Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

মেল চক্করে রাইসু

কবি, বুুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, আর্টিস্ট ব্রাত্য রাইসু আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড, ফেসবুকে আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ৪ কি ৫ বছর।

এই নভেম্বরের শুরুতে রাইসু এক স্ট্যাটাসে জানাইল যে নভেম্বরের ১৯ তারিখ তার বয়স ৫০ বছর পার হবে; মনে পড়ল, নভেম্বরের ১৬ তারিখ আমার বয়স ৫২ পার হবে। রাইসু তার স্ট্যাটাসে জানায় যে সে তার পঞ্চাশ পূর্তিতে ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খুলতে চায় যাতে তার বন্ধু ও পরিচিত জনেরা তাকে নিয়া কিছু লেখা-জোখা করতে পারে।

স্ট্যাটাসটা দেইখা ঠোঁটের দুই কোনায় একটা বাঁকা হাসি খেইলা গেল, মনে হইল, হ, রাইসুর ৫০ পূর্তির এই ইভেন্টে লেখি। কিন্তু রুটি-রুজির কসরৎ আর পারিবারিক দৌড়ে লেখার ভাবনাটা আর দানা বাঁধতে পারতেছিল না, ক্রমে চিন্তাটা মাথা থিকা আউট হইয়া যাইতেছিল। অতঃপর ৯ নভেম্বর জনপ্রিয় লেখিকা ও রাইসুর ঘনিষ্ঠা নাদিয়া ইসলামের কাছ থিকা মেসেনজারে এরূপ বার্তা পাইলাম:

“হাই ফরিদ, ব্রাত্য রাইসুর ৫০ তম জন্মদিন আসছে নভেম্বরের ১৯ তারিখ। আপনি রাইসুকে নিয়ে একটা লেখা দিতে পারবেন কি? মানে রাইসুর সাথে আপনার কীভাবে পরিচয়, কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে আছে কি না বা রাইসুকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন এইসব। লেখার শব্দসংখ্যা আনলিমিটেড। লেখা দিতে হবে ১৭ তারিখের ভিতর। লেখা দিলে তার নিচে/ উপরে আপনার নাম, পরিচয়, জন্মতারিখ উল্লেখ করবেন প্লিজ। দিলে আমাকে লেখা ইনবক্স করবেন, না দিলে এই ইনবক্সের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নাই। আমার নাম নাদিয়া ইসলাম বাই দ্যা ওয়ে, আমি রাইসুর বন্ধু। আমি রাইসুর পরিচিত/ বন্ধুদের সবার লেখা পাইল-আপ করছি, যেটা ওর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে যাবে। থ্যান্কস।”

ফরিদ আহম্মেদ

এই বার্তা পইড়া আমার ঠোঁটের কোনায় আবার এক পশলা হাসি খেইলা গেল, নাদিয়াকে আমি এই উত্তর দিলাম:
“হাই নাদিয়া, থ্যাংক ইউ ফর সেন্ডিং মি দিস মেসেজ। রাইসুর ৫০ উপলক্ষে রাইসুর বিজ্ঞাপনটা পড়ার সাথে সাথেই আমার কিছু একটা লেখার জন্য মনটা আঁকাবাকা হচ্ছিল, রুটি-রুজি আর পারিবারিক ব্যাস্ততায় বিষয়টা আবার দূরেও সরে যাচ্ছিল। আপনার এই বার্তায় বিষয়টায় আরও ইনসপায়ার্ড বোধ করতেছি। আপনার দেয়া দিন সীমানার মধ্যে কিছু একটা লেখার ব্রত নিলাম, বাকিটা এলাহি ভরসা।”

জবাবে নাদিয়া একটা “Thank YOU”-র GIF পাঠাইলে আমি তাতে লাইক দিলাম।

২. পরদিন রাইসুর কাছ থিকাও এ সংক্রান্ত একটা লেখার অনুরোধ ইনবক্সে পাইলাম। যেহেতু নাদিয়ার কাছে আমি এ সংক্রান্ত করার জানায়া দিছি তাই রাইসুর মেসেজের কোনো জবাব না দিয়া এই লেখাটা কেমনে পাকানো যায় সেই বিষয়ে মনোনিবেশ করলাম।

৩. রাইসুর প্রথম স্ট্যাটাসটা পইড়া যখন লেখার ব্যাপারে মনমনাইতে ছিলাম তখনও নিশ্চিত ছিলাম না ঠিক কী আমি লেখতে পারি। নাদিয়ার মেসেজটা দ্বিতীয় বার পাঠের সময় দেখলাম ওখানে ‘কী লেখা যায়’-এর একটা গাইডলাইন আছে। ভাবলাম, এই গাইডলাইন অনুসরণে যা পারি তাই লেখি, আর এই লিখতে বসলাম।

৪. রাইসুর সাথে আমার কীভাবে পরিচয়?

