?’

‘জ্বি আছে। বউ আছে। বাচ্চা নেই। নিজের বাগানের ফুল।’

‘ফুল খুব ভালোবাসেন বুঝি?’

‘না, তা না। আপনাকে দেখে খুব ভালো লাগলো।’

‘আপনি থাকেন কোথায়?’

‘থাকি সামনেই থাকি। আমার ওয়াইফের বয়স ছাববিশ।’

‘ছাববিশ কেন?’

‘আমি জানি না।’

‘তাই নাকি? ঠিক আছে। নিয়ে আসবেন তাঁকে।’

‘ঠিক আছে।’ ভদ্রলোক হাত নাড়িয়ে চলে গেলেন।

পরদিন ভদ্রলোক আসলেন তাঁর বৌ নিয়ে। আজকে ভদ্রমহিলার হাতে ফুল। বললেন, ‘আমি খুব ফুল ভালোবাসি।’

আমি হাসলাম, ‘তাই? কী নাম আপনার?’

‘আমি জুলেখা’ ভদ্রমহিলা এমনভাবে উচ্চারিলেন যেন জ-এর মধ্যে ঢুকে গেছে আস্ত একটা অন্তস্থ য আর তালব্য শ।

আমি বললাম, ‘যুলেখা বাদশার মেয়ে।’

ভদ্রমহিলা তাঁর বুকের ওপর কী একটা দোলা দিলেন, আর কীভাবে যে দিলেন যে আঁচল খসে পড়লো তাঁর কোলের ওপর, আর হাসলেন হা হা।

আমি বললাম, ‘কতদিন হয় বিয়ে করেছেন?’

ভদ্রমহিলা তাঁর হাসি থামালেন, ‘জী ছ’ বছর।’

‘বাচ্চা নিচ্ছেন না কেন?’

‘ওর সমস্যা আছে।’ ভদ্রমহিলা তাঁর চোখ ঘুরিয়ে নিলেন তাঁর হাতের ফুলের মধ্যে।

‘এসব কি আর এখন কোনো সমস্যা?’

‘সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা।’ ভদ্রলোক মিষ্টি করে হাসলেন।

ফলে কারেন্ট চলে যায়। আমি মোমবাতি জ্বালি। ‘আপনার মাপ কত?’ আমি যুলেখার চোখের দিকে তাকাই। ভদ্রমহিলা তাঁর শাড়ি খোলা শুরু করেন।

আমি ভদ্রলোককে বলি, ‘আপনি বরং হাত দুটি ধরুন। আমি ঠিক নরমালি আনন্দ পাই না।’

ভদ্রলোক এসে তাঁর স্ত্রীর হাত ধরলেন। ভদ্রমহিলা বললেন, ‘খানকির বাচ্চা!’

কাকে বললেন কে জানে।

 

তিন.

আমি যখন খেতের মধ্যে পাটের বীজ বুনছি, জানতাম না কেন বুনছি এই বীজ। মানে, জানার দরকারটিই পড়েনি। আমার বাপ, তার বাপ, তার বাপের বাপ সকলেই কেন কী করছে না-করছে সব বুঝে ওঠার আগেই নানাসমস্ত কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে।

ফলে, যখন পাটের গাছ ধীরে বড় হয়, আমি জানতাম না কেন বড় হয় গাছ। আর যখন কিছু পাটের গাছ এনে ভিজিয়ে দিলাম খালের পানিতে, আমার মন করে উঠল হু হু, আমি জানতাম না কেন, ভাবলাম চৈত্রের বাতাস। আর সেখান থেকে কিছু পাটের আঁশ আলগা করে দিলাম শুঁকোতে। তারপর দড়ি পাকানোর জন্য খুঁজতে গেলাম লাইলিকে। দেখি লাইলি মাছ ধরে।

আমি বলি, ‘দেখ লাইলি, এই যে কত পাটগাছ, আর তুই মাছ ধরিস।’

লাইলি বলে, ‘তোমার মনে রঙ লাগছে মামা।’

আমি বলি, ‘এই যে এত পাটগাছ বড় হয়ে যায়, জানিস কিছু কেন হয়?’

সে বলে সে জানে, আর আমার কানে কানে এমন আওয়াজ দেয় যে আমি তো আমি, আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর মাথা যায় বিগড়ে। আমি বলি, ‘চল লাইলি চল, দড়ি পাকাবি।’

আর আমরা গিয়ে ঢুকি একটা পাটখেতের মধ্যে। লাইলি বলে, ‘তুমি কি মামা এই গল্পেও সেক্স ঢুকাবা নাকি?’

