Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

মেল চক্করে রাইসু

কবি, বুুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, আর্টিস্ট ব্রাত্য রাইসু আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড, ফেসবুকে আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ৪ কি ৫ বছর।

এই নভেম্বরের শুরুতে রাইসু এক স্ট্যাটাসে জানাইল যে নভেম্বরের ১৯ তারিখ তার বয়স ৫০ বছর পার হবে; মনে পড়ল, নভেম্বরের ১৬ তারিখ আমার বয়স ৫২ পার হবে। রাইসু তার স্ট্যাটাসে জানায় যে সে তার পঞ্চাশ পূর্তিতে ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খুলতে চায় যাতে তার বন্ধু ও পরিচিত জনেরা তাকে নিয়া কিছু লেখা-জোখা করতে পারে।

স্ট্যাটাসটা দেইখা ঠোঁটের দুই কোনায় একটা বাঁকা হাসি খেইলা গেল, মনে হইল, হ, রাইসুর ৫০ পূর্তির এই ইভেন্টে লেখি। কিন্তু রুটি-রুজির কসরৎ আর পারিবারিক দৌড়ে লেখার ভাবনাটা আর দানা বাঁধতে পারতেছিল না, ক্রমে চিন্তাটা মাথা থিকা আউট হইয়া যাইতেছিল। অতঃপর ৯ নভেম্বর জনপ্রিয় লেখিকা ও রাইসুর ঘনিষ্ঠা নাদিয়া ইসলামের কাছ থিকা মেসেনজারে এরূপ বার্তা পাইলাম:

“হাই ফরিদ, ব্রাত্য রাইসুর ৫০ তম জন্মদিন আসছে নভেম্বরের ১৯ তারিখ। আপনি রাইসুকে নিয়ে একটা লেখা দিতে পারবেন কি? মানে রাইসুর সাথে আপনার কীভাবে পরিচয়, কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে আছে কি না বা রাইসুকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন এইসব। লেখার শব্দসংখ্যা আনলিমিটেড। লেখা দিতে হবে ১৭ তারিখের ভিতর। লেখা দিলে তার নিচে/ উপরে আপনার নাম, পরিচয়, জন্মতারিখ উল্লেখ করবেন প্লিজ। দিলে আমাকে লেখা ইনবক্স করবেন, না দিলে এই ইনবক্সের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নাই। আমার নাম নাদিয়া ইসলাম বাই দ্যা ওয়ে, আমি রাইসুর বন্ধু। আমি রাইসুর পরিচিত/ বন্ধুদের সবার লেখা পাইল-আপ করছি, যেটা ওর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে যাবে। থ্যান্কস।”

ফরিদ আহম্মেদ

এই বার্তা পইড়া আমার ঠোঁটের কোনায় আবার এক পশলা হাসি খেইলা গেল, নাদিয়াকে আমি এই উত্তর দিলাম:
“হাই নাদিয়া, থ্যাংক ইউ ফর সেন্ডিং মি দিস মেসেজ। রাইসুর ৫০ উপলক্ষে রাইসুর বিজ্ঞাপনটা পড়ার সাথে সাথেই আমার কিছু একটা লেখার জন্য মনটা আঁকাবাকা হচ্ছিল, রুটি-রুজি আর পারিবারিক ব্যাস্ততায় বিষয়টা আবার দূরেও সরে যাচ্ছিল। আপনার এই বার্তায় বিষয়টায় আরও ইনসপায়ার্ড বোধ করতেছি। আপনার দেয়া দিন সীমানার মধ্যে কিছু একটা লেখার ব্রত নিলাম, বাকিটা এলাহি ভরসা।”

জবাবে নাদিয়া একটা “Thank YOU”-র GIF পাঠাইলে আমি তাতে লাইক দিলাম।

২. পরদিন রাইসুর কাছ থিকাও এ সংক্রান্ত একটা লেখার অনুরোধ ইনবক্সে পাইলাম। যেহেতু নাদিয়ার কাছে আমি এ সংক্রান্ত করার জানায়া দিছি তাই রাইসুর মেসেজের কোনো জবাব না দিয়া এই লেখাটা কেমনে পাকানো যায় সেই বিষয়ে মনোনিবেশ করলাম।

৩. রাইসুর প্রথম স্ট্যাটাসটা পইড়া যখন লেখার ব্যাপারে মনমনাইতে ছিলাম তখনও নিশ্চিত ছিলাম না ঠিক কী আমি লেখতে পারি। নাদিয়ার মেসেজটা দ্বিতীয় বার পাঠের সময় দেখলাম ওখানে ‘কী লেখা যায়’-এর একটা গাইডলাইন আছে। ভাবলাম, এই গাইডলাইন অনুসরণে যা পারি তাই লেখি, আর এই লিখতে বসলাম।

৪. রাইসুর সাথে আমার কীভাবে পরিচয়?