যদিও ব্রাত্য রাইসুর সাথে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপ ৪/৫ বছরের কিন্তু আমরা পরস্পরকে মুখ দেখাদেখি চিনি ৮০-র দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময় থিকা। ঢাকার দূতাবাসগুলার কালচারাল সেন্টার (যেমন, ইউসিস, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, আঁলিয়াস ফ্রসেজ, গ্যাটে ইনস্টিটিউট, ইত্যাদি) ভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীগুলাতেই সম্ভবত প্রথম দেখাদেখি শুরু। যদিও দেখাদেখি হইত হরহামেশাই কিন্তু আলাপ হয় নাই তত। তারপর কবে থিকা আমরা পরস্পরকে তুমি সম্বোধন করি তাও মনে করার মত কোনো বিশেষ উপলক্ষ নাই তাই তা মনেও নাই।

উননব্বই সালে আমার এমএসসি পরীক্ষা হইয়া গেলে আমি জাহাঙ্গীরনগরের হল নিবাস সাঙ্গ করিয়া ঢাকায় স্থায়ী অস্থায়ী নিবাস নিলে পর আমার প্রায় প্রতিদিনের চক্কর ছিল পাবলিক লাইব্রেরি, চারুকলা, টি এস সি, হাকিম চত্বর , শাহবাগ, পি জি, পরে আজিজ মার্কেট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আর্ট এক্সিবিশন, ইত্যাদি। রাইসুকেও ঐ কালে দেখছি ঐসব মেল চক্করে। ইতমধ্যে রাইসু প্রকাশিত কবি, ‘গাণ্ডিব’ কবিদলে সে ঘুইরা বেড়ায়, কাছাকাছি কিন্তু প্রায় দূরে, অন্য কোন ম্যালে, অন্য কোনো ভাবধারায়।

৫. আমার নিজ বিষয়ে কতক টিকা টিক

এই কালে আমার প্রায় এরূপ ভাবধারা ছিল যে, আমার আশপাশের সব কিছু খুুব শ্যালো, কারো ভিতর কোন ডেপ্থ খুঁইজা পাইতাম না, সবাইরে মনে হইত ফাতরা, সবকিছুরে মনে হইত ফাতরামি-ইতরামি, এমনকি নিজেকেও তাই, ফলত আমি যদিওবা আশেপাশে তাকাইতাম কিন্তু কিছুই প্রায় দেখতাম না, মানে আমি আমার পরিপার্শ্ব বিষয়ে ছিলাম একান্তই অনওয়াকিবহাল, ভদ্রলোকেরা যাকে বলে ইগনোরেন্ট ঠিক তাই! যদিও আমি এসব চক্করের অনেকেরেই নামে-ধামে চিনতাম কিন্তু কারও সাথেই চিন-পরিচয় হয় নাই আরও দূর অগ্রগামী।

৬. রাইসুর সাথে আমার উল্লেখযোগ্য ঘটনা?

৬.১. রাইসুকে তখন সবচেয়ে বেশি দেখতাম সাজ্জাদ শরিফের সাথে। রাইসু সম্বন্ধে যে আমি বিশেষভাবে কিছু ভাবতাম এমন না, কিন্তু সাজ্জাদের অ্যাট্যুটুডের কোনো একটা দিক আমার বিশেষভাবে বিরক্তিকর লাগত, সেটা হৈল তার বেহুদা ঔদ্ধত্ব, এমন না যে সাজ্জাদের সাথে আমার এ সংক্রান্ত কোনো বিশেষ ঘটনা আছে, সাজ্জাদ আর আমার পারস্পরিক সম্বোধন ছিল আপনি, তো, সাজ্জাদের বিষয়ে আমার মনোভাবকে বলা যায়—এ ভেরি সাবজেকটিভ চয়েজ। এনিওয়ে, রাইসু-সাজ্জাদ যেহেতু একসাথে চলে তাই তাদের উভয়কে দেখলেই আমার কপাল কুুচকানি আসত। এমনও হইয়া থাকতে পারে যে, আমরা মনে মনে পরস্পরকে ভেঙচাইছি অনেকবার, তবে এখন এ বিষয়ে নিশ্চিত কইরা কিছুই মনে পড়তাছে না।