আমি বলি, ‘না, অন্য কিছু।’

আর লাইলি করে কী, হাসতে হাসতে তার জামা-কাপড় ছেড়ে ছেড়ে ছিটকে ছিটকে বেরোয় আর আমরা ঘরে ফিরে আসি।

আমি বলি, মামা কী সর্বনাশ তুমি করলা আমার। মামা কিছু বলে না, আমি কাচারি ঘর থেকে সব পাকানো দড়িদড়া এনে গাছে গাছে ঝুলিয়ে দেই দেই দেই কিন্তু…

লেখকের আগমন

আমি করলাম কী, আগের গল্পে না পাওয়া দুটি ফুল দিলাম মেয়েটির হাতে ধরিয়ে। মেয়েটি, লাইলি, খুব বুদ্ধিমান, বলে, এই এক জিনিস পাইছেন আপনে।

‘তো, এখন আপনি কী করবেন?’

কী করবো মানে? আমারে ভোদাই ঠাওরাইলেন নাকি, আরে দেখেন না ভাই… আর করে কী, লাইলি, তার নিঃসঙ্গ ও উদোম পেট বাগিয়ে ধরে আমাদের সামনে–সেখানে জন্মশাসনের মার্কিনী বিজ্ঞাপন ও আমরা চুমু খাই।

 

চার.

ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন খসরু ভাই: চিনছো নাকি রাইসু, বিশিষ্ট মাগীবাদী লেখক।

আমি ভদ্রমহিলাকে হাতজোড় করি, ‘ক্ষমা করবেন দিদি, আমি থাকি একেবারে বিবর্জিত এলাকায়। তবে আপনাকে কোথাও দেখে থাকবো।’ এইটা ফাও মারলাম। একে আমি ইহজনমে কোথাও দেখি নাই। ‘কী নাম আপনার?’

‘সি কঙ্কা।’

‘ও আচ্ছা। মহান নাম। আগে শুনেছি।’ আমি ভদ্রমহিলার হাতে একটা রজনীগন্ধার স্টিক ধরিয়ে দিই। ‘শুভকামনা।’

ভদ্রমহিলা দণ্ডটিকে সাত-আট ভাঁজ করে পকেটে চালান করেন। ‘এইসব ফুল-টুল দিয়ে কিছু হবে না মিস্টার। ফুল মানুষের খাদ্য নয়।’

‘তা ঠিক। ফুল খাওয়া ঠিক হাইজেনিক না।’

এরপর সাড়ে তিন বছর পর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। লঞ্চে। তিনি বরিশাল যাচ্ছেন। বললেন, ‘বরিশাল খুব সুন্দর জায়গা।’

আমি ‘হ্যাঁ’ বললাম।

তিনি হাসলেন। ‘আপনার গল্পের ব্যাপারে কথা বলতে চাই আমি।’

‘জ্বী, প্রকাশেন।’

‘আপনার গল্পে তো জীবন নেই। শুষ্ক গল্প। না লিখলেই পারেন।’

আমি বলি, ‘এভাবে বলছেন।’

‘না। গল্প এক জিনিস। স্টান্ট আরেক জিনিস। জীবনের কাছে থাকুন। মানুষের কাছে থাকুন।’

‘জ্বী, তাই তো আছি। মানুষ তো আমার খুব পছন্দের। বিশেষত মেয়ে মানুষ।’

‘ঐখানেই তো আপনাদের সমস্যা। মেয়ে মানুষ! পণ্য হিসেবে দেখেন নাকি মেয়েদের?’

‘জ্বী। তা দেখি। উত্তম পণ্য।’

এবার ভদ্রমহিলা রেগেছেন। তাঁর কেশর ফুলিয়ে ঠকাঠক পা ঠুঁকে গর্জাতে লাগলেন।

সম্ভবত এসব কারণেই আমাদের লঞ্চটি ডুবে গিয়ে থাকবে।

 

১৯৯৩; সংবেদ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রকাশিত

 

Flag Counter

Categories
গল্প

পুরোনো বন্ধুদের থেকে সাবধান

তো, পুরোনো আমার যে-বন্ধু সে আমাকে সকালে যোগাযোগ করে। আমি বলি, কী ব্যাপার, এতদিন কোথায় ছিলেন?

তিনি রুষ্ট হন: হারামজাদা, আপনে কইরা কইতেছো যে!

আমি ‘সরি’ বলি। সে বলে, ‘তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেছি, বাসায় থাকবা নাকি?’