যদিও ব্রাত্য রাইসুর সাথে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপ ৪/৫ বছরের কিন্তু আমরা পরস্পরকে মুখ দেখাদেখি চিনি ৮০-র দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময় থিকা। ঢাকার দূতাবাসগুলার কালচারাল সেন্টার (যেমন, ইউসিস, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, আঁলিয়াস ফ্রসেজ, গ্যাটে ইনস্টিটিউট, ইত্যাদি) ভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীগুলাতেই সম্ভবত প্রথম দেখাদেখি শুরু। যদিও দেখাদেখি হইত হরহামেশাই কিন্তু আলাপ হয় নাই তত। তারপর কবে থিকা আমরা পরস্পরকে তুমি সম্বোধন করি তাও মনে করার মত কোনো বিশেষ উপলক্ষ নাই তাই তা মনেও নাই।

উননব্বই সালে আমার এমএসসি পরীক্ষা হইয়া গেলে আমি জাহাঙ্গীরনগরের হল নিবাস সাঙ্গ করিয়া ঢাকায় স্থায়ী অস্থায়ী নিবাস নিলে পর আমার প্রায় প্রতিদিনের চক্কর ছিল পাবলিক লাইব্রেরি, চারুকলা, টি এস সি, হাকিম চত্বর , শাহবাগ, পি জি, পরে আজিজ মার্কেট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আর্ট এক্সিবিশন, ইত্যাদি। রাইসুকেও ঐ কালে দেখছি ঐসব মেল চক্করে। ইতমধ্যে রাইসু প্রকাশিত কবি, ‘গাণ্ডিব’ কবিদলে সে ঘুইরা বেড়ায়, কাছাকাছি কিন্তু প্রায় দূরে, অন্য কোন ম্যালে, অন্য কোনো ভাবধারায়।

৫. আমার নিজ বিষয়ে কতক টিকা টিক

এই কালে আমার প্রায় এরূপ ভাবধারা ছিল যে, আমার আশপাশের সব কিছু খুুব শ্যালো, কারো ভিতর কোন ডেপ্থ খুঁইজা পাইতাম না, সবাইরে মনে হইত ফাতরা, সবকিছুরে মনে হইত ফাতরামি-ইতরামি, এমনকি নিজেকেও তাই, ফলত আমি যদিওবা আশেপাশে তাকাইতাম কিন্তু কিছুই প্রায় দেখতাম না, মানে আমি আমার পরিপার্শ্ব বিষয়ে ছিলাম একান্তই অনওয়াকিবহাল, ভদ্রলোকেরা যাকে বলে ইগনোরেন্ট ঠিক তাই! যদিও আমি এসব চক্করের অনেকেরেই নামে-ধামে চিনতাম কিন্তু কারও সাথেই চিন-পরিচয় হয় নাই আরও দূর অগ্রগামী।

৬. রাইসুর সাথে আমার উল্লেখযোগ্য ঘটনা?

৬.১. রাইসুকে তখন সবচেয়ে বেশি দেখতাম সাজ্জাদ শরিফের সাথে। রাইসু সম্বন্ধে যে আমি বিশেষভাবে কিছু ভাবতাম এমন না, কিন্তু সাজ্জাদের অ্যাট্যুটুডের কোনো একটা দিক আমার বিশেষভাবে বিরক্তিকর লাগত, সেটা হৈল তার বেহুদা ঔদ্ধত্ব, এমন না যে সাজ্জাদের সাথে আমার এ সংক্রান্ত কোনো বিশেষ ঘটনা আছে, সাজ্জাদ আর আমার পারস্পরিক সম্বোধন ছিল আপনি, তো, সাজ্জাদের বিষয়ে আমার মনোভাবকে বলা যায়—এ ভেরি সাবজেকটিভ চয়েজ। এনিওয়ে, রাইসু-সাজ্জাদ যেহেতু একসাথে চলে তাই তাদের উভয়কে দেখলেই আমার কপাল কুুচকানি আসত। এমনও হইয়া থাকতে পারে যে, আমরা মনে মনে পরস্পরকে ভেঙচাইছি অনেকবার, তবে এখন এ বিষয়ে নিশ্চিত কইরা কিছুই মনে পড়তাছে না।

৬.২. পিজির নিচে বা পাবলিক লাইব্রেরিতে বা আজিজ মার্কেটে এ রকম অনেকবারই হইছে, দেখা গেল তিন-চাইরজন বা পাঁচ-ছয়জন বা সাত-আটজন বা আরও বহুজনের দাঁড়ানো আড্ডায় আমিও আছি আর রাইসুও আছে কিন্তু আজকে এইসব আড্ডার কিছু স্মৃতি শ্রুতি করতে গিয়া দেখি থিংকস আর অবলিভিয়াস।

এই সময় রাইসু কখনও কখনও বেগম আখতারের ঠুমরির কলি গাইত খেয়ালে-বেখেয়ালে, পাবলিকলি, আর বন্ধুদের, বিশেষত কিশোরীদের সাথে সাক্ষাৎ অভিভাষণ হিসাবে বলত—হোলা!