৬.২. পিজির নিচে বা পাবলিক লাইব্রেরিতে বা আজিজ মার্কেটে এ রকম অনেকবারই হইছে, দেখা গেল তিন-চাইরজন বা পাঁচ-ছয়জন বা সাত-আটজন বা আরও বহুজনের দাঁড়ানো আড্ডায় আমিও আছি আর রাইসুও আছে কিন্তু আজকে এইসব আড্ডার কিছু স্মৃতি শ্রুতি করতে গিয়া দেখি থিংকস আর অবলিভিয়াস।

এই সময় রাইসু কখনও কখনও বেগম আখতারের ঠুমরির কলি গাইত খেয়ালে-বেখেয়ালে, পাবলিকলি, আর বন্ধুদের, বিশেষত কিশোরীদের সাথে সাক্ষাৎ অভিভাষণ হিসাবে বলত—হোলা!

৬.৩. তারপর অনেক অনেক কাল আমাদের দেখা নাই, ২০০৫ থিকা আমি দেশছাড়া, তারপর ২০১১ কি ২০১২ তে আমি দেশে গেছি, তখন ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে বইমেলা চলতাছে আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলতাছে গণজাগরণ মঞ্চ, সেই সময়কার কোনো এক বিকাল বেলায় আমি ছবির হাটের কাছে উদ্যানে খাড়ায়া আছি, দেখি কাজল শাহনেওয়াজ, সুমন রহমান আর ব্রাত্য রাইসু এক সাথে বইমেলা থিকা ফিরতাছে, আমারে দূর থিকা দেইখা তিন জনই সখা ভাবে আগায় আসে উষ্ণ অভিবাদনে আর আমিও পুলকিত হয়ে হই বিগলিত চিত্ত। সেটাই রাইসুর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।

৭. রাইসুকে আমি কীভাবে মূল্যায়ন করি?
রাইসুর সাথে ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপের আগে রাইসুর লেখালেখি নিয়া আমার কোনো ধারণা ছিল না, তার সাথে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডশিপের পর দেখলাম রাইসু কুতর্কের দোকান চালায়, তার কবিতার পোস্টের অধিকাংশতে আমি লাইক দেই, তার অ্যাক্টিভ বুদ্ধিজীবিতায় অ্যাকশন আছে, বুদ্ধিজীবী হিসাবে সে মাঠ গরম কইরা তোলার বুদ্ধিবৃত্তি প্রদর্শন সক্ষম।

ব্রাত্য রাইসুর বুদ্ধিবৃত্তির উদাহরণ স্বরূপ তার ঢাকা ক্লাব কাণ্ডের উল্লেখ করা যায়, যে বুদ্ধিবৃত্তিক নৈপুণ্যে সে ঢাকা ক্লাব কাণ্ডের উপস্থাপন ঘটাইছে, যে টান টান সার্কাস্টিক আমেজ শুরু থিকা সমাপ্তি অবধি তাল লয় সহকারে খেলা করাইছে তাতে আমি বিগ অপেরা দেখার আনন্দ উপভোগ করছি, অবশ্য এ রকমও কয়েকবার মনে হইছে যে মাজুল প্রতিপক্ষের নিষ্ক্রিয় অন্তর্ধানে অপেরাটা বিগ শো-য়ের কতক স্ট্রিং মিস করছে।

৮. ব্রাত্য রাইসুর ৫০ উত্তর আভিযাত্রায় শুভকামনা।

Categories
বিষয় ব্রাত্য রাইসু

কুইন্টিসেনশাল রাইসু

১৯৯৪ সালের গোড়ার দিকে একটা জিনিস আমি মনে মনে বুঝে নিয়েছিলাম: সাহিত্য করতে হলে সাহিত্যসমাজের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেই তরুণদের সঙ্গে, যারা নতুন ধরনের সাহিত্য তৈরির চেষ্টা করছে। আমার জন্যে সেটা খুব কঠিন ছিল।

আমি তখন চারুকলা ইনস্টিটিউটে (এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হয়েছি। থাকি জগন্নাথ হলে। বৃহত্তর সাহিত্য সমাজের সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। সেই যোগসূত্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে একদিন সন্ধ্যারাতে আমি যখন উপযাচিত হয়ে এগিয়ে গেলাম শাহবাগের আজিজ মার্কেটে সন্দেশের বইয়ের দোকানের সামনে ফুটপাতে আড্ডারত কয়েকজন তরুণের দিকে, তখন ওই তরুণদের একজন ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে।