আমি বলি আমি খুব ব্যস্ত। কিন্তু সে বলে রাতে কোনো কাজ আছে নাকি? আমি বলি, ‘কখেন?’ সে বলে, ‘রাতে।’ আমি ভয় পাই। বলি, ‘রাতে সময় হবে না, বরং দিনের বেলায়ই; এবং আমি নিজেই আসছি, তোমার ঠিকানাটা বলো।’

সে ঠিকানা বলে। আমি তার বাসায় যাই।

তার বাসা যথারীতি। বিবাহিত। কাজের মেয়ে আছে। অসুন্দর; এবং—বাগানে ডালিয়া ফুল। বাগান মানে বারান্দা। বারান্দায় অনেক টব। টবের ফাঁকে কসরৎ করে বসানো চেয়ার। সেখানে আমরা বসি। বসার পর তাকে ভালো লেগে যায়। কিন্তু ইহজনমে তাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে কণ্ঠ কর্কশ বিধায় আগে হয়তো শুনে থাকবো।

সে বলে, ‘বড়ো সুখ লাগে বুঝলা রাইসু, তুমি প্রাপ্তিতে বড়ো সুখ হয়।’

আমি বলি, ‘তোমার কণ্ঠ বোধহয় আগে শুনে থাকবো।’

সে বলে, ‘শুয়ারের বাচ্চা!’ আমি হাসি। সে-ও হাসে। তার দাঁত সুন্দর। আমি বলি, তোমার দাঁত বোধহয় আগে কখনো দেখে থাকবো।

‘কিন্তু আগে কোনোদিনই দাঁতই ছিল না আমার!’—সে উঠে আমার ঠোঁট কামড়ে ধরে। আমার শিহরণ হয়। তার ছেলে আসে বারান্দায়। পাঁচ-ছয় বছরের শয়তান। কালো মোটা ফ্রেমের ইন্টেলেকচুয়াল চশমা। দাঁতের বিন্যাস মায়ের মতো নয়। পরস্পরবিচ্ছিন্ন। ফলে ভালো লাগে। তার মা, আমার পুরোনো দিনের বন্ধু, পরিচয় করিয়ে দেয় তার ছেলের সঙ্গে। বলে, ‘তোমার বাবা হন ইনি। হ্যান্ডশেক করো খোকা।’ খোকাবাবু হ্যান্ডশেক করে। বলে, ‘আগে কখনো দেখে থাকবো আপনাকে।’

‘আমিও।’

‘কী করছো এখন?’ তার মা জিগ্যেশ করে।

‘ছেলেটা কার আসলে?’ আমি জানতে চাই।

সে হাসে, ‘যাও বাবা ঘরে যাও।’ তার ছেলে ঘরে যায়। সে বলে, ‘তোমারই ছেলে। তা তুমি এখন কী করছো?’

আমি বলি, ‘গল্প-টল্প লিখি।’

‘আর কিছু না?’

‘না, আর কিছু না।’

‘চলো, আমার সঙ্গে ঘুরবে আজ।’ সে রিকশা নেয় এবং বলে, ‘গল্প কীভাবে লেখো, তোমার লজ্জা হয় না?’

আমি বলি, ‘গল্প লেখায় আবার লজ্জা কীসের?’

সে কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর বলে, ‘ঠিকই বলেছো, গল্প লেখায় আবার কীসের লজ্জা?’

: কিছু কিছু গল্প অবশ্য আছে, লিখতে সত্যি লজ্জা করে।

সে আগ্রহী হয় এবং আমি তাকে কিছু বলি না।

সে পুনরায় আগ্রহী হয় এবং আমি তাকে বলি। সে বলে, কী বললা বুঝলাম না। আমি তার কানের কাছে মুখ নিই এবং কিছু বলি না। সে খুব উল্লসিত হয়। বলে, ‘তাই নাকি! আমার খুব ভালো লাগছে। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে। ইশ্!’

আমিও ‘ইশ্’ বলি।

সে বলে, ‘কী, ভেঙচাচ্ছো নাকি?’

আমি বলি, ‘না ভেঙচাচ্ছি না। তোমার ছেলের বয়স কতো?’

‘সাত।’

‘সাত কেন?’

‘কীভাবে বলবো! আমি কীভাবে বলবো বলো! আমার কি বলার কিছু আছে।’ সে কাঁদতে লাগে। ফলে আমি হাসতে শুরু করি। আমি তাকে বলি, ‘তোমার মধ্যে উত্তেজনা হইছে লাইলি!’