৬.৩. তারপর অনেক অনেক কাল আমাদের দেখা নাই, ২০০৫ থিকা আমি দেশছাড়া, তারপর ২০১১ কি ২০১২ তে আমি দেশে গেছি, তখন ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে বইমেলা চলতাছে আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলতাছে গণজাগরণ মঞ্চ, সেই সময়কার কোনো এক বিকাল বেলায় আমি ছবির হাটের কাছে উদ্যানে খাড়ায়া আছি, দেখি কাজল শাহনেওয়াজ, সুমন রহমান আর ব্রাত্য রাইসু এক সাথে বইমেলা থিকা ফিরতাছে, আমারে দূর থিকা দেইখা তিন জনই সখা ভাবে আগায় আসে উষ্ণ অভিবাদনে আর আমিও পুলকিত হয়ে হই বিগলিত চিত্ত। সেটাই রাইসুর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।

৭. রাইসুকে আমি কীভাবে মূল্যায়ন করি?
রাইসুর সাথে ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপের আগে রাইসুর লেখালেখি নিয়া আমার কোনো ধারণা ছিল না, তার সাথে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপের পর দেখলাম রাইসু কুতর্কের দোকান চালায়, তার কবিতার পোস্টের অধিকাংশতে আমি লাইক দেই, তার অ্যাক্টিভ বুদ্ধিজীবিতায় অ্যাকশন আছে, বুদ্ধিজীবী হিসাবে সে মাঠ গরম কইরা তোলার বুদ্ধিবৃত্তি প্রদর্শন সক্ষম।

ব্রাত্য রাইসুর বুদ্ধিবৃত্তির উদাহরণ স্বরূপ তার ঢাকা ক্লাব কাণ্ডের উল্লেখ করা যায়, যে বুদ্ধিবৃত্তিক নৈপুণ্যে সে ঢাকা ক্লাব কাণ্ডের উপস্থাপন ঘটাইছে, যে টান টান সার্কাস্টিক আমেজ শুরু থিকা সমাপ্তি অবধি তাল লয় সহকারে খেলা করাইছে তাতে আমি বিগ অপেরা দেখার আনন্দ উপভোগ করছি, অবশ্য এ রকমও কয়েকবার মনে হইছে যে মাজুল প্রতিপক্ষের নিষ্ক্রিয় অন্তর্ধানে অপেরাটা বিগ শো-য়ের কতক স্ট্রিং মিস করছে।

৮. ব্রাত্য রাইসুর ৫০ উত্তর আভিযাত্রায় শুভকামনা।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

কুইন্টিসেনশাল রাইসু

১৯৯৪ সালের গোড়ার দিকে একটা জিনিস আমি মনে মনে বুঝে নিয়েছিলাম: সাহিত্য করতে হলে সাহিত্যসমাজের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেই তরুণদের সঙ্গে, যারা নতুন ধরনের সাহিত্য তৈরির চেষ্টা করছে। আমার জন্যে সেটা খুব কঠিন ছিল।

আমি তখন চারুকলা ইনস্টিটিউটে (এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হয়েছি। থাকি জগন্নাথ হলে। বৃহত্তর সাহিত্য সমাজের সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। সেই যোগসূত্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে একদিন সন্ধ্যারাতে আমি যখন উপযাচিত হয়ে এগিয়ে গেলাম শাহবাগের আজিজ মার্কেটে সন্দেশের বইয়ের দোকানের সামনে ফুটপাতে আড্ডারত কয়েকজন তরুণের দিকে, তখন ওই তরুণদের একজন ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে।

শিবব্রত বর্মন

রাইসুর তখন কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল। ফুলহাতা শার্টের হাতা এলোমেলো গোটানো। এই ব্যাপারটা আমার বিশেষভাবে চোখে পড়েছিল। শার্টের হাতা ওইভাবে কাউকে কখনও গোটাতে দেখিনি আমি। পায়ে স্পঞ্জের চপ্পল। প্যান্টের নিচটা গোটানো। এই বেশভূশার সঙ্গে একেবারেই বেমানান ছিল তার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতপ্রীতি। থেকে থেকেই সে কুমার গন্ধর্বের কোনো একটা কলি উচ্চৈস্বরে গেয়ে উঠতো। মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হতো ওই সময়ের জনপ্রিয় হিন্দি গানের কলি “লোয়ে লোয়ে আজা আজা মারি।” আমার চোখে এরকম একজন তরুণ ছিল টোটালি আনপ্রেডিকটেবল। ওইদিন একগাদা বই হাতে দাঁড়ানো আমাকে উদ্দেশ করে রাইসু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনে কী পড়েন?’

আজিজ মার্কেট রেগুলারদের মধ্যে রাইসুর সঙ্গে দ্রুতই আমার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। এটা একটু অসম বন্ধুত্বই ছিল বটে। কেননা, শাহবাগে ওইসময় তরুণদের মধ্যে লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার যে স্পন্দন ছিল, তার কোনোকিছু তখনও আমার মধ্যে তৈরি হয় নি। আমার সাহিত্যরুচি তখন দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রশাসিত। রাইসু আমার ঠিক বিপরীত। সে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমি বলব, ওইসময় ওই বর্গের মধ্যে রাইসুই ছিল সর্বান্তকরণে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমার পরিচিতজনদের মধ্যে সে-ই একমাত্র ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করতে গিয়ে যে কোনো সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা করে নি। আর বিশেষ করে মানুষে মানুষে দৈনন্দিন সম্পর্ক তৈরিতে ক্ষমতাকাঠামোর যে ছায়া পড়ে, তা পরিহারে সে বিশেষভাবে যত্নবান ছিল। এর একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটতো বয়স নির্বিশেষে এক প্রজন্মের সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করার মধ্যে। বয়সে আমি তার চেয়ে বছর পাঁচেক ছোট হলেও সে আমাকে আপনি করে বলে।