শিবব্রত বর্মন

রাইসুর তখন কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল। ফুলহাতা শার্টের হাতা এলোমেলো গোটানো। এই ব্যাপারটা আমার বিশেষভাবে চোখে পড়েছিল। শার্টের হাতা ওইভাবে কাউকে কখনও গোটাতে দেখিনি আমি। পায়ে স্পঞ্জের চপ্পল। প্যান্টের নিচটা গোটানো। এই বেশভূশার সঙ্গে একেবারেই বেমানান ছিল তার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতপ্রীতি। থেকে থেকেই সে কুমার গন্ধর্বের কোনো একটা কলি উচ্চৈস্বরে গেয়ে উঠতো। মাঝে মাঝে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হতো ওই সময়ের জনপ্রিয় হিন্দি গানের কলি “লোয়ে লোয়ে আজা আজা মারি।” আমার চোখে এরকম একজন তরুণ ছিল টোটালি আনপ্রেডিকটেবল। ওইদিন একগাদা বই হাতে দাঁড়ানো আমাকে উদ্দেশ করে রাইসু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনে কী পড়েন?’

আজিজ মার্কেট রেগুলারদের মধ্যে রাইসুর সঙ্গে দ্রুতই আমার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। এটা একটু অসম বন্ধুত্বই ছিল বটে। কেননা, শাহবাগে ওইসময় তরুণদের মধ্যে লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার যে স্পন্দন ছিল, তার কোনোকিছু তখনও আমার মধ্যে তৈরি হয় নি। আমার সাহিত্যরুচি তখন দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রশাসিত। রাইসু আমার ঠিক বিপরীত। সে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমি বলব, ওইসময় ওই বর্গের মধ্যে রাইসুই ছিল সর্বান্তকরণে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আমার পরিচিতজনদের মধ্যে সে-ই একমাত্র ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করতে গিয়ে যে কোনো সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা করে নি। আর বিশেষ করে মানুষে মানুষে দৈনন্দিন সম্পর্ক তৈরিতে ক্ষমতাকাঠামোর যে ছায়া পড়ে, তা পরিহারে সে বিশেষভাবে যত্নবান ছিল। এর একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটতো বয়স নির্বিশেষে এক প্রজন্মের সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করার মধ্যে। বয়সে আমি তার চেয়ে বছর পাঁচেক ছোট হলেও সে আমাকে আপনি করে বলে।

রাইসুর সঙ্গে টই টই করে রিকশায় ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ানো আমার নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। মাঝে মাঝে আমি সকালবেলা বাসে করে রাইসুর মধ্যবাড্ডার বাসায় চলে যাই। সেখানে তার নতুন কেনা ঢাউস সাইজের গান শোনার যন্ত্রে আমরা খানিকক্ষণ মল্লিকার্জুন মনসুর বা ওঙ্কারনাথ শুনে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি গুলশানের দিকে। তখন ঢাকা শহরে ভিআইপি রোড বলে কিছুই ছিল না। আমরা রিকশায় করে যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। মাঝে মাঝে রাইসু আমার জগন্নাথ হলের রুমে এসে হাজির হতো। দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা ছেড়ে আমি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। আবার কখনও কখনও সে চারুকলায় গিয়ে আমাকে ক্লাসরুম থেকে বের করে আনতো। কত কত লোকজনের বাসায় যে রাইসু যেত। শান্তিনগরে মঈন চৌধুরীর বাসা, রাজারবাগে তীব্র আলীদের বাসা, বাংলা মোটরে আহমদ ছফার বাসা ইত্যাদি। মনে পড়ে রাইসুর সঙ্গে একবার হুমায়ুন আহমেদের এলিফেন্ট রোডের বাসাতেও গিয়েছিলাম। কেন যাওয়া হয়েছিল, এখন আর মনে পড়ছে না।