সে বলে, ‘আমি লাইলি না, আমি যুলেখা।’

আমি বলি, ‘ঐ একই কথা। যাহা লাইলি তাহা—’

‘তাহা কী? বল্ কুত্তার বাচ্চা, তাহা কী?’

সে বক্র হয়। মোচড় দিয়ে তার যৌবন প্রকাশ করে। এবং তার অবস্থান থেকে খানিক উত্থিত হয়। ফলে তার ব্যক্তিত্ব। সে বলে, ‘চুতমারানি, এটাকে প্রেমের গল্প বানাবার ধান্দায় আছো, না?’

তার গালাগালকে আমার নারীবাদ ভ্রম হয়। আমি বলি, ‘না, এটা ঠিক প্রেমের গল্প না; এটা ক্রুয়ালটির গল্প। আমি শুধু ক্রুয়ালটির গল্পই লিখতে চাই।’

‘ক’টা লিখেছো?’

‘সাতটা।’

‘আমাকে দেখাবে?’

আমি তাকে হাসি : ‘কিন্তু আমাকে দেখা করতে চেয়েছেন কেন?’

‘সব বলছি। রহো।’

২.

আমরা একটা পিজা’র দোকানে ঢুকি। সেখানে লাল চেয়ারে বসি। সে মেনু দেখে। বলে, ‘ইক্সকিউস মি!’ তারপর অর্ডার দেয়। টিনটেড গ্লাস দিয়ে বাইরে তাকায়। বলে, ‘যে-শহরে এত রিকশা সেখানে হাই থিংকিং সম্ভব কী করে! বলো রাইসু, তুমি তো আমার ভাই হও, বলো কীভাবে সম্ভব?’

‘এটাই তোমার সমস্যা?’

‘না। এটা আমার সমস্যা হবে কেন? আর তোমাকে আমি কোনো সমস্যা শোনানোর জন্য ডাকি নি। আমি তোমার সংগে একটা দিন পরিব্যয় করতে চাই। অযথা আগ্রহ দেখাবে না। যা বলছি শুনে যাও।’ সে তার গল্প শুরু করে : ‘আমার তখন বয়স চোদ্দ। ফলে আমার এক মামার প্রেমে পড়ি। তিনি আমাকে ভূগোল পড়াতেন। বলতেন, মানুষের শরীর হচ্ছে মানচিত্র। বুঝতাম, এসব তিনি আমাকেই উদ্দেশ্য করেন। পর্বত, উপত্যকা, মালভূমি, আরো কী-সব কী-সব বলতেন। আমার তখন নতুন শরীর। এসব নোংরা শুনতে ভালোই লাগতো। তুমি বোধহয় জানো, সেই মামার সংগেই বিয়ে হয়েছিল আমার। বিয়ের পরও তাকে মামা ডাকতাম আমি।…’

‘তাই নাকি!’ আমি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করি। এতে সে বিরক্ত হয়। বলে, ‘ডিসটার্ব কোরো না রাইসু। যা বলছি শুনে যাও।’ সে পুনরায় তার গল্প শুরু করে: ‘কী বলছিলাম যেন? মামা ডাকতাম। মামা ডাকতাম, শেষে…যাই হোক, আমাদের ফ্যামেলি এ বিয়ে মেনে নেয় নি। তো, বিয়ের পর মামা আমাকে শাসন করা শুরু করলেন। আমাকে তুই করে বলা শুরু করলেন। বলতেন, “তুই তো কোনো ভালো মেয়ে না। মামার সংগে প্রেম করে বিয়ে করেছিস। তোর তো কোনো বিশ্বাস নাই।” তিনি তালা মেরে আটকে রাখতেন আমাকে ঘরের মধ্যে। গোপনে চাবি বানিয়ে নিয়েছিলাম দরজার। মামা কোনোদিন টের পান নাই। তখনই তো তোমার সংগে আমার পরিচয়। বরিশালে। মনে নেই তোমার?’

আমি ‘না’ বলি।

সে আমার ‘না’-কে পাত্তা দেয় না। দুই হাতে ঝাপটা মেরে উড়িয়ে দেয়। দিয়ে ফিক্ করে হেসে ফেলে: গল্পটা কেমন বানালাম?’

আমি সায় দিই। সে আমাকে জিগ্যেস করে, ‘তোমার কী মনে হয়, কেন একটি গল্প গল্প হয়ে ওঠে?’

আমি বলি, ‘বিশ্বাসযোগ্যতা—বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হয় গল্পের।’

‘কিন্ত বেশিরভাগ গল্প, ভালো ভালো গল্পগুলি কি অবিশ্বাস্য নয়?’