রাইসুর সঙ্গে টই টই করে রিকশায় ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ানো আমার নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। মাঝে মাঝে আমি সকালবেলা বাসে করে রাইসুর মধ্যবাড্ডার বাসায় চলে যাই। সেখানে তার নতুন কেনা ঢাউস সাইজের গান শোনার যন্ত্রে আমরা খানিকক্ষণ মল্লিকার্জুন মনসুর বা ওঙ্কারনাথ শুনে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি গুলশানের দিকে। তখন ঢাকা শহরে ভিআইপি রোড বলে কিছুই ছিল না। আমরা রিকশায় করে যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। মাঝে মাঝে রাইসু আমার জগন্নাথ হলের রুমে এসে হাজির হতো। দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা ছেড়ে আমি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। আবার কখনও কখনও সে চারুকলায় গিয়ে আমাকে ক্লাসরুম থেকে বের করে আনতো। কত কত লোকজনের বাসায় যে রাইসু যেত। শান্তিনগরে মঈন চৌধুরীর বাসা, রাজারবাগে তীব্র আলীদের বাসা, বাংলা মোটরে আহমদ ছফার বাসা ইত্যাদি। মনে পড়ে রাইসুর সঙ্গে একবার হুমায়ুন আহমেদের এলিফেন্ট রোডের বাসাতেও গিয়েছিলাম। কেন যাওয়া হয়েছিল, এখন আর মনে পড়ছে না।

ওই সময় আমাদের যাওয়ার আরেকটা জায়গা ছিল গ্যাটে ইনস্টিটিউট। ফিল্ম সোসাইটিগুলি তখন দারুণ সক্রিয় ছিল। তারা নিয়মিত ছবি দেখাতো। ফেলিনি, ত্রুফো, গদারের ছবি দেখে গ্যাটে ইনস্টিটিটিউটের ছাদে চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে অভ্যাগতরা ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ঘরানা ও প্রবণতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতেন। সেই পরিবেশে রাইসুর উপস্থিতির সঙ্গে আমি মিল খুঁজে পেতাম দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে উপন্যাসের লর্ড হেনরি চরিত্রটির। লর্ড হেনরি লন্ডন শহরের ভিক্টোরিয়ান কালচারকে কটাক্ষ করতেন। রাইসু তার সময়কার কালচারের নির্মম ক্রিটিক করতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কটাক্ষের লক্ষ্যবস্তু হতো যাবতীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং তাদের সাহিত্যতত্ত্ব। সে সময় দেরিদা আর ডিকনস্ট্রাকশন শব্দগুলো আজিজ মার্কেটের করিডোরে খুব ধ্বনিত হতো।

আমার সঙ্গে রাইসুর যখন পরিচয়, তখন রাইসু মঈন চৌধুরী সম্পাদিত লিটল ম্যাগ প্রান্ত-এর দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার জন্য উপকরণ সংগ্রহ করছে। আমাকে সে হাইডেগার অনুবাদ করতে দিলো। আর বললো, গল্প দেন। প্রান্ত ম্যাগাজিনে আমার গল্প ছাপা হয়েছিল। তাতে লিটল ম্যাগাজিনের ওই সময়কার ভাষাভঙ্গির অনেক ছাপ ছিল, বুঝতে পারি।

পরিচয়ের মাসখানেকের মধ্যে আমাকে একবার গ্রামের বাড়ি যেতে হয়েছিল। ট্রেনে যাবো। রাইসুকে বলামাত্র সে বললো সেও যেতে চায়। আমি বাড়িতে চিঠি লিখে দিলাম যে, এবার আমার সঙ্গে ঢাকার একজন কবিবন্ধু থাকবেন। কাজেই বাসাটা যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাফসুতরো দেখায় এবং আমার বন্ধুর অপরিপাটি বেশভূশায় তারা যেন অবাক না হন।

রাইসু আমার সঙ্গে আমার সৈয়দপুরের বাসায় গিয়েছিল। সেবার আমরা নানান জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছি। ডোমার উপজেলায় আমার নানাবাড়িতেও গিয়েছিলাম। তাছাড়া গিয়েছিলাম রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। ঠাকুরগাঁওয়ে সিংরা ফরেস্ট নামে একটি শালবন আছে। সেই বন রাইসুর ভালো লেগে গেল। আমরা কান্তজীর মন্দিরও দেখতে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ে রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পর আমার বাবা রাইসুকে হারমোনিয়াম সহযোগে অনেকগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শুনিয়েছিল। রাইসুও দুয়েকটা গাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এখনও বাবা ঢাকায় এলে জিজ্ঞেস করেন, ব্রাত্য রাইসু কেমন আছে? ও কি ওরকমই আছে? আমি বলি, ওরকমই আছে। বলতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, ২৩-২৪ বছর ধরে একটা লোক সম্পর্কে কত অনায়াসে আমি শব্দটা প্রয়োগ করতে পারছি।