ওই সময় আমাদের যাওয়ার আরেকটা জায়গা ছিল গ্যাটে ইনস্টিটিউট। ফিল্ম সোসাইটিগুলি তখন দারুণ সক্রিয় ছিল। তারা নিয়মিত ছবি দেখাতো। ফেলিনি, ত্রুফো, গদারের ছবি দেখে গ্যাটে ইনস্টিটিটিউটের ছাদে চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে অভ্যাগতরা ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ঘরানা ও প্রবণতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতেন। সেই পরিবেশে রাইসুর উপস্থিতির সঙ্গে আমি মিল খুঁজে পেতাম দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে উপন্যাসের লর্ড হেনরি চরিত্রটির। লর্ড হেনরি লন্ডন শহরের ভিক্টোরিয়ান কালচারকে কটাক্ষ করতেন। রাইসু তার সময়কার কালচারের নির্মম ক্রিটিক করতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কটাক্ষের লক্ষ্যবস্তু হতো যাবতীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং তাদের সাহিত্যতত্ত্ব। সে সময় দেরিদা আর ডিকনস্ট্রাকশন শব্দগুলো আজিজ মার্কেটের করিডোরে খুব ধ্বনিত হতো।

আমার সঙ্গে রাইসুর যখন পরিচয়, তখন রাইসু মঈন চৌধুরী সম্পাদিত লিটল ম্যাগ প্রান্ত-এর দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার জন্য উপকরণ সংগ্রহ করছে। আমাকে সে হাইডেগার অনুবাদ করতে দিলো। আর বললো, গল্প দেন। প্রান্ত ম্যাগাজিনে আমার গল্প ছাপা হয়েছিল। তাতে লিটল ম্যাগাজিনের ওই সময়কার ভাষাভঙ্গির অনেক ছাপ ছিল, বুঝতে পারি।

পরিচয়ের মাসখানেকের মধ্যে আমাকে একবার গ্রামের বাড়ি যেতে হয়েছিল। ট্রেনে যাবো। রাইসুকে বলামাত্র সে বললো সেও যেতে চায়। আমি বাড়িতে চিঠি লিখে দিলাম যে, এবার আমার সঙ্গে ঢাকার একজন কবিবন্ধু থাকবেন। কাজেই বাসাটা যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাফসুতরো দেখায় এবং আমার বন্ধুর অপরিপাটি বেশভূশায় তারা যেন অবাক না হন।

রাইসু আমার সঙ্গে আমার সৈয়দপুরের বাসায় গিয়েছিল। সেবার আমরা নানান জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছি। ডোমার উপজেলায় আমার নানাবাড়িতেও গিয়েছিলাম। তাছাড়া গিয়েছিলাম রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। ঠাকুরগাঁওয়ে সিংরা ফরেস্ট নামে একটি শালবন আছে। সেই বন রাইসুর ভালো লেগে গেল। আমরা কান্তজীর মন্দিরও দেখতে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ে রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পর আমার বাবা রাইসুকে হারমোনিয়াম সহযোগে অনেকগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শুনিয়েছিল। রাইসুও দুয়েকটা গাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এখনও বাবা ঢাকায় এলে জিজ্ঞেস করেন, ব্রাত্য রাইসু কেমন আছে? ও কি ওরকমই আছে? আমি বলি, ওরকমই আছে। বলতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, ২৩-২৪ বছর ধরে একটা লোক সম্পর্কে কত অনায়াসে আমি শব্দটা প্রয়োগ করতে পারছি।

ইত্যবসরে রাইসুর জীবনাচরণে পরিবর্তন খুব অল্পই এসেছে। তফাতের মধ্যে তার চারপাশের ঢাকা শহরটা বদলে গেছে। বদলে গেছে সামাজিক মেলামেশার ধরন। এখন মেলামেশাটা ভার্চুয়াল জগতেই বেশি হয়। রাইসু এই জগতের অতিসক্রিয়দের একজন। তাতে একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন এই হয়েছে যে, রাইসুর পরিচিতি ঢাকার বাইরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর দ্বিতীয়ত এই ভার্চুয়াল জগতে রাইসুর উপস্থিতি একটি লিখিত বা টেক্সুয়াল উপস্থিতি। রাইসু তখনই অস্তিত্বশীল যখন সে কোথাও কোনো দেয়ালে কিছু লিখছে। এই প্রকারে রাইসু একটি সাব-কালচারের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। অনেকে মনে করেন, এই সাব-কালচার মূলত রাইসুর ভাষাভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। আমি বলবো, ব্যাপারটা শুধুই ভাষাভঙ্গির নয়। রাইসুর বক্তব্যের কনটেন্টই এই সাব-কালচারের মূল চালিকাশক্তি। এই কনটেন্টের একটি স্পর্শযোগ্য বস্তুগত রূপ দেখতে পাওয়া যায় কুতর্কের দোকানের মধ্যে। আমি মনে করি, কুইন্টিসেনশাল রাইসুকে খুঁজে পাওয়া যাবে কুতর্কের দোকানের পোস্টগুলোর মধ্যে। এগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার।