‘তাহা ম্যাডাম, তাহা।’

‘কিন্তু সেসব গল্প খুবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাই না রাইসু সাহেব?’

আমি তার চোখের মধ্যে তাকাই: ‘তুমি একটু পাগলা আছো লাইলি।’

‘তো?’

‘তো আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ আমি তার শিরদাড়া বরাবর আঙুল ঢুকিয়ে দেই। সে মিষ্টি করে হাসে। বলে, ‘আমারো জগতে শুধু গান।’ আমি জিগ্যেস করি, ‘কার গান গো?’

সে হাসে। বলে, ‘তোমারই।’

৩.

তার হাজব্যান্ড আসেন বারান্দায়। ভদ্রলোক ফর্শা। মাগীমার্কা চেহারা। সোডিয়ামের আলোয় তাঁর মাগীভাব প্রকট হয়। বারান্দায় এসে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে তিনি আছেন কি নেই।

আমি বলি, ‘আপনি তো নেই।’

এতে আশ্বস্ত হন তিনি। গিয়ে এক কোনায় ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকেন। লাইলি কাচভাঙার মতো হেসে ওঠে। আমার দিকে তাকায়, ‘আমি জানতাম, আমি জানতাম তুমি বলবা।’

‘কী বলবো?’

‘এই যে বললা, তুমি আমারে ভালোবাসো।’

‘কখন বললাম?’

‘বলেছো, একটু আগে বলেছো।’

‘কিন্তু তোমাকে তো আমি জানি নাই প্রায়।’

‘কে কাকে জানে বলো?’

‘তা ঠিক,’ আমি তার হাজব্যান্ডের দিকে তাকাই। ভদ্রলোক উপদ্রবহীন তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। আমি তাঁকে মৃদু হাসি। লাইলি গাল দেয়: ‘খানকির বাচ্চা!’ কাকে দেয় কে জানে। আমার ভালো লাগে। আমি ঠিক করি কোনো গল্পই আত্মহত্যা দিয়ে শেষ করবো না। খুনখারাবি দিয়ে শেষ হয় শুধু দুর্বল গল্পগুলি। লাইলি আমার সন্দেহে একমত হয়। আমরা ঠিক করি দু’জন মিলে কিছু গল্প লিখবো।

সে বলে, ‘আমার খুব অভিজ্ঞতা।’

আমি বলি, ‘অভিজ্ঞতা ছাড়া তো গল্প হয় না।’

সে বলে, ‘সমাজ ছাড়াও গল্প হয় না।’

আমরা সমাজ ও অভিজ্ঞতার কথা লিখবো…

আমরা আস্তে আস্তে ভাষাকে কলুষিত করে ফেলবো…

লাইলির হাজব্যান্ড এরমধ্যে একবার এলেন, ‘আমার বৌকে আপনার কেমন লাগলো?’

আমি একটু হকচক খাই। আসলে খাই না। ভাব করি খেয়েছি। তারপর লাইলির দিকে তাকাই। লাইলি হাসি-হাসি মুখ ক’রে ভাষাকে কলুষিত করে দেয়: ‘রামছাগলটা জানতে চাচ্ছে আমার টেস্ট কী রকম; বোঝো না তুমি?’

‘বুঝি তো। বুঝি। একটু নোনতা আছো তুমি।’

‘আমি নোনতা! কী কইতে চাও মিয়া?’

‘কইতে চাই, তোমার মধ্যে প্রভূত লবণের ব্যবসায় আছে।’

‘তাই নাকি! আপনার জিহ্বা অনেক বৃহৎ হইছে মনে হয়।’

‘জ্বী হয় খালাম্মা, ইহা অনেক বৃহৎ হইছে।’

লাইলির হাজব্যান্ড মাঝখানে ঢুকলেন, ‘বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র, এটা আসলে আপেক্ষিক ব্যাপার। যাহা ক্ষুদ্র তাহাই বৃহৎ আবার যাহা বৃহৎ তাহাই ক্ষুদ্র।’

‘আপনারে কে বললো?’ আমি জিগ্যেশ করি।

‘বললো। আছে। বইয়ে লেখা আছে।’

‘ওর সঙ্গে তুমি বাক্যালাপ করছো কেন? তুমি আমার সঙ্গে বাক্যালাপ করো।’ বলে লাইলি।

আমি লাইলি সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করি: ‘লাইলি, আবেগ কমিয়া যাইছে।’

লাইলি মলিন হয়, ‘এটা তো খুবই ইয়ে। তুমি ডাক্তার দেখাও না কেন?’