ইত্যবসরে রাইসুর জীবনাচরণে পরিবর্তন খুব অল্পই এসেছে। তফাতের মধ্যে তার চারপাশের ঢাকা শহরটা বদলে গেছে। বদলে গেছে সামাজিক মেলামেশার ধরন। এখন মেলামেশাটা ভার্চুয়াল জগতেই বেশি হয়। রাইসু এই জগতের অতিসক্রিয়দের একজন। তাতে একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন এই হয়েছে যে, রাইসুর পরিচিতি ঢাকার বাইরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর দ্বিতীয়ত এই ভার্চুয়াল জগতে রাইসুর উপস্থিতি একটি লিখিত বা টেক্সুয়াল উপস্থিতি। রাইসু তখনই অস্তিত্বশীল যখন সে কোথাও কোনো দেয়ালে কিছু লিখছে। এই প্রকারে রাইসু একটি সাব-কালচারের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। অনেকে মনে করেন, এই সাব-কালচার মূলত রাইসুর ভাষাভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। আমি বলবো, ব্যাপারটা শুধুই ভাষাভঙ্গির নয়। রাইসুর বক্তব্যের কনটেন্টই এই সাব-কালচারের মূল চালিকাশক্তি। এই কনটেন্টের একটি স্পর্শযোগ্য বস্তুগত রূপ দেখতে পাওয়া যায় কুতর্কের দোকানের মধ্যে। আমি মনে করি, কুইন্টিসেনশাল রাইসুকে খুঁজে পাওয়া যাবে কুতর্কের দোকানের পোস্টগুলোর মধ্যে। এগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার।

মোহম্মদপুর, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭

Categories
কবিতা

বহুগামী কবিদের টাইডাল ওয়েভ

বুঝছো—তুমি একটি বারই ব্রেক আপ করবা
বয়ফ্রেন্ড ছেড়ে আইসা পড়বা
বিকালের আগেভাগেই।

এরপর আমরা দুইজন মিলা
ঘুরতে থাকব ছন্দে
ডানে তাকাইব আনন্দে আর বামেও তো
একই আনন্দ।

শাহবাগেই কত পরীরা ঘুরছে,
ওরা ছোট কবিদের বন্ধু,
তোমারে ছাড়াও ওদের সঙ্গে করব—
বেংলা কবিতার মায়রে চুদব
পেয়ারার গাছে দাঁড়কাক আছে
চোদাচুদিময় বাংলা!

মেয়েদেরই দিকে তাকাইয়া থাকব, আমরা—
অন্য কারো কি এসব ব্যাপারে মতামত নিব,
কামু কী বলেন আপনি?

১৪/৬/২০১৫

Categories
গল্প

মজিব কই রইলা রে

মজিব কই রইলা রে বাংগালিগো থুইয়া
বাংগালিরা মরতে আছে ছিডা গুললি খাইয়া
মজিব কই রইলা রে!

এইটা একটা গানের শুরু। মতলবের ছেঙ্গার চরে নানাবাড়িতে গিয়া শোনা এই গান। ১৯৭৪ সালে। বড় মামা আওয়ামী লীগের এমপিগিরি করতেন তখন। আগে শেখ মুজিবের লগে জেল খাটছেন কয়েকবার। নারায়ণগঞ্জে বিস্তৃত বাড়িতে বসবাস করতেন। আম্মার লগে মনে হয় দুই বার গেছিলাম ওই বাড়িতে। ‘৭৫-এর আগে। চাকর বাকর আর সরকারে ঠাসা বাসা। দেখতাম মামার ছোট ছেলে মুখ আর হাতভরা খাবার খাইতে খাইতে রুমের পর রুম থপ থপাইয়া দৌড়ায়। পিছনে চাকরের দল। আমরা গরীব মানুষের নিরব ছেলের মতো শান্ত যাইতাম ওই বাসায়।

আমার শার্ট আর হাফপ্যান্ট আম্মা হাতে চলা সিঙ্গার শিলাই মেশিনে তৈরি করতেন। আরো পরে, ক্লাশ সেভেনে পড়ার সময়ে, ১৯৮০ হবে বা, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধর্লা নদীর পারে ধর্লা নামের গ্রামে একবার আমার ফুপুর টাঙ্গাইল শহরে বসবাস করেন এমন আত্মীয়রা আমার এই হাতে বানানো শার্ট পরা লইয়া কিছু হাসাহাসি করছিলেন। আমি তখন দিনে-দুই-বই-শেষ-করা লেখকম্মন্য পাঠক। ওই বাড়িতে পাওয়া কৃষণ চন্দরের আমি গাধা বলছির অনুবাদ পড়তাম আর বিকালে যাইতাম নদী দেখতে। ফুপুর দেবররা ঢাকার সদরঘাট বাংলাবাজারে প্রুফ দেখতেন একটা সময়। হয়তো সে কারণেই অনুবাদ সাহিত্যের এই ধর্লা ভ্রমণ। তো নদীপাড়ে গেলেই আমার মনে পড়তো “তোমার বগা বন্দি হইছেন ধর্লা নদীর পারে রে!…”

তো ধললা নদী–ওই নামেই পার হইতাম নদী, যখন এলাছিন নাগরপুরে যাইতাম। ফলে হাসি আমারে ধরাশায়ী করতে পারে নাই। আমার সেই আমলের একটা ড্যাবডেবা ফটো আছে। খুঁইজা পাইতে হবে।