মোহম্মদপুর, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭

Categories
স্মৃতি

আওয়ার ছফা অ্যান্ড আজাদ

sofaazad
ছবিতে পাশাপাশি হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ ছফা

আমি ছফা আজাদ দুইজনরেই পছন্দ করি–করতাম। আজাদের বাসায় একাধিকবার গেছি। মেইনলি ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্যে। এছাড়াও গেছি। একবার মনে আছে, বিকালের দিকে, বোধহয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের দিকে হাঁইটা ওনাদের কলোনি পার হইতেছিলাম আমি আর সাজ্জাদ শরিফ ভাই। তখন আমি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে উপন্যাস লিখি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়– যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক। সাজ্জাদ ভাই ভোরের কাগজে আছেন। তো স্যার–স্যার নামেই ডাকতাম ওনারে–আমাদের দেখতে পাইলেন রাস্তায়। বললেন, কী ব্যাপার তোমরা! এখানে কী করছো! ওনার কণ্ঠস্বর, ‘এখানে কী করছো’ ভালো লাগল না আমার।

আমি বললাম, স্যার বিকাল বেলা মেয়ে দেখতে বাইর হইছি!

উনি প্রথমে অপ্রতিভ হইলেন–পরে সপ্রতিভ হইয়া হাইসা ফেললেন। বললেন কী বলো এগুলো, ওরা তো আমাদের মেয়ে! আমি বললাম, হ্যাঁ স্যার, ওদেরই দেখতে বাইর হইছি!

উনি বললেন, চলো, কাজ না থাকলে বাসায় চলো। আমরা ওনার বাসায় গিয়া চা বিস্কুট খাইলাম।

হুমায়ুন আজাদ স্যার সাবলীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ওনার সঙ্গে নানান জায়গায় দেখা হইত। প্রধানত আজিজ মার্কেট শাহবাগে। উনি সাদা কেডস, নেভি ব্লু জিনস আর সাদা টি শার্ট বা কখনো হাফ শার্ট পইরা আসতেন। আমারে আর সাজ্জাদ ভাইরে পারতপক্ষে ঘাটাইতেন না।

আমি ওনার একটা সাক্ষাৎকারের বই নিয়া একটা আলোচনা লিখছিলাম বাংলাবাজার সাময়িকীতে, ১৯৯৪ বা ৯৫-এ। বইটা যে পড়ি নাই তখনো তার উল্লেখ আছিল আলোচনায়। (সে বই অবশ্য এখনো পইড়া উঠি নাই। পড়মু।) সাক্ষাৎকারদানকারীদের ও ওনার চশমার বর্ণনা, কে কার দিকে চাইয়া আছে প্রচ্ছদে সে সব লিখছিলাম। উনি পইড়া খুশি হইছিলেন। বলছিলেন, তুমি না পড়েই যা লিখেছো, ওরা তা পড়েও লিখতে পারবে না।

ওনার অনেক গল্প আছে, আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বইলা সব মনে পড়ে না। সাজ্জাদ ভাইয়ের দেখছি অনেক কিছু মনে আছে। ওনারে জিগাইলে আবার আমারও মনে পড়বে। তেমন মনে পড়া ঘটলে আরো লিখব। ছফা-আজাদ দুই জনেরই আদর্শবাদ আছিল। যে যে আদর্শের তার কাছে তাঁর তাঁরটা হয়তো ভালো লাগবে। আমার আদর্শবাদ ওইভাবে কখনোই ছিল না। দুইজনের সঙ্গেই আমি মিশতে পারতাম। তবে ছফা ভাই যেমন পুত্রবৎ জ্ঞান করতেন আজাদ তেমন করতেন না–তিনি জ্ঞান করতেন ছাত্রবৎ। কিন্তু আমি কখনোই তার ছাত্র তো ছিলাম না, বৎও ছিলাম না। কোনো একটা ইন্টারভিউতে আমাদের ফাজিল সম্বোধন করছিলেন আজাদ স্যার। আমরা–অন্তত আমি তাই ছিলাম। এখনও আছি। ভদ্রলোকদের অফাজিল ভদ্রতার মায়রে বাপ!

১৯/৭/২০১৩