‘সেই জন্যেই তো আপনার কাছে আসা,’ আমি লাইলিকে তাকাই।

‘তাই নাকি! আইস, আইস, অভ্যন্তর হও।’

৪.

আমরা লাইলির শোওয়ার ঘরে ঢুকি। লাইলি গিয়ে তার বিছানায় শোয়। আমি তার পাশে বসি। সে বলে, ‘যুলেখা বাদশার মেয়ে।’ তারপর দুই হাতে জাপটে ধরে আমাকে, ‘আমার কিছু ভালো লাগে না রাইসু, আমার কিছু ভালো লাগে না।’ লাইলি তার ঠোঁট বাঁকা করে। ঢোক গেলে। চোখ পাল্টায়। তার সারা মুখ তিরতির করে। অদ্ভুত দক্ষতায় সমস্ত শরীরে ক্ষীণ ও তাৎক্ষণিক একটা ঝাঁকুনি দেয়। তারপর বলে, ‘কোনো-কোনো দিন এমন হয় না রাইসু, কী বলবো, আমার একদম মরে যেতে ইচ্ছে করে।’

‘কখন করে এটা?’

‘এই সকালের দিকে। তখন আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয় এই জগৎসংসার সব অর্থহীন। কেউ আমারে বুঝতে পারলো না।’

‘তারপর?’

‘তারপর আমার খালি খালি লাগে। মনে হয় শূন্য হয়ে গেছি।’

‘তারপর?’

‘তারপর আমার বন্ধুরা সব ঝাঁক বেঁধে আসতে থাকে। তুমি তো জানোই, আমার সব পুরোনো বন্ধুদের দিয়ে তৈরি আমার এই পার্সোনালিটি—এই আমি।’ লাইলি তার বুকের দিকে তাকায়। আমিও।

‘তুমি একবার ভাবো, আমার এই জীবৎকালে পুরোনো বন্ধুদের সংখ্যা কতো-কতো!’ লাইলি তার পুরোনো বন্ধুদের নাম মুখস্ত বলে যায়। দেখি আমার নামও বলছে। কিয়ৎ আশ্চর্য হই। আশ্চর্য হওয়া থামলে ফের শুরু করে সে: ‘তো, আমার এই যে পার্সোনালিটি—এটা একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ব্যাপার, নয় কি?’

আমি লাইলির বুকের দিকে পুনরায় তাকাই: অলওয়েজ নট, ম্যাডাম। অলওয়েজ নট।

‘সেক্ষেত্রে চিন্তা করে দ্যাখো, পাখি উড়ে গেছে কিন্তু পড়ে আছে তার ছায়া—সেই ছায়া দিয়ে আমি করবোটা কী?’

‘তুমি এইখানে পাখি পাইলা কই?’

‘এটা একটা অ্যানালজি—উদাহরণ। সবকিছু বুঝতে চাও কেন? তোমাকে না বলেছি, কেবল শুনে যাও।’

‘ঠিক আছে শুনছি। তারপর?’

‘তারপর, তারপর আমি যাদের কারণে আমি, সেই তারা তো প্রায় কেউ নেই। মানে তারা তো আর তারা নেই। তারা তো এখন না-তারা। এখন আমি কী করবো?’

‘থাকলে কী করতা?’

‘থাকলে কী করতাম সেটা তো কোনো ইয়ে না। তারা যে নেই, নেই যে, এই যে নাথিংনেস, এইটাই বড়ো। আমি এই ‘না’-টা নিয়ে প্রতিদিন সকালে দুঃখ দুঃখ করতে চাই। নস্টালজিয়া করতে চাই। কাঁদতে চাই আমি। আমি কাঁদতে চাই। আই ওয়ান্ট টু ক্রাই…’… লাইলি চিৎকার করতে করতে বিছানা ছেড়ে লাফ মেরে উঠে দাঁড়ায়। তার বৃহৎ স্বামী এবং ক্ষুদ্র সন্তান এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে। লাইলি এবার দ্বিগুণ শব্দ করে: ভাগ্ কুত্তার বাচ্চারা! ভাগ্ এখান থেকে!!

দুই ভদ্রলোক ছিটকে পড়লে আমি গিয়ে জড়িয়ে ধরি লাইলিকে, ‘লাইলি, তোমার স্ট্রাকচারে খুব ডেডিকেশান!’

লাইলি ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় আমাকে, ‘ইতর কোথাকার! সুযোগ নিতে চাও? লজ্জা করে না…?’

‘স্থির হও লাইলি। স্থির হও। তোমার কী হইছে?’