মুজিব যেদিন মারা যান সেদিন কী কারণে জানি না ছোট মামা আমাদের বাড্ডার বাসায় আছিলেন। বাড্ডায় আমাদের বাসাটা থাকতো রাস্তার পাড়ে।

শীতে কয়েক ইঞ্চি পুরা ধুলার রাস্তায় অল্প গাড়ি চলতো আর গরমে প্যাক আর প্যাক। তাতে মানুষের পায়ের ছাপ গিজগিজ করতো। আর কাদার মধ্যে কী একটা গাছের বেগনি রঙের ফুল পইড়া থাকতো। বাসার চারদিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া। পাশে বড় খালাম্মাদের বাসায় যাওয়ার জন্য খোলা জায়গা। এই বেড়া দেওয়ার সময় কামলা নেওয়া হইত। আব্বা তাদের সঙ্গে কাজ করতেন। তারা বাঁশ কাইটা বেড়া গাঁথলে পরে বাঁশের খুঁটি গাইড়া তাতে বেড়া লাগানো হইত। দুপুরে কামলারা খাইতে গেলে আব্বা আমারে রাস্তার ধারটায় দাঁড় করাইয়া ভিতর থিকা বেড়ার ফাঁকেতে তার দিতেন, আমি খুঁটির দূরত্ব আন্দাজ কইরা তার ফেরত দিতাম। আমরা তার বলতাম, আমার খালাত ভাইরা বলতো গুনা।

পেয়ারা গাছ থাকত একটা উঠানের পাশে, চাপকলটা থাকত তার নিচে। বরই গাছও একটা, বাড়ির সামনে ছিল, রাস্তা ঘেইষা। যুদ্ধের পরে যখন আমরা কুমিল্লা থিকা ঢাকায় আসলাম তখন আমার খালাতো ভাইবোনরা সবাই সার বাঁইধা ওই বরই গাছের নিচে দাঁড়ায় ছিল, যতদূর মনে পড়ে। তবে বরই গাছ নিজেও তখন ছোটই ছিল।

কাঠের একটা চেয়ার পাইতা রেডিও শুনতেছিলেন মামা। এর আগে ছোট খালাম্মা আর উনি মিলা একদিন দরজার দুই পাল্লায় চাপা দিয়া একটা বিড়াল মারছিলেন। বিড়ালের মরণ চিৎকারে আমরা ভাইবোনরা সন্ধ্যার পড়া থুইয়া হত্যাদৃশ্য দেখতেছিলাম। অনেক আনন্দ নিয়া ওনারা বিড়াল মারতেছিলেন। বিড়াল যতই ছটফটায় ওনারা দরজার পাল্লা শক্ত কইরা ধইরা ছিলেন, ছাড়েন নাই। মরার পরে প্রাণহীন বিড়াল দরজা থিকা ঝইড়া মাটিতে পড়ছিল। আমাদের বাসায় ছিল টিনের চাল, ফ্লোর মাটির, মাঝে মাঝে তা লেপা হইত। লেপলে মাঝারি মাঝারি বৃত্ত তৈরি হইত মেঝেতে। গোবর মেশানো কাদামাটির একটা গন্ধ তখন থাকত। সে আমলে এবং পরে আরো বহুদিন আমি ঘরের চালে উইঠা দূরের বর্ষা দেখতাম।

তো ছোট মামা উঠানে রৌদ্রের মধ্যে কাঠের চেয়ারে বইসা রেডিও শুনতেছিলেন। হঠাৎ শেখ মুজিবের হত্যাসংবাদ শুইনা চিৎকার দিয়া কান্দা শুরু করলেন। চোখ দিয়া পানি পড়তে ছিল তার।বয়স্ক লোকদের কান্না, এখনও দেখছি, কসমিক হতাশা তৈরি করে আমার মধ্যে। আর আমি তো তখনও বাচ্চা। তার কিছু দিন আগে আমার খালাতো ভাই মোহাম্মদ আলী ও লিয়াকত আলী শেখ মুজিবের লগে হ্যান্ডশেক কইরা আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব বাড্ডাতেই কোথাও খেলাঘরে আসছিলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে হাত মিলাইতে। আমি কেন যে খেলাঘরে ভর্তি হইছিলাম না তখন তা নিয়া দুঃখবোধ হইছিল। খালাতো ভাইরা কথা দিছিল, এরপরে প্রধানমন্ত্রী আসলে আমারে হ্যান্ডশেক করতে নিয়া যাবে। ছোট মামার আহাজারি দেইখা বুইঝা ফেললাম এই জীবনে আর শেখ মুজিবের লগে দেখা হইতেছে না।

শৈশবের অপ্রাপ্তিজনিত দুঃখবোধ আমার আরেকবার হইছিল। সেইবার গেছিলাম দাদাবাড়িতে। কুমিল্লার বাশরা গ্রামে।আমি তখন বোধহয় ক্লাশ টু কি থ্রিতে পড়ি। স্কুলের ছুটিতে গ্রামে গেছি। মাসখানেক ছিলাম কি সেইসময়? সবচেয়ে খারাপ লাগতো সূর্য না ওঠা। আর পুকুরে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে হইত। বিকালেও সূর্য নাই। সেই সময় একদিন আমি আর আরেকটা ছেলে–নাম খাইয়া ফেলছি–টিনের চালে উইঠা শিম পাড়তে ছিলাম। নতুন টিন। পিছলা। এক সময় সঙ্গের ছেলেটা পিছলাইয়া স্লো মোশনে ঘরের চাল থিকা মাটিতে পইড়া গেল। পইড়া অজ্ঞান। তো লোকজন করলো কী ওরে ধইরা নিয়া পাশের পুকুরের পানিতে ফেলাইয়া দিল। পানিতে পইড়া সাতরাইতে সাতরাইতে ওর হাড়গোর ঠিক হইয়া থাকবে। ও সাতরাইয়া উল্টা পাশে গিয়া উঠলো।

সে সময়ই মনে হয়, একদিন আমি দাদির সঙ্গে গেছি কোনো এক আত্মীয়ের বাসায়। পাঁচ ছয় মাইল দূরে। দাদি আর আমি হাঁইটা হাঁইটা যাইতাম। অনেক ক্ষেত, রাস্তা, আইল, নদী, খাল, চক পার হইয়া আমরা যাইতাম। একদিন ওইখানে ছিলামও। গ্রাম আমার ভালো লাগতো না। বিষণ্ণ লাগতো। পরদিন ফিরা আইসা শুনি আব্বা আসছিলেন। আমারে না পাইয়া আবার চইলাও গেছেন। আমি এই ঘটনায় অনেক দুঃখ পাইছিলাম। একটা বিস্কুটের প্যাকেট আব্বা নিয়া আসছিলেন আমার জন্য। আমি সেই প্যাকেট হাতে নিয়া ফোপাইতে ফোপাইতে অনেক কানছিলাম। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় বাচ্চা বয়সের দুঃখ অনেক গভীর, শারীরিক। কারণ বাচ্চাদের কোনো ওয়ে আউট থাকে না। দুঃখে বাচ্চাদের গলা আটকাইয়া যায়।

তো মুজিবের মৃত্যুর পরে বড় মামা নিঃশেষ হইয়া গেছিলেন। অন্য মামাদেরও দাপট কমতে থাকে। উনি আর দল বদল করেন নাই। পরে আওয়ামী লীগেরও কৃপা তিনি কেন জানি পান নাই আর।

মামারা লঞ্চ ভাড়া কইরা নারায়ণগঞ্জ ঘাট থিকা মতলবের ছেঙ্গার চরে যাইতেন। চুয়াত্তরে ওনাগো লগেই গেছিলাম আমরা–আমরা ভাইবোন তখন ছিলাম তিনজন; আর আম্মা। আব্বা ছুটিতে আসবেন। লঞ্চের জানালা থিকা নদীর ঘোলা ঘোলা পানি দেখতাম যাইতে যাইতে। আর ভট ভট শব্দ। লঞ্চ গজাইরা পার হইয়া ছেঙ্গার চর বাজারে ভিড়ত, ছোট মামা টুপ কইরা নাইমা যাইতেন। আর সবাই লঞ্চে বইসা থাকতাম। লঞ্চ অতি ধীরে ঘুইরা উল্টাপার্শ্বে আসলে দেখতাম মামা বাজারে পাবলিক মোলাকাত সাইরা লঞ্চে উইঠা আসছেন। তখন জিনিসটা বিভ্রম লাগতো। কেমনে যে উনি ডাঙায় নাইমা আবার লঞ্চে উঠতেন তা বেশ যেন হয় নাই হয় নাই লাগতো। আমি তো তখনও পৃথিবী গোল হইলে যে বাজারে নাইমা আবার চলন্ত লঞ্চেই উইঠা পড়া যায় তা জানতাম না। তো মামা নাইমা আবার কীভাবে লঞ্চে উঠলেন শৈশবের সেই বিস্ময়রে বয়স্ক লোকরা পাত্তা দিত না। ওই সময় অনেক দিন ছিলাম নানাবাড়িতে। তখন এই গানটা শোনা হইত। সকালের দিকে রোদ একটু উঠলে গানটা গাইত ছেলেটা। নিজে নিজেই। কেউ শুনতোও না সেইভাবে। পোলিও হইছিল বোধহয় ওর। উঠানে মাটিতে রাখলে ঠাণ্ডা লাগবে ভাইবা বোধহয় ঘরের চালে রইদে দিয়া রাখতো ওরে। ওইখানেই গানটা গাইত।

মামারা নাকি যুদ্ধের পরে রাজাকার ধইরা পুকুরে চুবাইয়া মারতেন। চুয়াত্তরে শোনা। বড় মামার ভোটের উপলক্ষে নানাবাড়িতে গেছি। মামারা হ্যাজাক জ্বালাইয়া নির্বাচনী আবহাওয়ায় বইসা থাকতেন। আমরা বাচ্চারা ঘরের কার থিকা দুর্ভিক্ষের টাইমে সাহায্য হিসাবে আসা স্বাস্থ্যবান ফুটা ফুটা বিদেশী বিস্কুট চুরি কইরা খাইতাম আর পটকা নিয়া উঠানে ফুটাইতাম। তেমন একদিন সন্ধ্যাবেলায় বন্দুক পরিষ্কার করতে ছিলেন মামার এক চাচাতো ভাই। তাদের ঘরের বারান্দায় বইসা। ওনার নাম বোধহয় ছিল মোস্তফা। তো তার বন্দুক থিকা গুলি বাইর হইয়া এই মামার—ফেরদৌস মামা– উরুতে গিয়া লাগে। পরে বস্তা বস্তা পাহাইড়া লতা চটকাইয়া তার রস দিয়া রক্ত বন্ধ করতে হইছিল।