‘ওর কিছু হয় নাই। আপনি আমাদের বিরক্ত করবেন না প্লিজ।’ তার স্বামী—বৃহৎ ইন্টেলেকচুয়ালটি—এইরূপ বলে। তখন লাইলির পুত্র—ক্ষুদে ইন্টেলেকচুয়াল—মাথা ঝটকায়: আমার মা তো দেখেন কতো কান্নাকাটি করে! এখন আমরা কী করবো?

আমি লাইলির ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসি। লাইলি বলে, ‘দাঁড়াও।’

আমি দাঁড়াই। লাইলি এসে হাত ধরে আমার।

৫.

আমরা ঠিক করি—আমি আর লাইলি—আমাদের বাচ্চাকাচ্চা হলে তার নাম রাখবো হ্রাহা। লাইলি হা হা দিয়ে ওঠে: ছেলে হলে হ্রাহা, মেয়ে হলে হ্রিহি।

আমি বলি, ‘ঠিক আছে। কিন্তু বাচ্চা কিভাবে নেবো আমরা? আমরা তো বিয়ে করি নাই!’

: বাচ্চা তো হবে আমার। তোমার এতসব চিন্তার কী দরকার?

‘তা ঠিক। কিন্তু মেয়েদের তো আমি দেখি মায়ের মতো।’

: তোমাকে আর দেখার সুযোগ দেওয়া হবে না। চোখে পট্টি বেঁধে দেয়া হবে তোমার। তারপর বাচ্চা নেবো আমরা।

‘আমার এসব ভয় করে লাইলি!’

: তোমার ভয়ের কিছু নাই। যার চোখ নাই তার ভয়ও নাই।’

‘তোমার হাজব্যান্ড যদি রাগ করে?’

: ও রাগ করবে কেন? ওর চোখেও পট্টি বেঁধে দেব আমরা। যার চোখ নাই তার রাগও নাই। আর গল্পের মধ্যে সবই সম্ভব।

‘তা ঠিক, আমাদের গল্পে কতো জায়গা বড়। কত সুযোগ সেখানে!’

: অনেক সুযোগ!

‘আমরা শুধু গল্পের মধ্যেই বাস করতে চাই।’

: গল্পের মধ্যেই করতে চাই আমরা।

৬.

এবং আমরা করি।

নিয়মটা হচ্ছে: প্রথমে দুজনের চোখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলতে হয়। তারপর আমরা কাঁদতে থাকি। লাইলির হাজব্যান্ড এসে বলেন, ‘কী হয়েছে?’ তখন আমরা বলি যে আমরা বাচ্চা নিতে চাই।

ভদ্রলোক বলেন, প্রত্যেকেরই বাচ্চা নেওয়া উচিত। তারপর তাঁকে সাক্ষী রেখে বাচ্চা নিই আমরা। পরদিন বাচ্চা হয়। মেয়ে। বাচ্চার নাম হ্রাহা।

রচনা: ১৯৯৩

 

Categories
গল্প

মৃত্যুচিন্তা করেন এমন কাউকে নিয়ে গল্প লেখা কঠিন

আমরা যে-দিনগুলিতে কেবলই বৈচিত্রের সন্ধান, আর বলছি ভালো লাগে না ভালো লাগে না, তেমন দিনে যিনি আমাদের বুঝতে পারতেন তিনি থাকতেন সদাই গম্ভীর, ফলে প্রতিটা বিষয়েই তার ছিল নিজস্ব সব ভিন্নমত। আর যখনি আমরা তার কাছে গিয়েছি তো আমাদের চা দিয়েছেন বিস্কিট দিয়েছেন, বলেছেন, ‘শোনো, নতুন একটা চিন্তা এসেছে মাথায় কিন্তু তার আগে তোমরা ভাতটাত কী খাবে বলো, আমি লাইলিকে বলি।’ কিন্তু আমরা নিশ্চই করে জানতাম, তাঁর যে নতুন চিন্তা, তা মৃত্যুবিষয়ক। আমরা কখনোই বুঝতে পারি নি কারো একজনের মৃত্যু বিষয়ে কেন এত চিন্তা করতে হয়, এবং আমরা বলেছিলাম যে দুপুরে আমরা খাবো।

লাইলি, যেহেতু তাঁর মেয়ে এবং একমাত্র, সে বলে, ‘তোমরা ভাত খেতে এসছো বুঝি।’ আমরা ‘হাঁ’ বলতেই তিনি গম্ভীর মুখে বলতেন, ‘বুঝলে, আত্মহত্যা-করতে-চায় এমন কাউকে দেখলে আমার কাছে নিয়ে আসবে। এরা মৃত্যুকামনা থেকে একধরনের যৌনানন্দ পায়, আমি একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম, করি নি কেন জানো?’ লাইলি, যেহেতু তাঁর মেয়ে, সে জিজ্ঞেস করে, ‘আনন্দের জন্য বুঝি?’