একটা ঘটনা নিয়া বেশ উত্তেজনা হইছিল তখন। বাড়ির পাশ দিয়া যে খাল গেছে তার মধ্যে খাটা পায়খানা আছিল একটা। পানি বেশ নিচুতে। দুই পাশে ঝোপঝাড়। বাঁশগাছ। পাশাপাশি ফেলায় রাখা দুইটা মোটা বাঁশ দিয়া সেইখানে পৌঁছাইতে হইত। দুই কামলা মহিলারে কে জানি দেখছিল পায়খানা থিকা এক লগে বাইরাইতে। তা নিয়া বেশ উত্তপ্ত অবস্থা। আমরা বুঝতে পারি নাই এই নিয়া এত উত্তেজনা করার কী আছে!

বাড়ি থিকা একটু দূরে কবরস্থানে গেছিলাম একদিন। নানা-নানির কবর দেখতে। ওই একবারই কবর দেখছি ওনাদের। নানানানি বইলা কোনো স্মৃতি বা সম্পর্কের বোধ তৈরি হয় নাই আমার মধ্যে কখনো। তবে সৎ নানি আছিলেন একজন। কেউ একজন জ্বিনের গল্প করছিল। যে জ্বিনরা নাকি বাড়ির এক কোনা থিকা কবরস্থানে উইড়া আসে বরই কাঁটা হইয়া। এর পরে অনেক দিন আমি ভাবতাম যে আমি নিজেই বরই কাঁটা উড়তে দেখছি কবরস্থানের দিকে।

তো ওই গায়ক ছেলেটার নাম আর মনে নাই আমার। গানটার বাকি লাইনগুলাও। এই গানটা আমার খুব প্রিয় একটা গান। শেখ মুজিবের নামও ঐ প্রথম শোনা। এখন তো ঐ নাম তেমন শোনা যায় না আর। এখন কেবলই বঙ্গবন্ধু।

২.
একদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ থিকা নামতেছি শাহবাগ যাব। সিঁড়িতে গান গাইতেছিলাম ‘মজিব কই রইলা রে’…

তো আমি তো বুঝি নাই নিচে হলরুমে সামওয়ান মুজিব একজন বইসা থাকবেন। উনি এই গান শুইনা ব্যক্তি আক্রমণ হিসাবে নিবেন। আর আমারে সেই দিনই শাহবাগে, সিলভানায়, ছোট গল্পকার সেলিম মোরশেদ আর ছোট কাগজ গাণ্ডীবের প্রকাশক হোসেন হায়দার চৌধুরীর সামনে ঘুষাইতে থাকবেন। তা বেশ আগের দিনের কথা। ১৯৮৯ সালের। ইশতিয়াক মুজিব অনেক দিন থিকাই কানাডায়। উনি বেশ লম্বা ছিলেন। ফলে তেরছা ঘুষি কম কম আঘাত করছিল আমারে।

৩.
১৯৮৯ সালেই বোধহয় আনোয়ার শাহাদাতের আসেদিনযায় পত্রিকায় প্রকাশিত একটা লেখার কারণে আমার বন্ধু ফাকরুল ইসলাম চৌধুরীর ফাঁসির দাবিতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের মিছিল হয় শুক্রবার বাদ জুমা। ফাকরুল তখন অবস্থা রেকি করতে ইসলাম চৌধুরী নাম ধইরা গোলাম আযমের লগে সাক্ষাৎ কইরা আসছে। এবং ঢাকার খারাপ অবস্থায় সিলেট চইলা গেছে। আমার একদিন পরে যাওয়ার কথা। আমি অগ্রিম টিকেট কাইটা আইসা শাহবাগে বইসা আড্ডা দিয়া রাতে বাসায় ফিরছি। বাসায় গিয়া দেখি ট্রেনের টিকেট আর পাই না। সাজ্জাদ ভাইরে ফোন করলাম। যে ভুলে ওনার বইপত্রের লগে টিকেট গেছে কিনা। উনিও এই টিকেট দেখেন নাই। পরে ভোর চাইরটার সময় খুঁজতে আসছি শাহবাগে টিকেট–যদি পাই! দেখি নর্দমায়–পানিতে–ভাসমান–টিকেট–স্থির। হিঃ হিঃ, টিকেট ধুইয়া আমি কমলাপুর রওনা দিছিলাম। তখন ঐ সকালে বা আরো পরে ঐ একই জায়গায় এক টোকাইরে দেইখা বাক্যালাপের ইচ্ছা হইল। আমি জিগাইলাম–কারণ তখন অনেক এক্সপেরিমেন্ট আমার–আইচ্ছা বলো দেখি ‘সাহিত্য’ কারে বলে? সেই টোকাইর বাচ্চা টোকাই বলে কী: “সাহিত্য অইল–তোমার বাসা কোথায়?”!

ঢাকা, ৭/২/২০১১ – ৬/৩/২০১১