আমরা হাসি। হাসতে হাসতে কেউ দাঁড়াই। কেউ, ‘চায়ে চিনি কম দিয়েছো লাইলি, ঘটনা কী?’ কেউ, ‘কিন্তু ফ্রয়েডের সব কথাই মেনে নেয়ার কোনো কারণ আছে কি?’

তিনি কখনো হাসেন না। মৃত্যুচিন্তা যিনি করেন, তার মুখে হাসি শোভা পায় না। ফলে তাঁর মেয়ে একাই হাসে। আমরা ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসি।

২.
আমরা তাঁর ঘর ছেড়ে সোজা হেঁটে যাই। সামনে যে-বাসা, নক করি। দরজা খোলে। ভেতরে ঢুকি। আমরা হাসি। ঘরভর্তি লোকজন। আমাদের বসতে বলে। বলে, ‘আপনারা বসুন। আমরা আত্মহত্যা করতে চাই।’ আমরা পরিবারটিকে লাইলির বাবার কাছে নিয়ে আসি। লাইলির বাবা বলেন, ‘আত্মহত্যা হচ্ছে নিজেকে ধবংস করার প্রবণতা। মর্ষকাম। এর সঙ্গে যৌনতা জড়িত।’

যৌনতার কথা ওঠায় আমাদের সবারই উত্তেজনা হয়। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল যে-পরিবারটি তার সব সদস্যরা নগ্ন হয়। লাইলি নগ্ন হয়। লাইলির বাবা নগ্ন হন। লাইলি হাসে। একাই, এবং বলে, ‘এ ধরনের গল্প আসলে পর্নোগ্রাফি।’

আমরা স্বীকার করি। লাইলির বাবা, যেহেতু প্রধান চরিত্র, বলেন, ‘পর্নোগ্রাফির ইতিহাস তোমরা জানো নাকি কিছু?’

লাইলি হাসতে হাসতে বলে, ‘আসলে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।’ যেন এই প্রথম কেউ স্বপ্ন দেখলো, এবং আমরা যৌনানন্দ থেকে ফ্রয়েড-মারফৎ স্বপ্নের মধ্যে চলে আসি।

‘কী স্বপ্ন তুমি দেখলা লাইলি?’

লাইলি বলতে রাজি হয় না। পরে বলে, সে দেখেছে হুমায়ূন আহমেদকে। তিনি পশুপাখির সঙ্গে কথা বলছেন।

আমরা হুমায়ূন আহমেদকে ফোন করি। কে এক পিচ্চি ফোন ধরে, ‘কী চাই?’

আমরা বলি, ‘হুমায়ূন আহমেদ সাহেবকে আমরা চাই। তিনি কি আছেন?’

এবার অপেক্ষাকৃত খসখসে ও বয়স্ক কণ্ঠ, ‘হুমায়ূন তো নেই। ও বাচ্চাদের নিয়ে জিরাফ দেখতে গেছে।’

আমরা লাইলির বাবাকে জিজ্ঞেস করি, জিরাফ দেখার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত নিষেধ আছে কি না, বাচ্চাদের। তিনি বলেন, এগুলো আসলে তেমন জরুরি কিছু নয়।

‘কিন্তু আপনি আত্মহত্যা করতে গেলেন কেন?’

‘সে সব আমি বলতে চাই না।’ আর তিনি বলা শুরু করেন, ‘লাইলির যখন মা চলে যায় তখন তার বয়স আট।’

‘আট কেন? ‘ভদ্রলোকটি কে ছিলেন? ‘আপনি আগে টের পাননি? ‘অবশ্য এগুলো আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার (যেন ব্যক্তিগতর বাইরে কোনো ব্যাপার রয়ে গেছে।)।’’’’

ফলে মৃত্যুচিন্তা করেন এমন কাউকে নিয়ে গল্প লেখা কঠিন। আমরা ঘুরে-ফিরে লাইলির কাছেই ফিরে আসি। আর এইমাত্র, গতকাল, লাইলি ফোন করে জানিয়েছে যে তার বাবা মারা গেছেন, আমরা যেন তাকে দেখতে যাই।

১৯৯৩